এপিলেপ্সি বা মৃগী এক মারাত্মক রোগ

0
164
এপিলেপ্সি ,মৃগী,epilepsy

এপিলেপ্সি রোগের কথা কেউ শোনেননি বা এপিলেপ্সির রোগীকে কেউ দেখেননি এমন লোক খুঁজে পাওয়া মুশকিল। আমাদের সমাজের আশপাশের অনেক পরিবারেই রয়েছেন এপিলেপ্সি রোগী। এসব রোগীকে নিয়ে পরিবারের দুশ্চিন্তা ও দুর্ভাবনার শেষ থাকে না। কারণ এসব রোগী নাজুক প্রকৃতির। তাদের যেকোনো সময় যেকোনো বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। ঘটে যেতে পারে হৃদয়বিদারক করুণ পরিণতি, যা আমাদের কারোরই কাম্য নয়। এপিলেপ্সি রোগীকে অনেকে জিনে বা পরীতে ধরেছে বলে মনে করেন। কেউ কেউ ভাবেন তার ‘হাওয়া’ (বাতাস) লেগেছে। আসলে এসবের বৈজ্ঞানিক কোনো কারণ নেই। এগুলো মূলত কুসংস্কার। আর আমাদের দেশে কী অশিক্ষিত, কী শিক্ষিত অনেকের মনেই নানা ধরনের অন্ধবিশ্বাস বা কুসংস্কার বিস্তার লাভ করে রয়েছে। এসব অন্ধবিশ্বাসের মূলোৎপাটন করা প্রয়োজন। আর এর জন্য আপনাকে, আমাকে ও সমাজের সব শ্রেণীর মানুষকে আগ্রহসহকারে এগিয়ে আসতে হবে।

এবার আসা যাক এপিলেপ্সির কথায়। এপিলেপ্সি একটি ভয়ানক জটিল রোগ। এ রোগ নারী-পুরুষ সবারই যেকোনো বয়সে হতে পারে। দেখা যায় বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এ রোগ কৈশোর বয়সে আরম্ভ হয়। আর শুরুতেই উপযুক্ত চিকিৎসা না করালে এর ভোগান্তি সারাজীবন ধরেই ভোগ করতে হতে পারে।

এপিলেপ্সি কী?
এপিলেপ্সি হলো একটি স্নায়ুতন্ত্রের রোগ। মানুষের স্নায়ুতন্ত্র দু’টি বড় ভাগে বিভক্ত। একটি হলো সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেম আর অন্যটি হলো পেরিফেরিয়াল নার্ভাস সিস্টেম। মানুষের এই যে দু’টি নার্ভাস সিস্টেম­ এই সিস্টেমের কার্যপ্রণালীর গোলামাল সৃষ্টি হয় এপিলেপ্সি রোগে। শিশু বা কিশোর-কিশোরীদের যখন এই ব্যাধি দেখা যায়, তখন তাদের তাৎক্ষণিকভাবে চেতনার বিলুপ্তি ঘটে। তারা অজ্ঞান হয়, জ্ঞান হারায়-নিথর হয়ে পড়ে যায়। দেখা দেয় অসহনীয় কষ্টের আঘাত। এপিলেপ্সি রোগের কারণে মানসিক রোগও দেখা যায়। দেখা যায় মনোবৈকল, বিশৃঙ্খল মনমানসিকতা।

এপিলেপ্সি রোগে হঠাৎ করে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র বা নার্ভাস সিস্টেমের কিছু নিউরন উত্তেজিত হয়ে ওঠে। বিক্ষিপ্ত স্নায়ু কোষগুলোকে এ উত্তেজনা উত্তেজিত করে তোলে। ফলে কিছু সময়ের মধ্যেই সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেমগুলো উত্তেজিত হয়। ফলে মুহূর্তের মধ্যেই রোগী চেতনা হারিয়ে যায়। রোগী অজ্ঞান হয়ে পড়ে যায়। এপিলেপ্সিতে শিশু বয়সে আক্রান্ত হলে হঠাৎ করে শিশু মাথা ঘুরে পড়ে যায়। এতে তার জ্ঞান হারিয়ে যেতে পারে। তার পর শুরু হয় খিঁচুনি। এই খিঁচুনির স্তর দু-তিন মিনিট পর্যন্ত চলে। এরপর রোগী ঘুমে তলিয়ে যায়। আক্রান্ত ব্যক্তি মাটিতে পড়ে যাওয়ার সাথে সাথে দাঁতের ফাঁকে তার জিহ্বা আটকে যেতে পারে। ফলে জোর করে জিহ্বা চেপে কয়েক সেকেন্ড এ রকম অচেতন অবস্থায় তাকে থাকতে হতে পারে। কয়েক সেকেন্ড থেকে কয়েক মিনিট পর্যন্ত এই অচেতন অবস্থা অব্যাহত থাকতে পারে। তবে জানার মতো কথা হলো, সাধারণত কেউই ১৫ মিনিটের বেশি অজ্ঞান অবস্থায় থাকে না। অনেক শিশুর ১০৩-১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত জ্বর উঠলে অনেক সময় খিঁচুনি দেখা দেয়। ১০ শতাংশ শিশুর এই জ্বরজনিত খিঁচুনি দেখা যায়। সুখের কথা হলো, এটিকে এপিলেপ্সি রোগ বলা হয় না। তবে জ্বর ছাড়া যদি বারবার বিরতি দিয়ে খিঁচুনি হতে থাকে তখন সেটি এপিলেপ্সি। আরেকটি কথা হলো, যেসব শিশু ছোটবেলায় জ্বরজনিত খিঁচুনিতে ভোগে তাদের প্রায় ৩ শতাংশ শিশু বড় হয়ে এপিলেপ্সি রোগে আক্রান্ত হতে পারে। আর তখন এ রোগের বিশেষ চিকিৎসার প্রয়োজন দেখা যায়। আপনাদের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে এপিলেপ্সি কোন কারণে হয়। সাধারণত অনেক কারণেই এপিলেপ্সি রোগ হতে পারে। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এ রোগের ১০০ শতাংশ নিশ্চিত কোনো কারণ জানা যায়নি এখন পর্যন্ত। গবেষণা চলছে, এক দিন নিশ্চয়ই এই রোগের কারণ খুঁজে বের করা সম্ভব হবে। আর তখন এ রোগের চিকিৎসা ব্যবস্থা হয়ে উঠবে অনেক সহজ।

আরও পড়ুনঃ   সিজনাল ফ্লু ও করণীয়

যারা এপিলেপ্সি রোগে আক্রান্ত হয় তাদের অনেকেই স্বাভাবিক ও সুস্থ জীবনযাপন করে থাকে। কিন্তু কোনো কোনো সময় স্নায়ুতন্ত্রের কিছু নিউরন বা কোষ হঠাৎ করে উত্তেজিত হয় এবং এ উত্তেজনা বিক্ষিপ্ত স্নায়ু কোষগুলোকে উত্তেজিত করে তোলে। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই স্নায়ুতন্ত্রগুলো উত্তেজিত হয় ও রোগী অজ্ঞান হয়ে যায়। এ সময়টা সত্যিই কঠিন সময়। এ সময় রোগীর মুখ দিয়ে ফেনা বোরোতে থাকে। প্রথম প্রথম হলে রোগীর রোগের অবস্থা এনালাইসিস করতে প্রয়োজন হতে পারে। এপিলেপ্সি রোগে অনেক রকমের উপসর্গ দেখা যায়, এগুলো হলোঃ

– রোগীর হাত-পা খিঁচুনি হয়,
– চোখ উল্টে যেতে পারে,
-ঘাড় বা মুখ বেঁকে যেতে পারে,
-রোগী কাপড়ে প্রস্রাব-পায়খানা করতে পারে,
– রোগীর জিহ্বা কেটে রক্ত বের হতে পারে,
– অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ার ফলে রোগীর দেহের কোনো জায়গায় আঘাতের চিহ্ন দেখা দিতে পারে,
– অনেকের ঘুমের মধ্যে উপসর্গ বা খিঁচুনি দেখা দিতে পারে­ একে বলে ্লিপিং-এপিলেপ্সি,
-ঘুমের মধ্যে এপিলেপ্সির খিঁচুনি দেখা দিলে রোগীর বিছানা বা বালিশে ফেনা ও রক্ত লেগে থাকতে দেখা যেতে পারে,
– যেসব শিশুর বিছানায় প্রসাব করার অভ্যাস বা রোগ নেই, সেসব শিশু হঠাৎ করে বিছানায় প্রস্রাব করে ফেলে, সেটিও এপিলেপ্সির উপসর্গ হতে পারে,
-কোনো কোনো রোগী অজ্ঞান না হয়ে সামান্য সময়ের জন্য আনমনা হয়ে যায়­ সেটিও উপসর্গ হতে পারে।

যেসব রোগী ১০ মিনিটের বেশি সময় অজ্ঞান অবস্থায় থাকে, সেসব রোগীকে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে নেয়া প্রয়োজন। আবার কিছু ক্ষেত্রে এপিলেপ্সির রোগীকে নিকটবর্তী স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নেয়া প্রয়োজন হতে পারে। কারণ সে ক্ষেত্রে রোগীকে অক্সিজেন দিতে হতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিশুর হজম ও বিপাক ক্রিয়া ঠিকঠাকমতো না হলে শিশু এ রোগে আক্রান্ত হতে পারে। জ্বর হলে শিশুকে জ্বরের ওষুধ খাওয়াতে হবে। এপিলেপ্সি রোগী অজ্ঞান হলে সবাই চেষ্টা করে চামচ দিয়ে দাঁত ফাঁক করার জন্য। এটি ভুল, এমনটি কোনো সময়ই করা উচিত নয়। অনেকে আবার রোগীর মুখে পানির ঝাপটা মারেন­ এটিও ঠিক নয়। অনেকে আবার রোগীকে নোংরা মোজার গন্ধ শুঁকায়, অনেকে আবার রোগীকে জুতার গন্ধ শুঁকায়­ এগুলো ভুল। এসবের কোনোই প্রয়োজন নেই। রোগী এ রোগে আক্রান্ত হলে তাকে ডান পাশে কাত করে শুয়ে দেবেন আর ১০ মিনিটের বেশি খিঁচুনি ও অজ্ঞান হলে রোগীকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবেন বা চিকিৎসা কেন্দ্রে নিয়ে যাবেন। এপিলেপ্সি রোগী বিভিন্ন ধরনের মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়। তাই মানসিক ডাক্তারের পরামর্শ গ্রহণ করাও অত্যন্ত প্রয়োজন। মনে রাখবেন মানসিক রোগের ডাক্তার বা বিশেষজ্ঞরাও এপিলেপ্সি রোগীর চিকিৎসা করে থাকেন। আগামীতে আপনাদের জন্য এপিলেপ্সি বা মানসিক রোগের ওপর কিছু কথা লেখার ইচ্ছা নিয়ে আজকের লেখা এখানেই শেষ করছি। আপনারা সবাই সুস্থ থাকুন­ নিরাপদ থাকুন।

আরও পড়ুনঃ   সামাজিক কুসংস্কার ও মৃগী রোগ

**************************
অধ্যাপক ডাঃ এ এইচ মোহাম্মদ ফিরোজ
লেখকঃ মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ, নিউরোসাইকিয়াট্রি মনোজগৎ সেন্টার, ঢাকা

LEAVE A REPLY