উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের উপায়

0
319
উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের উপায়

আরও পড়ুনঃ হাই ব্লাড প্রেশার? ঘরেই আছে সমাধান।

সাধারণত রক্তচাপ বলতে সিস্টেমিক প্রবাহের ধমনিক প্রবাহকে বোঝায়। প্রতিটি হৃৎস্পন্দনের সময় একবার সর্বোচ্চ চাপ (সিস্টোলিক) এবং সর্বনিম্ন চাপ (ডায়াস্টলিক) হয়। মূলত হৎপিন্ডের সংকোচন প্রবণতাই রক্তচাপের প্রধান কারণ। উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে মানুষ বেশিরভাগ সময়ই ওষুধ ব্যবহার করে থাকে। তবে লাইফ স্টাইল পরিবর্তন করেই কিন্তু এটা কমানো সম্ভব। এমন কিছু প্রাকৃতিক উপায় রয়েছে; যা সব রক্তচাপকেই নিয়ন্ত্রণে রাখে।

উচ্চ রক্তচাপ বা উচ্চমাত্রার উত্তেজনায় ভোগা বেশ সাধারণ সমস্যা এবং এটি কোনো রোগও নয়। কিন্তু এটি এমন এক সমস্যা যা আমন্ত্রণ করে নিয়ে আসে হৃদরোগসহ বিভিন্ন গুরুতর রোগকে এবং আপনাকে নিয়ে যেতে পারে মৃত্যুর দুয়ারেও! যখন রক্তের প্রবাহ খুব বেশি থাকে এবং বিশুদ্ধ রক্তবাহী ধমনীতে রক্ত প্রবাহিত হওয়ার সময় ধমনীর দেয়ালে খুব জোর দিয়ে ধাক্কা দেয়, তখনই এই সমস্যাকে আমরা উচ্চ রক্তচাপ বলি।

হৃৎপিণ্ডে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কতটা রক্ত প্রবেশ করছে ও বের হচ্ছে এবং ধমনী রক্তপ্রবাহে কতটা সহনশীল, এই দুইয়ের পরিমাপের মাধ্যমে রক্তচাপ নির্ণয় করা হয়। হৃৎপিণ্ডে যতো বেশি রক্ত প্রবেশ করবে ও বের হবে- অর্থাৎ হৃৎস্পন্দনের মাত্রা যতো বেশি হবে এবং ধমনী যতো সরু হবে, রক্তচাপ ততোই বাড়তে থাকবে। উচ্চ রক্তচাপ এমন একটি ঘাতক, যা নিঃশব্দে আসে। হৃদরোগ, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ, দেহের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়া ইত্যাদির কারণ এই উচ্চ রক্তচাপ।

আর উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশনে আক্রান্ত ব্যক্তির রক্তচাপ স্বাভাবিকের চেয়ে ঊর্ধ্বে থাকে। কারো রক্তচাপ সাধারণত ১৪০-এর উপড়ে গেলেই তার হাইপারটেনশন আছে ধরে নেয়া যায়। যদিও উচ্চ রক্তচাপ আলাদাভাবে কোনো অসুস্থতা নয়, কিন্তু এটি শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের ওপর স্বল্প থেকে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে। উচ্চ রক্তচাপের ফলে স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক, চোখের ক্ষতি, ব্রেন অথবা কিডনির ক্ষতি হতে পারে। ওষুধের মাধ্যমেই যে কেবল উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় এমনটি কিন্তু নয়। বরং এমন কিছু কাজ আছে যা করলে ওষুধ ছাড়াও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব অর্থাৎ  যা দিয়ে অনায়াসে আপনি উচ্চ রক্তচাপ কমিয়ে ফেলতে পারেন। যেমন :

লবণ: উচ্চ রক্তচাপের জন্য ভীষণ বিপজ্জনক হলো লবণ। তাই দৈনন্দিন খাবারে লবণের মাত্রা কমিয়ে আনতে হবে। কারণ লবণ রক্ত চাপ বাড়িয়ে দেয়। রান্নার সময় লবন ব্যবহার করতে পারেন। এক্ষেত্রে মেডিক্যাল বিশেষজ্ঞরা দৈনিক ১১০০-১৫০০ মিলিগ্রাম লবণ খাওয়ার পরামর্শ দেন। উচ্চ রক্তচাপের রোগীরা কখনোই কাঁচা লবণ খাবেন না।

ফাস্টফুড :ফাস্টফুড যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলাই ভালো। কারণ বেশীরভাগ ফাস্টফুডে বা যে সব খাবারে প্রিজারভেটিভ দেয়া থাকে তাতে সোডিয়ামের মাত্রা অনেক বেশি থাকে। তাই সবার প্রথমে এসব খাবারকে খাদ্যতালিকা থেকে বাদ দিন।

অতিরিক্ত ওজন : শরীরের অতিরিক্ত ওজন অর্থ হৃিপণ্ডের অতিরিক্ত কাজের চাপ। কেননা রক্ত সঞ্চালনের ক্ষেত্র বেশি বেড়ে যাচ্ছে। এতে করে হৃদরোগ এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে। অতিরিক্ত ওজনের কারণে ৬৫ বছরের আগেই হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের ঝুঁকি তিন থেকে পাঁচগুণ বৃদ্ধি পায়।

অতিরিক্ত ওজন আরও যে সব জটিলতার সৃষ্টি করতে পারে—
– উচ্চ রক্তচাপ—উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি ২-৬ গুণ বৃদ্ধি পায়।
– রক্তের কোলেস্টেরলের মাত্রা বৃদ্ধি—অতিরিক্ত ওজনে শরীরে রক্তের কোলেস্টেরল বৃদ্ধিতে ঝুঁকি বাড়ায়।

ব্যায়াম: ব্লাড প্রেসার কমানোর একটি কার্যকারী উপায় হচ্ছে ব্যায়াম। প্রতিদিন মাত্র ৩০ মিনিট ব্যায়াম করলেই এক সপ্তাহ পর ব্লাড প্রেসার অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আসবে। এজন্য হাঁটা, দৌঁড়ানো, সাঁতার কাটা এবং সাইকেল চালানোর মতো আরও অনেক কাজ করতে পারেন আপনি।এক কথায় হালকা ব্যায়াম করলে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। দৈনিক আধা ঘণ্টা ব্যায়াম উচ্চ রক্তচাপ ৬ থেকে ৮ ইউনিট পর্যন্ত কমিয়ে দেয়।

ধ্যান বা মেডিটেশন: নিয়মমাফিক মেডিটেশন করলেও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে। উন্মুক্ত ও বিশুদ্ধ বাতাসে মিনিট পাঁচেক সময় ধীরে ধীরে এবং দীর্ঘ দম নিলে রক্তচাপ কমে যায়। প্রতিদিন একটা নির্দিষ্ট সময়ে নিয়ম করে প্রার্থনা, ধ্যান বা মেডিটেশন করলে ব্লাড প্রেসার অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এছাড়া নিয়ম করে যোগ ব্যায়াম করলেও ব্লাড প্রেসার কমানো সম্ভব।

আরও পড়ুনঃ   কিভাবে রক্তে চর্বির পরিমাণ কমাতে পারেন?

সুস্থ খাদ্যাভ্যাস :
প্রত্যেকের বয়স, উচ্চতা, লিঙ্গ অনুযায়ী ডায়েট চার্ট দেখে যতটুকু প্রয়োজন ততটুকুই খাওয়া উচিত। প্রতিটি খাদ্যের খাদ্যশক্তি বা খাদ্যমূল্যও তাই জানা উচিত। কেউ যদি প্রতিদিন প্রয়োজনের তুলনায় ১০০ ক্যালরি বেশি গ্রহণ করেন তবে বছরে সাড়ে চার কেজি ওজন বৃদ্ধি পাবে।

সুস্থ খাদ্যাভ্যাস বলতে বোঝায়—
— বেশি করে টাটকা ফলমূল ও শাকসবজি খাওয়া
— চর্বিবিহীন বা কম চর্বিযুক্ত খাবার গ্রহণ
— চিনি এবং লবণে সতর্ক থাকা
— রান্নায় সুস্থ পদ্ধতি অর্থাত্ স্টামির, বয়েলিং, গ্রিলিং এবং বেকিং পদ্ধতি বেছে নেয়া
— প্রতিদিন পরিমাণমত পানি গ্রহণ।

এনার্জি ব্যালান্স :
শরীরের অতিরিক্ত ওজনের কারণ হচ্ছে ক্যালরি ব্যয়ের তুলনায় বেশি পরিমাণ খাদ্য ক্যালরি গ্রহণ করা। তাই ওজন নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজন ক্যালরি ব্যয় এবং ক্যালরি গ্রহেণর ভারসাম্য বজায় অর্থাত্ এনার্জি ব্যালান্স। এজন্য ব্যালান্সড ডায়েট এবং নিয়মিত ব্যায়ামের বিকল্প নেই। চর্বিযুক্ত খাদ্য এড়িয়ে চলুন এবং বেশি করে আঁশযুক্ত খাবার গ্রহণ করুন। সঠিক ডায়েট মেনে চললেই অর্ধের শারীরিক সমস্যার সমাধান করা যায়। পটাশিয়াম যুক্ত স্বাস্থ্যকর খাবার রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে।

টমেটোঃ লাইকোপেন ও অন্য গুরুত্বপূর্ণ অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে টমেটোতে যা রক্তচাপ কমতে সাহায্য করে। পটাসিয়াম এর একটি ভালো উৎস টমেটো। পটাসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার খেলে উচ্চরক্তচাপ কমতে ও হার্ট ডিজিজের ঝুঁকি কমায়।

ধুমপান ও অ্যালকোহল এড়িয়ে চলুন: ধুমপায়ীদের সবচেয়ে বেশি উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি রয়েছে। তাই উচ্চ রক্তচাপ থেকে বাচঁতে চাইলে তা এড়িয়ে চলুন। ব্লাড প্রেসার নিয়ন্ত্রণে অ্যালকোহলের মাত্রা কমিয়ে ফেলুন। গবেষণা দেখা গেছে, দিনে ২ প্যাকের বেশি অ্যালকোহল পান করলে উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়ে।সুতরাং বিভিন্ন ধরনের মাদক পরিহার করে চলা এবং রাতে পর্যাপ্ত ঘুমের অভ্যাস করতে পারলে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

ক্যাফেইন: ক্যাফেইন রক্তচাপ বাড়িয়ে দেয়। কফি খাওয়ার পর রক্তচাপ মাপলে দেখতে পাবেন স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি আসবে। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে ক্যাফেইনের মাত্রা কমান।

হালকা গরম পানি: রাতে ঘুমাতে যাওয়ার ১৫ মিনিট আগে হালকা গরম পানি দিয়ে গোসল করলে ঘুমও যেমন ভালো হয় তেমনি ওই রাতের জন্য উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখাও সম্ভাব হয়। প্রতিদিন এক কোয়া রসুন চিবিয়ে খেলেও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে।

স্ট্রেস: উচ্চ রক্তচাপের অন্যতম কারণ ক্রনিক স্ট্রেস। যদি পারিবারিক, পেশাগত বা আর্থিক স্ট্রেস মাথায় চেপে বসে তাহলে অবশ্যই সতর্ক থাকুন। চেষ্টা করুন স্ট্রেস নিয়ন্ত্রণে রাখার।

তরমুজের বিচি:

তরমুজের বিচিতে রয়েছে কিউকার্বোসিট্রিন নামক এক উপাদান যা রক্তের সূক্ষ্ম নালিগুলোকে বিস্তীর্ণ করে। পাশাপাশি এটি কিডনির কার্যপ্রণালী উন্নীত করে। ২০১০ সালের ফ্লোরিডা স্টেট পাইলট স্টাডিতে বলা হয়, ভ্যাসোডাইলেটরি ইফেক্ট রয়েছে বলে তরমুজের বিচি রক্তচাপ কমায়।
•     শুকনো তরমুজের বিচি ও পোস্তদানা সমপরিমাণে গুঁড়া করুন। একসঙ্গে মিশিয়ে এয়ার টাইট বয়ামে সংরক্ষণ করুন। প্রতিদিন সকালে ও সন্ধ্যায় খালিপেটে এক চা চামচ করে খান।
•    এক কাপ গরম পানিতে দুই চা চামচ তরমুজের বিচির গুঁড়া দিয়ে একঘণ্টা রেখে দিন। ছেঁকে সারাদিনে অল্প অল্প করে কয়েকবারে পান করুন।

নিয়মিত চেক আপ: যদি আপনার উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা থাকে তা হলে বাড়িতেই রক্তচাপ মাপার যন্ত্র কিনে রাখুন। নিয়মিত মনিটর করুন রক্তচাপ। যদি সমস্যা না থাকে তাহলে প্রতি ৬ মাস থেকে এক বছর অন্তর চিকিত্সকের কাছে গিয়ে পরীক্ষা করিয়ে নিন।

লেবু: লেবু রক্তনালি নমনীয় রাখে ও কাঠিন্য দূর করে। ভিটামিন সি সমৃদ্ধ লেবুর রস প্রতিদিন পান করে রোধ করা যেতে পারে হার্ট ফেইলর। ভিটামিন সি হচ্ছে এমন একটি এন্টি-অক্সিডেন্ট যা ফ্রি রেডিক্যালসের ক্ষতিকর প্রভাব অপসারণ করতে সক্ষম। রোজ সকালে খালিপেটে এক গ্লাস হালকা গরম পানিতে অর্ধেক লেবুর রস দিয়ে পান করুন। চিনি বা লবণ ব্যবহার করবেন না।

পরিবার: সুস্থ থাকার জন্য পারিবারিক সম্পর্কগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সুস্থ পারিবারিক সম্পর্ক আমাদের স্বাস্থ্য ভাল রাখতে সাহায্য করে। স্ট্রেস দূরে রাখে। ফলে চিকিত্সকের কাছে যাওয়ার প্রয়োজনও অনেক কমে যায়।

ডার্ক চকলেটঃ ২০০৭ সালের জুলাই মাসে “দ্যা জার্নাল অফ দ্যা আমেরিকান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন” (JAMA) তে প্রকাশিত প্রতিবেদনে পরামর্শ দেয়া হয় যে, প্রতিদিন সামান্য পরিমাণে ডার্ক চকলেট খেলে রক্তচাপ কমে। ডার্ক চকলেটে ফ্লেভোনলস নামক উপাদান থাকে যা কারডিওভাস্কুলার ডিজিজ এর ঝুঁকি কমায়।

আরও পড়ুনঃ   ওষুধ না খেয়েও আপনি যেভাবে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন

মাছ ও মুরগির মাংস: উচ্চ রক্তচাপের এক অনন্য চিকিৎসা হলো মাছ ও মুরগির মাংস। তবে সব ধরনের মাছ-মাংস নয়- লাল মাংস বা ‘রেড মিট’ জাতীয় মাংস পরিহার করে কেবল মুরগির মাংস ও বিভিন্ন ধরনের মাছ খান, সাথে প্রচুর সবজি। জাদুর মতো কার্যকরী এই উপায় অনুসরণ করলেই উচ্চ রক্তচাপ থেকে অনায়াসেই মুক্তি পাবেন!

রসুন: রসুন বাঙালী খাদ্যের অন্যতম ‘না হলেই নয়’- এমন উপাদান হলো রসুন, যা আমাদের রোজকার খাবারেই ব্যবহৃত হয়ে থাকে। কিন্তু প্রতিদিনের খাবারে মশলা হিসেবে ব্যবহৃত রসুনের ওপর নির্ভরশীল না থেকে রোজ এক কোয়া কাঁচা রসুন খান নিয়মিত। প্রাকৃতিক এই ঔষধ রক্তের দূষিত কোলেস্টেরল কমিয়ে ফেলে এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে।

কলা খান: বৃটিশ মেডিকেল জার্নালের সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় দেখে গেছে যে পটাশিয়াম সমৃদ্ধ খাবার যেমন কলা খেলে লবণ খাওয়ার প্রবণতা কমে যায়। ফলে নিয়মিত কলা খেলে প্রতিবছর হাজার হাজার জীবন বাঁচানো সম্ভব। কলা খেলে শরীরে প্রয়োজনীয় পটাসিয়ামের অভাব পূরণ হয় এবং শরীরের ফ্লুইডের সমতা রক্ষা হয়। ফলে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে। সপ্তাহে ৫টি কলা উচ্চ রক্তচাপের কারণে মৃত্যু ঝুঁকি কমায়। কলার সঙ্গে খেতে পারেন অ্যাপ্রিকট, কিশমিশ, কমলার রস, মিষ্টি আলু, ফুটি ইত্যাদি।

কাজের চাপ কমানঃ মানুষ বেঁচে থাকতে হলে জীবিকার প্রয়োজন আছে তবে তা অবশ্যই প্রমিত হতে হবে। যত বেশী কাজ ততো বেশী প্রেসার। কাজের চাপে আপনার টেনশান বৃদ্ধি পায়। ফলে রক্ত চাপ বেড়ে যায়। সুতরাং কাজের চাপ কমালে আপনার রক্ত চাপও কমবে।

নারকেলের পানি: যাদের হাইপারটেনশন রয়েছে তাদের প্রচুর পানি পান করা উচিত। দিনে অন্তত ১০ গ্লাস পানি তো অবশ্যই। নারকেলের পানি রক্তচাপ কমানোর ক্ষেত্রে বিশেষ উপকারি। ২০০৫ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান মেডিকেল জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, নারকেলের পানি পটাশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম ও ভিটামিন সি তে সমৃদ্ধ। এটি সিস্টোলিক ব্ল‍াড প্রেসার কমায়।

পেঁয়াজ ও মধু: কোয়ার্সটিন নামক এন্টি-অক্সিডেন্ট ফ্লেভোনল রয়েছে তাই পেঁয়াজ রক্তচাপ কমায়।  পেঁয়াজ ও মধু উচ্চ রক্তচাপ দ্রুত কমানোর একটি কার্যকরী ঔষধ হলো এক টেবিল চামচ পেঁয়াজের রসের সাথে দুই টেবিল চামচ মধু। একটি কাপে এই মিশ্রণটি নিয়ে রোজ পান করুন। ফল পাবেন হাতে হাতেই! অথবা  প্রতিদিন একটি মাঝারি সাইজের পেঁয়াজ খান। এছ‍াড়াও টানা এক সপ্তাহ দিনে দু’বার দুই টেবিল চামচ করে পেঁয়াজের রস ও মধু দিয়ে তৈরি মিশ্রণ খান।

সয়া জাতীয় খাবার খানঃ আপনি দৈনিক খাবারের পাশাপাশী সম্পূরক খাবার গ্রহন করতে পারেন। শর্করা জাতীয় খাবারের পরিবর্তে সয়াজাতীয় বা নিন্মচর্বির দুগ্ধজাত খাবার খেলে উচ্চ রক্তচাপ কমতে পারে।উচ্চ রক্তচাপের সঙ্গে হৃদরোগের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। তাই প্রাণিজ চর্বি যেমন ঘি, মাখন, মাংসের চর্বি না খাওয়াই ভালো।

মেথি: মেথিতে রয়েছে হাই ফাইবার ও পটাশিয়াম।
•     দেড় কাপ পানিতে দুই চা চামচ মেথি দিয়ে ৩/৪ মিনিট সিদ্ধ করুন। ছেঁকে পান করুন।
•     মেথি গুঁড়া করে বোতলে সংরক্ষণ করুন। সকালে ও বিকেলে খালিপেটে এক চা চামচ মেথি পানিতে পেস্ট করে খান। রক্তচাপ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে টানা দুই/তিন মাস এভ‍াবে খেতে হবে।

কারি পাতা: কারি পাতা বিভিন্ন সুপারস্টোরে আজকাল কারি পাতা বেশ সহজলভ্য। ভারতীয় রান্নায় ব্যাপকভাবে এই পাতার ব্যবহার এখন বাংলাদেশী সংস্কৃতিতেও প্রবেশ করেছে। বিভিন্ন উপলক্ষ্যে বিশেষ খাবার দাবার হলেও আজকাল বাংলাদেশেও খাবার-দাবারে কারি পাতা ব্যবহার করা হয়। তবে যদি উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের কথা হয়, তাহলে শুধু ওই উপলক্ষ্য উদযাপনের মধ্যেই এর ব্যবহার সীমিত রাখলে হবে না! উচ্চ রক্তচাপই কেবল নয়, অনেক ধরনের রোগের সাথে যুদ্ধ করে এই প্রাকৃতিক ঔষধটি। একটি পাত্রে খাবার পানীয়ের সাথে চার-পাঁচটি কারি পাতা নিয়ে চুলায় ফোটান এবং ঠাণ্ডা করে পান করুন, প্রতিদিন।

আরও পড়ুনঃ   দেশে উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত ১৫ শতাংশ মানুষ

গাজর ও পালং শাক: আপনার রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে দিনে দুবার গাজরের জুস খান। নিয়মিত গাজর খেলে আমাদের ত্বকও ভালো থাকে। অথবা  একটি গাজর ও পালং শাক ধুয়ে ব্লেন্ডারে ব্লেন্ড করে এক গ্লাস পরিমাণ শরবত বানান। দিনে দু’বার পান করুন এই পানীয়। বিশেষ করে পালংশাকে ক্যালোরি কম থাকে, উচ্চমাত্রার ফাইবার থাকে এবং হৃদস্বাস্থ্যের জন্য পুষ্টিকর উপাদান যেমন- পটাসিয়াম, ফোলেট ও ম্যাগনেসিয়ামে পরিপূর্ণ থাকে। রক্তচাপের মাত্রা স্বাস্থ্যকর ভাবে নিয়ন্ত্রণের মূল উপাদানই এগুলো।

বিট রুটের শরবত: বিট উচ্চ রক্তচাপ কমানোর অবিশ্বাস্য একটি উপায় হলো বিট নামের সুন্দর সবিজিটি। বিট রুটের শরবত তৈরি করে দৈনিক দু’বার পান করুন।

কফি পান করবেন নাঃ গবেষণায় দেখা গেছে প্রতিদিন ৫ কাপের বেশী কফি শরীরের জন্য বিশেষ ঝুঁকি বহন করে।

রক্ত চাপ কমাত চা উপকারীঃ এক গবেষণায় দেখে গাছে পরিমাণ মত চা পান করার ফলে মানুষের রক্তচাপ কমতে পারে। তবে দৈনিক ৩ কাপের বেশী চা পান করা যাবেনা। তবে  আমেরিকার উত্তর ক্যারোলিনার ডিউক ইউনিভার্সিটি অফ মেডিকেল সেন্টারের মতে ৫০০ মিলিগ্রামের অর্থাৎ প্রায় ৩ কাপ চা/কফি খায় তাদের ব্লাড প্রেশার ৩ পয়েন্ট বেড়ে যায়। এই প্রভাব রাতে ঘুমানোর আগ পর্যন্ত থাকে।

টক দই খান: আমেরিকার ইউনিভার্সিটি অফ মিনোসোটার গবেষকদের মতে প্রতিদিন মাত্র এক কাপ করে টক দই খেলে উচ্চ রক্ত চাপ প্রায় এক তৃতীয়াংশ কমে যায় এবং স্বাভাবিক হয়ে আসে। গবেষকদের মতে দই খেলে রক্ত চাপ ও রক্তের খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা কমে। গবেষণায় দেখা গেছে যে যারা প্রায় ১৫ বছর ধরে প্রতিদিন ১২০ গ্রাম টক দই খায় তাদের উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি প্রায় ৩১% কমে যায় অন্যদের তুলনায়।

সপ্তাহে একদিন জগিং করুন: সপ্তাহে অন্তত একদিন মাত্র এক ঘন্টা করে জগিং করলে ৬ বছর আয়ু বৃদ্ধির সম্ভাবনা থাকে। কোপেনহেগেন সিটি হার্ট কার্ডোভাসক্যুলার স্টাডিতে ২৩ থেকে ৯৩ বছর বয়সী ২০,০০০ পুরুষ ও মহিলার উপর গবেষণা করে এই তথ্য পাওয়া গেছে। গবেষকদের মতে জগিং হৃদপিন্ডের রক্ত সঞ্চালন বাড়িয়ে দেয় এবং হৃদপিন্ডকে শক্তিশালী করে। রক্ত চাপ কমিয়ে স্ট্রোকের ঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি শরীরকে সতেজ ও সুস্থ রাখে।

পাস্তুরিত দুধঃ এটি শরীরের জন্য সত্যিই উপকারি। পাস্তুরিত দুধ ক্যালসিয়াম, পটাসিয়াম ও ভিটামিন ডি প্রদান করে। এই ৩টি উপাদান একত্রে একটি টিমের মত কাজ করে উচ্চ রক্তচাপের মাত্রা ৩-১০% পর্যন্ত কমাতে পারে।

সমাপনী কথা: উচ্চ রক্তচাপের উপর আরো অনেক কারণই প্রভাব বিস্তার করে যেমন- শারীরিক কার্যকারিতা, পর্যাপ্ত ঘুম, সান এক্সপোজার, মেডিটেশন এবং অন্যান্য স্ট্রেস ব্যবস্থাপনার কাজগুলো করা ইত্যাদি। তবে আপনি কি খাচ্ছেন তা অবশ্যই অনেক গুরুত্বপূর্ণ এবং এমন আরো অনেক খাবারই আছে যা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে যেমন- সয়াবিন, মটরশুঁটি, জলপাই তেল, গ্রিনটি, হলুদ, কাঠবাদাম, বিট ও মাছের তেল, কিউই, পিচফল, টকদই, আস্ত শস্যদানা ইত্যাদি।

বাড়িতে রক্ত চাপ পরিমাপক যন্ত্র,এবং যন্ত্রটি সম্পর্কে ধারণা রাখুন। যন্ত্রটি ঠিক আছে কিনা সেটিও লক্ষ্য রাখুন। একটি গবেষনায় দেখা যায়,দুই বাহুতে পরীক্ষা করলে রক্তচাপের ভিন্ন ভিন্ন ফলাফল পাওয়া যায়। তাই দুই বাহুতেই পরীক্ষা করুন। অনেকে উচ্চ রক্তচাপের লক্ষনগুলো জানেন না। আবার,অনেকে জানলেও অবহেলা করেন। ভাবেন হয়ত ঠিক হয়ে যাবে। কিন্ত যখন এর ফলে হার্ট এট্যাক বা স্ট্রোক হয়ে যায় তখন করার থাকে না কিছুই। আজকাল অনেক বিজ্ঞানী খাদ্যের ফরমালিনের সাথে উচ্চ রক্তচাপের যোগাযোগ আছে বলে অনুমান করছেন। তাই খাদ্যদ্রব্য কেনার সময়ও সচেতন হন।

উচ্চ রক্তচাপ কমানোর এই ঘরোয়া পথ্যগুলো ব্যবহারের আগে চাইলে চিকিৎসকের পরামর্শও নিয়ে নিতে পারেন। কারখানায় প্রস্তুতকৃত বিভিন্ন কৃত্রিম ঔষধ যতোটা এড়িয়ে চলা যায়, ততোই উত্তম। কারণ এসব ঔষধের আছে নানারকম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। তাছাড়া কৃত্রিম এসব ঔষধ অধিক ব্যবহারের ফলে দেহের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়াসহ নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে, শরীর অভ্যস্ত হয়ে পড়ে এসব ঔষধে। তাই প্রকৃতির সাহায্য নিয়েই নিয়ন্ত্রণে রাখুন রক্তচাপ, অনাকাঙ্ক্ষিত রোগে দেহকে বাসা বাঁধা থেকে বিরত রাখুন। সুস্থ থাকুন।

LEAVE A REPLY