গেঁটে বাত লক্ষণ ও চিকিৎসা

0
844
গেঁটে বাত,gout

গেঁটে বাত বা গাউট হলো অনেক উপসর্গের সমষ্টি। প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে মানুষ গেঁটে বাত রোগের সাথে পরিচিত। গেঁটে বাত কয়েকটি অতি প্রাচীন রোগের মধ্যে একটি। আজ থেকে প্রায় ৮০০ বছর আগে গেঁটে বাতের নাম প্রথমবারের মতো গাউট রাখা হয়।

পুরুষের এ রোগ হওয়ার প্রবণতা বেশি। গেঁটে বাত সাধারণত অল্প বয়সী পুরুষ ও বেশি বয়সী মহিলাদের হয়ে থাকে। এছাড়া কৈশোর-উত্তর থেকে মাঝ বয়সের পুরুষের এ রোগ হওয়ার প্রবণতা বেশি বলে মনে করেন আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা। মহিলাদের সাধারণত এ রোগ হয় না বললেই চলে, তবে স্রাব-উত্তর প্রৌঢ় মহিলা অর্থাৎ ঋতুস্রাব বন্ধ হওয়ার পর মহিলাদের মধ্যে এ রোগ দেখা দিতে পারে। শহরে ধনী সমাজ থেকে গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে এ রোগের প্রাদুর্ভাব একেবারেই কম বলে মনে করা হয়।

গেঁটে বাত একপ্রকার সিন্ড্রোম, যা ইউরেট নামে এক প্রকার লবণ দানা জমে জোড়া বা সন্ধিতে সৃষ্ট প্রদাহ, যা দেহের রক্তের প্লাজমায় অতিরিক্ত ইউরিক এসিডের উপস্থিতির ফলেই ঘটে থাকে। গেঁটে বাত স্বল্পকালীন তীব্র প্রদাহ বা দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ এই দুই প্রকারের হতে পারে। আবার যে কারণে রক্তের ইউরেট লবণ বেড়ে যায় তা বিভিন্ন কারণে হতে পারে। যেমন: পারিপার্শ্বিক বা পরিবেশগত কারণ, ব্যক্তির খাদ্যাভ্যাসের কারণে বা ব্যক্তির জন্মগত ত্রুটির কারণে, যাকে জিনেটিক কারণও বলা যায়।

গেঁটে বাতের কারণগুলোর মধ্যে রক্তে অতিরিক্ত ইউরেট লবণ বা ইউরিক এসিডের উপস্থিতির কথা আগেই বলা হয়েছে। অতিরিক্ত ইউরিক এসিড দেহে দুইভাবে জমতে পারে। যেমন: অতিরিক্ত ইউরিক এসিড উৎপাদন এবং ইউরিক এসিড দেহ থেকে নির্গত হতে বাধাপ্রাপ্ত হওয়া। ইউরিক এসিড দেহ থেকে সাধারণত কিডনির সাহায্যে বের হয়। কোনো কারণে বিশেষ করে কিডনি রোগের কারণে কিডনির কর্মক্ষমতা হ্রাসে অসুবিধা হতে পারে।

গেঁটে বাতের লক্ষণ

এই রোগের প্রধান প্রধান উপসর্গের মধ্যে পায়ের বুড়ো আঙুলের অসহনীয় ব্যথাসহ হাঁটু, গোড়ালি বা কাঁধে ব্যথা হতে পারে। এই ব্যথা সাধারণত প্রোটিন জাতীয় খাবার খেলে বেড়ে যেতে পারে।

আরও পড়ুনঃ   রূপচর্চায় তেজপাতার অসাধারণ ৬টি গুণ

-হঠাৎ তীব্র ব্যথা, এমনকি ব্যথার দরুন ঘুম ভেঙে যাওয়া।

-পায়ের বুড়ো আঙুলের গোড়া ফুলে লাল হয়ে যাওয়া।

– হাঁটু, কনুই বা অন্য যে কোনো জোড়া বা সন্ধি ফুলে যাওয়া।

-ক্রমান্বয়ে হাড় ও তরুণাস্থি ক্ষয় হয়ে যাওয়া।

-ইউরেট লবণের দানা জমাট বেঁধে টফি তৈরি করতে পারে।

– ক্রমান্বয়ে জোড়া বা সন্ধি স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা হারাতে পারে।

গেঁটে বাতের চিকিৎসা ও প্রতিকার

চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রথমত রোগীর আক্রান্ত স্থানকে বিশ্রামে রাখতে হবে। বেদনানাশক ওষুধ হিসেবে ইন্ডোমেথাসিন বেশ কার্যকর। তা ছাড়া বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী এলুপিউরিনল ওষুধ সেবন করা যেতে পারে। এই রোগীদের পিউরন-সমৃদ্ধ খাবার যেমন: কবুতরের গোশ্ত, হাঁসের গোশত, গরুর লাল গোশত, সামুদ্রিক মাছ, মাছের ডিম, ছোট মাছ, মগজ, কলিজা, পুঁইশাক, ফুলকপি ও শিমের বিচি বর্জন করা উচিত।

গেঁটে বাতের চিকিৎসায় প্রাথমিক তীব্র ব্যথার জন্য বেশ কিছু ব্যথার ওষুধের কথা বলা হয়েছে, যার সব একসাথে এনএসআইডি বলা হয়। এদের মধ্যে ইন্ডোমেথাসিন এ ব্যাপারে বহুল ব্যবহৃত। গেঁটে বাতের অ্যাকুট অবস্থার তীব্র ব্যথার জন্য কোলচিসিনও খুবই কার্যকর। গেঁটে বাতের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার জন্য অনেক ওষুধ থাকলেও এলুপিউরিনল ওষুধটিই সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। এ ছাড়া রক্তের ইউরিক এসিড কমানোর জন্য ইউরিকোসইউরিক এজেন্ট নামে কিছু ওষুধ ব্যবহার করা হয়। যেমন: প্রোবেনাসিড। অসুস্থ হলে রোগীর প্রয়োজন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া, নিজে ওষুধ খাওয়া নয়। তা ছাড়া গেঁটে বাত হলে হাত বা পায়ের দিকে বেশি নজর দিতে হবে, যাতে হাত বা পায়ে কোনো আঘাত না লাগে। কারণ আঘাত লাগলে এ রোগের তীব্রতা বেড়ে যায়। তাই আসুন গেঁটে বাত হলে এর উপযুক্ত চিকিৎসা করা এবং এ রোগকে নিয়ন্ত্রণ করি।

ডা. এমএ শাকুর, বাত-ব্যথা বিশেষজ্ঞ, ইব্নে সিনা পেইন, ফিজিওথেরাপি অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার, বাড়ি নং-৪৮, রোড নং-৯/এ, ধানমন্ডি, ঢাকা।

আরও পড়ুনঃ   মরণ ব্যাধি এইডস সারাবিশ্বের জন্য হুমকি

LEAVE A REPLY