ওষুধ শিল্পে বিপ্লব

0
11
ওষুধ শিল্পে বিপ্লব

২০১৫ সালে ৮৩২ কোটি, ২০১৬ সালে ২ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা : ৭ বছরের ব্যবধানে রফতানি বেড়েছে ১৮শ’ কোটি টাকার বেশি : ২০২১ সাল নাগাদ আয় হবে ৬০০ কোটি ডলার -বাণিজ্যমন্ত্রী  : বাজেটে ক্যান্সারসহ গুরুত্বপূর্ণ ওষুধের কাঁচামালে শুল্ক রেয়াত সুবিধা প্রদান করায় শিল্প আরও সমৃদ্ধ হবে -বিশেষজ্ঞদের অভিমত

হাসান সোহেল : গার্মেন্টস শিল্পের পর দেশের ওষুধ শিল্পে বিপ্লব ঘটে গেছে। দেশের চাহিদার ৯৮ ভাগ মিটিয়ে বিদেশে রফতানী হচ্ছে বাংলাদেশের ৫৪টি প্রতিষ্ঠানের তৈরি ওষুধ। আমেরিকা, ইউরোপসহ বিশ্বের অনেক উন্নত দেশে বাংলাদেশের ওষুধের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বর্তমানে বিশ্বের ১২৭ দেশে বাংলাদেশের ওষুধ রফতানি হচ্ছে। ২০১৫ সালে বাংলাদেশ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ৮৩২ কোটি টাকার ওষুধ ও কাঁচামাল রফতানি করেছে। অথচ এক বছরেই এই রফতানির পরিমান তিনগুন বেড়ে ২০১৬ সালে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ হাজার ২শ’৪৭ কোটি টাকা। চলতি বছরের ৬ মাস পার না হতেই ১৫শ’ কোটি টাকা ওষুধ রফতানি করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামীতে ওষুধ রফতানি করে বাংলাদেশ বিপুল পরিমান বৈদেশিক মূদ্রা অর্জন করবে; যা গার্মেন্টস রফতানি রেমিটেন্সকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ মনে করেন, ২০২১ সাল নাগাদ ওষুধ রফতানি থেকে বাংলাদেশের আয় প্রায় একশ গুণ বেড়ে ৬০০ কোটি ডলারে উন্নীত হবে। এ জন্যই সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় সরকার বাজার ও পণ্য বহুমুখীকরণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। যদিও ওষুধ শিল্প সমিতির মতে, ওই সময়ে রফতানি আয় ৬০০ কোটি ডলারেরও বেশি হবে।
ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের হিসেব মতে, চলতি বছরের ১৫ জুন পর্যন্তই ১৪৩১ কোটি টাকার ওষুধ ও কাঁচামাল রফতানি করা হয়েছে। যা গত ২০১৬ সালে ছিল ২ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা। ওষুধ খাত সংশ্লিষ্টরা জানান, ওষুধ রফতানিতে বিপ্লব শুরু হয়েছে। যা ওষুধ শিল্প ও দেশের জন্য একটি স্বপ্নই বটে।
তাদের মতে, বর্তমানে ১২৭ দেশে ৫৪ টি প্রতিষ্ঠানের ওষুধ রফতানি হচ্ছে। ওষুধের মান ও নিরাপত্তা ধরে রাখতে পাড়লে খুব শিগগিরই ১৫০টি দেশে ওষুধ রফতানি সম্ভব হবে। এদিকে প্রস্তাবিত বাজেটে সম্ভাবনাময় ওষুধ খাতকে বিকশিত করতে এই শিল্পে ব্যবহৃত ক্যান্সারসহ গুরুত্বপূর্ণ ওষুধের কাঁচামালে শুল্ক রেয়াত সুবিধা প্রদানের প্রস্তাব করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের অনেক কোম্পানীই এখন আন্তর্জাতিক মানের ওষুধ তৈরি করছে। উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর সার্টিফিকেশন সনদও পেয়েছে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান। এ কারণে ওই সব দেশসহ অন্যান্য দেশে ওষুধ রফতানি পর্যায়ক্রমে বাড়ছে। তাদের মতে, বাংলাদেশসহ স্বল্পোন্নত দেশগুলোর (এলডিসি) জন্য ২০৩৩ সাল পর্যন্ত ওষুধের মেধাস্বত্বে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডবিøউটিও) ছাড়ের সুযোগ রয়েছে। এটাকে কাজে লাগাতে হবে। সরকারের পক্ষ থেকেও ওষুধশিল্প বিকাশে সব ধরনের সহযোগিতা করা হচ্ছে। তারা জানান, বর্তমান উৎপাদন ক্ষমতা আর বিশ্ববাজারের সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে ওষুধ রপ্তানিতে এশিয়ার শীর্ষে উঠে আসবে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে ১জুলাই থেকে শুরু হওয়া নতুন অর্থবছরের (২০১৭-১৮) বাজেটে সম্ভাবনাময় ওষুধ খাতকে বিকশিত করেত এই শিল্পে ব্যবহৃত ক্যান্সারসহ গুরুত্বপূর্ণ ওষুধের কাঁচামালে শুল্ক রেয়াত সুবিধা দেয়া হয়েছে। যা ওষুধ শিল্পের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলেও মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের ওষুধ তত্তাবধায়ক সৈকত কুমার কর ইনকিলাবকে বলেন, বর্তমানে আমেরিকায় বেক্্িরমকো ফার্মার প্রেসারের কার্বিটিলল ওষুধটি রফতানি হচ্ছে। এটার মান ভালো হলে আরও ওষুধ নিবে তারা। কারণ এই ওষুধের মানের উপরও আরও ১০টি ওষুধের রফতানির বাজার খুলে যেতে পারে। দেশও বড় অঙ্কের রেমিট্যান্স পাবে। আর সে দিকটায়ই পৃথকভাবে নজড় দিচ্ছে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর।
বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ ২০২১ সাল নাগাদ ওষুধ রপ্তানি থেকে বাংলাদেশের আয় প্রায় একশ গুণ বেড়ে ৬০০ কোটি ডলারে উন্নীত হবে বলে আশাপ্রকাশ করেছেন। মন্ত্রী বলেছেন, সরকার সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় বাজার ও পণ্য বহুমুখীকরণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। সে পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ওষুধ রপ্তানি বাড়াতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা চলছে। ইতিমধ্যেই আমাদের কয়েক ওষুধ কোম্পানি আমেরিকায় ওষুধ রপ্তানির অনুমোদন পেয়েছে। এই সুযোগকে ‘দেশের রপ্তানি বাণিজ্যের জন্য খুব ইতিবাচক’ উল্লেখ করে তোফায়েল বলেন, ২০২১ সালের মধ্যে দেশের রপ্তানির পরিমাণ ৬ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হবে বলে প্রত্যাশা করছি।
প্রতি বছরই রফতানির পরিমান ও দেশের সংখ্যা বাড়ছে। দেশে উৎপাদিত ওষুধ ২০১৬ সালে বিশ্বের ১১৭ টি দেশে রপ্তানি হয়েছে। যা বর্তমানে ১২৭টিতে দাড়িয়েছে।
রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ সালে (জানুয়ারি-ডিসেম্বর) পৃথিবীর ৮৭টি দেশে ৪২১ কোটি ২২ লাখ টাকার ওষুধ রফতানি করা হয়। পরের বছর একই সংখ্যক দেশে রফতানির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৫৩৯ কোটি ৬২ লাখ টাকা। ২০১৩ সালেও দেশে ৬০৩ কোটি ৬৭ লাখ টাকা রফতানি হয়। ২০১৪ সালে ৯৫টি দেশে ৭১৩ কোটি ৯৮ লাখ টাকা। ২০১৫ সালে ১০২টি দেশে ৮৩২ কোটি টাকার ওষুধ ও কাঁচামাল রফতানি হয়েছে। সেখানে ২০১৬ সালে প্রায় ৩ গুণ ২২শ’৪৭ কোটি টাকার ওষুধ রফতানি হয়েছে। এ বছরের ৬ মাস পার না হতেই ইতোমধ্যে ওষুধ রফতানি ১৫শ’ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। অর্থাৎ বিগত ৭ বছরের ব্যবধানে রফতানির পরিমাণ বেড়েছে ১৮শ’ কোটি ডলারেরও বেশি।
রফতানিতে শীর্ষ পাঁটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে যথাক্রমে বেক্সিমকো ফার্মা লিমিটেড, স্কয়ার ফার্মা লিমিটেড, ইনসেপ্টা ফার্মা লিমিটেড, নোভারটিস (বিডি) লিমিটেড, রেনেটা লিমিটেড, দ্য একমি ল্যাবরেটরিজ লিমিটেড, এ্যারিষ্টো ফার্মা লিমিটেড, এসকেএফ ফার্মা বাংলাদেশ লিমিটেড, এসিআই লিমিটেড, পপুলার ফার্মা, পপুলার ইনফিউসন, বায়ো ফার্মা, অপসোনিন, গেøাব ফার্মা, বীকন ফার্মা, ড্রাগস ইন্টারন্যাশনাল, হেলথকেয়ার ফার্মা, ওরিয়ন ফার্মা, জেসন, নাভানা, জেনারেল, ডেলটা, গøাক্্েরা, ইবনেসিনা, রেডিয়ান্ট, নভো হেলথকেয়ার ফার্মাসহ আরও কয়েকটি কোম্পানী।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ওষুধ রপ্তানি বাড়াতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ চলছে। ইতিমধ্যেই দেশের কয়েকটি ওষুধ কোম্পানি আমেরিকার বাজারে ওষুধ রপ্তানির অনুমোদন পেয়েছে। এমনকি রফতানি প্রক্রিয়া শুরুও করেছে। ফলে উন্নত বিশ্বে বাংলাদেশের তৈরি ওষুধ রপ্তানির দরজা খুলছে।
ওষুধ শিল্প সমিতির তথ্য মতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, জাপান, ফ্রান্স, সুইডেন, ইতালি, কানাডা, স্পেন, নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম, সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, রাশিয়া, তুরস্ক, সৌদি আরব, ইরান, মালয়শিয়া, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, মিয়ানমার, শ্রীলংকা, আফগানিস্তান, কেনিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, মিসর, মরক্কো, আলজেরিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের ওষুধ রপ্তানি হচ্ছে।
জানা গেছে, স্বাধীনতার পর ৭০ ভাগ ওষুধই আমদানি করা হতো। এখন উন্নত প্রযুক্তির সব কারখানায় ওষুধ উৎপাদিত হচ্ছে। ফলে উৎপাদন অনেকগুন বেড়েছে। দেশীয় চাহিদা পূরণ করে বিদেশে রফতানি হচ্ছে। প্রযুক্তিগত উৎকর্র্ষ এবং দক্ষ ফার্মাসিস্টদের সহয়তায় বর্তমানে ক্যান্সারের মত জটিল ও মারাত্মক রোগের ওষুধও দেশেই উৎপাদন হচ্ছে।
বাংলাদেশসহ স্বল্পোন্নত দেশগুলোর (এলডিসি) জন্য ২০৩৩ সাল পর্যন্ত ওষুধের মেধাস্বত্বে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডবিøউটিও) ছাড়ের প্রসঙ্গে বাণিজ্য মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেন, এ সুযোগকে কাজে লাগাতে হবে। সরকার দেশের ওষুধশিল্প বিকাশে সব ধরনের সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে। ওষুধ রপ্তানিতে নগদ আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হবে।
বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প বিশ্ববাসীর নজর কাড়তে সক্ষম হয়েছে দাবি করে বাণিজ্য মন্ত্রী বলেন, সরকার সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় যে সকল পণ্য রপ্তানিতে অধিক গুরুত্ব দিয়েছে, ওষুধ তার মধ্যে অন্যতম।
ওষুধ রপ্তানির এ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. আবুল কালাম লুৎফুল কবির বলেন, এখন দেশের ১৬ কোটি মানুষের ওষুধের চাহিদার প্রায় ৯৮ ভাগ দেশেই উৎপাদন করা হচ্ছে। বর্তমান সরকারও দেশের ওষুধশিল্প বিকাশে বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতা দিচ্ছে। চলতি অর্থবছরের ক্যান্সারসহ গুরুত্বপূর্ণ ওষুধের কাঁচামালে শুল্ক রেয়াত সুবিধা দেয়া হয়েছে। যা এই শিল্পকে আরও সমৃদ্ধ করবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।  তবে এই শিল্পকে এগিয়ে নিতে সরকার ও সংশ্লিষ্টদের আরো উদ্যোগী হওয়ার কথা বলেছেন ড. লুৎফুল কবির।
ওষুধ শিল্প সমিতির মহাসচিব এস এম শফিউজ্জামান বলেন, ওষুধ শিল্প একটি টেকনিক্যাল শিল্প। এটার রেজিস্ট্রেশন থেকে শুরু করে প্রমোশন পর্যন্ত সকল পর্যায়ে অনেক সময়ের প্রয়োজন হয়। তিনি বলেন, গত অর্থবছরের তুলনায় চলতি বছরে রফতানিতে আয় আরও বাড়বে। তবে এক্ষেত্রে রপ্তানি প্রক্রিয়া আরও সহজিকরন করার উপর গুরুত্বারোপ করেন। এস এম শফিউজ্জামান বলেন, রফতানি আয় বাড়াতে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন। বর্তমানে ওষুধ রপ্তানিতে এশিয়ায় আমাদের প্রতিদ›দ্বী ভারত। তারা নানা ধরনের এক্সপোর্ট বেনিফিট পেয়ে থাকে। আমাদের এ ধরনের সুবিধা দিলে ভারতকে ছাড়িয়ে যেতে সময় লাগবেনা।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিন চেষ্টা করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বেক্্িরমকো ও স্কয়ারের রেজিস্ট্রেশন হয়েছে। বিশ্ব বাজারে একটি অবস্থান করতে সক্ষম হয়েছি। একই সঙ্গে খুবই ভালো করছি। তাই ওষুধ শিল্পে আমাদের সম্ভাবনা অনেক। একই সঙ্গে ১২৭টি দেশে রফতানির জন্য রেজিস্ট্রেশন হয়েছে। এটা বাড়ছে। ওইসব দেশে ইতোমধ্যে বাংলাদেশের ওষুধের মান অন্যান্য দেশের তুলনায় ভালো বলে প্রতীয়মান হয়েছে। আর তাই প্রতিদিনই বাংলাদেশের ওষুধের চাহিদাও বাড়ছে। এজন্য রফতানিও বাড়ছে। ভবিষ্যতে রফতানির নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা না থাকলেও এস এম শফিউজ্জামান আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, সবকিছু ঠিক থাকলে ২০২১ সাল নাগাদ রফতানি ৬০০ কোটি ডলার ছাড়াবে। একই সঙ্গে খুব শিগগিরই জাপানেও বাংলাদেশের ওষুধ রফতানি করা হবে বলে উল্লেখ করেন। এমনকি সম্প্রতি জাপান সফর করে ওখানকার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, আমাদের দেশের ওষুধ ফ্যাক্টরির মান জাপানের চেয়েও ভালো।

আরও পড়ুনঃ   ইলেক্ট্রনিকস বর্জঃ স্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি

২০১৫ সালে ৮৩২ কোটি, ২০১৬ সালে ২ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা : ৭ বছরের ব্যবধানে রফতানি বেড়েছে ১৮শ’ কোটি টাকার বেশি : ২০২১ সাল নাগাদ আয় হবে ৬০০ কোটি ডলার -বাণিজ্যমন্ত্রী  : বাজেটে ক্যান্সারসহ গুরুত্বপূর্ণ ওষুধের কাঁচামালে শুল্ক রেয়াত সুবিধা প্রদান করায় শিল্প আরও সমৃদ্ধ হবে -বিশেষজ্ঞদের অভিমত হাসান সোহেল : গার্মেন্টস শিল্পের পর দেশের ওষুধ শিল্পে বিপ্লব ঘটে গেছে। দেশের চাহিদার ৯৮ ভাগ মিটিয়ে বিদেশে রফতানী হচ্ছে বাংলাদেশের ৫৪টি প্রতিষ্ঠানের তৈরি ওষুধ। আমেরিকা, ইউরোপসহ বিশ্বের অনেক উন্নত দেশে বাংলাদেশের ওষুধের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বর্তমানে বিশ্বের ১২৭ দেশে বাংলাদেশের ওষুধ রফতানি হচ্ছে। ২০১৫ সালে বাংলাদেশ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ৮৩২ কোটি টাকার ওষুধ ও কাঁচামাল রফতানি করেছে। অথচ এক বছরেই এই রফতানির পরিমান তিনগুন বেড়ে ২০১৬ সালে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ হাজার ২শ’৪৭ কোটি টাকা। চলতি বছরের ৬ মাস পার না হতেই ১৫শ’ কোটি টাকা ওষুধ রফতানি করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামীতে ওষুধ রফতানি করে বাংলাদেশ বিপুল পরিমান বৈদেশিক মূদ্রা অর্জন করবে; যা গার্মেন্টস রফতানি রেমিটেন্সকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ মনে করেন, ২০২১ সাল নাগাদ ওষুধ রফতানি থেকে বাংলাদেশের আয় প্রায় একশ গুণ বেড়ে ৬০০ কোটি ডলারে উন্নীত হবে। এ জন্যই সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় সরকার বাজার ও পণ্য বহুমুখীকরণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। যদিও ওষুধ শিল্প সমিতির মতে, ওই সময়ে রফতানি আয় ৬০০ কোটি ডলারেরও বেশি হবে। ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের হিসেব মতে, চলতি বছরের ১৫ জুন পর্যন্তই ১৪৩১ কোটি টাকার ওষুধ ও কাঁচামাল রফতানি করা হয়েছে। যা গত ২০১৬ সালে ছিল ২ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা। ওষুধ খাত সংশ্লিষ্টরা জানান, ওষুধ রফতানিতে বিপ্লব শুরু হয়েছে। যা ওষুধ শিল্প ও দেশের জন্য একটি স্বপ্নই বটে। তাদের মতে, বর্তমানে ১২৭ দেশে ৫৪ টি প্রতিষ্ঠানের ওষুধ রফতানি হচ্ছে। ওষুধের মান ও নিরাপত্তা ধরে রাখতে পাড়লে খুব শিগগিরই ১৫০টি দেশে ওষুধ রফতানি সম্ভব হবে। এদিকে প্রস্তাবিত বাজেটে সম্ভাবনাময় ওষুধ খাতকে বিকশিত করতে এই শিল্পে ব্যবহৃত ক্যান্সারসহ গুরুত্বপূর্ণ ওষুধের কাঁচামালে শুল্ক রেয়াত সুবিধা প্রদানের প্রস্তাব করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের অনেক কোম্পানীই এখন আন্তর্জাতিক মানের ওষুধ তৈরি করছে। উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর সার্টিফিকেশন সনদও পেয়েছে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান। এ কারণে ওই সব দেশসহ অন্যান্য দেশে ওষুধ রফতানি পর্যায়ক্রমে বাড়ছে। তাদের মতে, বাংলাদেশসহ স্বল্পোন্নত দেশগুলোর (এলডিসি) জন্য ২০৩৩ সাল পর্যন্ত ওষুধের মেধাস্বত্বে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডবিøউটিও) ছাড়ের সুযোগ রয়েছে। এটাকে কাজে লাগাতে হবে। সরকারের পক্ষ থেকেও ওষুধশিল্প বিকাশে সব ধরনের সহযোগিতা করা হচ্ছে। তারা জানান, বর্তমান উৎপাদন ক্ষমতা আর বিশ্ববাজারের সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে ওষুধ রপ্তানিতে এশিয়ার শীর্ষে উঠে আসবে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে ১জুলাই থেকে শুরু হওয়া নতুন অর্থবছরের (২০১৭-১৮) বাজেটে সম্ভাবনাময় ওষুধ খাতকে বিকশিত করেত এই শিল্পে ব্যবহৃত ক্যান্সারসহ গুরুত্বপূর্ণ ওষুধের কাঁচামালে শুল্ক রেয়াত সুবিধা দেয়া হয়েছে। যা ওষুধ শিল্পের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলেও মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের ওষুধ তত্তাবধায়ক সৈকত কুমার কর ইনকিলাবকে বলেন, বর্তমানে আমেরিকায় বেক্্িরমকো ফার্মার প্রেসারের কার্বিটিলল ওষুধটি রফতানি হচ্ছে। এটার মান ভালো হলে আরও ওষুধ নিবে তারা। কারণ এই ওষুধের মানের উপরও আরও ১০টি ওষুধের রফতানির বাজার খুলে যেতে পারে। দেশও বড় অঙ্কের রেমিট্যান্স পাবে। আর সে দিকটায়ই পৃথকভাবে নজড় দিচ্ছে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর। বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ ২০২১ সাল নাগাদ ওষুধ রপ্তানি থেকে বাংলাদেশের আয় প্রায় একশ গুণ বেড়ে ৬০০ কোটি ডলারে উন্নীত হবে বলে আশাপ্রকাশ করেছেন। মন্ত্রী বলেছেন, সরকার সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় বাজার ও পণ্য বহুমুখীকরণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। সে পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ওষুধ রপ্তানি বাড়াতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা চলছে। ইতিমধ্যেই আমাদের কয়েক ওষুধ কোম্পানি আমেরিকায় ওষুধ রপ্তানির অনুমোদন পেয়েছে। এই সুযোগকে ‘দেশের রপ্তানি বাণিজ্যের জন্য খুব ইতিবাচক’ উল্লেখ করে তোফায়েল বলেন, ২০২১ সালের মধ্যে দেশের রপ্তানির পরিমাণ ৬ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হবে বলে প্রত্যাশা করছি। প্রতি বছরই রফতানির পরিমান ও দেশের সংখ্যা বাড়ছে। দেশে উৎপাদিত ওষুধ ২০১৬ সালে বিশ্বের ১১৭ টি দেশে রপ্তানি হয়েছে। যা বর্তমানে ১২৭টিতে দাড়িয়েছে।   রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ সালে (জানুয়ারি-ডিসেম্বর) পৃথিবীর ৮৭টি দেশে ৪২১ কোটি ২২ লাখ টাকার ওষুধ রফতানি করা হয়। পরের বছর একই সংখ্যক দেশে রফতানির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৫৩৯ কোটি ৬২ লাখ টাকা। ২০১৩ সালেও দেশে ৬০৩ কোটি ৬৭ লাখ টাকা রফতানি হয়। ২০১৪ সালে ৯৫টি দেশে ৭১৩ কোটি ৯৮ লাখ টাকা। ২০১৫ সালে ১০২টি দেশে ৮৩২ কোটি টাকার ওষুধ ও কাঁচামাল রফতানি হয়েছে। সেখানে ২০১৬ সালে প্রায় ৩ গুণ ২২শ’৪৭ কোটি টাকার ওষুধ রফতানি হয়েছে। এ বছরের ৬ মাস পার না হতেই ইতোমধ্যে ওষুধ রফতানি ১৫শ’ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। অর্থাৎ বিগত ৭ বছরের ব্যবধানে রফতানির পরিমাণ বেড়েছে ১৮শ’ কোটি ডলারেরও বেশি। রফতানিতে শীর্ষ পাঁটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে যথাক্রমে বেক্সিমকো ফার্মা লিমিটেড, স্কয়ার ফার্মা লিমিটেড, ইনসেপ্টা ফার্মা লিমিটেড, নোভারটিস (বিডি) লিমিটেড, রেনেটা লিমিটেড, দ্য একমি ল্যাবরেটরিজ লিমিটেড, এ্যারিষ্টো ফার্মা লিমিটেড, এসকেএফ ফার্মা বাংলাদেশ লিমিটেড, এসিআই লিমিটেড, পপুলার ফার্মা, পপুলার ইনফিউসন, বায়ো ফার্মা, অপসোনিন, গেøাব ফার্মা, বীকন ফার্মা, ড্রাগস ইন্টারন্যাশনাল, হেলথকেয়ার ফার্মা, ওরিয়ন ফার্মা, জেসন, নাভানা, জেনারেল, ডেলটা, গøাক্্েরা, ইবনেসিনা, রেডিয়ান্ট, নভো হেলথকেয়ার ফার্মাসহ আরও কয়েকটি কোম্পানী। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ওষুধ রপ্তানি বাড়াতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ চলছে। ইতিমধ্যেই দেশের কয়েকটি ওষুধ কোম্পানি আমেরিকার বাজারে ওষুধ রপ্তানির অনুমোদন পেয়েছে। এমনকি রফতানি প্রক্রিয়া শুরুও করেছে। ফলে উন্নত বিশ্বে বাংলাদেশের তৈরি ওষুধ রপ্তানির দরজা খুলছে। ওষুধ শিল্প সমিতির তথ্য মতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, জাপান, ফ্রান্স, সুইডেন, ইতালি, কানাডা, স্পেন, নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম, সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, রাশিয়া, তুরস্ক, সৌদি আরব, ইরান, মালয়শিয়া, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, মিয়ানমার, শ্রীলংকা, আফগানিস্তান, কেনিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, মিসর, মরক্কো, আলজেরিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের ওষুধ রপ্তানি হচ্ছে। জানা গেছে, স্বাধীনতার পর ৭০ ভাগ ওষুধই আমদানি করা হতো। এখন উন্নত প্রযুক্তির সব কারখানায় ওষুধ উৎপাদিত হচ্ছে। ফলে উৎপাদন অনেকগুন বেড়েছে। দেশীয় চাহিদা পূরণ করে বিদেশে রফতানি হচ্ছে। প্রযুক্তিগত উৎকর্র্ষ এবং দক্ষ ফার্মাসিস্টদের সহয়তায় বর্তমানে ক্যান্সারের মত জটিল ও মারাত্মক রোগের ওষুধও দেশেই উৎপাদন হচ্ছে। বাংলাদেশসহ স্বল্পোন্নত দেশগুলোর (এলডিসি) জন্য ২০৩৩ সাল পর্যন্ত ওষুধের মেধাস্বত্বে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডবিøউটিও) ছাড়ের প্রসঙ্গে বাণিজ্য মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেন, এ সুযোগকে কাজে লাগাতে হবে। সরকার দেশের ওষুধশিল্প বিকাশে সব ধরনের সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে। ওষুধ রপ্তানিতে নগদ আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হবে। বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প বিশ্ববাসীর নজর কাড়তে সক্ষম হয়েছে দাবি করে বাণিজ্য মন্ত্রী বলেন, সরকার সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় যে সকল পণ্য রপ্তানিতে অধিক গুরুত্ব দিয়েছে, ওষুধ তার মধ্যে অন্যতম। ওষুধ রপ্তানির এ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. আবুল কালাম লুৎফুল কবির বলেন, এখন দেশের ১৬ কোটি মানুষের ওষুধের চাহিদার প্রায় ৯৮ ভাগ দেশেই উৎপাদন করা হচ্ছে। বর্তমান সরকারও দেশের ওষুধশিল্প বিকাশে বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতা দিচ্ছে। চলতি অর্থবছরের ক্যান্সারসহ গুরুত্বপূর্ণ ওষুধের কাঁচামালে শুল্ক রেয়াত সুবিধা দেয়া হয়েছে। যা এই শিল্পকে আরও সমৃদ্ধ করবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।  তবে এই শিল্পকে এগিয়ে নিতে সরকার ও সংশ্লিষ্টদের আরো উদ্যোগী হওয়ার কথা বলেছেন ড. লুৎফুল কবির। ওষুধ শিল্প সমিতির মহাসচিব এস এম শফিউজ্জামান বলেন, ওষুধ শিল্প একটি টেকনিক্যাল শিল্প। এটার রেজিস্ট্রেশন থেকে শুরু করে প্রমোশন পর্যন্ত সকল পর্যায়ে অনেক সময়ের প্রয়োজন হয়। তিনি বলেন, গত অর্থবছরের তুলনায় চলতি বছরে রফতানিতে আয় আরও বাড়বে। তবে এক্ষেত্রে রপ্তানি প্রক্রিয়া আরও সহজিকরন করার উপর গুরুত্বারোপ করেন। এস এম শফিউজ্জামান বলেন, রফতানি আয় বাড়াতে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন। বর্তমানে ওষুধ রপ্তানিতে এশিয়ায় আমাদের প্রতিদ›দ্বী ভারত। তারা নানা ধরনের এক্সপোর্ট বেনিফিট পেয়ে থাকে। আমাদের এ ধরনের সুবিধা দিলে ভারতকে ছাড়িয়ে যেতে সময় লাগবেনা। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন চেষ্টা করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বেক্্িরমকো ও স্কয়ারের রেজিস্ট্রেশন হয়েছে। বিশ্ব বাজারে একটি অবস্থান করতে সক্ষম হয়েছি। একই সঙ্গে খুবই ভালো করছি। তাই ওষুধ শিল্পে আমাদের সম্ভাবনা অনেক। একই সঙ্গে ১২৭টি দেশে রফতানির জন্য রেজিস্ট্রেশন হয়েছে। এটা বাড়ছে। ওইসব দেশে ইতোমধ্যে বাংলাদেশের ওষুধের মান অন্যান্য দেশের তুলনায় ভালো বলে প্রতীয়মান হয়েছে। আর তাই প্রতিদিনই বাংলাদেশের ওষুধের চাহিদাও বাড়ছে। এজন্য রফতানিও বাড়ছে। ভবিষ্যতে রফতানির নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা না থাকলেও এস এম শফিউজ্জামান আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, সবকিছু ঠিক থাকলে ২০২১ সাল নাগাদ রফতানি ৬০০ কোটি ডলার ছাড়াবে। একই সঙ্গে খুব শিগগিরই জাপানেও বাংলাদেশের ওষুধ রফতানি করা হবে বলে উল্লেখ করেন। এমনকি সম্প্রতি জাপান সফর করে ওখানকার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, আমাদের দেশের ওষুধ ফ্যাক্টরির মান জাপানের চেয়েও ভালো।

আরও পড়ুনঃ   ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বজ্রপাতে দুইজনের মৃত্যু

সূত্রঃ ইনকিলাব

LEAVE A REPLY