চিকিৎসক-সংকটে ধুঁকছে বরিশালের স্বাস্থ্যসেবা- অর্ধেকের বেশি পদ শূন্য

0
36
বরিশালের স্বাস্থ্যসেবা

বরগুনার আমতলী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসকের পদ ২৫টি। আছেন মাত্র দুজন। সম্প্রতি প্রেষণে আনা হয়েছে কুকুয়া ও গাজীপুর উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রের দুই চিকিৎসককে। ফলে ওই কেন্দ্র দুটি এখন চিকিৎসকশূন্য।
গত ১৩ আগস্ট সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স রোগীর চাপে হিমশিম খাচ্ছে। বহির্বিভাগের সামনে রোগীর দীর্ঘ সারি। অপেক্ষমাণ আমেনা বেগম বললেন, ‘যেদিনই হাসপাতালে আই, চিকিৎসা পাই না। চিন্তা হরছি, আর আমু না।’
উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা এম এ মতিন বললেন, ‘প্রতিদিন গড়ে ৩৫০-৪০০ রোগী আসেন। মাত্র দুজন চিকিৎসক দিয়ে কীভাবে ৫০ শয্যার একটা হাসপাতাল চলে, বলুন?’
বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ছয় জেলায় সরকারি হাসপাতাল রয়েছে ৩৮২টি। এর মধ্যে ছয়টি জেনারেল হাসপাতাল, ৪০টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ৭০টি উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র ও ২৬৬টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র। এসব হাসপাতালে চিকিৎসকের পদ ১ হাজার ৮৫টি। বর্তমানে কর্মরত ৫০৮ জন। বরিশাল বিভাগে জনসংখ্যা প্রায় ১ কোটি। সে হিসাবে প্রতি ১৮ হাজার মানুষের জন্য আছেন একজন চিকিৎসক। সবচেয়ে খারাপ অবস্থা উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের।
শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বাদে বরিশাল জেলায় চিকিৎসকের পদ আছে ২২৪টি। এর মধ্যে ৮৯টিই এখন শূন্য। একইভাবে পটুয়াখালীতে ২২৯টির মধ্যে ১৩৮টি, ভোলায় ২০০টির মধ্যে ১০৫টি, পিরোজপুরে ১৬৮টির মধ্যে ৮৭টি, বরগুনায় ১৬২টির মধ্যে ১১১টি এবং ঝালকাঠিতে ১০২টি পদের মধ্যে ৪২টি চিকিৎসকের পদ শূন্য।
স্বাস্থ্য বিভাগের বরিশাল কার্যালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, নিয়োগ পাওয়ার পর অধিকাংশ চিকিৎসকই তদবির করে বদলি হয়ে চলে যান। ফলে এ বিভাগে চিকিৎসক-সংকট লেগেই থাকে। সর্বশেষ ৩৩তম বিসিএসে ৩৫০ জন চিকিৎসককে নিয়োগ দেওয়া হলেও ৬০ জন বদলি নিয়ে চলে গেছেন। একইভাবে ২০১০ সালে প্রত্যন্ত অঞ্চলের সরকারি হাসপাতালগুলোর জন্য সাড়ে তিন হাজার নন-ক্যাডার চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হয়। প্রতি জেলায় ৫৫ জন করে পদায়নের কথা ছিল। সে হিসাবে বরিশালের ৬ জেলার ৩৩০ জনের পদায়নের কথা থাকলেও করা হয় ২১২ জন চিকিৎসককে। তাঁদের মধ্যে ৮২ জনই তদবির করে নিয়োগ পান বরিশালের বিভিন্ন হাসপাতালে। সবচেয়ে কম (মাত্র ১৪ জন) চিকিৎসক পায় বরগুনা। আবার এই ২১২ জন চিকিৎসকের বেশির ভাগ বছর না ঘুরতেই তদবির করে নিজেদের সুবিধামতো জায়গায় চলে গেছেন। ফলে কাঙ্ক্ষিত সেবা না পেয়ে, বিশেষ করে দরিদ্র রোগীদের হাতুড়ে ও গ্রাম্য চিকিৎসকদের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে।
মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা বেহাল: উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পাশাপাশি জেলা সদরের হাসপাতালও চিকিৎসক-সংকটে ধুঁকছে। ফলে তৃণমূলে চিকিৎসাসেবা মুখ থুবড়ে পড়েছে। বরগুনা ও ঝালকাঠির বিভিন্ন হাসপাতাল ঘুরে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।
গত ১৩ আগস্ট সকালে বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, বহির্বিভাগের সামনে প্রায় ২০০ রোগীর সারি। মাত্র একজন চিকিৎসক তাঁদের নিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন। আবুল হোসেন নামের কেওড়াবুনিয়া গ্রামের এক রোগী জানালেন, তিনি দুই ঘণ্টা ধরে অপেক্ষায় আছেন। পোটকাখালী গ্রামের লতিফা বেগম ঠায় দাঁড়িয়ে আড়াই ঘণ্টা। ধৈর্যহারা হয়ে বাড়ি ফিরে যাওয়ার আগে তিনি বললেন, ‘যে ভিড়, হ্যাতে আরও দুই ঘণ্টায়ও মুই ডাক্তারের দ্যাহা পামুনা। হ্যার চাইতে বাজারের ফার্মেসিতে ডাক্তার (পল্লিচিকিৎসক) দ্যাহামু।’
এ হাসপাতালে ভর্তি থাকা অন্তত ১০ জন রোগীর সঙ্গে কথা হয়। তাঁরা বলেন, ভাগ্য প্রসন্ন হলে দিনে একবার চিকিৎসকের দেখা মেলে। পরিচয় গোপন রাখার শর্তে এক রোগী বলেন, তিনি দুদিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি থাকলেও চিকিৎসকের দেখা পাননি।
হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) কামরুল ইসলাম বলেন, ‘২৫০ শয্যার এ হাসপাতালে মাত্র সাতজন চিকিৎসক আছেন। আমরা দিন-রাত কাজ করছি।’
জানতে চাইলে বরগুনার সিভিল সার্জন রুস্তম আলী প্রথম আলোকে বলেন, মাত্র ৪৫ জন চিকিৎসক দিয়ে বরগুনা জেনারেল হাসপাতাল, ৫টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ৪২টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
একইভাবে ঝালকাঠি সদর হাসপাতালে ২৩টি পদের বিপরীতে চিকিৎসক আছেন মাত্র ৮ জন। ১৪ আগস্ট এ হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, বহির্বিভাগে রোগীদের ভিড়। গাবখান এলাকার আনসার আলী অসুস্থ শিশুকে কোলে নিয়ে দেড় ঘণ্টা ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি বলেন, ‘গরিব মানুষ ছাড়া এই হাসপাতালে কেউ আয় না, আমাগো তো টাহা দিয়া বাইরে ডাক্তার দ্যাহানের সামর্থ্য নাই। কী করমু।’
একই দিন ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়ে জানা যায়, ৫০ শয্যার এ হাসপাতালে ১৫ জন চিকিৎসকের স্থলে আছেন মাত্র দুজন। সম্প্রতি প্রেষণে আরও দুজন চিকিৎসক আনা হয়েছে।
রাজাপুরের পুটিয়াখালী গ্রামের সালেহা বেগম (৫২) বলেন, ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে গত শুক্রবার সকালে তিনি ভর্তি হয়েছেন। কিন্তু শনিবার সকাল পর্যন্ত কোনো চিকিৎসকের দেখা পাননি তিনি। তবে জ্বর ও শ্বাসকষ্টের সমস্যায় আক্রান্ত নৈকাঠী গ্রামের শাহ আলম হাওলাদার (৫৫) বলেন, ভর্তি হওয়ার পর চার দিনে দুবার চিকিৎসক তাঁকে দেখেছেন।
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আরএমও আবুল খায়ের বলেন, তাঁদের চেষ্টায় ত্রুটি নেই। কিন্তু চিকিৎসক-সংকটের কারণে রোগীদের পর্যাপ্ত সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
স্বাস্থ্য বিভাগের বরিশাল বিভাগীয় পরিচালক বিনয় কৃষ্ণ বিশ্বাস প্রথম আলোকে বলেন, ‘চিকিৎসক-সংকট এখন এতটাই তীব্র যে হাসপাতালগুলোতে সেবা দেওয়া দুঃসাধ্য হয়ে পড়ছে। আমি বিষয়টি লিখিতভাবে বেশ কয়েকবার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানিয়েছি। তাঁরা আশ্বাস দিচ্ছেন। কিন্তু ফল পাচ্ছি না।’

আরও পড়ুনঃ   আবিস্কার : কম ঘুমানো ক্ষতিকর

বিঃ দ্রঃ গুরুত্বপূর্ণ হেলথ নিউজ ,টিপস ,তথ্য এবং মজার মজার রেসিপি নিয়মিত আপনার ফেসবুক টাইমলাইনে পেতে লাইক দিন আমাদের ফ্যান পেজ বিডি হেলথ নিউজ এ ।

এম জসীম উদ্দীন, বরিশাল

LEAVE A REPLY