বসন্তের যাতনা জলবসন্ত

0
52
জলবসন্ত,chicken pox

গুটিবসন্ত বিশ্বের অন্যান্য দেশে যেমন নেই আমাদের দেশেও নেই। নেই এ কারণে যে এর ভয়াবহতা দেখে এর বিরুদ্ধে সকল অভিযান চালানো হয়েছিল। কিন্তু জলবসন্ত ব্রিটেন ও আমেরিকার মতো উন্নত বিশ্বেও অদ্যাবদি আছে আর বাংলাদেশে তো আছেই। বাংলাদেশে এর প্রকোপ এবং ভয়াবহতা উন্নত বিশ্বের তুলনায় অনেক বেশি। জলবসন্তকে এখন আর জলবৎ তরল অর্থাৎ একটি অতি সাধারণ রোগ মনে করা হয় না। অতিসম্প্রতি বাংলাদেশেরও এর টিকা পাওয়া যায়। আমাদের দেশে শীতের শুরুতে এর প্রকোপ বেশি হলেও সব ঋতুতেই জলবসন্তের রোগী কম-বেশি দেখা যায়। জলবসন্ত হয় ভেরিসেলা জোস্টার নামের ভাইরাস দ্বারা, যা আক্রান্ত রোগীর স্নায়ুতন্ত্রের একটি নির্দিষ্ট জায়গা দীর্ঘদিন ঘাপটি মেরে বসে থাকতে পারে। পরবর্তী সময়ে যখন রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পায় (বৃদ্ধ বয়সে এইডস আক্রান্ত হলে এবং অন্যান্য কারণে) তখন নতুন রূপে ফিরে আসে। যেভাবে প্রকাশ পায়, জ্বর, শরীর ব্যথা, এসব উপসর্গের মাধ্যমে অন্যান্য ভাইরাস রোগের মতোই শুরু হয় এ রোগ। একদিন পর গাঁয়ে লালা ছোট ছোট ফুসকার মতো ওঠে। ফুসকাগুলো বেশ চুলকায়। চার পাঁচ দিন পর ফুসকাগুলো ফেটে যায়। এ সময়ের মধ্যে সেকেন্ডারি ইনফেকশন হওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি। কিভাবে ছড়ায় : এটি একটি ছোঁয়াছে রোগ, রোগীর শরীরের সংস্পর্শে এলে বা হাঁচি-কাশির মাধ্যমে একজন থেকে অন্যজনের ছড়ায়। কখন ছড়ায় : আক্রান্ত ব্যক্তির ফুসকা ওঠার পর প্রথম দু’দিন বেশি পরিমাণে জীবাণু ছড়াতে পারে। তবে প্রথম পাঁচ দিন সুস্থ ব্যক্তি রোগীর সংস্পর্শে এলে আক্রান্ত হতে পারে। ছয় দিনপর থেকে আর সে ভয় থাকে না। এ কারণে আক্রান্ত শিশুকে প্রথমে পাঁচ দিন স্কুল যেতে দিতে নেই, এমনকি অন্যান্য শিশু থেকে আলাদা করে রাখা উত্তম। শিশু একবার আক্রান্ত হলে তার এ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা জন্মায় এবং পরবর্তী সমযে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। যে সব জটিলতা দেখা যায় : আমেরিকায় এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, সাধারণত এক বছরের কম বয়সের শিশুদের এবং বয়োবৃদ্ধদের বেলায় জটিলতার হার যেমন বেশি তেমনি ভয়াবহও এর কারণ হিসেবে ধরা হয়েছে শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতার দুর্বলতাকে। এইডস আক্রান্তদের মৃত্যুকে সহায়তা করতে পারে জলবসন্ত নামের রোগীটি। অনুরূপভাবে ক্যান্সার রোগী, যারা কেমোথেরাপি (ওষুধ) পায় তারাও ঝুঁকির আওতায় আসতে পারে জটিলতার মধ্যে-(ক) নিউমোনিয়া : আমেরিকায় এক পরিসংখ্যানে দেখানো হয়েছে, জলবসন্তে আক্রান্তদের নিউমোনিয়া হওয়ার সম্ভাবনা থাকে বেশি। দেখা গেছে এক বছরের কম বয়সী শিশু এবং বয়োবৃদ্ধদের মৃত্যু হার বেশি। জলবসন্ত থেকে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত রোগীর মৃত্যু হার-এক বছরের কম বয়সের আটজন প্রতি এক লাখে, বয়স্কদের বেলায় ২৫ জন প্রতি লাখে। এইডস আক্রান্তদের এই চিত্র খুবই মারাত্মক। এইডস রোগীদের প্রায় ৫৩ শতাংশ নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয় এবং মৃত্যৃর হার অনেক বেশি। (খ) মাইয়োকর্ডাইটিস বা হৃদরোগ : জলবসন্তে আক্রান্তদের মাইয়োকর্ডাইসি আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি আছে। তবে এ সংক্রান্ত কোনো পরিসংখ্যান আমাদের জানা নেই। (গ) এনকেফালাইটিস বা মস্তিস্কের ইনফেকশন : এটি একটি জটিল সমস্যা। আক্রান্ত শিশুদের বেশির ভাগের পরিণতি মৃত্যু। তবে জলবসন্ত থেকে এনকেফালাইটিসে আক্রান্ত হওয়ার হার খুব কম। (ঘ) বিকলাঙ্গতা : গর্ভাবস্থায় মা জলবসন্তে আক্রান্ত হলে ২৫ শতাংশ শিশু এই ভাইরাস নিয়ে জন্মাতে পারে এবং এদের কেউ কেউ বিকলাঙ্গ হয়ে জন্মাতে পারে।

আরও পড়ুনঃ   বাড়ির ব্যবস্থাপনায়ই চিকুনগুনিয়া নিরাময় সম্ভব!!!

চিকিৎসা : জ্বর, ব্যথা এবং চুলকানির উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসা দেয়া হয়ে থাকে। এছাড়া জটিলতা দেখা দিলে তদনুযায়ী চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।

প্রতিরোধ : বেশির ভাগ ভাইরাস রোগের মতো জলবসন্তকে দমন করতে হয় প্রতিরোধের মাধ্যমে। প্রতিরোধ করা যায় দু’ভাবে-(১) আক্রান্ত শিশু বা রোগীকে পৃথক রেখে সুস্থ শিশু সংস্পর্শে বা কাছাকাছি না এলে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা তেমন একটা থাকে না। (২) টিকার মাধ্যমে।

লেখক : ডা. দিদারুল আহসান, চর্ম, এলার্জি ও যৌনরোগ বিশেষজ্ঞ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, আলরাজি হাসপাতাল, ১২ ফার্মগেট, ঢাকা।

গ্রন্থনা : সালমা আক্তার (মন)

LEAVE A REPLY