জেনে নিন নবজাতক শিশুকে দুধ খাওয়ানোর সঠিক নিয়ম

0
991
শিশুকে দুধ খাওয়ানো

অনেকেই নবজাতককে বুকের দুধ খাওয়ানোর সঠিক নিয়ম না জানার কারণে নানা সমস্যার মুখোমুখি হন। শরণাপন্ন হতে হয় ডাক্তারের। কিছু নিয়ম মেনে চললে আপনার শিশু যেমন ভালোভাবে বুকের দুধ পাবে তেমনি সুস্থভাবে বেড়ে উঠবে। শিশুকে দুধ খাওয়ানোর সঠিক নিয়ম ও অন্যান্য যত্ন সম্পর্কে জানাচ্ছেন শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. কামরুন নাহার লুনা।

বুকের দুধই আপনার শিশুর প্রথম ও প্রধান খাবার। জন্মের পর পর ১ ঘণ্টার মধ্যেই বাচ্চাকে বুকের দুধ দিন।
•    জন্মের পর বাচ্চার মুখে মধু বা চিনির রস দেবেন না। মুখের কথা মিষ্টি হবার অজুহাতে মুরব্বীরা এটা করে থাকেন। এতে শিশুর ইনফেকশন হতে পারে। তাছাড়া মধু ডাইজেস্ট করার এনজাইম এ সময় বাচ্চার থাকে না। এক বছরের আগে বাচ্চাকে মধু খাওয়ানো যায় না।
•    ৬ মাস পর্যন্ত বাচ্চাকে শুধুমাত্র বুকের দুধ দিন। ৬ মাস শেষ হয়ে ৭ মাসে পড়লে, আস্তে আস্তে আলগা খাবার শুরু করুন এবং আলগা খাবারের পাশাপাশি ২ বছর পর্যন্ত বুকের দুধ দিন।
•    জন্মের প্রথম ৩ দিন বাচ্চা একটু কম দুধ পায়। তাই বাচ্চাকে বার বার বা ঘণ্টায় ঘণ্টায় দুধ চুষতে দিন, এ সময় শাল দুধ পাবে যা বাচ্চার জন্য অনেক উপকারী। শালদুধে রোগ প্রতিরোধকারী উপাদান থাকে।
•    সাধারনত ৩ দিনের পর পর্যাপ্ত পরিমাণ দুধ নামে। তখন ২ থেকে ৩ ঘণ্টা পর পর দুধ দিন। রাতে কমপক্ষে ২ বার দুধ দেবেন।
•    বেশীর ভাগ মা অভিযোগ করে যে তার বাচ্চা দুধ পাচ্ছে না। সাধারণত বাচ্চা অল্প দুধ টেনেই ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে যায়। পরে উঠে আবার কাঁদে, তাতে মা মনে করেন বাচ্চা দুধ কম পাচ্ছে।
কি ভাবে বুঝবেন বাচ্চা ঠিকমতো দুধ পাচ্ছে।
•    যদি বাচ্চা সারাদিনে ৬ বার প্রস্রাব করে তাহলে বুঝবেন সে ঠিকমতো দুধ পাচ্ছে।
সঠিক নিয়মে দুধ খাওয়ালে বাচ্চা ঠিক মতো দুধ পাবে। দুধ খাওয়ানোর পজিসন ও এটাচমেন্ট জেনে নিন।
পজিসন হল :
১ বাচ্চার পুরো শরীর সাপোর্ট দিন।
২ বাচ্চার পুরো শরীর মায়ের গায়ের সাথে লাগিয়ে নিন।
৩ বাচ্চার মাথা শরীরের সাথে সোজা থাকবে।
৪ বাচ্চা স্তনের দিকে ঘুরানো থাকবে।
৫ বাচ্চার নাক নিপল বরাবর থাকবে।
এটাচমেন্ট হল :
১ বাচ্চার চিন ব্রেস্টে লাগানো থাকবে।
২ বাচ্চার মুখ বড় করে খোলা থাকবে।
৩ বাচ্চার নিচের ঠোট বাইরের দিকে বাঁকানো থাকবে।
প্রথম বার ডাক্তার বা নার্সের কাছ থেকে পজিসনগুলো জেনে ও শিখে নিন।
•    প্রথমে বাচ্চার ঠোট নিপলে লাগান, সে বড় করে হা করলে নিপলসহ চার পাশের কালো অংশ (এরিওলা) বাচ্চা মুখে দিন।
•    বাচ্চা এরিওলাই চুষবে। তাহলে ঠিকমতো দুধ পাবে। কিন্তু যদি শুধু নিপল চুষে, তাহলে নিপল ছিরে যেতে পারে, মা ব্যথা পাবে, বাচ্চাও দুধ কম পাবে। তাই স্তনের বেশি অংশ বাচ্চার মুখে দিন, বাচ্চা ঠিকমতো দুধ পাবে।
•    বাচ্চাকে একটি স্তন পুরা শেষ করতে দিন। বাচ্চা ১৫ থেকে ২০ মিনিট চুষবে। দুই স্তন থেকে অল্প অল্প খাওয়াবেন না। একবারে একটা স্তন খাওয়া শেষ হলে অন্য স্তনে দিন। কারণ দুধের প্রথম অংশ যাকে আমরা foremilk বলি তাতে কার্বোহাইড্রেট ও পানি থাকে। পরের অংশ hind milk এ fat থাকে। দুই স্তন থেকে অল্প অল্প খেলে সে প্রতিবারই পানি আর কারবোহাইড্রেট পেল।
•    বাচ্চা প্রসাবের সাথে পানি বের হয়ে যাবে আর এই কার্বোহাইড্রেট হল ল্যাকটোজ, যেটা বেশি খেলে ওর ল্যাকটেজ এনজাইমটা অপর্যাপ্ত হবে। ফলে বেশি বেশি বা ফেনা ফেনা বা সবুজ পায়খানা হবে, মনেহবে ল্যকটোজ ইনটলারেনস হচ্ছে। বাচ্চা বারেবারে ক্ষুধার্ত হবে।
•    একটি স্তন অনেকক্ষণ ধরে খাওয়ালে hind milk টাও পাবে তাতে fat বেশি বলে এটা ভাঙতে সময় নেয়। ফলে বাচ্চা দেরিতে ক্ষুধার্ত হবে। ওজনও দ্রুত বাড়বে।
•    দুধ খাওয়ার পর স্তনের বাকী দুধ গেলে বের করে নিন, সেটা বাটি চামচে খাইয়ে দিন। এতে দুধের ফ্লো বাড়বে। কারণ স্তন বেশি খালী হলে, বেশি দুধ তৈরি হয়। গেলে নেওয়া দুধ ৮ ঘণ্টা বইরে রাখতে পারবেন। এবং ফ্রিজে ২৪ ঘণ্টা রাখতে পারবেন। কর্মজীবী মায়েরা বাইরে যাওয়ার আগে এভাবে দুধ রেখে যেতে পারেন।
•    দুধ খাওয়ানোর আগে ও পরে এক গ্লাস করে পানি খেয়ে নিন। দুধের ফ্লো বাড়ানোর জন্য ডাল, লাউ, কালি জিরা ইত্যাদি খাবার খেতে পারেন।
•    ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে tab omidon খেলেও দুধ বেশি পাবে বাচ্চা।
•    বুকের দুধ খেলে কোনো কোনো বাচ্চা দিনে ১০ থেকে ২৫ বার পায়খানা করতে পারে, আবার কোনো বাচ্চা ৭ দিন পর পর একবার পায়খানা করতে পারে। দুটোই নরমাল। এটা পরে নিজে নিজেই ঠিক হয়ে যায়। foremilk বেশি খেলে, মানে দুই স্তন থেকে অল্প অল্প খেলে, বেশি পায়খানা করতে পারে। সেক্ষেত্রে এক স্তন থেকে বেশীক্ষণ দুধ চুষতে দিন।
•    প্রথম ৩ মাস পর্যন্ত বাচ্চা দুধ ও বাতাস আলাদা করতে পারে না। দুধের সাথে বাতাসও গিলে। একে এরেফেজিয়া বলে। এতে বাচ্চার পেটব্যথা, পেট ফুলে থাকা, বাতাস যাওয়া, মোচর দেয়া ইত্যাদি হতে পারে। দুধ খাওয়ার পর কাঁধে রেখে বারপিং করুন। এটা ৩ মাস পর নিজে নিজেই ঠিক হয়ে যায়।
•    বাচ্চাকে গরুর দুধ দেবেন না। এক বছরের আগে গরুর দুধ দেয়া যায় না। গরুর দুধ দিতে চাইলে ২ বছরের পর দেয়াই ভালো।
বুকের দুধের পাশাপাশি বোতলে দুধ খাওয়াবেন না। এতে বাচ্চার নিপল কনফিউসন হয়। পরে বাচ্চা আর বুকের দুধ নাও খেতে পারে

আরও পড়ুনঃ   থ্যালাসেমিয়া কী? থ্যালাসেমিয়ার চিকিৎসা কী?

-ডা. কামরুন নাহার লুনা, এফসিপিএস, এমডি।

বিঃ দ্রঃ গুরুত্বপূর্ণ হেলথ নিউজ ,টিপস ,তথ্য এবং মজার মজার রেসিপি নিয়মিত আপনার ফেসবুক টাইমলাইনে পেতে লাইক দিন আমাদের ফ্যান পেজ বিডি হেলথ নিউজ এ ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here