চট্টগ্রামে চিকিৎসকদের প্রেসক্রিপশন বাণিজ্য : প্রতারিত হচ্ছে রোগী ও অভিভাবক

0
83
প্রেসক্রিপশন বাণিজ্

জামালুদ্দিন হাওলাদার, চট্টগ্রাম : চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ নগরীর সরকারি হাসপাতাল, বিভিন্ন প্রাইভেট ক্লিনিক এবং ডায়াগনোস্টিক সেন্টারে চিকিৎসকদের প্রেসক্রিপশন বাণিজ্যের কারণে প্রতিদিন চিকিৎসা ব্যবস্থায় প্রতারিত হচ্ছেন অসংখ্য মানুষ। যার ফলে চিকিৎসা ব্যয় বেড়ে গেছে বহু গুণ। দরিদ্র মধ্যবিত্তদের নাগালের বাইরে চলে গেছে চিকিৎসাসেবা। বর্তমানে উপঢৌকন ও কমিশন প্রবণতা চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষের জন্য মরার উপর খাড়ার ঘা হিসেবে দেখা দিয়েছে। কোম্পানিগুলোর উপঢৌকন আর কমিশন মহামারী আকার ধারণ করেছে চিকিৎসা ব্যবস্থায়।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, হাসপাতালের চিকিৎসক ও বিভিন্ন কোম্পানির মেডিকেল প্রতিনিধিদের (এমআর) এক অভিন্ন চিত্র। প্রায় প্রতিটা কক্ষেই বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভদের আনাগোনা থাকে। সুকৌশলে রোগীদের প্রেসক্রিপশন চেক করতেও দেখা গেছে অনেক মেডিকেল প্রতিনিধিকে। উদ্দেশ্য চিকিৎসক এমআর-এর কোম্পানির ওষুধ প্রেসক্রিপশনে লিখছেন কিনা তা যাচাই করা। যদি কোনো চিকিৎসক ওই প্রতিনিধির কোম্পানির ওষুধ না লিখেন, তাহলে যে কোনোভাবে তার কোম্পানির ওষুধ লিখতে উৎসাহিত করাই এমআর-এর মূল উদ্দেশ্য। একাধিক এমআর জানিয়েছেন, চিকিৎসক ম্যানেজ করে তার কোম্পানির ওষুধ লেখাতে ব্যর্থ হলে চাকরি হারাতে হয়। এছাড়া এসব প্রেসক্রিপশন যাচাইয়ের জন্য কোম্পানির উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা হঠাৎ করে মাঠপর্যায়ে বিভিন্ন হাসপাতাল ও চিকিৎসকদের চেম্বার মনিটরিং করেন। সম্প্রতি রাজধানীর বাড্ডা এলাকার একটি ক্লিনিকে মধ্যম শ্রেণীর একজন চিকিৎসক দেশের স্বনামধন্য এক ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের দেয়া ল্যাপটপ উপঢৌকন হিসেবে গ্রহণ করেন। এ উপঢৌকনের বিপরীতে চিকিৎসক ৬০ শতাংশ প্রেসক্রিপশনে পরবর্তী ছয় মাস ওই কোম্পানির ওষুধ লিখবেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওই চিকিৎসক এ ধরনের একাধিক ওষুধ কোম্পানির উপঢৌকন গ্রহণ করেছেন।
সম্প্রতি হেলথ ওয়াচের এক সমীক্ষার রিপোর্ট থেকে জানা গেছে, গত ১৫ বছরে চিকিৎসকদের ব্যবস্থাপত্রে গ্যাস্ট্রিক ও এন্টিবায়োটিক ওষুধের ব্যবহার বেড়েছে বহুগুণ। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এন্টিবায়োটিক ওষুধের অপ্রয়োজনে প্রয়োগ বা অতিরিক্ত ব্যবহারে মানবদেহে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়, এছাড়া এর ফলে পর্যায়ক্রমে মানুষের চিকিৎসা ব্যয় বেড়ে যায়।
নগরীর প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতেও চিকিৎসকরা বিভিন্ন কোম্পানির প্রতিনিধিদের মাধ্যমে ১ লাখ থেকে ৫ লাখ পর্যন্ত আর্থিক উপঢৌকন নেয়ার অভিযোগ রয়েছে। এ ধরনের উপঢৌকনের বিনিময়ে ঐ চিকিৎসক ৬ মাস থেকে ১ বছর পর্যন্ত নির্দিষ্ট কোম্পানির ওষুধ প্রেসক্রিপশন করার অলিখিত চুক্তিতে আবদ্ধ হন। আবার অপেক্ষাকৃত কম চাহিদাপূর্ণ চিকিৎসকদের বেলায় কোম্পানির দেয়া ছোট ছোট উপঢৌকন অথবা মাসে ২ থেকে ৫ হাজার টাকা উপঢৌকন গ্রহণ করছে। এমনও তথ্য জানা গেছে, নগরীর জামালখানস্থ একটি ক্লিনিকের এক চিকিৎসক একটি কোম্পানির ওষুধ ৬ মাস প্রেসক্রিপশন করার চুক্তিবদ্ধ হয়েও ৩ মাসের মাথায় গিয়ে ওই প্রেসক্রিপশনে অন্য কোম্পানির ওষুধ লিখতে শুরু করেছেন।
কিছু ওষুধ কোম্পানি ও চিকিৎসকদের অন্যায়-অনিয়মের কারণে আমাদের দেশের চিকিৎসাসেবীদের চিকিৎসা ব্যয় বেড়ে গেছে। ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর অতি উৎসাহের কারণে চিকিৎসক সম্প্রদায়ের অনেকেই বাণিজ্যলোভী হয়ে পড়েছেন। কিছু ডায়াগনস্টিক ও ওষুধ কোম্পানি তাদের মেডিকেল রিপ্রেজেনটেটিভের (প্রতিনিধি) মাধ্যমে চিকিৎসকদের বিভিন্ন ধরনের উপঢৌকন দিয়ে প্রেসক্রিপশনে (চিকিৎসা ব্যবস্থাপত্র) তাদের কোম্পানির ওষুধ লিখতে উৎসাহিত করেন। অপরপক্ষে কিছু ডায়গনস্টিক সেন্টার বৃহৎ অঙ্কের কমিশনের প্রলোভন দিয়ে চিকিৎসকদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলেন। এভাবে একজন চিকিৎসককে একাধিক কোম্পানির উপঢৌকন গ্রহণ করায় দায়িত্ব পালনে অনেক ক্ষেত্রে মানসিক চাপ থাকে। যার ফলে বাধ্য হয়ে ওই চিকিৎসক ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সকল প্রতিষ্ঠানের সন্তুষ্টির দিকে চিন্তা করে ব্যবস্থাপত্র লিখে থাকেন। এসব কারণে চিকিৎসক কর্তৃক হয়রানির শিকার হন রোগীরা। রোগীদের অনেক প্রেসক্রিপশন (চিকিৎসা ব্যবস্থাপত্র) যাচাই করে দেখা গেছে চিকিৎসক রোগ সংশ্লিষ্ট অপ্রয়োজনীয় একাধিক ওষুধ ও ল্যাব সংশ্লিষ্ট পরীক্ষা দিয়ে থাকে এবং নির্দিষ্ট পরীক্ষাকেন্দ্রে (ল্যাব) পরীক্ষা করিয়ে দেখানোর নির্দেশ থাকে। এছাড়া প্রায় ৯০ শতাংশ প্রেসক্রিপশনে কমন ওষুধ হিসেবে বিভিন্ন প্রকার গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ ও অ্যান্টিবায়োটিক জাতীয় ওষুধ লিখছেন।
সংশ্লিষ্ট এক সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশে ওষুধ কোম্পানিগুলোয় ২০ হাজারের ঊর্ধ্বে মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভ কাজ করছে। মূলত এসব প্রতিনিধি কোম্পানিগুলোর ওষুধ বিক্রি বাড়ানোর কাজ করে থাকে বলে তাদের ওপরে কোম্পানিগুলোর বিক্রি বাড়ানোর চাপ থাকে। লক্ষ্য পূরণের জন্য এমআরদের প্রণোদনা পুরস্কারও ঘোষণা থাকে। এ কারণে লক্ষ্য পূরণে এমআর মরিয়া হয়ে চিকিৎসকের পিছু লেগে থাকে। ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোও নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের এমআর নিয়োগ দিয়েছে। এ সকল এমআর ২৫ শতাংশ থেকে ৭৫ শতাংশ কমিশনের প্রস্তাব নিয়ে চিকিৎসকের কাছে ঘুরে বেড়ায়। ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো ব্যবস্থাপত্র হিসাব করে নিজেদের প্রতিনিধির মাধ্যমে চিকিৎসকের কছে চুক্তি মোতাবেক কমিশন পৌঁছে দেয়। চিকিৎসা সংশ্লিষ্ট এ প্রতারণা থেকে দেশের জনগণকে মুক্ত করার কোনো জোরালো পদক্ষেপ নেই সরকারের।

আরও পড়ুনঃ   ডায়বেটিক রোগীদের যেসব খাবার খাওয়া উচিত

বিঃ দ্রঃ গুরুত্বপূর্ণ হেলথ নিউজ ,টিপস ,তথ্য এবং মজার মজার রেসিপি নিয়মিত আপনার ফেসবুক টাইমলাইনে পেতে লাইক দিন আমাদের ফ্যান পেজ বিডি হেলথ নিউজ এ ।

LEAVE A REPLY