কেমন করে বুঝবেন আপনার যক্ষ্মা হলো কিনা?

0
68
যক্ষ্মা ,ফুসফুস , tuberculosis

যক্ষ্মা দুই ধরনের। চিকিৎসা শাস্ত্রের ভাষায় এদের বলা হয় Pulmonary TB ফুসফুসের যক্ষ্মা এবং Extra-Pulmonary TB বা ফুসফুস বহির্ভূত যক্ষ্মা। তবে ফুসফুসের যক্ষ্মা রোগীর সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। মোট যক্ষ্মা রোগীর শতকরা ৮৫ ভাগই ফুসফুসের যক্ষ্মা রোগী। ফুসফুসের যক্ষ্মা আবার দুই ধরনের স্পুটাম স্মিয়ার পজেটিভ বা কফে জীবাণুযুক্ত যক্ষ্মা রোগী এবং স্পুটাম স্মিয়ার নেগেটিভ বা কফ জীবাণুযুক্ত যক্ষ্মা রোগী। এই দুই গ্রুপের মধ্যে স্মিয়ার স্পুটাম পজেটিভ রোগীরাই মারাত্মক সংক্রামক। এদের ফুসফুস থেকে নির্গত যক্ষ্মা জীবাণু বাতাসের সাহায্যে শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে সুস্থ লোকের শরীরে প্রবেশ করে এবং নানা ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার পর এদের মধ্যে কেউ কেউ যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়। চিকিৎসার আওতায় আসেনি এমন একজন স্পুটাম স্মিয়ার পজেটিভ রোগী বছরে একজন করে নতুন যক্ষ্মা রোগীর জন্ম দেয়। এভাবে সমগ্র কমিউনিটির মধ্যে যক্ষ্মা রোগ ছড়িয়ে পড়ে। এ কারণে জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচিতে কফ পরীক্ষার ওপর অধিক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে যাতে কফে জীবাণুযুক্ত যক্ষ্মা রোগীদের সহজে শনাক্ত করে চিকিৎসার আওতায় এনে রোগ ছড়ানোর পথ বন্ধ করা এবং রোগ নির্মূল করা যায়। ফুসফুস ছাড়া শরীরের সব স্থানেই যক্ষ্মা হতে পারে, শুধু চুল, হাতের নখ এবং দাঁত ছাড়া। একে বলা হয় Extra Pulmonary TB ফুসফুস বহির্ভূত যক্ষ্মা। কিডনী, অন্ত্র, হার্ট, জয়েন্ট, শিরদাড়া, নাক, চোখ, চামড়া এমনকি স্ত্রী-পুরুষের যৌনাঙ্গেও এই রোগ হতে পারে। তবে এই যক্ষ্মা একেবারেই কম সংক্রামক।

এ ছাড়াও আরও দুই ধরনের মারাত্মক যক্ষ্মা আছে। এ দুটির নাম ম্যানেঞ্জিয়াল টিবি এবং মিলিয়ারি টিবি। সময় মতো রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা না হলে এ রোগে মৃত্যু অনিবার্য। ম্যানেঞ্জিয়াল টিবিতে জ্বর হতে পারে। খাওয়ায় অরুচি দেখা দেয় ও বমি হতে পারে। মাধা ধরে, ঘাড় শক্ত হয়ে যেতে পারে, এমনকি রোগী অজ্ঞানও হয়ে যেতে পারে এবং খিচুনী হতে পারে। তবে বিসিজি টীকা দেয়ার কারণে এ ধরনের যক্ষ্মার প্রকোপ বহুলাংশে হ্রাস পেয়েছে। মিলিয়ারী টিবিতে যক্ষ্মার জীবাণু রক্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। যৌক্তিক কারণ ছাড়া খুব বেশি জ্বর, দুর্বলতা এবং ওজন হ্রাস পেতে পারে।

আরও পড়ুনঃ   ডায়রিয়াঃ কী করবেন কী করবেন না

যক্ষ্মার লক্ষণ দুই ধরনের যথাথ স্থানীয় লক্ষণ ও সাধারণ লক্ষণ। শরীরের আক্রান্ত স্থান ভেদে স্থানীয় লক্ষণের হেরফের হলেও সব যক্ষ্মার সাধারণ লক্ষণ অভিন্ন।

পালমুনারি টিবি বা ফুসফুসের যক্ষ্মার স্থানীয় লক্ষণ : কাঁশি, বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, গলা দিয়ে রক্তক্ষরণ। তবে গলা দিয়ে রক্তক্ষরণ হলেই যক্ষ্মা হয়েছে এমন ধারণা সঠিক নয়। এটা নানা কারণে হতে পারে। কিন্তু কাঁশি এমন একটি উপসর্গ যা ফুসফুসের যক্ষ্মায় কোন না কোন সময় হবেই।

Extra Pulmonary TB ফুসফুস বহির্ভূত যক্ষ্মার স্থানীয় লক্ষণ। শরীরের অঙ্গ ভেদে এই লক্ষণ বিভিন্ন ধরনের হতে পারে :

গান্ডা টিবি : গান্ড ফুলে যায়, লাল হয়ে ওঠে এবং ব্যথা হয়। শরীরের বিভিন্ন গান্ডের মধ্যে সাধারণত ঘাড়ের গান্ডগুলোতেই এই যক্ষ্মা বেশি হয়।

কিডনি : মাঝে মাঝে পেটের পেছনের দিকে কিডনির অবস্থানে ব্যথা হয়। পেশাবের সঙ্গে রক্তপাত হতে পারে তব অনেক সময় তা খালি চোখে দেখা যায় না। পেশাবে জ্বালাপোড়া ও ঘন ঘন পেশাব হয়।

অন্ত্র ও খাদ্যনালী : ক্ষুধামন্দা, বদহজম, পেটফাঁপা, পেটব্যথা, পেটের মধ্যে বুটবাট শব্দ করা কখনও পাতলা পায়খানা, খাবারে অরুচি ইত্যাদি। সাধারণ চিকিৎসায় এগুলো উপশম হয় না।

অন্ডকোষ এবং এর আনুষঙ্গিক অঙ্গ (এপিডিডামিস) : অন্ডকোষ ও এপিডিডামিস ফুলে যায়, ব্যথা হয়।

জয়েন্ট, হাড় ও শিরদাড়া : এগুলো ফুলে যায়, ব্যথা হয়, শিরদাড়া বাঁকা হয়ে যেতে পারে।

মেয়েদের যৌনাঙ্গ, জরায়ু, ফেলোপিয়ান টিউব ও ওভারি : তলপেটে ব্যথা হয়, দুই পাশে বেশি ব্যথা হতে পারে এবং পেটে হাত দিলে অনেক সময় শক্ত কিছু অনুমিত হয়। এখানে একটি কথা বিশেষভাবে বলা দরকার যে যদি কোন যুবতী মেয়ের কোন কারণ ছাড়াই হঠাৎ মাসিক বন্ধ হয়ে যায় তবে অনেক ক্ষেত্রেই ধরে নেয়া যায় তার জরায়ুতে যক্ষ্মা হয়েছে। পরীক্ষার পর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা সত্যে পরিণত হয়। দুঃখের বিষয় এদের অনেকেই জীবনে আর কখনও মা হতে পারে না।

আরও পড়ুনঃ   ঘন ঘন প্রস্রাবের চাপ হলে যা খাবেন

পুরাল ইফিউশন ও পেরি কার্ডিয়াল ইফিউশন : কখনও কখনও যক্ষ্মার কারণে ফুসফুসের অন্ত ও বহিরাবরণের মধ্যে এক ধরনের তরল পদার্থ জমে এটা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পানির মতো দেখা যায়, কখনও বা রক্ত অথবা দুধের মতো দেখা যেতে পারে। একে বলা হয় পরাল ইফিউশন এবং একই কারণে হৃৎপিন্ডেও এ ধরনের পদার্থ জমতে পারে। এর নাম পেরিকার্ডিয়াল ইফিউশন। এর ফলে বুকে ব্যাথা, বুক ধড়ফড়, শ্বাস কষ্ট, কাঁশি ও জ্বর হতে পারে। পানি জাতীয় পদার্থ বেশি জমা হলে শ্বাসকষ্ট এত তীব্র হয় যে তখনই এটা বের করা না হলে মারাত্মক জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।

চামড়া : চামড়ায় যক্ষ্মা হলে চামড়া ফুলে যায়, লাল হয়ে ওঠে, ঘা হয় এবং কালো কালো দাগ পড়তে পারে। ঘা এর মাঝখানটা নিচু থাকে।

পূর্বেই বলা হয়েছে শরীরের আক্রান্ত স্থান ভেদে যক্ষ্মার স্থানীয় লক্ষণে তারতম্য থাকলেও সব যক্ষ্মার সাধারণ লক্ষণ একই। যেমন ওজন হ্রাস, ক্ষুধামন্দা, ঘুষঘুষে জ্বর বিশেষ করে সান্ধ্যকালীন সময়ে, শরীর দিয়ে দরদর করে ঘাম ঝরা, ক্লান্তি এবং ভাল না লাগা। বোধ করি এখানে যক্ষ্মার একেবারে প্রারম্ভিক লক্ষণ সম্পর্কে কিছু বলা দরকার। কোন সুস্থ লোকের শরীরে যক্ষ্মা জীবাণু প্রবেশ করার তিন থেকে আট সপ্তাহের মধ্যে তার শরীরে কিছু লক্ষণ দেখা দেয়। যেমন খুব অল্প অল্প জ্বর, কারণ ছাড়াই চোখ দুটো একটু লাল হওয়া এবং শরীরের চাপ কেন্দ্রে (প্রেসার পয়েন্ট) যেমন-কনুই, হাঁটু, কবজি ইত্যাদি স্থানে ব্যাথা যুক্ত লালচে দাগ ইত্যাদি। এসব লক্ষণ আপনা আপনি ভাল হয়ে যেতে পারে।

পরিবশেষে এটা বলা দরকার যে, কারও শরীরে যক্ষ্মার স্থানীয় লক্ষণ বা সাধারণ লক্ষণসমূহ দেখা দিলে আর বিলম্ব না করে তার চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত কারণ এই অবস্থায় যে কোন লোকেরই যক্ষ্মা হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।

আরও পড়ুনঃ   জেনে নিন আর্থ্রাইটিস রোগের প্রাকৃতিক সমাধান

ডা. একেএমডি আহসান আলী

লেখক : যক্ষ্মা ও বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ

LEAVE A REPLY