পান যে কারণে উপকারী এবং যে কারণে উপকারী নয়!

0
531
পান

পান খাওয়ার রীতি আমাদের দেশে অনেক পুরনো। অনেকে পান খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর বলে মনে করেন। কিন্তু এই ধারণা মোটেই ঠিক নয়। কারণ পান পতার অনেক উপকারিতা রয়েছে। গবেষণাও তাই বলে। আয়ুর্বেদ শাস্ত্র অনু‌যায়ী পান খেলে ক্যান্সারে মতো ভয়াবহ রোগ দূর করা সম্ভব।

তাহলে আসুন জেনে নিই পানে কি কি উপকারী গুণ রয়েছে?

* বাতের ব্যথা দূর করতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে পান। পান থেঁতো করে একটা কাপড়ের পুটুলিতে ভরুন। এবার গরম পানিতে ওই পুঁটলি ডুবিয়ে ব্যথা জায়গায় সেঁক দিন। আরাম পাবেন।

* পান পাতায় অ্যান্টিব্যাক্টেরিয়াল রাসায়নিক থাকে। তাই পান পাতা বেটে ক্ষতস্থানে দিলে দ্রুত নিরাময় সম্ভব। পান পাতা ব্যবহার করলে সংক্রমণের ভয়ও থাকে না।

* পান তার নিজের বিশেষ ধরণের গন্ধের জন্য বিখ্যাত। পান খেলে মুখের দুর্গন্ধ নাশ হয়। পান খেলে মুখের ভিতরের অ্যাসকরবিক অ্যাসিডের স্তর স্বাভাবিক থাকে। ‌যার ফলে বিভিন্ন রোগ দূরে থাকে।

* পান খেলে দাঁত পরিষ্কার হয়, ফলে দাঁতে ক্ষয়ের সম্ভবানা থাকে না।

* গলা খুসখুস করলে পান পাতার ৫ মিলিলিটার রস এক গ্লাস গরম পানিতে মিশিয়ে আস্তে আস্তে খান। আরাম পাবেন। বিখ্যাত অনেক গায়ক গলা ভালো রাখতে এই টোটকা ব্যবহার করেন।

* পেটে ব্যথা বা কোষ্ঠকাঠিন্য হলে পান পাতার ওপর নারকেল তেল লাগিয়ে মোমবাতির ওপর ধরুন। এবার পেটে সেঁক দিন। পেটে ব্যথা থেকে মুক্তি মিলবে।

সূত্রঃ বিডিলাইভ

এখন আমরা আব্দুল্লাহ শহীদ লিখিত ”পান খাবেন না যে কারণে” পোস্টি দেখব যেখানে তিনি বিষয়টিকে ইসলামের আলোকে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেছেন এবং এই লেখাটি পাঠকদের বিজ্ঞ বিবেচনা করতে সহায়তা করবে —

পান খাওয়া মানে পান পাতা চিবানো নয়। চুন, সুপারী, খয়ের, জর্দা ইত্যাদি দিয়ে পান পাতা চিবানোর নাম হল পান খাওয়া। আমার এ প্রবন্ধে পান খাওয়া বলতে প্রচলিত এ তরীকাকে বুঝানো হবে। প্রচলিত এ পদ্ধতিতে পান খাওয়ার ব্যাপক প্রচলন রয়েছে আমাদের এ উপমহাদেশে। এ ছাড়া বিশ্বের অন্য কোথাও এ ধরনের পান খাওয়ার ব্যাপকতা দেখা যায়না বলেই মনে হয়। অনেকের ধারণা মোঘল আমলে পান খাওয়ার প্রচলন ব্যাপকতা লাভ করে।
যারা পান খেয়ে থাকেন তাদের আমরা তিন ভাগে ভাগ করতে পারি।
প্রথমতঃ যারা অত্যাধিক পান খেতে অভ্যস্ত পান ছাড়া একটি ঘন্টা কাটানো তাদের জন্য খুব মুশকিল হয়ে পড়ে। এদের মধ্যে শতকরা নিরানব্বই জনের বেশী পান,সুপারী, ও চুনের সাথে তামাক-জর্দা, খয়ের ইত্যাদি খেয়ে থাকেন।
দ্বিতীয়তঃ যারা সাড়াদিন পান খেতে অভ্যস্ত নন তবে খাওয়ার পর একটু পান না খেলে চলেনা। এদের মধ্যে শতকরা প্রায় ৫০ ভাগ পানের সাথে তামাক-জর্দা ও খয়ের গ্রহণ করে থাকেন।
তৃতীয়তঃ যারা পেশাদার পানখোর নন তবে কোন বিশেষ দাওয়াত বা অনুষ্ঠানে পান ট্রাই করে থাকেন।
আর যারা একে বাড়ে পান দু চোখে দেখতে পারেননা তাদের আলোচনা না-ই করালাম।
তবে পান খাওয়া ঠিক কিনা? স্বাস্থ্য বিশারদদের দৃষ্টিতে পান খাওয়া কতটা মন্দ? শরীয়তের দৃষ্টিতে পান খাওয়ার বিধান কি? এ সব প্রশ্নের উত্তর খোজার চেষ্টা করা হবে এ লেখায়।
আমাদের দেশের সাধারণ শিক্ষিতদের তুলনায় ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত তথা আলেম সমাজে পান খাওয়ার প্রবণতা বেশী দেখা যায়। আমাদের দেশের আলেমগন পান খাওয়াকে জায়েয মনে করেন। কিন্তু আরব দেশের আলেমগন পান খাওয়াকে হারাম বলে ফতোয়া দিয়েছেন। এ কারণে সৌদী আরবে পান খাওয়া সরকারী ভাবেই নিষিদ্ধ।
যা মানুষের স্বাস্থের জন্য ক্ষতিকর তা খাওয়া ইসলামী শরীয়ত অনুমোদন করেনা। বরং নিষেধ করে। যদিও পান পাতা স্বাস্থের জন্য ক্ষতিকর বলে এখনো প্রমাণিত হয়নি তবে চুন, সুপারী, খয়ের, জর্দা শরীর স্বাস্থের জন্য ক্ষতিকর। এ ব্যাপারে চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য বিজ্ঞানীদের কারো দ্বিমত নেই। যখন কোন রোগী ডাক্তারের কাছে যায় তখন ডাক্তার তাকে পান ত্যাগ করার পরামর্শ দেন। কোন ডাক্তার কাউকে পান খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বলে আজ পর্যন্ত শোনা যায়নি। চুন তো কোন খাদ্য তালিকায় পড়েনা। জর্দা; সে তো তামাক। সুপারী চিবানো স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। ক্যানসার সৃষ্টিতে সহায়তা করে। সমপ্রতি এক খবরে প্রকাশ মার্কিন গবেষকরা দীর্ঘদিন গবেষণার পর প্রমাণ করেছেন সর্বদা সুপারী চিবানোর ফলে মুখে ক্যানসার হতে পারে। যারা সুপারী খেয়ে থাকেন তাদের মুখে ক্যানসার হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশী।
(দৈনিক ইনকিলাব ৮ ই আগষ্ট ২০০৪)
অবশ্য পানের রস দিয়ে ব্লাড ক্যানসারের প্রতিষেধক উদ্ভাবনের চেষ্টা করে যাচ্ছেন চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা। কিছুটা সফল ও হয়েছেন।
তাই আপনি যে কারণে পান খাওয়া ছেড়ে দেবেন তা একটু আলোচনা করা যাক।
(১) আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন ঃ “তিনি তোমাদের জন্য পবিত্র ও ভাল ( তাইয়েবাত) বস্তু হালাল করেন আর ক্ষতিকর- নোংড়া ( খাবায়িস) জিনিষ হারাম করেন।
সূরা আরাফ আয়াত ১৫৭
সকল চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য বিজ্ঞানীরা বলেছেন পান খাওয়া স্বাস্থের জন্য ক্ষতিকর। ডাক্তার তার রোগীকে পান খেতে বারণ করেন।
পান খাওয়ার মধ্যে কোন উপকারিতা থাকলেও থাকতে পারে তবে ক্ষতির দিকটা প্রবল।
আল্লাহ তায়ালা মদ ও জুয়া হারাম করতে যেয়ে বলেন ঃ “তারা আপনাকে মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলে দিন উভয়ের মধ্যে রয়েছে মহাপাপ। আর তার মধ্যে মানুষের জন্য উপকারিতাও আছে। তবে এগুলোর পাপ উপকারের চেয়ে বড়।”
সূরা বাকারা আয়াত ২১৯
আল্লাহ তায়ালার এ বানী দ্বারা বুঝে আসে মদের মধ্যে উপকারিতা থাকা সত্বেও তা হারাম করেছেন।
পানের মধ্যে উপকারিতা থাকলেও তার ক্ষতির দিকটা বড় কর দেখা হবে। ফিকাহর মূলনীতিও তাই বলে।
(২) প্রত্যেক খাদ্যের মধ্যে দুটো গুণের কমপক্ষে একটি থাকে। গুণ দুটো হল (ক) পুষ্টি জোগান (খ) ক্ষুধা নিবারণ।
কিন্তু পান পুষ্টিও যোগায়না ক্ষুধাও নেভায়না।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন জাহান্নামীদের খাদ্যের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন ঃ
“ এটা তাদের পুষ্টি যোগাবেনা এবং ক্ষুধা নিবারণ করবেনা।”
সূরা গাশিয়াহ আয়াত ৭
তাই গুণগত দিক দিয়ে পানকে জাহান্নামীদের খাদ্যের সাথে তুলনা করা যেতে পারে। এ আয়াতের আলোকে এমন খাদ্য গ্রহণ করা ঠিক নয় যা ক্ষুধা নিবারণ করেনা বা পুষ্টি যোগান দেয়না।
(৩) পান দাঁত কে কলুষিত করে। আর ইসলামের নবী (সঃ) দাঁতকে সর্বদা পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি তার উম্মতকে মিছওয়াক করার আদেশ দিয়েছেন খূব গুরুত্ব সহকারে। আর বলেছেনঃ “এ মিছওয়াকের উদ্দেশ্য হল মুখের পরিচ্ছন্নতা ও আল্লাহর সন্তুষ্টি।” যিনি পান খেয়ে থাকেন তিনি শত চেষ্টা করেও দাঁতকে পরিচ্ছন্ন রাখতে পারেননা। তাই পান খাওয়ার মাধ্যমে ইসলামী শরীয়তে মিছওয়াকের যে উদ্দেশ্য রয়েছে তা মারত্নকভাবে ব্যহত হয়।
(৪) চুন ছাড়া পান খাওয়ার কথা কল্পনা করা যায়না। আর চুন কোন খাদ্যের মধ্যে পড়েনা। চুন পিত্তথলিতে পাথর তৈরীতে সহায়তা করে।
(৫) পানে সুপারী খাওয়া হয়। সুপারী নেশা উদ্রেক করে। যিনি সুপারী খেতে অভ্যস্ত নন তিনি সুপারী খাওয়ার সাথে সাথে কিছুটা বেহুঁশ হয়ে পড়েন। তাই সুপারী কোন উপকারী খাদ্য নয়।
(৬) পান-খাদক ব্যক্তি তার প্রতিবেশীকে কষ্ট দিয়ে থাকেন। আপনি যদি পান খেতে অভ্যস্ত না হয়ে থাকেন আর আপনার বাসায় এমন একজন মেহমান আসে যিনি পান খেয়ে থাকেন তাহলে তার আচরণে আপনি বিরক্ত হবেন। দেখবেন আপনার পরিস্কার ঘরের এখানে সেখানে পানের চিপটি। বিছানার চাঁদর গুলোতে দাগ পড়ে গেছে। বেসীনগুলো এমন লালচে ময়লাযুক্ত হয়ে পড়েছে যা দেখলে আপনার অসহ্য লাগবে।
এমনি ভাবে আপনি যদি এক পানখাদকের কাছে সালাত আদায় করতে দাঁড়ান তাহলে সত্যিই আপনার কষ্ট হবে তার মুখের দুর্গন্ধে।
অনেকে বলেন পান খেলে মুখে দুর্গন্ধ হয়না বরং পান মুখের দুর্গন্ধ দূর করে। আমি বলি কথাটি ঠিক তবে তা দুটি অবস্থায়; যতক্ষণ পান খেতে থাকে ততক্ষণ দুর্গন্ধ হয়না আর যদি পার্শের ব্যক্তি অনুরূপ পানখোর হয়ে থাকেন তাহলে তিনি দুর্গন্ধ অনুভব করেননা। এ ছাড়া সর্বাবস্থায় পানখাদকের মুখ থেকে পান সুপারী, তামাক-মিশ্রিত দুর্গন্ধ বের হতে থাকে।
আর প্রতিবেশী বা সহযাত্রীর কষ্ট হয় এমন কোন কাজ করা জায়েয নয়।
(৭) অনেক পান খেতে অভ্যস্ত ব্যক্তিকে দেখেছি যে তারা পান খাওয়া সত্বেও দাঁত পরিস্কার রাখার ব্যাপারে অত্যাধিক যত্নবান থাকেন। বার বার মেছওয়াক ও ব্রাশ করেন। বিভিন্ন ধরণের টুথপেষ্ট ও টুথপাউডার ব্যবহার করেন। তবুও তারা দাঁতকে পানের দাগ থেকে মুক্ত রাখতে পারেননি। তাদের দাঁত কালো রং ধারণ করে বিশ্রি হয়ে গেছে। এখন আপনি ভেবে দেখতে পারেন যে, দাঁত ও মুখ এমন এক স্থান যা বার বার পরিস্কার করা হয় ও এ স্থানটা ময়লা আটকে রাখেনা তা সত্বেও দাঁত ও মুখ পান দ্বারা কিভাবে কলুষিত হয়ে থাকে। তাহলে পানের সংস্পর্ষে দেহের ঐ সকল ভিতরের অংশের অবস্থা কেমন হয়ে যায় যা পরিস্কার করা যায়না কখনো ?
(৮) একটু বিবেক দিয়ে কল্পনা করুন যে, রাসূলে কারীম (সঃ) এর কাছে এক ব্যক্তি পান চিবাতে চিবাতে আসল। তিনি তার মুখের দিকে তাকালেন। দেখলেন তার মুখ ও জিহবা পানের রংয়ে লাল ও দাঁত গুলো কালো হয়ে গেছে। তখন তিনি তাকে কি বললেন ? তিনি কি বলবেনঃ খুব ভাল জিনিষ খাচ্ছো, তুমি আমাদেরও পান খেতে দাও ? না বলবেন, পান খেলে মুখ ও দাঁতের সৌন্দর্য যা আল্লাহ দান করেছেন তা নষ্ট হয়?
এ প্রশ্নটা নিজের বিবেকের কাছে করুন। অতঃপর সিদ্ধান্ত নিন; পান খাবেন, না ত্যাগ করবেন।
(৯) পান খেলে সম্পদের অপচয় হয়। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেনঃ
“তোমরা খাবে ও পান করবে কিন্তু অপচয় করবেনা।”
সূরা আরাফঃ ৩১
এ আয়াত দ্বারা বুঝে আসে মানুষ সাধারণত খাওয়া ও পান করার মধ্যে সম্পদের অপচয় করে থাকে।
আর যা কিছু মুখে দিয়ে গলধকরণ করা যায় তা উপকারী হোক বা নাে হাক তা খাওয়া বা পান করার অনুমতি দেয়া হয়নি। যদি খাদ্যটা উপকারী না হয় তবে তার পিছনে সম্পদ ব্যয় করার নাম অপচয়। তাই পান খাওয়া একটি অপচয়।
(১০) পান খাওয়া একটা অনর্থক কাজ। সকল অনর্থক কাজ পরিহার করা ইসলামের দাবী। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আল-কুরআনে মুমিনদের গুণাবলী আলোচনা করতে যেয়ে বলেছেনঃ
“ যারা অনর্থক কাজ থেকে বিরত থাকে।”
সূরা মুমিনুন ঃ ৩
রাসূলে কারীম সঃ বলেছেন “ যে সকল কথা ও কাজ মানূষের কোন উপকারে আসেনা তা পরিহার করা তার ইসলামের সৌন্দর্য।”
মুসলিম
তাই পান খাওয়ার মত অনর্থক কাজ সকল ঈমানদার ব্যক্তির পরিহার করা উচিত।

আরও পড়ুনঃ   কোষ্ঠকাঠিন্য : ইচ্ছে করলেই যে রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়

বিঃ দ্রঃ গুরুত্বপূর্ণ হেলথ নিউজ ,টিপস ,তথ্য এবং মজার মজার রেসিপি নিয়মিত আপনার ফেসবুক টাইমলাইনে পেতে লাইক দিন আমাদের ফ্যান পেজ বিডি হেলথ নিউজ এ ।

LEAVE A REPLY