জন্ডিসের ইতিবৃত্ত

0
32
জন্ডিসের ইতিবৃত্ত,জন্ডিসে,জন্ডিসের ইতিহাস

জন্ডিস কি?
জন্ডিস আসলে কোন রোগ নয়, এটি রোগের লক্ষণ মাত্র। চোখের সাদা অংশ হলুদ হয়ে যাওয়াকে আমরা জন্ডিস বলে থাকি। জন্ডিস মাত্রা বেশি হলে হাত, পা আর এমনকি সমস্ত শরীরও হলুদ হয়ে যেতে পারে। এর পাশাপাশি প্রস্রাবের রং হালকা থেকে গাঢ় হলুদ হতে পারে। বিলিরুবিন নামক এক ধরনের পিগমেন্টের মাত্রা বেড়ে গেলে জন্ডিস দেখা দেয়। জন্ডিসে অধিকাংশ ক্ষেত্রে লিভার আক্রান্ত হয়। আর তাই জন্ডিসকে কখনোই হেলাফেলা করা উচিত নয়।
জন্ডিস কেন হয়?
আগেই যেমনটি বলেছি, রক্তে বিলিরুবিনের মাত্রা বেড়ে গেলে জন্ডিস দেখা দেয়। আমাদের রক্তের লোহিত কণিকাগুলো একটা সময়ে স্বাভাবিক নিয়মেই ভেঙ্গে গিয়ে বিলিরুবিন তৈরি করে যা পরবর্তীতে লিভারে প্রক্রিয়াজাত হয়ে পিত্তরসের সাথে পিত্তনালীর মাধ্যমে পরিপাকতন্ত্রে প্রবেশ করে। অন্ত্র থেকে বিলিরুবিন পায়খানার মাধ্যমে শরীর থেকে বেরিয়ে যায়। বিলিরুবিনের এই দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় যে কোনো অসঙ্গতি দেখা দিলে রক্তে বিলিরুবিন বেড়ে যায় আর দেখা দেয় জন্ডিস।
জন্ডিস ও লিভার
লিভারের রোগ জন্ডিসের প্রধান কারণ। আমরা যা কিছুই খাই না কেন তা লিভারে প্রক্রিয়াজাত হয়। লিভার নানা কারণে রোগাক্রান্ত হতে পারে। হেপাটাইটিস এ, বি, সি, ডি, এবং ই ভাইরাসগুলো লিভারে প্রদাহ সৃষ্টি করে যাকে বলা হয় ভাইরাল হেপাটাইটিস। আমাদের দেশসহ সারা বিশ্বেই জন্ডিসের প্রধান কারণ এই হেপাটাইটিস ভাইরাসগুলো। তবে উন্নত দেশগুলোতে অতিরিক্ত মদ্যপান জন্ডিসের একটি অন্যতম কারণ।
এছাড়াও অটোইমিউন লিভার ডিজিজ এবং বংশগত কারণসহ আরো কিছু অপেক্ষাকৃত বিরল ধরনের লিভার রোগেও জন্ডিস হতে পারে। ওষুধের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ায়ও অনেক সময় জন্ডিস হয়। তাছাড়াও থ্যালাসিমিয়া ও হিমোগ্লোবিন ই-ডিজিজের মতো যেসমস্ত রোগে রক্ত ভেঙ্গে যায় কিংবা পিত্তনালীর পাথর বা টিউমার এবং লিভার বা অন্য কোথাও ক্যান্সার হলেও জন্ডিস হতে পারে। তাই জন্ডিস মানেই লিভারের রোগ এমনটি ভাবা ঠিক নয়।
জন্ডিসের লক্ষণ
জন্ডিস হলে চোখ হলুদ হয়। তবে হেপাটাইটিস রোগে জন্ডিসের পাশাপাশি ক্ষুদামন্দা, অরুচি, বমি ভাব, জ্বর জ্বর অনুভূতি কিংবা কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসা, মৃদু বা তীব্র পেট ব্যথা ইত্যাদি হতে পারে। এসব উপসর্গ দেখা দিলে তাই অবশ্যই একজন লিভার বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেয়া উচিত। চিকিৎসক শারীরিক লক্ষণ এবং রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে জন্ডিসের তীব্রতা ও কারণ নির্ণয় করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসার নির্দেশনা দিয়ে থাকেন।
জন্ডিসের চিকিৎসা
ভাইরাল হেপাটাইটিসের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেয়া চিকিৎসার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কোনো কোনো ক্ষেত্রে রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করারও প্রয়োজন হতে পারে। ভাইরাল হেপাটাইটিস সাধারণত ৩ থেকে ৪ সপ্তাহের মধ্যে সম্পূর্ণ সেরে যায়। এসময় ব্যথার ওষুধ যেমন, প্যারাসিটামল, এসপিরিন, ঘুমের ওষুধসহ অন্য কোনো অপ্রয়োজনীয় ও কবিরাজী ওষুধ খাওয়া উচিত নয়। অন্যভাবে বলতে গলে জন্ডিস হলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধই বাস্তবে সেবন করা ঠিক না। এতে হিতে-বিপরীত হবার ঝুঁকিটাই বেশি থাকে।
হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাস দুটি কিছু কিছু ক্ষেত্রে জন্ডিস সেরে যাবার পরও লিভারের র্দীর্ঘমেয়াদী প্রদাহের সৃষ্টি করতে পারে যা লিভার পরবর্তী সময়ে লিভার সিরোসিস আর এমনকি লিভার ক্যান্সারের মতোন জটিল রোগও তৈরি করতে পারে। তাই এদুটি ভাইরাসে আক্রান্ত হলে দীর্ঘমেয়াদী লিভার বিশেষজ্ঞের ফলোআপে থাকতে হবে এবং প্রয়োজনে এন্টিভাইরাল চিকিৎসা নিতে হবে।
হেপাটাইটিস ভাইরাস থেকে বাঁচার উপায়
হেপাটাইটিস এ ও ই খাদ্য ও পানির মাধ্যমে সংক্রমিত হয়। আর বি, সি এবং ডি দূষিত রক্ত, সিরিঞ্জ এবং আক্রান্ত ব্যক্তির সাথে শারীরিক সম্পর্কের মাধ্যমে ছড়ায়। তাই সবসময় বিশুদ্ধ খাদ্য ও পানি খেতে হবে। শরীরে রক্ত দরকার হলে অবশ্যই প্রয়োজনীয় স্ক্রিনিং করে নিতে হবে। ডিসপোজেবল সিরিঞ্জ ব্যবহার করাটাও খুবই জরুরী।
ডেপাটাইটিস বি ও এ -এর টিকা আমাদের দেশে পাওয়া যায়। বিশেষ করে হেপাটাইটিস বি -এর টিকা প্রত্যেকেরই নেয়া উচিত। যারা সেলুনে সেভ করেন, তাদের খেয়াল রাখতে হবে যেন আগে ব্যবহার করা ব্লেড বা ক্ষুর আবারও ব্যবহার করা না হয়।
শেষ কথা
জন্ডিস অনেক ক্ষেত্রেই এমনকি মৃত্যুরও কারণ হতে পারে। তাই বাঁচতে হলে আমাদের সবাইকে জানতে হবে, হতে হবে সচেতন।

আরও পড়ুনঃ   এপেন্ডিসাইটিস

ডাঃ মামুন-আল-মাহতাব (স্বপ্নীল)
সহকারী অধ্যাপক, লিভার বিভাগ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়
লিভার, গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিশেষজ্ঞ
ইন্টারভেনশনাল এন্ডাস্কোপিস্ট
ল্যাব এইড স্পেশালাইজড হসপিটাল

LEAVE A REPLY