জলপাইয়ের দারুণ সব উপকারিতা জেনে নিন

0
135
জলপাইয়ের উপকারিতা

যে ফলগুলোর প্রসঙ্গ মহাগ্রন্থ আল কোরআনে এসেছে তার অন্যতম হলো জয়তুন বা জলপাই। আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন, ‘আর তিনি এ পানি দ্বারা তোমাদের জন্য উৎপাদন করেন ফসল। জয়তুন (জলপাই) খেজুর, আঙুর ও সব ধরনের ফল। নিশ্চয় এতে চিন্তাশীলদের জন্য নিদর্শন রয়েছে ! (সূরা নাহ্ল : ১১)। জয়তুন বা জলপাই হচ্ছে এক ধরনের টক ফল। এটি পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের উপকূলীয় এলাকা, বিশেষ করে লেবানন, সিরিয়া ও তুরস্কের সামুদ্রিক অঞ্চল, ইরানের উত্তরাঞ্চল তথা কাস্পিয়ান সাগরের দক্ষিণে ভালো জন্মে। তাছাড়া ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে তেলের কারণে এর অর্থনৈতিক গুরুত্ব বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। জলপাই গাছ এক ধরনের চিরহরিৎ বৃক্ষ। ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল এশিয়া, বাংলাদেশ ও আফ্রিকার কিছু অংশে এটা ভালো জন্মে। জলপাই গাছ ৮ থেকে ১৫ মিটার লম্বা হয়ে থাকে। এর পাতা ৪ থেকে ১০ সেন্টিমিটার লম্বা ও ১ থেকে ৩ সেন্টিমিটার প্রশস্ত হয়ে থাকে! জলপাই ফল বেশ ছোট আকারের, লম্বায় ১-২.৫ সেন্টিমিটার হয়ে থাকে।
যুদ্ধে শান্তির প্রতীক জলপাইয়ের পাতা এবং মানুষের শরীরের শান্তির দূত জলপাইয়ের তেল, যা অলিভ অয়েল (olive oil) আরবিতে জয়তুন, (জলপাই তেল) যেটাকে liquid gold বা ‘তরল স্বর্ণ’ নামেও ডাকা হয়। হাদিস শরিফে এরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা জয়তুন (জলপাই) তেল ভক্ষণ করো এবং শরীরে মাখাও! (ইবনে মাজা : ৩৩২০)। সেই গ্রিক সভ্যতার প্রারম্ভিক কাল থেকেই এ তেল ব্যবহার হয়ে আসছে  রন্ধন কর্মে ও চিকিৎসা শাস্ত্রে। আকর্ষণীয় এবং মোহনীয় সব গুণাবলিই এ জলপাই তেলের মধ্যে রয়েছে। অবশ্য বাংলাদেশে এ তেলের ব্যবহার তেমন একটা নেই। শুধু শীতকালে শরীরে মাখা বা মালিশের কাজে ব্যবহার হয়, তাও খুবই কম! এছাড়া এ  তেল খাওয়ার কাজে ব্যবহার নেই বললেই চলে। তবে জলপাই ফল সবাই খায়। আমাদের দেশে জলপাই খুবই সস্তা এবং এর আচার বেশ জনপ্রিয় এ দেশে। জলপাই ফলের দামের তুলনায় এর তেলের দাম আকাশচুম্বী! এতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান রয়েছে. যেগুলো আমাদের শরীর সুস্থ ও সুন্দর রাখে। গবেষকরা জানিয়েছেন, ‘খাবারে জলপাইয়ের তেল ব্যবহারের ফলে শরীরের ব্যাড কোলেস্টরেল নিয়ন্ত্রণ হয় এবং গুড কোলেস্টেরল জন্ম হয়।  তাছাড়া পাকস্থলীর জন্য এ তেল অনেক উপকারী।
দেহের এসিড কমায়, যকৃৎ (liver) পরিষ্কার করে, যা প্রতিটি মানুষের ২-৩ দিনে একবার করে দরকার হয়। কোষ্ঠকাঠিন্য রোগীদের জন্য দিনে এক চামচ জলপাই তেল বহু উপকারী। সাধারণত সন্তান জন্মের পর মায়েদের পেটে সাদা রঙের স্থায়ী দাগ পড়ে যায়, গর্ভধারণ করার পর থেকেই পেটে জলপাই তেল (olive oil) মাখলে কোনো জন্ম দাগ পড়ে না। এটা একটি পরীক্ষিত ব্যাপার। জলপাই তেল গায়ে মাখলে বয়স বাড়ার সঙ্গে ত্বক কুঁচকানো প্রতিরোধ হয়। গবেষকরা ২.৫ কোটি (25 million) লোকের ওপর গবেষণা করে দেখেছেন, ‘প্রতিদিন দুই চামচ কুমারী’ জলপাই তেল (virgin olive oil) এক সপ্তাহ ধরে খেলে ক্ষতিকারক এলডিএল (LDL) কোলেস্টেরল কমায় এবং উপকারী এইচডিএল (HDL) কোলেস্টেরল বাড়ায়। স্প্যানিশ (span) গবেষকরা দেখেছেন, খাবারে জলপাই তেল ব্যবহার করলে ক্লোন ক্যান্সার (colon cancer) প্রতিরোধ হয়। আরও কিছু গবেষক জানিয়েছেন, ‘এটা ব্যথানাশক (pain killer) হিসেবেও কাজ করে। তাছাড়া গোসলের পানিতে ১ থেকে ৪ চামচ মিশিয়ে গোসল করলে শরীর আরামদায়ক অনুভূত হয়। মেয়েদের রূপ বর্ধনের জন্য এটা অনেকটাই কার্যকর। জলপাই তেল যে কোষ্ঠকাঠিন্য কমায় তা আল্লামা ইবনুল কাইয়্যুম জাওযি (রহ.) তার (The medicine of the prophet) গ্রন্থে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন! বাজারে কয়েক ধরনের জলপাই তেল (অলিভ অয়েল) পাওয়া যায়। যেমন : এক. Extra virgin. এটা প্রথম ধাপ, সরাসরি জলপাই থেকে তৈরি। এসিডের পরিমাণ এক শতাংশের নিচে। রান্নার জন্য বা সালাদে গবেষকরা এর প্রস্তাব করেন। দুই. virgin – Extra virgin এর পরের ধাপ এটা। এতে এসিডের পরিমাণ ১ থেকে ২ শতাংশ থাকে। তিন. Refine pure তৃতীয় ধাপ, এতে এসিডের পরিমাণ ৩ থেকে ৪ শতাংশ।
জয়তুন একাধারে ফল ও তরকারি হয়ে থাকে। এর তেল সর্বাধিক পরিষ্কার ও স্বচ্ছ এবং অসংখ্য গুণাগুণ ও বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হয়ে থাকে। এটি হাজারো রোগের উত্তম প্রতিষেধক!

 চলুন, দেখে নেয়া যাক জলপাইয়ের আরও কিছু উপকারিতার কথা।

১. ক্যান্সার প্রতিরোধে : কালো জলপাই ভিটামিনেরই ভালো উৎস। জলপাইতে আছে মনোস্যাটুরেটেড ফ্যাট। জলপাইয়ের ভিটামিন ই কোষের অস্বাভাবিক গঠনে বাধা দেয়। ফলে ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি কমে।
২. হৃদযন্ত্রের উপকারিতা : যখন মানুষের হৃদপিণ্ডের রক্তনালীতে চর্বি জমে, তখন হার্টএ্যটাক করার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি থাকে। জলপাইয়ের অ্যান্টি অক্সিডেন্ট হার্ট ব্লক হতে বাধা দেয়। জলপাইয়ে রয়েছে মোনো-স্যাচুরেটেড ফ্যাট, যা আমাদের হার্টের জন্য খুবই উপকারী।
৩. ওজন কমাতে : যখন জলপাইয়ের মোনো-স্যাচুরেটেড ফ্যাট অন্য খাবারে বিদ্যমান স্যাচুরেটেড ফ্যাটের বদলে গ্রহণ করা হয় তখন তা দেহের ভেতরের ফ্যাট সেলকে ভাঙতে সাহায্য করে। জলপাইয়ের তেলেও রয়েছে লো কোলেস্টেরল যা ওজন এবং ব্লাডপ্রেশার কমাতে সহায়ক।
৪. আয়রনের উৎস : জলপাই বিশেষ করে কালো জলপাই আয়রনের উৎস, আয়রন আমাদের দেহে রক্ত চলাচল করাতে সহায়তা করে, আর প্রাকৃতিক আয়রনের উৎসের জন্য জলপাই-ই সেরা।
৫. অ্যালার্জি প্রতিরোধে : গবেষণায় দেখা গেছে, জলপাই অ্যালার্জি প্রতিরোধে সহায়তা করে। জলপাইয়ে আছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি যা ত্বকের ইনফেকশন ও অন্যান্য ক্ষত সারাতে কার্যকরী ভুমিকা রাখে।
৬. কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে : জল পাইয়ে যে খাদ্যআঁশ আছে তা মানুষের দেহের পরিপাক ক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে এবং হজমে সহায়তা করে। নিয়মিত জলপাই খেলে কোলন ক্যান্সারের ঝুঁকি কমে।খাবার পরিপাকক্রিয়ায় সাহায্য করেজলপাই।শুধু তাই নয়, গ্যাস্টিক ও আলসারে হাত থেকেও বাঁচায় জলপাই।জলপাইয়ের তেলে প্রচুরপরিমানে ফাইবার থাকে। যা বিপাক ক্রিয়ায় সাহায্য করে।
৭. ত্বক ও চুলের যত্নে : কালো জলপাইয়ের তেল আছে ফ্যাটি এসিড ও এ্যান্টি অক্সিডেন্ট যা কিনা ত্বক ও চুলের যত্নে কাজ করে। জলপাইয়ের ভিটামিন ই ত্বকে মসৃনতা আনে। চুলের গঠনকে আরও মজবুত করে। ত্বকের ক্যানসারের হাত থেকেও বাঁচায় জলপাই। সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মির কারণে ত্বকের যে ক্ষতি হয় তা রোধ করে জলপাই।
৮. চোখের যত্নে : জলপাইয়ে ভিটামিন এ পাওয়া যায়। ভিটামিন এ চোখের জন্য ভালো। যাদের চোখ আলো ও অন্ধকারে সংবেদনশীল তাদের জন্য ওষুধের কাজ করে জলপাই।
৯.হাড়ের ক্ষয়রোধ করে জলপাই: 
এর মনোস্যাটুরেটেড ফ্যাটে থাকে এন্টি ইনফ্লামেটরি। রয়েছে ভিটামিন ই ও পলিফেনাল। যা কিনা অ্যাজমা ও বাত-ব্যাথা জনিত রোগের হাত থেকে বাঁচায়। বয়সজনিত কারণে অনেকেরই হাড়ের ক্ষয় হয়। এই হাড়ের ক্ষয়রোধ করে জলপাইয়ের তেল।

১০.বিভিন্ন রোগ দূর করে জলপাই: 
সংক্রামক ও ছোঁয়াচে রোগগুলোকে রাখে অনেক দূরে। নিয়মিত জলপাই খেলে পিত্তথলির পিত্তরসের কাজ করতে সুবিধা হয়। পরিণামে পিত্তথলিতে পাথরের প্রবণতা কমে যায়। এই তেলে চর্বি বা কোলেস্টেরল থাকে না। তাই ওজন কমাতে কার্যকর। যেকোনো কাটা-ছেঁড়া, যা ভালো করতে অবদান রাখে। জ্বর, হাঁচি-কাশি, সর্দি ভালো করার জন্য জলপাই খুবই উপকারী।

আরও পড়ুনঃ   আনারস ও দুধ একসাথে খেলে কী হয়?

১১.রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় জলপাই:
জলপাইয়ে প্রাকৃতিক অ্যান্টি-অক্সিডেন্টও রয়েছে প্রচুর পরিমাণে, যা দেহের ক্যান্সারের জীবাণুকে ধ্বংস করে এবং রোগ প্রতিরোধ শক্তিকে বাড়ায় দ্বিগুণ পরিমাণে।

—————————————————–

শুধু ফলের নয়, জলপাই পাতারও রয়েছে নানা ভেষজ গুণ। যেমন- জলপাই পাতা ছেঁচে কাটা স্থানে লাগালে ক্ষত দ্রুত শুকিয়ে যায়।

বাতের ব্যথায় জলপাই পাতা গুঁড়া ও জলপাই ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। জলপাই পাতার রস উকুন তাড়াতে কাজে দেয়।

ত্বকের ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকজনিত সমস্যায় জলপাই পাতা গুঁড়া ব্যবহার করা হয়।

ভাইরাসজনিত জ্বর, ক্রমাগত মোটা হওয়া, জন্ডিস, কাশি ইত্যাদির পথ্য হিসেবে জলপাই পাতা গুঁড়া ব্যবহার করা হয়।

পুষ্টিগুণ : জলপাই খুবই পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ ফল। প্রতি ১০০ গ্রাম জলপাইয়ের খাদ্যযোগ্য অংশে রয়েছে-

 খাদ্যশক্তি- ১৪৬ কিলোক্যালরি, শকরা-৩.৮৪ গ্রাম, চিনি-০.৫৪ গ্রাম, খাদ্য আঁশ- ৩.৩ গ্রাম, চর্বি-১৫.৩২ গ্রাম, আমিষ-১.০৩ গ্রাম, ভিটামিন এ- ২০ আইইউ, বিটা ক্যারোটিন-২৩১ আইইউ, থায়ামিন-০.০২১, রিবোফ্লাবিন-০.০০৭ মিলিগ্রাম, নিয়াসিন-০.২৩৭ মিলিগ্রাম, ভিটামিন বি৬-০.০৩১ মিলিগ্রাম, ফোলেট-৩ আইইউ, ভিটামিন ই-৩.৮১ মিলিগ্রাম, ভিটামিন কে-১.৪ আইইউ, ক্যালসিয়াম-৫২ মিলিগ্রাম, আয়রন-৩.১ মিলিগ্রাম, ম্যাগনেসিয়াম-১১মিলিগ্রাম, ফসফরাস-৪ মিলিগ্রাম, পটাসিয়াম ৪২ মিলিগ্রাম।

দেহের রক্ত চলাচল ঠিক রাখে ফলে হৃৎপিন্ড সঠিকভাবে কাজ করে।

জলপাইয়ে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ‘এ’ ও ‘সি’ আছে যা চোখের বিভিন্ন রোগ দূর করে, ত্বক, চুল, দাঁত ও হাঁড়কে মজবুত করে।

জলপাই খেলে পিত্তথলিতে পাথর জমবে না, বাতের ব্যথা কমবে।

এতে প্রচুর পরিমাণে প্রাকৃতিক অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট রয়েছে, যা দেহের ক্যানসারের জীবাণুকে ধ্বংস করে, রোগ প্রতিরোধ শক্তিকে বাড়ায়।

জলপাইয়ের তেলে কোনো চর্বি বা কোলেস্টেরল নেই। এই তেল রক্তের চর্বি বা ফ্যাটের পরিমাণ কমায়।

এই ফলে উচ্চহারে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল এজেন্ট রয়েছে যা দেহের রোগ-জীবাণুগুলো ধ্বংস করে।

বিঃ দ্রঃ গুরুত্বপূর্ণ হেলথ নিউজ ,টিপস ,তথ্য এবং মজার মজার রেসিপি নিয়মিত আপনার ফেসবুক টাইমলাইনে পেতে লাইক দিন আমাদের ফ্যান পেজ বিডি হেলথ নিউজ এ ।

আরও পড়ুনঃ   তিল ও তিলের তেলের চমকপ্রদ স্বাস্থ্য উপকারিতা

LEAVE A REPLY