বসন্তকালের অসুখ-বিসুখ

0
29
বসন্তকাল, অসুখ-বিসুখ

এই ঋতুতে ভাইরাস ধরনের অসুখ যেমন-হাম, জলবসন্ত, ভাইরাস ফিভার হতে দেখা যায়। জ্বরে বাড়ির এক ব্যক্তি আক্রান্ত হলে আস্তে আস্তে আরেকজনও আক্রান্ত হয়। এভাবে এক ঘর থেকে অন্য ঘর-এই চক্র চলতে থাকে। এ ঋতুতে শীতের আবহাওয়ায় ঘুমন্ত ভাইরাস গরম পড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাতাসের মাধ্যমে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এ কারণে আমাদের করণীয় সম্পর্কে জানা দরকার। জলবসন্ত খুব ছোঁয়াচে, বিশেষ করে যার কোনোদিন এ রোগ হয়নি, সেজন্য এ রোগ হলে যার জীবনে হয়নি তাকে রোগীর কাছ থেকে দূরে রাখতে হবে। সরাসরি সংস্পর্শে এবং রোগীর হাঁচি-কাশির মাধ্যমে জলবসন্ত ছড়ায়। তাই জলবসন্ত হলে যা যা করতে হবে সেগুলো হলো :

১. আক্রান্ত রোগীকে আলাদা রাখতে হবে।

২. রোগীর কফ, নাকের পানি, শুকনো ফুসকুড়ির মাটির নিচে পুঁতে রাখতে হবে। আর রোগীর ব্যবহার করা সব কাপড়-চোপড় গরম পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে।

৩. পুষ্টিকর ভালো মানের খাবার রোগীকে খেতে দিতে হবে। অনেকের মাঝে এ রোগের ব্যাপারে কিছু কুসংস্কার রয়েছে, জলবসন্তের রোগীকে মাছ, গোশত, ডিম, দুধ খেতে দেয়া যাবে না। এগুলো খেলে নাকি ঘাগুলো পেকে যাবে। আবার কোনো কোনো রোগীকে বেশি করে ঠান্ডা খাবার খেতে দেয়া হয়। এগুলো সবই ভ্রান্ত ধারণা।

৪. চুলকানি হলে এন্টিহিস্টামিন জাতীয় ওষুধ খেতে দিতে হবে। যদি ঘাগুলো পেকে যায় বা নিউমোনিয়া দেখা দেয় তবে এক কোর্স কার্যকর এন্টিবায়োটিক খেতে দিতে হবে। লোকাল এন্টিসেপটিক হিসেবে ফ্লোরোহেক্সিডিন লাগাতে হবে।

এবার আসা যাক হামের ব্যাপারে। হাম একটি অতি মারাত্মক অথচ নিরাময়যোগ্য ব্যাধি। প্রতিটি শিশুকে ৯ মাস বয়সে হামের টিকা দিয়ে দিতে হবে। হাম হলে কিছুতেই রোগীকে ঠান্ডা লাগাতে দেয়া যাবে না। কারণ ঠান্ডা লেগে নিউমোনিয়া কিংবা ব্রংকোনিউমোনিয়া দেখা দিতে পারে। হাম হলে শিশুকে প্রোটিন খাওয়া কমানো যাবে না বরং প্রোটিনযুক্ত খাবার বেশি করে খেতে দিতে হবে।

আরও পড়ুনঃ   ছোঁয়াচে রোগ জলবসন্ত থেকে মুক্ত থাকুক শিশু

এখন ভাইরাল ফিভার নিয়ে আলাপ করা যায়। এই ঋতুতে কিছু কিছু টাইফয়েড এবং প্যারাটাইফয়েড জ্বরও দেখা দিতে পারে। ভাইরাল ফিভারে সাধারণত সর্দি, কাশির সঙ্গে মাথাব্যথা এবং শরীর ব্যথা দেখা দেয়। প্রথম দিকে জ্বরের শুরুতে এ জ্বর এবং টাইফয়েড জ্বরের মাঝে পার্থক্য বের করা মুশকিল হয়ে পড়ে। জ্বরের ধরন এবং ব্লাড টেস্টের পর রোগীকে ভালোমত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে আমরা বোঝার চেষ্টা করি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভাইরাল ফিভার দেখা দেয় বিধায় রোগীকে পুরোপুরি বিশ্রামে রাখতে হয়। ভালো ভালো এবং সুষম পুষ্টিকর খাবার খেতে দিতে হবে। জ্বর ১০১ ফারেনহাইটের ওপর থাকলে এসপিরিন কিংবা প্যারাসিটামল ধরনের ওষুধ খেতে দিতে হবে এবং রোগীর মাথায় পানি দেয়া এবং কোল্ড স্পঞ্জিং দিতে হবে। রোগীকে বেশি করে পানি খেতে দিতে হবে। এ অবস্থায় ৩ থেকে ৪ দিনের মধ্যেই জ্বরের প্রকোপ কমতে থাকে, যা ৫ থেকে ৭ দিনের মধ্যেই কমে গিয়ে রোগী পুরোপুরি সুস্থ হয়ে যায়। এই নিয়মে জ্বর না কমলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। একটা কথা মনে রাখতে হবে, নিজে নিজে অর্থাৎ চিকিৎসকের পরামর্শ ব্যতীত এন্টিবায়োটিক খাবেন না। এই ঋতুতে প্রকৃতিতে অ্যালার্জেনের মাত্রা খুব বেশি থাকে। গাছগাছালি থেকে ফুলের পরাগ রেণুতে বাতাস ভরে ওঠে। সে জন্য এই সময় অ্যালার্জিক রাইনাইটিস, হে ফিভার এবং হাঁপানি রোগের আধিক্য দেখা যায়। গ্রাম বাংলায় এই ঋতুতে অ্যালার্জিক এলভিওলাইটিস দেখা দেয়। এটা হাঁপানির মতো এক ধরনের শ্বাসকষ্টজনিত রোগ। যদিও এ রোগে সাঁই সাঁই শব্দ শুনতে পাওয়া যায় না। এক জাতীয় ছত্রাক দ্বারা এ রোগ হয় এবং খড়কুটো, গরুর ভুষি ব্যবহারের সময় অ্যালার্জেন (এসপারগিলাস ফিউমিগেটাস) নিঃশ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসে ঢুকে এ ব্যাধির জন্ম দেয়। এর হাত থেকে বাঁচতে হলে এগুলো ব্যবহার করার সময় নাকে-মুখে মাস্ক কিংবা রুমাল ব্যবহার করতে হবে। একটা কথা মনে রাখবেন, ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের অনেকেই রোগে আক্রান্ত হই। তবে এটা দেখা যায় যাদের মধ্যে রোগ প্রতিরোধ শক্তির অভাব আছে। সে জন্য আমাদের প্রত্যেকেরই উচিত ঋতু পরিবর্তনের সময় সতর্ক থাকা।

আরও পড়ুনঃ   মরণ ব্যাধি এইডস সারাবিশ্বের জন্য হুমকি

-অধ্যাপক (ডা.) ইকবাল হাসান মাহমুদ

LEAVE A REPLY