নিজের জীবনই তার কাছে সব থেকে প্রিয়!-বিশেষ সাক্ষাৎকার

0
61
নিজের জীবন, জীবন
‘মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে’- এই কথাটি প্রত্যেকটি মানুষের জন্যই সত্য। তবুও কেউ কেউ নিজেই নেয় তার মৃত্যুর ভার। স্বেচ্ছামৃত্যুর মধ্য দিয়ে ‘সুন্দর ভুবন’র মায়া ত্যাগ করে চলে যায়। কেন এমনটি ঘটে! কখনো মানসিক অসুস্থতা, কখনো পরিবার, সমাজ বা পৃথিবীর বৈরীতা মানুষের বাঁচার স্পৃহাকে নষ্ট করে দেয়। কীভাবে এই মানুষগুলো মানসিক অসুস্থতা থেকে মুক্তি পেতে পারে, আমরা কীভাবে সমাজটিকে সুস্থতা দিতে পারি, পৃথিবীর সাথে সম্পর্ক ছিঁড়ে ফেলতে চাওয়া মানুষগুলোকে বাঁচার প্রেরণা জোগাতে পারি এই বিষয়গুলো নিয়েই কথা বলেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগবিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ঝুনু শামসুন্নাহার।

আত্মহত্যা কথাটির সাথে আমরা যতটা পরিচিত ‘আত্মহত্যা প্রতিরোধ’ ধারণার সাথে আমরা ততটা পরিচিত নই। আত্মহত্যা প্রতিরোধ করা সম্ভব এটা আমরা হয়তো ভাবিই না। এরকম অবস্থান থেকে আত্মহত্যা প্রতিরোধে বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে আমাদের প্রাথমিক উদ্যোগ কী হওয়া উচিৎ?

আসলে আত্মহত্যা কেন হয় সেটা তো আমাদের জানতে হবে আত্মহত্যা প্রতিরোধ করতে হলে। আত্মহত্যা করার পেছনে কিছু কারণ আছে। তার মধ্যে মানসিক অসুস্থতা একটা বড় কারণ। বিশেষ করে ডিপ্রেশন বা বিষণ্নতা রোগ যেটা সেটা কিন্তু একটা বড় কারণ। সেই সঙ্গে আরো অন্যান্য রোগ যেগুলো আছে যেমন: সিজোফ্রেনিয়া তারপর মাদকাসক্তি বা drag dependents. কিংবা ব্যক্তিত্বের সমস্যা বা personality disorder তাদের মধ্যেও কিন্তু আত্মহত্যা প্রবণতা বেশি দেখা যায়। এছাড়া অন্যান্য ব্যাপার দেখা যায় আমাদের দেশের মহিলাদের মধ্যে কম বয়সী গৃহবধূদের মধ্যে আত্মহ্ত্যা প্রবণতা বেশি। সেখানে দেখা যাচ্ছে যৌতুক, domestic violence ইত্যাদির কারণেও অনেকে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। এর বাইরেও কিছু কারণ রয়েছে। যেমন- দীর্ঘদিনের বেকারত্ব, পারিবারিক জীবনে অশান্তি বা প্রেমের সম্পর্কে হতাশা। তাছাড়া আরেকটি জিনিস দেখা যায়- আত্মহত্যা কিন্তু বেশি হয় বয়স্ক মানুষের ক্ষেত্রে এবং বয়ঃসন্ধিকালে। বয়স্ক মানুষের মধ্যে আত্মহত্যা প্রবণতা কাজ করে নিঃসঙ্গতার জন্য। তারা মরে যাবে, একা থাকে, ভালো লাগে না- এসব কারণে তারা আত্মহত্যার কথা ভাবে। একসময় পরিবারকে সে অর্থনেতিক সহায়তা দিত এখন পারছে না ফলে পরিবার তাকে অবজ্ঞা করছে এসবও বয়স্ক মানুষদের আত্মহত্যার কারণ। আর বয়ঃসন্ধিকালে হরমোনের নানা পরিবর্তনের কারণে তারা খুব অভিমানী হয়, আবেগী হয়- একটুতেই তারা আবেগাক্রান্ত হয়ে পড়ে। এসব কারণ থেকে আমরা বিবেচনা করতে পারি আমরা কীভাবে আত্মহত্যা প্রতিরোধ করতে পারি, মানসিক অসুস্থতা যেটা সেটা নির্মূল করতে হবে যথাযথভাবে চিহ্নিতকরণ এবং চিকিৎসা প্রদানের মাধ্যমে। তারপর যদি বয়ঃসন্ধিকালের কথা ধরি তাহলে বলতে হবে আমাদের proper parenting দরকার। বাবা- মাকে good parenting টা শিখতে হবে। কীভাবে আমরা বাচ্চাকে লালন করবো, বড় করবো এবং তার সাথে মানসিক যোগাযোগ রক্ষা করবো সেটা আমাদের জানতে হবে। মাদকাসক্তির ক্ষেত্রেও বাবা-মা’র যথাযথ অভিভাবকত্ব দরকার, সেই সাথে মাদক বিরোধী সচেতনতা তৈরিতে স্কুল শিক্ষকরাও ভূমিকা রাখতে পারেন। বয়স্কদের আত্মহত্যা প্রবণতা দূর করার জন্য তাদের প্রতি মনোভাব পরিবর্তন করতে হবে, আরো সহানুভূতিশীল হতে হবে। এছাড়া নারীরা যে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে যৌতুক, পারিবারিক কলহ এসবের কারণে সেগুলো নির্মূলে সামাজিক সচেতনতা তৈরি করতে হবে। এসব যদি আমরা করতে পারি এবং সামাজিক মূল্যবোধ জাগ্রত করতে পারি তাহলে আমার মনে হয় আমরা আত্মহত্যা প্রতিরোধ করতে পারবো। মনে রাখতে হবে এটা কোনো ব্যক্তিক ব্যাপার না, এটা প্রত্যেকটা সচেতন নাগরিক, সরকার, সুশীল সমাজ এবং আমরা যারা এই ব্যাপারে বিশেষজ্ঞ সবাই মিলে করতে হবে।

যে ব্যক্তি আত্মহত্যা করে তার আচরণে কি সবসময় আত্মহত্যার লক্ষণ বা পূবার্ভাস প্রকাশ পায়?

সাধারণত আমরা দেখি, যে সত্যি সত্যি আত্মহত্যা করতে চায় সে আগেই সেটা প্রকাশ করে যে আমি আর বেঁচে থাকতে চাই না, আমি মরে যাব এবং দেখা যায় যে সে গোপনে গোপনে আত্মহত্যার প্রস্তুতি নেয়। যেমন সে যদি ওষুধ খেয়ে করতে চায় দেখা যায় সে গোপনে গোপনে একশটি ওষুধ সংগ্রহ করে রাখলো। সে যদি মরেই যেতে চায়, দেখা যায় যে সে একটা সুইসাইড নোট লিখে, তার যদি সম্পত্তি থাকে তার বিলি-বন্টন করে দেয় এবং এমন একটা জায়গা বেছে নেয় যেখান থেকে উদ্ধার হওয়ার সম্ভাবনা কম। হয়তো দেখা যায় সে বিকেল তিনটার সময় আত্মহত্যা করলো যখন বাড়িতে কেউ নেই। এমনকি সে প্রকাশও করে। আমরা মনে করি যে, আত্মহত্যা যে করবে সে বলে না। যে বলছে সে আসলে আত্মহত্যা করবে না। আসলে তা নয়। সে আত্মীয়স্বজনের কাছে, বন্ধু-বান্ধবের কাছে, এমনকি ডাক্তারের কাছে প্রকাশ করে যে সে বেঁচে থাকতে চায় না, আত্মহত্যা করতে চায়। তখন আমরা জিজ্ঞেস করি, আপনি কি প্ল্যান করেছেন? এতে সে বুঝতে পারে তার কথাটা আমরা বুঝতে পেরেছি। আর অনেকে আছে ঝোকের বশে আত্মহত্যা করে। হয়তো বাবা-মা বকা দিল সে দৌড়ে গিয়ে আত্মহত্যা করলো। সেটা কিন্তু ইমপালসিভ এবং সে জানে যে তাকে উদ্ধার করা হবে।

আরও পড়ুনঃ   সাধারণ মানসিক অসুস্থতা ‘অকালমৃত্যু' ডেকে আনে

যারা এরকম হুট করে আবেগতাড়িত হয়ে আত্মহত্যা করতে যায় তাদের মধ্যে কি একটা দৃষ্টি আকর্ষণ করার বা মনোযোগ আদায়ের প্রবণতা থাকে?

হ্যাঁ মনোযোগ আদায়ের ব্যাপার থাকে। আমরা বলি ইমপালসিভ। তাতে তারা যেটা চায় সেটা আদায় করে নেয়ার একটা প্রবণতা থাকে। কিন্তু তার মানে এটা যে বিপদজনক না তা নয়। এরকম করে কিন্তু আত্মহত্যার দিকে চলে যেতে পারে। ইমপালসিভ উপায়েই হোক বা ইচ্ছে করেই হোক কেউ যদি একবার আত্মহত্যা করার চেষ্টা করে পরবর্তীতে কিন্তু তার আত্মহত্যা করার প্রবণতা বেড়ে যায়।

আমাদের দেশে আত্মহত্যা করার উপকরণগুলো খুব সহজপ্রাপ্য। এটা কীভাবে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব?

হ্যাঁ এগুলো বাসায়ই থাকে-কীটনাশক ওষুধ বা কেউ হারপিক খাচ্ছে। এগুলো নিয়ন্ত্রণের জন্য আমাদের সচেতনতা দরকার। আমাদের দেশে ওষুধগুলো যেমন over the counter পাওয়া যায়। ফার্মেসীতে বললেই দিয়ে দেয়। সেটা যেন না দেয় এই বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। সবচেয়ে বড় বিষয় একজন মানুষের মধ্যে যখন হতাশা-নৈরাশ্য তৈরি হয়, যখন সে ভাবতে থাকে, আমার কোনো আশা নেই, আমার কোনো মূল্য নেই তখনই কিন্তু মানুষ আত্মহত্যা করে। এগুলো থেকে আমরা যদি তাদের বের করে আনতে পারি তাহলে কিন্তু সে আত্মহত্যা করবে না।

অনেক সময় দেখা যায় আমাদের কাছের কেউ অনেক সময় কথায় কথায় মরে যাওয়ার কথা বলছে। আমরা সেটাকে গুরুত্বের সাথে নিই না। তার মানে এরকম কেউ বললেই সাথে সাথেই তার বিষয়ে আমাদের সচেতন হতে হবে-

হ্যাঁ সচেতন হওয়া উচিত, তাকে সময় দেয়া উচিৎ। তারপর বিদেশে যেমন আছে হট লাইন। এরকম হট লাইন যদি থাকে যে ঠিক সেই মুহূর্তে যে মুহূর্তটাকে সে খুব খারাপ মনে করছে তার কথা যদি কেউ শোনে এবং শোনার সঙ্গে সঙ্গে কোনো ইমারজেন্সি ব্যবস্থা করে, যদি তাকে বলে, আস তোমার সাথে কথা বলি কিংবা আমরা তোমার কাছে যাই- এরকম করতে পারলে খুব ভালো হয়। আমাদের দেশে তো সেই ব্যবস্থা নেই এজন্য কাছের মানুষদের জন্য সেই সময় পাশে দাঁড়ানোটা খুব জরুরি। তাকে বোঝাতে হবে যে আমরা তোমার পাশে আছি। মানুষ তো আসলে মরে যেতে চায় না। নিজের জীবনই তার কাছে সবথেকে প্রিয়। কাজেই যখন সে মরে যাওয়ার কথা ভাবে তখন যদি তাকে বোঝানো যায় যে সে একা নয় তার কাছের মানুষগুলো তার পাশে আছে, তাকে যদি মানসিক সাপোর্টটা সেসময় দেয়া যায় তাহলে হয়তো সে ঐ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে।

যদি পরিবারের কেউ এরকম মরে যাওয়ার কথা বলে তাহলে তাকে চিকিৎসার জন্য কোথায় নিয়ে যাবে?

আমার মনে হয় সুইসাইডের কথা যদি কেউ বলে প্রথমত তাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে। বিশেষ করে মনরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়াই ভালো। আর এরকম যদি কেউ বলে তাহলে আমরা পরামর্শ দিই তাকে হাসপাতালে ভর্তি করে চব্বিশ ঘন্টা পাহারায় রাখার। তার কাছে ছুরি-কাচি-ওষুধ এগুলো সরিয়ে রাখার। বা সেটা সম্ভব না হলে পরিবারের লোকদেরকেই বলি এ বিষয়ে সচেতন থাকতে। এছাড়া কেউ যদি আমাদের কাছে আসে, সেশন নেয় নিজের মনের কথা খুলে বলে তাহলে আমরা তাকে মাঝে মাঝে এও বলি, আপনি ভালো হয়ে যাবেন কিন্তু চিকিৎসা চলাকালীন সময়ে আপনি নিজের ক্ষতি করবেন না, আত্মহত্যার চেষ্টা করবেন না। এভাবে আমরা তাকে বুঝিয়ে একটা চুক্তি করারও চেষ্টা করি।

আপনি good parenting এর কথা বলছিলেন। বাংলাদেশে অভিভাবকত্বের ধারণাটা তো খুব প্রথাগত। আমাদের দেশে এমন ধারণাই প্রতিষ্ঠিত যে শুধু বিধিনিষেধ আর শাসনই অভিভাবকত্বের মাপকাঠি। এই ধারণার পরিবর্তন কীভাবে সম্ভব?

আমাদের এখানে একটা ঘাটতি আছে parenting এর ক্ষেত্রে। আমরা এখন বলছি good parenting এর কথা। parenting টা গুড হতে হবে, পজিটিভ হতে হবে। parenting এর কতগুলো স্টাইল আছে। একটা স্টাইল হচ্ছে authoritative parenting. এটার ধরন হচ্ছে আমি বাচ্চার কাছে ডিমান্ড করবো কিন্তু বাচ্চার সুবিধা-অসুবিধার কথা চিন্তা করবো না। সেটা হলে হবে না। আমাকে হতে হবে আমি বাচ্চার কাছে ডিমান্ডও করবো আবার সে যা বলবে সেটাও শুনবো। এটা হচ্ছে democratic parenting. আমাদের এই parenting ‍স্টাইলটা অনুসরণ করতে হবে। সবকিছুতে বাচ্চাকে সংযুক্ত করতে হবে। আমার যেমন মতামত আছে, বাচ্চারও মতামত আছে। আমি বাচ্চার কাছে চাই ভালো ফলাফল, সে আমার কাছে কি চায় সেটা জানতে হবে। বাচ্চা খুব বেশি কিছু চাইলে হবে না। আমি যেটা দিতে পারবো তার সাথে বাচ্চার চাওয়ার সামঞ্জস্য থাকতে হবে। এখন সাত-আট বছরের একটা বাচ্চা যদি বলে আমি একটা স্পোর্টস কার চাই বা চৌদ্দ-পনেরো বছরের একটা বাচ্চা যদি বলে আমি পাজেরো গাড়ি চাই তাহলে তো হবে না । সেই অনুযায়ী আমাদের parenting হতে হবে। কিছু কিছু আছে authoritarian যেটা তুমি বললে যে খুবই ডিমান্ডিং। কিছু আছে authoritative democratic যে দুজনের মধ্যে ডিমান্ডও থাকবে রেসপন্সও থাকবে, কিছু আবার আছে neglect প্রবণ- বাচ্চা কী করছে আমি দেখলামই না। আমিও ডিমান্ড করি না, বাচ্চারও রেসপন্স পাই না। আবার কিছু আছে permissive. আমি কিছু ডিমান্ড করছি না কিন্তু বাচ্চা যা চাচ্ছে সব দিয়ে দিচ্ছি। সেজন্য democratic parenting কে আমরা উৎসাহিত করছি যেখানে আমি ডিমান্ড করবো বাচ্চা রেসপন্স করবে। আমাদের মধ্যে ভালো বোঝাপড়া থাকবে। সেজন্য parenting নিয়ে আমরা গবেষণাও করছি, কিছু ট্রেনিং ও দিয়েছি। আমার মনে হয়ে এখানে আমাদের কিছুটা গ্যাপ আছে। কিন্তু আস্তে আস্তে তরুণ দম্পতি, হবু মা কিংবা সদ্য বাবা-মা হয়েছে এমন মানুষজন এটা চাইছে। সেটা খুব দরকার। কারণ আস্তে আস্তে বাচ্চা বড় হবে- শৈশবের হতাশা, বয়ঃসন্ধিকালীন মানসিক জটিলতা বা হতাশা থেকে তাকে বের করে আনা, মাদকাসক্তি থেকে বের করে আনা ইত্যাদি ক্ষেত্রে সুদক্ষ বাবা-মা’র প্রয়োজন।

আরও পড়ুনঃ   তরুণদের বিয়ে ভীতি সম্পর্কে বিস্তারিত .........

আপনি একটু আগেই বললেন যে অনেক সময় অনেক বেশি ডিমান্ড করে বাচ্চারা, এক্ষেত্রে যেটা হয় যে ছোট একটা কিছু না পেলেও তারা ভাবে যে তারা কিছুই পেল না জীবনে এবং তখন তার মধ্যে জীবনের প্রতি একটা নৈরাশ্যবাদী মনোভাব তৈরি হয়। আমরা দেখছি সময়ের সাথে এই প্রবণতাটা বৃদ্ধি পাচ্ছে, আমরা কীভাবে এই সংকট অতিক্রম করতে পারি?

এটার কারণ হচ্ছে ধরো, কোনো স্বামী-স্ত্রী দুজনেই ভালো চাকরি করে। তারা তাদের চাকরি নিয়ে খুব ব্যস্ত, তারা উচ্চাকাঙ্ক্ষী- হতেই পারে এটা কোনো খারাপ কিছু না। কিন্তু তারা তাদের বাচ্চাকে সময় দিতে পারে না। আর এই সময় দিতে না পারার কারণে তাদের মধ্যে অপরাধবোধ হয়। তখন দেখা যায় তারা অফিস থেকে আসার পথে বাচ্চার জন্য কিছু একটা নিয়ে আসে। হয়তো বাচ্চা কিছু চাইলোও না তারপরও কিছু না কিছু নিয়ে আসে। বাচ্চাতো প্রথমেই কিছু ডিমান্ড করে না। কিন্তু সে না চাইতেও অনেক কিছু পেয়ে যাচ্ছে। এরকম করতে করতে যখন বাচ্চার বয়স চার বছর পাঁচ বছর বা আরো বাড়তে থাকে তখন তার চাওয়াও বাড়তে থাকে। আর আগে যেহেতু সে না চাইতেই পেয়েছে পরবর্তীতে চেয়ে না পেলে তার মধ্যে অভিমান হয়, হতাশা কাজ করে। সে তখন ভাবে তার কোনো মূল্য নেই। সেজন্য আমাদেরকে প্রথম থেকেই বাচ্চার আকাঙ্ক্ষা খুব বাড়ানো যাবে না। তাকে যতটা দেয়ার, কেয়ার করার ততটাই করতে হবে। তাকে যদি আমি খুব বেশি সময় দিতে না পারি তাকে বোঝাতে হবে আমি তাকে কেন সময় দিতে পারিনি। তাকে বোঝাতে হবে আমি যখন এসেছি তখন আমি তাকেই শুধু সময় দিতে হবে। আর বাইরে ছিলাম, ব্যস্ত ছিলাম এটাও তারই জন্য, তার ভবিষ্যত গড়ার জন্য। এরকম যোগাযোগটা যদি তৈরি করা যায় তাহলে কিন্তু বাচ্চা দুবছর তিনবছর থেকেই বোঝে। আর এটা কিন্তু শুধু মারই দায়িত্ব তা কিন্তু না। বাবারও দায়িত্ব। বাবা-মা দুজনই মিলে যদি এই দায়িত্বটা পালন করে তাহলে কিন্তু তাদের সন্তানদের মধ্যে এরকম অবাস্তব আকাঙ্ক্ষার তৈরি হয় না।

আর একটা বিষয়- আমাদের সমাজে চাকচিক্যের প্রতি একটা ঝোঁক লক্ষ্য করা যায়। হয়তো আমার বাচ্চাকে আমি অপরিমিত কিছু দিলাম না। কিন্তু সে তার সমান বয়সী বন্ধুকে দেখলো তার হাতে ফোন বা ট্যাব, সে গেইম খেলছে। তখন তো তার ভেতরও ডিমান্ড তৈরি হয়। এক্ষেত্রে আমাদের করণীয় কী?

হ্যাঁ এটা একটা কঠিন বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে আমাদের দেশে। এই চাকচিক্যটা কিন্তু বাংলাদেশেই বেশি দেখা যাচ্ছে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত অর্থনৈতিকভাবে আমাদের চেয়ে অনেক সমৃদ্ধ। ওদের ভেতর কিন্তু এই চাকচিক্যটা চোখে পড়ে না। ওদের মধ্যে কিন্তু আমাদের মত দামি গাড়ি চালানো, দামি পোশাক পড়া, বাচ্চাদের হাতে ট্যাব- এই বিষয়গুলো নেই। এটা আমাদের দেশে বেশি দেখা যাচ্ছে। এমনকি ওয়েস্টার্ন কালচারেও এত বেশি নেই। এটা আমার মনে হয় আমাদের ভ্যালু সিস্টেমে একটা সমস্যা রয়েছে। এটা আসলে একটা কঠিন ব্যাপার কারণ আমার বাচ্চার কাছে আমি ট্যাব, সেলফোন বা আইফোন দিচ্ছি না কিন্তু পাশেই সাত/ আট বছরের একটা বাচ্চার ট্যাব আছে। ষোল/ সতের বছরের বাচ্চার আইফোন আছে। এটা কিন্তু একা বাবা-মা করলে হবে না। সব বাবা-মা মিলে যদি একটা self-help group করে বা স্কুলে অভিভাবকরা মিলে যদি এ বিষয়ে সচেতন হয়ে সিদ্ধান্ত নেয় যে আমরা এটা করবো না তাহলে আমার মনে হয় সুফল পেতে পারি।

আরও পড়ুনঃ   জানেন কি মধু ও দুধ একসঙ্গে খেলে কী হয়?

শিক্ষাব্যবস্থার যে সিস্টেম প্রতিযোগিতার যে ধারণা সেটাও অনেক সময় আত্মহত্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায় এ অবস্থা পরিবর্তন সম্ভব কীভাবে?

আমাদের দেশের অভিভাবকরা মনে করেন যে খুব ভালো রেজাল্ট করতে হবে। বিশেষ করে প্রাইমারি, জেএসসি, এসএসসি এইচএসসি তে খুব ভালো রেজাল্ট করতে হবে। জিপিএ ৫ পেতে হবে, গোল্ডেন পেতে হবে। এটা দিয়ে বাচ্চাদের খুব বেশি চাপ দেয়া হয় এবং বাচ্চাদের খেলার সময় নেই, খেলার জায়গাও নেই। কিন্তু বাচ্চারা এ+ বা গোল্ডেন এ+ পেয়ে কতটুকু শিখছে সেটাও দেখা দরকার। হয়তো সে গোল্ডেন এ+ পেল কিন্তু তার মধ্যে ক্রিয়েটিভ কিছু নেই। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাটা এর থেকে অন্যরকম করতে পারলে ভালো হতো। বাচ্চাদের ওপর কম প্রেসার দিয়ে ওপরের লেভেলে গিয়ে quality study করতে পারলে ভালো হতো। ফাইভ সিক্স পর্যন্ত যদি খেলাধুলা বা ক্রিয়েটিভ বিষয় দিয়ে স্কুলটাকে ইন্টারেস্টিং করা যেত। অতিরিক্ত চাপে তো মানুষের নার্ভাস সিস্টেম থেকে পুরো শরীরেই প্রভাব পড়ে। চাপ কম হলে পারফর্মেন্সও ভালো হবে। কম্পিটিশন থাকবে, হেলদি কম্পিটিশন থাকবে। কিন্তু আনহেলদি কম্পিটিশন সম্পর্কে সচেতন হতে হবে।

আজকাল প্রায়ই একটা কথা শোনা যায় যে মানুষ অনেক আত্মকেন্দ্রিক হয়ে যাচ্ছে। ভার্চুয়াল জগত বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এত সম্পৃক্ত হয়ে পড়ছে যে বাস্তব জগতে পারস্পরিক সম্পর্কগুলো ঢিলে হয়ে যাচ্ছে। এই আত্মকেন্দ্রিকতা কি আত্মহত্যার প্রবণতাকে বাড়িয়ে দেয়ার সম্ভাবনা রাখে?

হ্যাঁ বাড়িয়ে দেয়। এই ধরো তুমি আমার কাছে আসলে তোমার সাথে আমার একটা সম্পর্ক হলো। ভার্চুয়াল জগতের বন্ধুরা হচ্ছে ভার্চুয়াল নট রিয়াল। তুমি যতই ভার্চুয়াল জগতে ঢুকবে, বন্ধু বানাবে তোমার এক হাজার বন্ধু আছে, এক হাজার জন লাইক দেয় তোমাকে কিন্তু you are a lonely person. Nobody is around you. এখানে একজন হলেও তুমি আমার সাথে আছ। কিন্তু ওখানে তোমার পাশে কেউ নেই। ভার্চুয়াল জগতে তোমার যতই বন্ধু থাকুক না কেন কেউ বাস্তব নয়। এজন্য মানুষ তখন অনেক নিঃসঙ্গ হয়ে যায়। আর নিঃসঙ্গতায় আত্মহত্যা প্রবণতা বেড়ে যায় কিন্তু। আমার অসুখ হয়েছে, হাসপাতালে যেতে হবে- ফেসবুকের ফ্রেন্ডরা তো আসছে না। কিন্তু আগে আমরা পাড়া প্রতিবেশি আশেপাশের লোকজন সবার সাথে কথা বলতাম। একটা যোগাযোগ থাকতো সবসময়। এটাতে তোমার নিঃসঙ্গতা দূর হবে। বিপদে আপদে তুমি তাদের পাশে পাবে এবং তারা তোমার real friends. কিন্তু ভার্চুয়াল জগতের ফ্রেন্ড ভার্চুয়াল। তারা real না। এজন্য মানুষ ভার্চুয়াল জগতে যত ঢুকবে তত নিঃসঙ্গ হবে।

আত্মহত্যা প্রতিরোধের বিষয়টা তখনই সবেচেয়ে কার্যকরী হতে পারে যদি প্রতিরোধের উদ্যোগটা সরকারীভাবে বা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নেয়া হয়। সেক্ষেত্রে সরকারের কাছে আমরা কী প্রত্যাশা করতে পারি?

সরকার উদ্যোগ নিলে তো সবচেয়ে ভালো হয়। যদি সবার মধ্যে প্রচারণা করতে চায় তাহলে সরকার প্রথমে জনগণকে সচেতন করার ব্যাপারে উদ্যোগ নিতে পারে- রেডিও, টিভি, পত্রিকায় প্রচারণা চালাতে পারে। দক্ষ লোকজন নিয়ে একটা প্রজেক্ট গ্রহণ করতে পারে। বিভিন্ন রকম প্রচারণার পাশাপাশি তারা স্কুলে যেয়ে যেয়ে আলোচনা করতে পারে। বাচ্চাদের হতাশার বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলতে পারে এবং অন্যান্য যেসব বিষয়ে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে যেমন: নারী নির্যাতন, domestic violence এগুলোর বিরুদ্ধেও মানুষের কাছে যেয়ে যেয়ে সচেতন করতে হবে। আত্মহত্যা প্রবণ মানুষদেরকে টার্গেট করে যেমন: বয়সন্ধিঃকালীন, গৃহবধূ বা বয়োবৃদ্ধ এদের জন্য বিশেষ কেয়ারের ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। এরকম একটা প্রজেক্ট নিয়ে যদি আমরা পুরো বাংলাদেশে এটা করতে পারি তাহলে তো খুবই ভালো হয়। সরকার এটা করতেই পারে।

গত ১০ সেপ্টেম্বর চলে গেল ‘আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস’। কিন্তু আত্মহত্যার ঘটনা থেমে নেই। স্বাভাবিক মৃত্যুর অধিকার প্রত্যেকটি মানুষের রয়েছে। সেই অধিকারকে স্বেচ্ছায় বিসর্জন দিয়ে কেন একটা মানুষ মৃত্যুর কাছে পরাজিত হয় সেটা ভাববার দায় আমাদের সকলের এবং সেই দায় মেটাতে গেলে আমাদের ফিরে তাকাতে হবে এই সমাজের দিকে। মানুষে মানুষে মানবিক সম্পর্কই পারে জীবনের আশ্বাস, বাঁচার আনন্দ ফিরিয়ে দিতে।

সাদিকা রুমন, বিশেষ প্রতিবেদক
মনেরখবর

LEAVE A REPLY