ইলেক্ট্রনিকস বর্জঃ স্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি

0
223
ইলেক্ট্রনিকস বর্জ

প্রযুক্তির সঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি বাড়ছে প্রযুক্তি পণ্যের ব্যবহার। ডেস্কটপ পিসির জায়গা দখল করে নিয়েছে ল্যাপটপ। ল্যাপটপ বদলে ট্যাব, ফিচার ফোনের বদলে স্মার্টফোন, সিআরটি মনিটরের জয়গা দখল করেছে এলসিডি, এলইডি মনিটর। এভাবেই নতুন নতুন সংস্করণের ডিভাইস বিদায় জানাচ্ছে পুরোনো ডিভাইসকে। দিন দিন বাড়ছে ই-বর্জ্যের স্তুপ।  বিশ্বজুড়ে বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির বর্জ্য বা ই-বর্জ্য ২০১৭ সালের মধ্যে ৩৩ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। এ সমস্যার সমাধানে জাতিসংঘসহ কয়েকটি সংগঠন বিশ্বের মোট ই-বর্জ্যের পরিমাণ হিসাব করেছে। পরিত্যক্ত রেফ্রিজারেটর, টেলিভিশন, মুঠোফোন, মনিটর ইত্যাদি ই-বর্জ্যের অন্তর্ভুক্ত। এসব বর্জ্য রূপান্তর না করলে পরিবেশ দূষণ বাড়তে পারে। গবেষকদের অনুমান, সারা বিশ্বের এসব বর্জ্যের ওজন হবে প্রায় ২০০টি এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিংয়ের (নিউইয়র্ক) ওজনের সমান। সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার অভাবে বাতিল ইলেক্ট্রনিক পণ্য– ই-বর্জ্য এখন মারাত্মক পরিবেশ ও স্বাস্থ্য ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জীববৈচিত্র হুমকির পাশাপাশি দেশে ১৫ শতাংশ শিশুমৃত্যুরও কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এ বর্জ্য। গবেষকরা বলছেন, ই-বর্জ্যের সবচেয়ে বড় বিপদ হচ্ছে, বিষাক্ত কয়েক ধরনের রাসায়নিক পদার্থ এবং বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক সামগ্রী। আর সুনির্দিষ্ট নীতিমালা বা আইন না থাকায় ডিজিটাল বর্জ্য ভাগাড় হতে চলেছে বাংলাদেশ। তারা এসব ই-বর্জ্য সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনার জন্য সচেতনতা সৃষ্টির পাশাপাশি বছর চারেক আগের খসড়া নীতিমালাকে আইনে পরিণত করার তাগিদ দেন। তারপরও দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে ঝুলে রয়েছে ই-বর্জ্য ব্যস্থাপনা বিষয়ক নীতিমালা। ২০১১ সালে ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা খসড়া আইন ও বিধিমালা তৈরি করে পরিবেশ অধিদফতর। পরে ওই খসড়া আইন ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হয় আইন মন্ত্রণালয়ে। কিন্তু আইন মন্ত্রণালয় মতামত না দেয়ায় আইনটি প্রণয়নের কাজ থমকে রয়েছে। এছাড়া ই-বর্জ্য সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিয়ে ১৯৮৯ সালে শুরু হওয়া বেসেল কনভেনশনের স্বাক্ষর সংগ্রহ কর্মসূচিতে স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ। এরপরেও সরকারি নীতি-নির্ধারক মহল বিষয়টি গুরুত্বসহ বিবেচনা না করলে আগামী দিনে দেশ একটি বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে, এমনটিই আশংকা বিশেষজ্ঞদের।

ঢাকার এলিফেন্ট রোড, নিমতলী ও ধোলাইখালে ছাড়াও অনির্দিষ্ট আরও কয়েকটি স্থানে স্তুপ করা হচ্ছে ই-বর্জ্য। ব্যবহার্য প্রযুক্তি পণ্যের পাশাপাশি ই-বর্জ্যের এই পাল্লা ভারি করছে সিঙ্গাপুর, চীন ও কোরিয়া থেকে অবৈধ পথে আসা পুরোনো পণ্য। কখনও নতুন পণ্যের সঙ্গে মিশ্রিতভাবে আবার কখনও অন্য পণ্যের সঙ্গে দেশে ঢুকছে এসব ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম যা অল্পদিনেই পরিণত হচ্ছে বাতিল পণ্যে। ফেলে দেয়া হচ্ছে যত্রতত্র। অথচ এসব পণ্যে বিদ্যমান পরিবেশ ও মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর জিংক, ক্রোমিয়াম, নাইট্রাস অক্সাইড, সিসা, পারদ, ক্যাডমিয়াম, বেরিলিয়ামসহ বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান নিরব ঘাতকের মতো খুন করছে মানসিক ও শারীরিক সুস্থতা। ক্যান্সার, কিডনির সমস্যা, উচ্চ রক্তচাপ, থাইরয়েড হরমোনের সমস্যা, নবজাতকের বিকলাঙ্গতাসহ রক্তনালির বিভিন্ন রোগের প্রোকপ বাড়াচ্ছে। দেশের বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর এখানে জমা হচ্ছে ১০ মিলিয়ন মেট্রিক টন ই-বর্জ্য। প্রতি দুই বছর অন্তর এই বর্জ্যের পরিমাণ দ্বিগুণ বাড়ছে। খোদ পরিবেশ অধিদপ্তরের সমীক্ষা বলছে, ঢাকায় প্রতিদিন প্রায় ৫০০ টন ই-বর্জ্য বাড়ছে। আর দেশে মোট ই-বর্জ্যের ১৫ শতাংশই শুধু তৈরি হয় ঢাকায়। পরিবেশ বিষয়ক বেসরকারি সংস্থা এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (এসডো) এক সমীক্ষা প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ২০১১-১২ সালে বাংলাদেশে ই-বর্জ্যের পরিমাণ ছিলো ৫১ লাখ ৮১ হাজার ৪০০ টন। আর ২০১৩-১৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ কোটি ১ লাখ ৫ হাজার ৫৭০ টনে।  এর মধ্যে শুধু সেলফোন থেকে বছরে হাজার টন আর টেলিভিশন/মনিটর থেকে তৈরি হচ্ছে ১ লাখ ৭০ হাজার টন।   ডিভিডি প্লেয়ার, ভিডিও ক্যামেরা, ফ্যাক্স ও ফটোকপি মেশিন, ভিডিও গেমস, মেডিকেল ও ডেন্টাল সরঞ্জামাদি থেকে ১ লাখ টনের বেশি ই-বর্জ্য হয়। বাংলাদেশ ইলেকট্রিক্যাল মার্চেন্ডাইজ ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সূত্রে, বাংলাদেশে প্রতিবছর ৩২ কোটি টন ইলেকট্রনিক পণ্য ব্যবহার করা হয়। তবে এর মধ্যে পুনর্ব্যবহার উপযোগী করা হয় মাত্র ২০-৩০ শতাংশ পণ্য। এ ছাড়া দেশে প্রতিবছর ৫০ হাজারের বেশি কম্পিউটার আমদানি করা হচ্ছে। তবে পুরনো ও নষ্ট হওয়া কম্পিউটারগুলো কী হচ্ছে ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়ক সুনির্দিষ্ট আইন না বা বিধি না থাকার কারণে সে বিষয়টিও এখন উপেক্ষিত রয়েছে। এদিকে আমদানি নীতি আদেশ ২০১২-১৫-এর ২৬(২১) ধারায় পুরনো কম্পিউটার ও যন্ত্রাংশ আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও তা না না মানায় এই ই-বর্জ্যের পরিমাণ আশঙ্কা জনক হারে বাড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে দেশের চিহ্নিত কয়েকটি প্রযুক্তি বাজারে এখন ডেল, এইচপি ব্র্যান্ডের সম্পূর্ণ কম্পিউটার সেট ১০ হাজার টাকার মধ্যে দেয়া সম্ভব হচ্ছে। আর এই সস্তা প্রযুক্তি কিনে কেবল ক্রেতারাই পস্তাচ্ছেন না, হুমকীর মুখে পড়ছে ভবিষ্যত প্রজন্ম।

বিশেজ্ঞরা বলছেন, কম্পিউটারের বর্জ্য মাটিতে পুঁতে ফেলা হচ্ছে। যা থেকে তৈরি হচ্ছে ল্যাকটেটস। এটি মাটির নিচে পানিকে দূষিত করছে। এ ছাড়া বাসাবাড়ির আশপাশে দীর্ঘদিন ফেলে রাখা ই-বর্জ্য থেকেও ভয়াবহ মাত্রার স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে দেশের বিভিন্ন বড় বড় সরকারি-বেসরকারি অফিসগুলোতে নষ্ট হয়ে যাওয়া ইলকট্রনিক পণ্যগুলো নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই। বাংলাদেশ ইলেকট্রনিক বর্জ্যরে ব্যবস্থাপনাবিষয়ক আন্তর্জাতিক ভেসেল কনভেনশনে স্বাক্ষর করছে। কনভেনশনের শর্তানুযায়ী ইলেকট্রনিক বর্জ্যবিষয়ক একটি নীতিমালা বাংলাদেশের তৈরি করার কথা। কিন্তু বাংলাদেশ এখনও তা তৈরি করেনি। এদিকে ই-বর্জ্যরে ভয়াবহতার কথা স্বীকার করে পরিবেশবাদীরা বলছেন, গেল এক দশকে ই-বর্জ্য জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ সংকটে ভয়াবহ মাত্রা যোগ করেছে। ২০১২ সালে ইলেকট্রনিক বর্জ্য নিয়ে ডিসপোজাল ম্যানেজমেন্ট রুল নামে একটি আইনের খসড়া পরিবেশ অধিদফতর থেকে আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। কিন্তু এটি এখনও আলোর মুখ দেখেনি। দীর্ঘদিন বিষয়টি নিয়ে আর কোনো কার্যক্রম বন্ধ থাকার পর ২০১৪ সালের ৯ ডিসেম্বর জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি পরিষদের নির্বাহী কমিটির ২২তম সভায় ই-বর্জ্য আইন প্রণয়নের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এ সিদ্ধান্তের পর চলতি বছরের ১০ জুন ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত আইন/বিধিমালা পর্যালোচনা করতে ১৫ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি ৯ আগস্ট সর্বশেষ পর্যালোচনা বৈঠক শেষে আইন/বিধির খসড়া চূড়ান্ত করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। বর্তমানে সেটি আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিংয়ের জন্য অপেক্ষমান রয়েছে। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে আইন মন্ত্রণালয়ের একজন উপ-সচিব বলেন, সংশ্লিষ্টদের একমত হতে না পারার কারণে আইনটি প্রণয়নে দেরি হচ্ছে। তবে শুধু ই-বর্জ্যের জন্য আইন তৈরি করা হলে সমস্যাও রয়েছে। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন সংশোধন করে সব বর্জ্যের জন্য সম্মিলিত একটি আইন করে বিধিমালা সংশোধন করা যায় কিনা তাও বিবেচনা করা হচ্ছে।
সম্পাদনাঃ নূর মোহাম্মদ নূরু

LEAVE A REPLY