যেভাবে পর্নোগ্রাফির প্রতি ঝুকছে টিন এজাররা

0
148
পর্নোগ্রাফি,পর্নো, টিনএজার

সন্তান নিয়ে বহুমাত্রিক উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় মা-বাবা। স্কুল-কলেজ এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া সন্তান নিয়েও দুশ্চিন্তার শেষ নেই তাদের। দিনদিন বাড়ছে এর মাত্রা। পারিবারিক সামাজিক অবক্ষয় যেভাবে ছড়িয়ে পড়ছে, তাতে কখন কিভাবে প্রিয় সন্তান খারাপ কাজে জড়িয়ে পড়ে তা নিয়ে দুর্ভাবনা সারাক্ষণ। গ্রাম কিংবা শহর সর্বত্র মা-বাবার একই চিন্তা, কিভাবে সন্তানকে অবক্ষয় থেকে দূরে রাখা যায়। ক্ষেত্রবিশেষে পরিস্থিতি এমনপর্যায়ে গড়িয়েছে যে, মা-বাবা সন্তানকে শাসন করার ব্যাপারেও শঙ্কিত। কারণ শাসন করায় সন্তানের হাতে মা-বাবা খুনের মতো লোমহর্ষক ঘটনাও ঘটছে এখন। আর ছোটখাটো কারণেও পরিবারের ওপর অভিমান করে কিশোর-কিশোরীরা আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছে অহরহ।

অভিভাবকদের মতে, তারা অপেক্ষায় থাকেন প্রাইমারি অথবা হাইস্কুলের গণ্ডি পেরোনোর পর হয়তো আর সন্তানকে হাত ধরে স্কুলে নিয়ে যেতে হবে না। কিন্তু যেভাবে সামাজিক অবক্ষয় ছড়িয়ে পড়ছে তাতে সন্তান যতই বড় হচ্ছে ততই নতুন মাত্রায় বাড়ছে উদ্বেগ উৎকণ্ঠা। এক মুহূর্ত চোখের আড়াল হলেই যেন বিপদ। সন্তান বড় হলে ঘরে বন্দী করে রাখা যায় না। আবার বাইরে গেলেও খারাপ পরিবেশ ও সঙ্গদোষের দুর্ভাবনা। তা ছাড়া প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ ও মোবাইল ইন্টারনেটের কারণে সঙ্গদোষের সব উপাদান এখন তাদের হাতের মুঠোয়। একসময় মা-বাবার দুশ্চিন্তা ছিল নিরাপত্তা, মাদক, খারাপ বন্ধুবান্ধব ও পরিবেশ, সন্ত্রাস, বখাটেপনা থেকে কিভাবে সন্তানকে রক্ষা করা যায় তা নিয়ে। কিন্তু প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং এর খারাপ প্রভাব নিয়ে অভিভাবকদের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ছাড়িয়ে গেছে অতীতের সব দুশ্চিন্তার মাত্রা। পাশাপাশি পরিমল, পান্না মাস্টার, মনিরুজ্জামান, হুমায়ুন কবিরের মতো ভয়ঙ্কর শিক্ষকদের কারণে মেয়েদের নিয়ে দুশ্চিন্তা কুরে কুরে খাচ্ছে মা-বাবাকে।

হাতের মুঠোয় সঙ্গদোষঃ
আগের দিনে পাঠ্যবইয়ে শিক্ষার্থীদের শেখানো হতো খারাপ বন্ধুর সাথে মেলামেশা করাই শুধু সঙ্গদোষ নয়। কুগ্রন্থ অধ্যয়ন, কুচিত্র দর্শন, কুসঙ্গীত শ্রবণ এসবই খারাপ সঙ্গদোষের মধ্যে পড়ে। খারাপ সঙ্গীর প্রভাবে যেমন একজনের খারাপ হওয়ার আশঙ্কা থাকে তেমনি কুচিত্র, কুগ্রন্থ, কুসঙ্গীতের প্রভাবেও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সঙ্গদোষে লোহা ভাসে। সঙ্গদোষ নিয়ে অনেক প্রবাদ আছে। সঙ্গদোষ বিষয়ে সবাই ওয়াকিবহাল। তাই মা-বাবা সঙ্গদোষ নিয়ে একসময় ভীষণ সচেতন থাকতেন সন্তান যেন কোনো খারাপ বন্ধুর পাল্লায় না পড়ে। মহল্লা বা এলাকার খারাপ কারো সাথে না মেশে। যখন-তখন বা বেশি সময় ধরে বাইরে বের হওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ, সবসময় চোখে চোখে রাখা এবং আদেশ উপদেশ বকাঝকার মাধ্যমে অনেক মা-বাবা সন্তানদের সঙ্গদোষের প্রভাব থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করতেন। কিন্তু প্রযুক্তির প্রভাব আর প্রসারে সঙ্গদোষের সব উপাদান এখন ছেলেমেয়েদের হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। সচেতন বা অচেতনে মা-বাবাই সন্তানদের হাতে তুলে দিচ্ছেন মাল্টিমিডিয়া মোবাইল, স্মার্টফোন, প্যাড, আইপড, কম্পিউটার, ল্যাপটপ ও ইন্টারনেট সংযোগ। এসবের বদৌলতে বেশির ভাগ শিক্ষার্থীর হাতের মুঠোয় এখন অশ্লীল নাচগান এবং রাজ্যের সব পর্নো ভিডিওর সমাহার।

সম্প্রতি মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, রাজধানীতে ৭৭ শতাংশ কিশোর পর্নো ভিডিওতে আসক্ত। রাজধানীর একটি স্কুলে নবম শ্রেণীর ক্লাস চলাকালে কয়েক শিক্ষার্থী পেছনে বসে মোবাইলে পর্নোগ্রাফি দেখছিল। শিক্ষকের হাতে এ ঘটনা ধরা পড়ার পর শিক্ষার্থীদের মোবাইল ফোন জব্দ করা হয় এবং প্রায় সবার মোবাইলে পর্নো ভিডিও পাওয়া যায়। রাজধানীর বিভিন্ন মোবাইল মার্কেট থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী প্রতিদিন কয়েক কোটি টাকার পর্নো ভিডিও মোবাইলে লোড করা হয়। এর বেশির ভাগ গ্রাহক স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী। সকাল থেকে রাত অবধি সব ডাউনলোডের দোকানে শিক্ষার্থীরা ভিড় করে পর্নো ভিডিও সংগ্রহের জন্য। তা ছাড়া ইন্টারনেট আছে যাদের তারা ইচ্ছামতো পর্নো ভিডিও ডাউনলোড করে নেয়। শিক্ষক, অভিভাবক, দোকানদার, শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, সুযোগ পেলেই একা একা এমনকি কয়েকজন মিলে অসঙ্কোচে আড়ালে-আবডালে বসে তারা পর্নো ভিডিও দেখে থাকে এবং এসব নিয়ে আলোচনা করে। এমনকি শিক্ষার্থীরা এসবের প্রতি এতই আসক্ত যে কাসে বসেও তারা এগুলো দেখছে এবং মাঝে মধ্যে তা ধরাও পড়ছে।

বিভিন্ন জেলা-উপজেলা এমনকি গ্রামগঞ্জের শিক্ষার্থী তরুণ যুবকদের মধ্যেও ভয়াবহ আকারে ছড়িয়ে পড়ছে পর্নো আগ্রাসন। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা হুমড়ি খেয়ে পড়ছে ভিডিও দোকানে এসব ডাউনলোড করার জন্য। এমনকি পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থীর মোবাইলেও পর্নোগ্রাফি ধরা পড়ার খবর বেরিয়েছে। জেলা-উপজেলা এবং গ্রামগঞ্জের হাটেবাজারে ১০ টাকায় মিলছে মোবাইল ভর্তি পর্নোগ্রাফি। অলিগলিতে নির্জনে বসে বসে ক্লাস ফাঁকি দিয়ে শিক্ষার্থীরা দেখছে এসব ভিডিও। প্রযুক্তির দ্রুত প্রসার এবং নিত্য-নতুন উদ্ভাবনের কারণে সাইবার ক্যাফে ঢাকা থেকে বিদায় নিয়েছে কিন্তু জেলা-উপজেলায় এবং মফস্বল শহরে এর কদর বাড়ছে। বিভিন্ন এলাকায় স্কুল ছুটির পর শিক্ষার্থীরা সাইবার ক্যাফেতে গিয়ে পর্নোগ্রাফি দেখছে।

মোবাইল ভাঙলেন মাঃ
শাপলা (আসল নাম নয়) জানান, তারা ছেলের মোবাইল চেক করে এক দিন নুড ছবি পান। এরপর রাগে তিনি মোবাইল আছাড় দিয়ে ভেঙে ফেলেন। পরে আবার মোবাইল কিনে দিতে হয়েছে। কারণ তার ছেলে মিরপুর কমার্স কলেজে দ্বিতীয় বর্ষে পড়ে এবং সেখানে থাকে। তাদের বাসা রামপুরা। দূরে থাকে সে জন্য মাঝে মধ্যে যোগাযোগ করতে হয়। শাপলা বলেন, মাঝে মধ্যে তিনি ছেলের মোবাইল চেক করেন। ফেসবুকে তার বন্ধু কারা তাও দেখেন। কিন্তু এভাবে পাহারা দিয়ে কী লাভ? কারণ তাকে ল্যাপটপ কিনে দেয়া হয়েছে। স্কাইপের মাধ্যমে সে লোকজনের সাথে কথা বলে। স্কাইপে কথা বলার সময় দুইজনকে লাইভ দেখতে পায় ওয়েবক্যামে। দরজা বন্ধ করে সে যদি কোনো মেয়ের সাথে কথা বলে বা ইন্টারনেটে খারাপ কিছু দেখে তা থেকে কিভাবে তাকে রক্ষা করব? শাপলা জানান এসব দুশ্চিন্তা তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে।

শাপলার মতো উদ্বেগ কুরে-কুরে খাচ্ছে অসংখ্য মা-বাবাকে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন অভিভাবক জানান, তার বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছেলে এক দিন দরজার সিটকানি না লাগিয়ে রুমে বসে পর্নোগ্রাফি দেখছিল। তার কানে লাগানো ছিল এয়ারফোন। রাতে ঘুমানোর আগে তিনি মশার এ্যারোসল স্প্রে করার জন্য দরজায় নক না করে ছেলের রুমে ঢুকে এ দৃশ্যের মুখোমুখি হন। শিক্ষক-অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বললে তারা জানান, অনেকে হয়ত প্রচলিত পর্নোগ্রাফি থেকে বিরত থাকতে চায়; কিন্তু নানা কারণে অনেকের পক্ষে তা এড়ানো সম্ভব হয় না। দেশীয় মডেল, শিল্পী এবং নাটক সিনেমার অভিনেত্রীদের পর্নো ভিডিও বাজারে ছড়িয়ে পড়ে প্রায়ই। কেউ একজন হয়ত সচেতনভাবে পর্নোগ্রাফি এড়িয়ে চলে; কিন্তু দেশীয় এসব ভিডিও সবার সামনে বন্ধুবান্ধব মিলে একসাথে দেখে এবং আদান প্রদান করে থাকে অনেক তরুণ-তরুণী এবং শিক্ষার্থী নিজেদের মধ্যে। এসব দেখা এবং এ নিয়ে কথা বলা যেন খারাপ কিছু নয়। এসব ক্ষেত্রে সবাই খোলামেলা, বেপরোয়া। কোনো একজনের মোবাইলে এসব ভিডিও ক্লিপ আসা মাত্রই তা সে অনায়াসে ছড়িয়ে দিচ্ছে তার পরিচিত সব বন্ধুদের মধ্যে। এভাবে আস্তে আস্তে অনেকে পর্নোগ্রাফির দিকে ধাবিত হয়।

অনেক মা-বাবা দুঃখ করে জানান, মোবাইল ইন্টারনেট এসব না থাকলে হয়ত বাঁচতাম। কিন্তু যে যুগ চলছে তাতে আবার এসব থেকে একেবারে দূরেও থাকা যায় না। সব মিলিয়ে এসব বিষয় তারা কিভাবে মোকাবেলা করবেন সে ব্যাপারে অনেকে দ্বিধাগ্রস্ত, অনেকে দিশাহীন। তবে অনেক অভিভাবক এবং শিক্ষক জানিয়েছেন খারাপ জিনিস সরকারিভাবে নিয়ন্ত্রণের পদক্ষেপ নেয়া উচিত। তা না হলে ভবিষ্যতে সামাজিক বিপর্যয় দেখা দিতে পারে।

পর্নো আসক্তি হেরোইনের মতোই বিপজ্জনকঃ
সম্প্রতি ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটির এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে পর্নোগ্রাফি আসক্তি মাদকের চেয়েও ভয়ানক হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। সাধারণত ১৩ বছরের কিশোররা ইন্টারনেট পর্নোতে বেশি আগ্রহী এবং তারা মেয়েদের যৌনতা একটি বিষয় হিসেবে চিন্তা করতে শুরু করে। প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয়, নিষ্পাপতার দিন শেষ হয়ে গেছে। মানুষ এখন ইন্টারনেটের মাধ্যমে অনেক কিছুই জানতে পারে। এটা হচ্ছে ঘরে হেরোইন রেখে শিশুকে ছেড়ে দেয়ার মতো। কিছু ডাক্তার অবশ্য বলেছেন, যারা অতিরিক্ত পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত তারা মাদকাসক্তদের চেয়েও বেশি ঝুঁকিতে আছেন। প্রমাণ হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মনোবিজ্ঞানী জেফরি সেটিনোভার বলেন, আধুনিক বিজ্ঞান আমাদের বুঝতে সাহায্য করেছে, পর্নোগ্রাফির আসক্তি হেরোইনের মতোই। শুধু প্রয়োগটা ভিন্ন।

গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, যারা পর্নো আসক্ত তাদের মস্তিষ্কে মাদকাসক্তদের মতোই নেশা কাজ করে। মাদক গ্রহণের ফলে আসক্ত ব্যক্তিদের মস্তিষ্কের যে অংশে অনুভূতি কাজ করে ঠিক সেই অংশই উদ্দীপিত হয়ে ওঠে পর্নো আসক্তরা যখন পর্নো দেখে। মাদকাসক্তদের যেমন স্বাভাবিক জীবনে ছন্দপতন ঘটে, বিপর্যয় বিশৃঙ্খলা নেমে আসে তেমনি পর্নো আসক্তরাও ধীরে ধীরে অনেক ক্ষেত্রে স্বাভাবিকতা হারিয়ে ফেলে এবং বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়। তাই তরুণসমাজকে রক্ষার জন্য ক্ষতিকর ওয়েবসাইট বন্ধের জন্য যুক্তরাজ্য সরকারকে সুপারিশ করা হয়েছে গবেষণা প্রতিবেদনে।

বিঃ দ্রঃ গুরুত্বপূর্ণ হেলথ নিউজ ,টিপস ,তথ্য এবং মজার মজার রেসিপি নিয়মিত আপনার ফেসবুক টাইমলাইনে পেতে লাইক দিন আমাদের ফ্যান পেজ বিডি হেলথ নিউজ এ ।

LEAVE A REPLY