মস্তিষ্কের অসুখ স্ট্রোক

0
368
মস্তিষ্কের অসুখ, স্ট্রোক, মস্তিষ্ক

মস্তিষ্কে রক্ত পরিবাহী ধমনী আকস্মিক ব্লক হলে বা রক্তক্ষরণ হলে, মস্তিষ্কের কিছু অংশে অক্সিজেন ও গ্লুকোজের সরবরাহ বন্ধ হয়ে মস্তিষ্কের স্বল্পমেয়াদি বা স্থায়ী ক্ষতি হয় এটিই স্ট্রোক।

অনেকেই মনে করেন স্ট্রোক হার্টের অসুখ। সে কারণে হার্ট অ্যাটাকের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেন অনেকেই। প্রকৃতপক্ষে স্ট্রোকে আক্রান্ত হয় মস্তিষ্ক।

স্ট্রোক সাধারণত দুই ধরনের : রক্ত পরিবহন বাধাগ্রস্ত স্ট্রোক বা ইশকেমিক স্ট্রোক এবং রক্তক্ষরণজনিত স্ট্রোক বা হেমোরেজিক স্ট্রোক।

ইশকেমিক স্ট্রোক : শতকরা ৭৫ ভাগ ক্ষেত্রেই রক্ত পরিবহন বাধাগ্রস্ত হয়ে ইশকেমিক স্ট্রোক হয়। মস্তিষ্কে রক্ত সংবহনকারী ধমনীগুলো সরু হয়ে গেলে মস্তিষ্কের অল্পকিছু এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

মস্তিষ্কের সামনের দিকে রক্ত পরিবহন করে ক্যারোটিড আর্টারি। এটি মস্তিষ্কের যেসব স্থান নড়ার ক্ষমতা, অনুভূতি, চিন্তাশক্তি, বাকশক্তি ও আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে, সেখানে রক্ত পরিবহন করে। আর পেছনের দিকে রক্ত সরবরাহ করে ভার্টিব্রোব্যাসিলার ধমনী। এটি মস্তিষ্কের অটোমেটিক কার্যকলাপ (যেমন- হার্টবিট, শ্বাসপ্রশ্বাস) নিয়ন্ত্রণকারী অংশ ও সমন্বয়কারী অংশে রক্ত সরবরাহ করে। যদি এই ধমনীগুলোর কিছু অংশ চর্বি জমে সরু হয়ে যায় অথবা থ্রম্বাস দিয়ে বন্ধ হয়ে যায় বা রক্ত নিজেই জমাটবদ্ধ হয়ে রক্ত চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়, তবে মস্তিষ্কের একটি বড় অংশ অক্সিজেন আর পায় না। ফলে ওই অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ইশকেমিক স্ট্রোক হয়।

মস্তিষ্কের যে অংশটুকু ক্ষতিগ্রস্ত হয় সে অংশ যে কাজ করে, বিঘ্নিত হয় সেটাই। তাই দেখা যায়, স্ট্রোক আক্রান্ত মানুষের বিভিন্ন শারীরিক কার্যকলাপ সীমিত হয়ে পড়ে।

রক্তক্ষরণজনিত স্ট্রোক : এ ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের ভেতরে রক্তক্ষরণ হয়। অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপের কারণেই অধিকাংশ সময় এই স্ট্রোক হয়। রক্তের উচ্চচাপের কারণে রক্তনালির ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশগুলো ফেটে গিয়ে রক্তক্ষরণ হয়। স্ট্রোকের অন্যান্য কারণের মধ্যে রয়েছে অ্যানুরিজম ফেটে যাওয়া ও আর্টারিওভেনাস ম্যালফরমেশন (যেখানে রক্তনালির অস্বাভাবিকতার কারণে রক্তক্ষরণ হয়ে থাকে)।

যে কারণে ঝুঁকি বাড়ে : উচ্চ রক্তচাপ, রক্তে অতিরিক্ত চর্বি, ধূমপানের অভ্যাস, ডায়াবেটিস, বার্ধক্য, এগুলো স্ট্রোক আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়। অনিয়মিত হৃদস্পন্দন এবং হার্টের ভাল্বে সমস্যা ও রক্তনালির প্রদাহ বা ভ্যাসেকুলাইটিসে আক্রান্ত রোগীরাও স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকির মধ্যে থাকেন। যদি অল্প বয়সে অর্থাৎ ৫০ বছর বয়সের আগে স্ট্রোক হয়, সেক্ষেত্রে অন্য কিছু কারণ যেমন- কোকেন বা অন্য কোনো ড্রাগ সেবন, রক্ত জমাটবদ্ধ হওয়ার সমস্যা অথবা বংশগত বা জেনেটিক ত্রুটি আছে বলে মনে করা হয়।

আরও পড়ুনঃ   মস্তিষ্কের গুরুত্বপূর্ণ ৮ ব্যায়াম জেনে নিন

লক্ষণ : বর্তমান বিশ্বে হার্টের অসুখ এবং ক্যান্সারের পর স্ট্রোকে বেশি মানুষ মারা যায়। বাংলাদেশে এ ধরনের কোনো পরিসংখ্যান না থাকলেও এখানে মৃত্যুর প্রথম সাতটি কারণের মধ্যে স্ট্রোক একটি বলে চিকিৎসকরা মনে করেন। আবার যারা স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার পরও বেঁচে যান, তাদের মধ্যে ৩০ শতাংশেরই চিরকালের জন্য কাজকর্মে অসামর্থ্য বা পক্ষাঘাতগ্রস্ততা দেখা দেয়। ফলে ওই ব্যক্তি ও তাঁর পুরো পরিবারই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যদি স্ট্রোকের সঙ্গে সঙ্গে লক্ষণ বুঝে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়া যায়, তবে স্ট্রোকজনিত মৃত্যুহার ও ক্ষতি কমিয়ে আনা সম্ভব। স্ট্রোকের লক্ষণগুলো নির্ভর করে মস্তিষ্কের কতটুকু অংশ ও কোন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তার ওপর।

অল্প এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হলে ওই স্ট্রোকে তেমন কোনো লক্ষণ নাও প্রকাশ পেতে পারে। একে নীরব স্ট্রোক বা সাইলেন্ট স্ট্রোক বলে। আমেরিকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোলজিক্যাল ডিসঅর্ডার অ্যান্ড স্ট্রোকের তথ্যানুযায়ী স্ট্রোকের প্রধান পাঁচটি লক্ষণ হলো-

  আকস্মিকভাবে মুখ, হাত, পা বিশেষ করে শরীরের যেকোনো এক পাশের দুর্বলতা দেখা দেয়া। শরীরের কোনো অংশের আংশিক বা সম্পূর্ণ অনুভূতিশূন্যতা ও হাত-পা নাড়ানোয় অসামর্থ্য হওয়া। দুর্বল অংশে অস্বাভাবিক অনুভূতিও (জ্বলা, ব্যথা, চুলকানি ইত্যাদি) হয়ে থাকে।

 হঠাৎ করে কথা জড়িয়ে যাওয়া, কথা বলতে না পারা ও মুখের মাংসপেশি যেকোনো একদিকে বেঁকে যাওয়া।

 হঠাৎ করে এক বা উভয় চোখেই দেখতে না পাওয়া।

 হঠাৎ করে মানসিক বৈকল্য, মনোসংযোগে অপারগতা, মাথা ঝিমঝিম করা ও হাঁটতে অসুবিধা বোধ করা।

 হঠাৎ করে প্রচন্ড মাথাব্যথা, সঙ্গে কখনো বমি হতে পারে।

করণীয় : পরিবারের কোনো সদস্যের হঠাৎ করে উপরোক্ত লক্ষণগুলোর যেকোনো এক বা একাধিকটি প্রকাশ পেলে অতি দ্রুত হাসপাতালে নেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। বিশেষ করে রোগী যদি অজ্ঞান হয়ে যায় সে ক্ষেত্রে দেরি করার কোনো সুযোগ নেই।

রোগী যদি অজ্ঞান না থাকে তবে স্ট্রোক বোঝার জন্য তিনটি বিষয় লক্ষ্য করুন-

 রোগীকে হাসতে বলুন। হাসতে গিয়ে মুখ বেঁকে যায় কি না লক্ষ্য করুন।

 দুই হাত ওপরে তুলতে বলুন। দেখুন হাত তুলতে কোনো দুর্বলতা আছে কি না।

 একটি সাধারণ বাক্য বলতে বলুন। সম্পূর্ণ বাক্য বলতে পারে কি না লক্ষ্য করুন।

আরও পড়ুনঃ   ইস! কৌশলটা আগে জানা থাকলে বাবা স্ট্রোক করে মারা যেতেন না!

যদি রোগী অজ্ঞান থাকে, তবে তাকে লম্বা করে শোয়ান, যেন মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহ ব্যাহত না হয়। রোগী যদি বমি করতে থাকে, তবে তাকে কাত করে এমনভাবে শোয়ান, যেন বমি নাকে বা মুখে আটকে যেতে না পারে। সাবধানে অ্যাম্বুলেন্সে বা যানবাহনে তুলুন, যেন রোগী ব্যথা না পায়।

রোগ নির্ণয় : স্ট্রোক শনাক্ত করার জন্য প্রচলিত পরীক্ষা হলো ব্রেনের সিটি স্ক্যান করা। এ ছাড়া এমআরআই, ম্যাগনেটিক রেজোন্যান্স এনজিওগ্রাম, ক্যারোটিড ডপলার ইত্যাদিও করা হয়ে থাকে। এ ছাড়া হার্টের পরীক্ষা যেমন-ইসিজি, ইকোকার্ডিওগ্রাম, ২৪ ঘণ্টার ইসিজি মনিটরিং, রক্ত পরীক্ষা ইত্যাদিও করা হয়ে থাকে।

রোগের জটিলতা :

 স্ট্রোক হলে অনেক সময়ই রোগী প্রস্রাব ও মলত্যাগের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারায় ও নিজের অজান্তেই প্রস্রাব-পায়খানা করে ফেলে।

 স্ট্রোকের রোগী নড়াচড়া করতে পারে না বলে একইভাবে শুয়ে বা বসে থাকার কারণে পিঠে ও কোমরে ঘা (বেডসোর) হয়ে যায়। এই ঘা দ্রুত গভীর হয় ও সহজে শুকাতে চায় না।

 হাত-পা অবশ হওয়ার কারণে নড়াচড়া বন্ধ হয়ে যায় ও আক্রান্ত অংশ শুকিয়ে যায়।

 অনেক সময়ই রোগী খাদ্য ভালোভাবে গিলতে না পারায় খাদ্য শ্বাসনালিতে ঢুকে যায় ও নিউমোনিয়া হয়।

 অনেক ক্ষেত্রে পায়ের রক্তনালিতে রক্ত জমাট বেঁধে যায়। এই জমাটবদ্ধ রক্ত ফুসফুসে গিয়ে শ্বাসকষ্ট তৈরি করতে পারে।

 রোগীর কথাবার্তায় অস্পষ্টতা থাকার দরুন পারিবারিক ও সামাজিক কর্মকান্ডে তার অংশগ্রহণ কমে যায়। ফলে রোগী বিষণ্ণতায় ভোগে। এতে অনেক সময় আত্মহত্যার প্রবণতা পর্যন্ত দেখা যায়।

প্রতিরোধ

 উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখুন। যারা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের ওষুধ খান, তাঁদের তা নিয়মিত সেবন করতে হবে।

 ডায়াবেটিস থাকলে নিয়ন্ত্রণে রাখুন।

 ধূমপান ও তামাকের ব্যবহার পরিহার করুন।

 চর্বি ও তেলসমৃদ্ধ খাবার কম খাবেন।

 চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসারে রক্ত তরল রাখতে অ্যাসপিরিন সেবন করতে পারেন।

 যাদের ক্যারোটিড আর্টারি সরু হয়ে গেছে ও আগে হার্ট অ্যাটাক অথবা স্ট্রোক হয়েছে, তারা পরবর্তী স্ট্রোক প্রতিরোধ করার জন্য ক্যারোটিড অ্যান্ড আর্টেরেকটনি অপারেশন করাতে পারেন। এ ছাড়াও নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, প্রতিদিন ব্যায়াম, অতিরিক্ত ক্যালরিযুক্ত খাবার পরিহার করা, দিনে ৮ ঘণ্টা বিশ্রাম নেয়া ও টেনশনমুক্ত জীবন যাপন করা স্ট্রোকের ঝুঁকি কমিয়ে দেয়। যাদের বংশে স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার ইতিহাস রয়েছে, তাদের বেশি সতর্ক থাকতে হবে।

আরও পড়ুনঃ   স্ট্রোক ও প্যারালাইসিস রোগীদের ফিজিও থেরাপি চিকিৎসা বিষয়ক প্রশিক্ষণ কর্মশালা অনুষ্ঠিত

রোগীর যত্ন

 রোগী যদি হাঁটাচলায় অক্ষম হয়, তবে দুই ঘণ্টা পর পর কাত করে দিন, যেন দীর্ঘক্ষণ একটি বিশেষ অংশের ওপর চাপ না পড়ে। পিঠ যেন ভেজা ভেজা না থাকে। প্রয়োজন হলে পাউডার দিয়ে দিন।

 কোনো হাত-পা অবশ থাকলে ওই অংশের ব্যায়াম করান। নিয়মিত প্রতিটি অস্থিসন্ধি নাড়ান। বিশেষ ধরনের বিছানা ব্যবহার করতে পারেন।

 রোগী যদি মুখে খায়, তবে চামচ দিয়ে সাবধানে খাওয়ান। অল্প অল্প করে দিন। খাবার যেন ফুসফুসে চলে না যায়, সেদিকে লক্ষ্য রাখুন। খাবার পর মুখ মুছে দিন।

 রোগী যদি নাকে নল দিয়ে খায়, তবে তরল খাবার নির্দিষ্ট পরিমাণে নির্দিষ্ট সময় অন্তর অন্তর দিন। নলে জোরে চাপ দিয়ে খাবার ঢোকাবেন না। নাক ও নল পরিষ্কার রাখুন।

 প্রতিদিন দুই বেলা দাঁত ও মুখ পরিষ্কার করে দিন।

 রোগীকে সব সময় বিছানায় থাকতে বাধ্য করবেন না। প্রয়োজন হলে হুইল চেয়ারের ব্যবস্থা করবেন, যেন রোগী নিজেই এক ঘর থেকে অন্য ঘরে যেতে পারে ও পরিবারের সবার সঙ্গে বিভিন্ন কাজে অংশগ্রহণ করতে পারে।

 রোগী যদি নিজে থেকেই কোনো পারিবারিক ও সামাজিক কাজে অংশ নিতে চায়, তাকে উৎসাহিত করবেন। রোগীকে যতটা সম্ভব নিজের কাজ নিজে করতে দিন।

 রোগীর কথা বলায় সমস্যা থাকলে তার কথা মনোযোগ দিয়ে বোঝার চেষ্টা করুন। এতে রোগীর আত্মবিশ্বাস বেডে যাবে। প্রয়োজন হলে রোগীর জন্য স্পিচ থেরাপির ব্যবস্থা করুন।

 পরিবারের সব সদস্যই রোগীকে সময় দিন। কিছু সময় তার সঙ্গে কাটান। এতে তার বিষণ্ণতা হবে না।

 রোগীর প্রস্রাব ও মলত্যাগ নিয়মিত হচ্ছে কি না খেয়াল করুন। প্রস্রাবের নল দেয়া থাকলে ২১ দিন অন্তর নল পরিবর্তন ও পরিষ্কার রাখবেন।

 সব ওষুধ নিয়মিত খাওয়াবেন।

 মাসে দুবার বা একবার চিকিৎসকের কাছে নিযয় যান।

স্ট্রোক মানেই জীবনের শেষ নয়, অনেক বিশ্বখ্যাত ব্যক্তি রয়েছেন, যারা স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার পরও নিজেদের মননশীল কার্যকলাপ অব্যাহত রেখেছেন। তাই স্ট্রোকে আক্রান্ত হলে আশা হারাবেন না। মনের শক্তি ধরে রাখুন। আর যারা আক্রান্ত হননি, সতর্ক হোন আজ থেকেই।

-ডা. সাবরিনা শারমিন

রেসিডেন্ট, কার্ডিয়াক সার্জারি বিভাগ

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়

LEAVE A REPLY