আপুমনিরা সিজার ও নরমাল ডেলিভারি নিয়া কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা অবশ্যই পড়বেন

0
935
সিজার , নরমাল ডেলিভারি

বিষয়টা হইলো সিজার ও নরমাল ডেলিভারি নিয়া! আপনি কখনও শুনেছেন হলিউড বলিউডের কোনো নায়িকার সিজার কইরা বাচ্চা হইছে? আত্মীয় স্বজন বন্ধু বান্ধব যারা ইউরোপ আমেরিকায় বউ নিয়া থাকে তাদের বউয়েরও সিজারে বাচ্চা হইছে কখনো শুনেছেন? আমি শুনি নাই। ওদের বাচ্চা হইবার আগে কসাই গাইনি ডাক্তার তাদের আত্মা শুকানো ভয় দেখাইয়া বলে না যে আপনার তো পেটের পানি শুকায়া গেছে! নুচাল কর্ড (নার) প্যাঁচায়া গেছে! পজিশন উল্টায়া গেছে! বিশ্বের কোথাও দাঁড় করানো অজুহাতে পেট কাইট্টা বাচ্চা বের করেনা। অনলি বাংলাদেশে বাচ্চা জন্ম দিতে গেলে কসাই গাইনি ডাক্তারদের হাজারও অজুহাত পাবেন!

আপনাকে এই অমানুষ গুলো এমন সব ভয় দেখাবে যে আপনার অনাগত বাচ্চার সামনেই কাল্পনিক কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিবে! বলবে এ মুহুর্তে সিজার না করলে বাচ্চা বাঁচানো যাবেনা। দায় দায়িত্ব সব আপনার! এছাড়াও ডেলিভারি পেইন নিয়া ক্লিনিকে যাইবেন তো দিবো একটা ইঞ্জেকশন পুশ করে কুনো কিছু বোঝার আগে আর অমনি আপনার ব্যাথা শেষ! এইবার এই অজুহাতেও না হয় পেট কাটো!! এখন তো আবার গাইনিওয়ালারা অজুহাত ও দেখায় না। ডাইরেক্ট বইলা দেয় আমি নরমাল ডেলিভারি করাই না! কী আজব দেশ রে ভাই! এত সিজার ডেলিভারি বিশ্বের আর কোনো দেশে হয় কি??

আজকাল অনেক জাহেল মেয়েরাও কম যায় না! আগেই চুজ করে ফেলে যে সিজারে বাচ্চা নিবে। মাতৃত্বের স্বাদ পেতে একটুও কষ্ট সহ্য করবে না! এটা আরেক আখেরি জামানার নিউ ফ্যাশন, স্টাইল!! আজব এই দেশ! জন্ম নিয়ন্ত্রণ, শিক্ষার হার, বৃক্ষ রোপন, টিকা দান, শিশুমৃত্যু হার রোধ এসব কিছুতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সবুজ মার্ক পাইলেও সিজার ডেলিভারি নিয়া লাল দাগ খাইয়া বইসা আছে অনেক বছর। সরকার কিন্তু স্পিকটি নট!!! তাই স্বঘোষিত নরমাল ডেলিভারি না করনেওয়ালা কসাই গাইনি ডাক্তারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া আজ ফরজ হয়ে গেছে।

এক বন্ধুর কাছে শুনলাম আমেরিকাতে নাকি বাইশ ঘন্টা ডেলিভারি পেইন শহ্যের পরে ও ডাক্তার সিজার করে নাই। অবশেষে সুস্থ বাচ্চা হয়েছিলো এবং মাও সুস্থ ছিলো।

আমার পরিচিত এক গাইনি ডাক্তার (MBBS, DGO) পঁচানব্বই ভাগ নরমাল ডেলিভারি করাইতো বিধায় কোনো ক্লিনিক তারে নিতে চায় না। এই ডাক্তার এ ক্লিনিক ওই ক্লিনিক এ জেলা ওই জেলা ঘুইরা ঢাকার মিরপুরের এক অখ্যাত ক্লিনিকে থিতু হইছে। আমার বন্ধু কন্যার ডেলিভারি কিন্তু এই ডাক্তারের হাতেই হইছিলো নরমাল পন্থায়। সেকেন্ডবার তার বউরে আরও বড় ডাক্তার দেখাইলো (MBBS, FCPS)। অজুহাত দেখাইয়া, ভয় দেখাইয়া পেট কাইটা দিলো!! -;)

আরও পড়ুনঃ   পিরিয়ড চলাকালীন কি প্রেগন্যান্ট হওয়া সম্ভব?

এইবার আরেকটা সত্য ঘটনা (তাও ফেনীবাসি ডাক্তার বন্ধুর কাছে শোনা) বলি, ফেনীতে এক গর্ভবতী মহিলা প্রসব বেদনা নিয়া ক্লিনিকে ভর্তি হইছে। নার্সরা সাথে সাথে ওটিতে নিয়া গেছে এবং গাইনি ডাক্তাররে ফোন দিছে। ডাক্তার ফোনে কয়েকটা ইঞ্জেকশন দিতে নির্দেশনা দিয়ে জাস্ট দশ মিনিটের মধ্যে আইসা সিজার করবো বইলা ফোন রাইখা দেয়। নার্স নীচে যায় ইঞ্জেকশনের জন্য, ডাক্তারও দশ মিনিটের মধ্যে পৌঁছায়া দেখে নার্স ইঞ্জেকশন পুশ করার আগেই বাচ্চা নরমাল ডেলিভারি হয়া গেছে! ডাক্তারের গেছে মিজাজ খারাপ হইয়া! নার্সদের সে কী বকাবকি! এই বাচ্চা হইলো কেমনে? তোমরা কী করছিলা? দশটা মিনিট স্টপ করাইতে পারছিলা না?? …….!!!!!!!!!!!!! কই যাই, কই যাইবেন?? আর সেই ডাক্তাররা যদি নকল কইরা। প্রশ্ন আগেই পইড়া পাশ তাহলে কেমন সলিড সিজার হবে কল্পনা করতে পারেন????

এবার আসেন সিজার আর সিজারিয়ান অপারেশন সম্পর্কে জানি।

উদর দিয়ে জরায়ুর নিম্নাংশ কেটে বেবী বের করার পদ্ধতিই হলো সিজারিয়ান সেকশন। এর আরেক নাম হলো“হিস্টেরোটমি”। আধুনিক সিজারিয়ান সেকশন প্রথম শুরু হয় ১৮২৬ সালে ২৫ জুলাইয়ে দক্ষিন আফ্রিকার কেপ টাউন শহরে। বলা হয়ে থাকে পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশী সিজারিয়ান অপারেশন হয় চীনে। প্রতি ২ জন শিশুর ১ জন (প্রায় ৫০%) জন্ম নেয় সিজারে এই দেশে। আর সবচেয়ে কম সুইডেন আর আইসল্যান্ডে। মাত্র ১৪%। বাংলাদেশে প্রায় ২৫% শিশুর জন্ম হয় এই মাধ্যমে। এখন সারা পৃথিবীতে ইন্ডিকেশন ছাড়াইঃ অবস্ট্রেটিশিয়ানের ম্যাল্প্রাক্সিস ও মায়ের ব্যাথার ভয়- দুইয়ে মিলে সিজারিয়ান বেবী হওয়া যেন বাধ্যতামূলক হয়ে দাড়িয়েছে।

আসুন এবার জেনে নেই এই নাম কোথা থেকে আসলো। বলা হয়ে থাকে খ্রিষ্ট পূর্ব ৭০০ সালের দিকে “Lex ceasaria” নামের এক মহিলার পেট থেকে মরা বাচ্চা বের করা হয়। সবাই বিশ্বাস করেন এই মহিলার নাম অনুসারেই পেট কেটে বাচ্চা বের পদ্ধতিই সিজারিয়ান সেকশন। কিন্তু কিছু মহলের ধারনা – রোমান শাসক“জুলিয়াস সিজার” (Juius Ceasar) এর জন্ম হয় এই সিজারিয়ান সেকশনের মাধ্যমে। তাই তার পর থেকে এই পদ্ধতি তে বেবী ডেলিভারির নাম নামকরণ করা হয় ঐ বিখ্যাত সম্রাটের নামে। কিন্তু অক্সফোর্ড ডিকশনারীর মতে“Caedere” থেকে সিজার শব্দের উৎপত্তি। আর এই শব্দের মানে হলো- পেট কেটে বেবী বের করা।

আরও পড়ুনঃ   সিজার করে বাচ্চা হয়েছে? অবশ্যই জেনে রাখুন দরকারি এসব তথ্য

শাহনামা মহাকাব্যের অন্যতম গল্প “সোহরাব- রুস্তম” গল্পের অন্যতম নায়ক “রুস্তম” এর জন্ম হয়েছিল এই সিজারিয়ান সেকশনে।

মেডিকেল ভাষ্যঃ সিজারিয়ান সেকশনে যে incision দেয়া হয় তার নাম pfannensteil ইনসিশন। ১৯০০ সালে হারম্যান ফেনেনস্টেইল এই পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। তার নাম অনুসারেই এই নামকরন করা হয়েছে। পরীক্ষার জন্য এই আবিষ্কারকের নামের বানান টা শিখে যাইয়েন ভালো করে।

পুনশ্চঃ সিজার/কেচি দিয়া অপারেশন করে বলে জনগন কে ভুল বুঝাবেন না। সিজার বা কেচি লাগে সুতা কাটতে, তাই বলে পেট কাটতে না। আর একটা কথা- এক সিজারিয়ান অপারেশন আরেক সিজারিয়ান অপারেশন কে বাধ্য করে। তাই ইন্ডিকেশন ছাড়া সিজারিয়ান অপারেশন না করাই ভালো।

সিজারের পর নরমাল ভেজাইনাল ডেলিভারি সম্ভব কি?

আমাদের দেশে অনেকেরই ধারণা একবার সিজারের মাধ্যমে ডেলিভারি হলে পরবর্তী প্রতিটি প্রেগনেন্সিতে সিজার করার দরকার হয়। অথচ এ্যামেরিকান প্রেগনেন্সি এ্যাসোসিয়েশন এর রিপোর্ট অনুযায়ী সিজারিয়ান ডেলিভারির পরও ৯০% মায়েরা পরবর্তী প্রেগনেন্সিতে নরমাল ভেজাইনাল ডেলিভারি করানোর জন্য উপযুক্ত থাকেন। এদের মধ্যে ৬০-৮০% মায়ের কোন সমস্যা ছাড়াই সফল ভাবে নরমাল ভেজাইনাল ডেলিভারি সম্ভব হয়। কিন্তু ডেলিভারি ট্রায়াল দেয়ার আগে দেখে নিতে হবে কোন কোন মায়েরা এই ডেলিভারির জন্য উপযুক্ত। এজন্য আগের সিজার সম্পর্কে কিছু তথ্য নিতে হবে। যেমন;

পূর্বের সিজারের সংখ্যাঃ

যাদের পূর্বে একটি  সিজার হয়েছে, তারাই  কেবলমাত্র পরবর্তীতে  ভেজাইনাল ডেলিভারি ট্রায়াল দিতে পারবে।

কী কারণে সিজার হয়েছিল?

সিজার এমন কিছু কারণে হয়েছিল যা পুনরাবৃত্তি হবার সম্ভাবনা কম যেমন, বাচ্চার এ্যাবনরমাল পজিশনের কারণে সিজার হলে কিংবা বাচ্চা বা মায়ের কোন সমস্যার কারণে সিজার হলে যা বর্তমান প্রেগনেন্সিতে অনুপস্থিত।

পূর্বের সিজারের স্থানটি কতখানি মজবুত আছেঃ

Lower uterine caesarean section বা LUCS (জরায়ুর নিচের অংশে সেলাই) এর ক্ষেত্রেই কেবল পরবর্তীতে ভেজাইনাল ডেলিভারি ট্রায়াল দেবার সুযোগ থাকে, এক্ষেত্রে পূর্বের সেলাই ফেটে যাবার সম্ভাবনা ০.৫  থেকে ১.৫%। অন্যদিকে  ক্লাসিক্যাল সিজারের ক্ষেত্রে সেলাই ফাটার হার  ৪ থেকে ৯%।

আরও পড়ুনঃ   শিক্ষামূলক পোস্ট: নারীদের যোনি টাইট বা সঙ্কোচনের উপায় কী ?

দুই প্রেগনেন্সির মধ্যে অন্তত দুই বছরের গ্যাপ থাকা উচিত, পূর্বের সেলাইয়ের স্থানটি মজবুত হয়।

পূর্বের প্রেগনেন্সিতে প্লাসেন্টা প্রিভিয়া থাকলে বা সিজারের পর ইনফেকশন হলে সেলাইয়ের স্থানটি দুর্বল করে ফেলে যা পরবর্তীতে ফেটে যাবার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়।

এছাড়া বর্তমান প্রেগনেন্সিতে মায়ের অন্যান্য কোন জটিলতা যেমন উচ্চ রক্তচাপ বা ডায়াবেটিস থাকলে তাকে নরমাল ভেজাইনাল ডেলিভারি ট্রায়ালের জন্য উপযুক্ত ধরা হয় না।

বাচ্চার ওজন চার কেজির কম থাকা এবং প্রসবের রাস্তা যথেষ্ট প্রশস্ত থাকাও ভেজাইনাল ডেলিভারির একটি পূর্ব শর্ত।

সবকিছু ঠিক থাকলে এই ডেলিভারির সুবিধা অসুবিধা মা এবং অভিভাবকদের অবহিত করতে হবে। ডেলিভারি এমন হাসপাতালে ট্রায়াল দিতে হবে যেখানে ইমারজেন্সি সিজার করার দরকার হলে তা দ্রুত এরেঞ্জ করা সম্ভব। বাচ্চা এবং মায়ের নিবিড় পর্যবেক্ষণ করাটা এক্ষেত্রে জরুরি বিষয়। উন্নত দেশে লেবারের সময় CTG (cardio-topography) মেশিনের মাধ্যমে বাচ্চাকে সার্বক্ষণিক মনিটরিং করা হয়।

২০ থেকে ৫০ ভাগ ক্ষেত্রে ভেজাইনাল ডেলিভারি সম্ভব হয় না এবং ইমার্জেন্সি সিজারের দরকার হয়। এই ডেলিভারির সময় সঠিক মনিটরিং না হলে মা ও বাচ্চার জটিলতার হার বেড়ে যায়। অপরদিকে সফল ভেজাইনাল ডেলিভারির মাধ্যমে শরীরে বাড়তি অস্ত্রপাচার এড়ানো যায়। শরীরে অস্ত্রপাচারেরে সংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে টিস্যু এডহেশন এবং টিস্যু ইনজুরির সম্ভাবনা বেড়ে যায়, এবং এই ডেলিভারির অস্ত্রপাচারজনিত সমস্ত রিস্ক থেকে মুক্ত।

কিন্তু আমাদের দেশে এই প্রাকটিস সাধারণত করা হয় না, এর কারণ দক্ষ লোকবলের অভাব, মা ও বাচ্চার মনিটরিং এর জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অপ্রতুলটা এবং ভ্যজাইনাল ডেলিভারিতে মায়েদের অনিহা ও ভীতি কিন্তু এই ভ্যজাইনাল ডেলিভারি কে এড়িয়ে গিয়ে যে কি পরিমাণ ক্ষতির সম্মুখীন হয় একজন মা তা পরবর্তী জীবনে হাড়ে হাড়ে টের পায়।

মনে রাখতে হবে যে মহান আল্লাহ পাক মানুষ কে সৃষ্টি করেছেন এবং মানুষ জন্মের যে প্রাকৃতিক সুযোগ করে দিয়েছেন তার চেয়ে মানুষের আবিষ্কৃত কোনো পন্থায় সুফল বয়ে কখনো আনতে পারবেনা। আপনাকে ধন্যবাদ কষ্ট করে পোষ্ট টি পড়ার জন্যে।

সংগৃহীত এবং সংকলিত।

বিঃ দ্রঃ গুরুত্বপূর্ণ হেলথ নিউজ ,টিপস ,তথ্য এবং মজার মজার রেসিপি নিয়মিত আপনার ফেসবুক টাইমলাইনে পেতে লাইক দিন আমাদের ফ্যান পেজ বিডি হেলথ নিউজ এ ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here