মাড়িরোগ প্রতিরোধ করা যায়

0
8
মাড়িরোগ

অদ্বৈত মারুত: দাঁত ও মুখগহ্বরের বিভিন্ন রোগের মধ্যে অন্যতম হলো মাড়িরোগ। সাধারণত জীবাণু সংক্রমণের কারণে মাড়িরোগ হয়ে থাকে। যথাযথ চিকিৎসা না করা হলে এ রোগটি আরও জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। এ নিয়ে কথা হয় সৌদি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ তায়েফ ডেন্টাল হাসপাতালে কর্মরত বাংলাদেশি দন্তরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. সিকদার নাজমুল হক-এর সঙ্গে।

অদ্বৈত মারুত : মাড়িরোগ কীভাবে সৃষ্টি হয়?

ডা. সিকদার নাজমুল হক : মাড়িরোগ সৃষ্টির কারণ অনেক। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয় মাড়িতে ডেন্টাল প্ল্যাক জমা হওয়া। মুখে জমা হওয়া খাদ্যকণার মাধ্যমে ব্যাকটেরিয়ার যে আস্তর জমে ওঠে, তার নামই ডেন্টাল প্ল্যাক। এটি দাঁত ও মাড়ির সংযোগস্থলে জমা হলে তা ক্রমে মাড়িতে প্রদাহ বা জিঞ্জিভাইটিস তৈরি করে। এ অবস্থায় মাড়ির সময়মতো এবং যথাযথ চিকিৎসা না করানো হলে তাতে অবস্থা গুরুতর হয়ে আক্রান্ত হয়ে পড়ে মাড়িতন্তু বা পেরিওডন্টাল ফাইবার। আর এতে সৃষ্টি হয় পেরিওডন্টাইটিস নামক আরেকটি রোগের।

অদ্বৈত মারুত : এ রোগের উপসর্গগুলো কী?

ডা. সিকদার নাজমুল হক : মাড়িরোগের উপসর্গগুলো হলো মাড়ি থেকে রক্ত পড়া, বিশেষ করে দাঁত ব্রাশ করার সময় মাড়ি থেকে রক্ত বের হওয়া, মাড়ির রঙ উজ্জ্বল লাল বর্ণ ধারণ করা, মাড়ি ফুলে যাওয়া, মুখে দুর্গন্ধ হওয়া, চাপ দিলে মাড়িতে ব্যথা হওয়া। কারো কারো ক্ষেত্রে মাড়ি থেকে পুঁজ বের হওয়ার মতো ঘটনাও ঘটতে পারে।

অদ্বৈত মারুত : মাড়িরোগ হলে মুখে কী ধরনের জটিলতা তৈরি হতে পারে?

ডা. সিকদার নাজমুল হক : মাড়িরোগের কারণে সৃষ্ট জটিলতাগুলো হলো পেরিওডন্টাইটিস বা পায়োরিয়া হতে পারে। মাড়িতে, এমনকি চোয়ালে পুঁজ জমতে পারে। শেষ পরিণতি হিসেবে ধীরে ধীরে দাঁত নড়বড়ে হয়ে যেতে পারে এবং দাঁত পড়ে যেতে পারে।

অদ্বৈত মারুত : মাড়িরোগের কারণে কি অন্য কোনো শারীরিক জটিলতা দেখা দিতে পারে?

আরও পড়ুনঃ   ডায়াবেটিসে কিডনি রোগ হলে কী করবেন?

ডা. সিকদার নাজমুল হক : হ্যাঁ, তা হতে পারে। যেমন যে মায়েরা মাড়িরোগে ভুগছেন, তাদের নির্ধারিত সময়ের আগেই সন্তান প্রসব করা এবং কম ওজনের সন্তান জন্মদানের হার অন্য যে কোনো মায়ের তুলনায় অনেক বেশি। মাড়িরোগ যত বেশি গুরুতর, মায়েদের এ ঝুঁকির হার তত বেশি বেড়ে যায়। এ রোগে আক্রান্তদের হৃদরোগের ঝুঁকিও অনেক বেড়ে যায়। এ ছাড়া নিউমোনিয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসতন্ত্রের রোগ সৃষ্টিতে মাড়িরোগের ভূমিকা রয়েছে বলে গবেষণায় দেখা গেছে।

অদ্বৈত মারুত : মাড়িরোগ নিরূপণের পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে চাই।

ডা. সিকদার নাজমুল হক : মাড়িরোগ নির্ণয়ে ডেন্টাল সার্জনরা ‘প্রোব’ নামে একটি যন্ত্র ব্যবহার করে থাকেন। এটির মাধ্যমে মাড়ি থেকে রক্ত বের হয় কিনা, তা পরীক্ষা করা হয়। এ রোগটি জটিল হয়ে ‘পেরিওডন্টাইটিস’ বা পায়োরিয়া সৃষ্টি করল কিনা, তা নির্ণয় করতে মাড়ির ভেতরের গভীরতাও বের করা হয় পেরিওডন্টাল প্রোব নামক এ যন্ত্রের মাধ্যমে। এ ছাড়া এক্স-রে করে দাঁতের চারপাশের হাড় ক্ষয় হয়ে গেছে কিনা, ক্ষয় হলে কতটুকু হয়েছে, তা বের করা যায়।

অদ্বৈত মারুত : কীভাবে মাড়িরোগের চিকিৎসা করা হয়?

ডা. সিকদার নাজমুল হক : মাড়িরোগ চিকিৎসার মূল সূত্রটি হলো, রোগীকে নিয়মিত দাঁত মাজার জন্য প্রস্তুত করে তোলা। এ চিকিৎসার জন্য ডেন্টাল ক্লিনিকে রোগীর দাঁত ও মাড়ির ভেতর থেকে ডেন্টাল প্ল্যাক পরিষ্কার করে ফেলা হয়। এ জন্য প্রথমেই স্কেলিং করে দাঁতে জমা হওয়া পাথর সরিয়ে ফেলা হয়। ডিপ স্কেলিং এবং ডিপ কিউরেটেজ নামক পদ্ধতিতে মাড়ির ভেতরের অংশ পরিষ্কার করা হয়। রুট প্লেনিং নামক পদ্ধতিতে দাঁতের শেকড়ে জমা হওয়া পাথর এবং বর্জ্য উপাদান পরিষ্কার করে ফেলা হয়। যেসব কারণে দাঁতে সহজেই ডেন্টাল প্ল্যাক জমা হয়, সে কারণগুলো দূর করাও জরুরি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মাড়ির অস্ত্রোপচার বা ফ্ল্যাপ সার্জারি করারও প্রয়োজন হয়ে পড়ে।

আরও পড়ুনঃ   ক্যান্সার-এইচআইভি প্রতিষেধক উদ্ভিদ এশিয়া মহাদেশেই

অদ্বৈত মারুত : এ রোগ প্রতিরোধে বিশেষ কোনো পদ্ধতি আছে কি?

ডা. সিকদার নাজমুল হক : মাড়িরোগ প্রতিরোধে প্রয়োজন নিয়মিত ও সঠিক নিয়মে দাঁত ব্রাশ করা। দাঁতের মাঝখানের ফাঁকা জায়গাটুকু পরিষ্কার করার জন্য ডেন্টাল ফ্লোস নামক সুতা ব্যবহার করা যায়, যা ওষুধের দোকানে পাওয়া যায়। ক্লোরহেক্সিডিন বা হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডসমৃদ্ধ মাউথওয়াশ দিয়ে প্রতিদিন কুলি করার মাধ্যমেও এ রোগ প্রতিরোধ করা যায়। সাধারণত দুবার দাঁত মাজা দরকার সকালে ঘুম থেকে উঠে একবার এবং রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে আরেকবার। ব্যবহার করা উচিত নরম টুথব্রাশ। যে কোনো ভালো মানের টুথপেস্ট দিয়ে দাঁত মাজতে হবে। তবে সবচেয়ে বেশি জরুরি বিষয়টি হলোকয়লা, ছাই বা অমসৃণ টুথ পাউডার দিয়ে দাঁত মাজা কখনো উচিত নয়। নিয়মিত ডেন্টাল ক্লিনিকে গিয়ে দাঁতের স্কেলিং করিয়ে নেওয়ার মাধ্যমেও মাড়িরোগ সহজে দমন করা সম্ভব।

অদ্বৈত মারুত : আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

ডা. সিকদার নাজমুল হক : আপনাকে এবং পত্রিকার সব পাঠককেও ধন্যবাদ। সবচেয়ে বড় কথা, আমরা যদি সবাই দাঁত থাকতেই দাঁড়ের মর্যাদা দিই, তা হলে অনেক রোগ থেকে সহজেই দূরে থাকতে পারব।

LEAVE A REPLY