রক্তদান কেন প্রয়োজন?

0
74
রক্তদান

কেন রক্তদান করা দরকার, এ বিষয়ে আলোচনা করার আগে আমরা বুঝে নিই রক্ত বস্তুটি আসলে কি, এবং আমাদের দেহে রক্ত প্রকৃতপক্ষে কি কাজ করে। যে কোন সচল প্রাণীর দেহ তৈরি হয়েছে লক্ষ কোটি জীব-কোষ দিয়ে। এই কোষ গুলি বেঁচে থাকে অক্সিজেনের উপর নির্ভর করে। প্রতি মুহূর্তে মুহূর্তে অক্সিজেন গ্রহণ করে, এবং পর মুহূর্তেই তাকে কার্বন-ডাই-অক্সাইডে সংশ্লেষিত করার মধ্য দিয়েই জীব কোষ বেঁচে থাকে। তিন থেকে পাঁচ মিনিট ওই অক্সিজেন না পেলে জীবকোষ মরে যায়। আর মানব শরীর যেহেতু অসংখ্য জীবকোষেরই সমষ্টি, তাই বিপুল সংখ্যায় জীবকোষ মরে গেলে মানুষও মারা যায়। এ জন্যই আমরা প্রতি পলে পলে শ্বাসের মাধ্যমে অক্সিজেন গ্রহণ করি এবং প্রশ্বাসের সঙ্গে কার্বন-ডাই-অক্সাইড দেহ থেকে বের করে দেই। ঘুমিয়ে থাকলেও এই প্রক্রিয়া বন্ধ হয় না, চলতেই থাকে।
ঘটনা হল, আমরা শ্বাসের মাধ্যমে যে অক্সিজেন গ্রহণ করি, সেটা যায় আমাদের ফুসফুসের (Lung)মধ্যে। কিন্তু এই অক্সিজেনকে তো পৌছিয়ে দিতে হবে দেহের প্রত্যেকটি কোনায় কোনায়, প্রতিটি কোষে কোষে – সেটা কি করে হবে ? ফুসফুস থেকে জীবকোষ অব্দি এই অক্সিজেন বয়ে নিয়ে যাওয়া, এবং জীবকোষ থেকে বর্জ্য কার্বন-ডাই-অক্সাইড ফুসফুসে ফিরিয়ে নিয়ে আসার কাজটি করে আমাদের রক্ত। রক্তের দুটো প্রধান উপাদান ; রক্তকোষ (Blood Cell) এবং রক্তরস (Plasma)। কোষ গুলি আবার মুখ্যত তিন প্রকার; লোহিত কণিকা (RBC), শ্বেত কণিকা (WBC) এবং অনুচক্রিকা (Platelet)। আমরা যা কিছু খাই, ভাত বা রুটি, আমিষ বা নিরামিষ, তা থেকেই আমাদের দেহযন্ত্র এক জটিল প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় রক্ত তৈরি করে নেয়। রক্ত তৈরির এই প্রক্রিয়া প্রতি নিয়তই চলতে থাকে। দেহের বিভিন্ন অংশে উৎপাদিত হয়ে কোষ গুলি এবং প্লাজমা অহরহ দেহের মূল রক্তস্রোতে মিশে চলেছে।
আমাদের দেহে অবস্থিত দুই শতাধিক হাড়ের মধ্যে কিছু আছে ফাঁপা (Hollow)। সেই ফাঁপা হাড়ের মধ্যে যে মজ্জা থাকে, লোহিত কণিকা (RBC) তৈরি হয় সেখানেই। কম বেশি ১২০ দিনের মত আমাদের দেহের মধ্যে বেঁচে থেকে তারা তাদের দায়িত্ব পালন করে। তারপর মরে গিয়ে পায়খানা ও প্রস্রাবের মধ্য দিয়ে বেরিয়ে যায়। লোহিত কণিকার কেন্দ্রীয় উপাদান হল লোহা। চিকিৎসা বিজ্ঞানের পরিভাষায় হিমোগ্লোবিন। অক্সিজেন ও কার্বন-ডাই-অক্সাইড পরিবহণের কাজটা এরাই করে। নির্দিষ্ট পরিমাণের চেয়ে কমে গেলে রক্তাল্পতা (Anemia) দেখা দেয়, অল্প পরিশ্রমেই হাঁফ ধরে। এক ফোঁটা রক্তে আট লক্ষের মত লোহিত কণিকা থাকে। শ্বেত কণিকা চার-পাঁচ রকমের হয়। যদিও এদের শ্বেত কণিকা বলা হয়, আসলে এগুলো রংহীন। এদের কিছু জন্মায় যকৃতে (Liver) আর কিছু মজ্জাতে। এদের আয়ুষ্কাল ছয় থেকে আট ঘণ্টা। তারপর মরে যায়। একাংশ রি-সাইকেল পদ্ধতিতে আবার জন্ম নেয়, আর বাকি গুলো দেহ থেকে বেরিয়ে যায়। প্রতি ফোঁটা রক্তে এদের সংখ্যা ছয় থেকে আট হাজার। শ্বেত কণিকারা আসলে মানব দেহের বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স। বহিঃশত্রুর (রোগজীবাণু) আক্রমণ হলে এরাই প্রথম তাদের বাধা দেয়, প্রতি-আক্রমণ করে রোগ জীবাণুদের মেরে ফেলে, অথবা নিজেরা মরে যায়। পুঁজ বস্তুটি হচ্ছে লক্ষ লক্ষ মৃত শ্বেত কণিকার দেহাবশেষ। যে কোন কাটা-ছেঁড়ায় সংক্রমণ (Infection) প্রতিরোধ করে। উল্লেখ করা দরকার যে, আভ্যন্তরীণ সংক্রমণের সময়, আমাদের দেহযন্ত্র শ্বেত কণিকার উৎপাদন কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে। রক্তে শ্বেত কণিকার সংখ্যা বৃদ্ধি হলে নিশ্চিত বলে দেওয়া যায় যে, কোন না কোন রোগ জীবাণু দেহে প্রবেশ করেছে। রোগ নিরাময় হয়ে গেলে নিজে থেকেই তাদের সংখ্যা আবার স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরে আসে। শত্রু যদি বেশি শক্তিশালী হয়, তা হলে যেমন ব্যারাক থেকে সামরিক বাহিনী তলব করা হয়, তেমনি শ্বেত কণিকারা রোগ প্রতিরোধে ব্যর্থ হলে, তবেই আমাদের ওষুধের শরণাপন্ন হতে হয়। অণুচক্রিকাও (Platelet) বর্ণহীন একপ্রকার রক্তকোষ, যা যকৃৎ, প্লীহা (Spleen) প্রভৃতি জায়গায় জন্ম নিয়ে রক্তস্রোতে মিশে যায়। বাঁচে মাত্র কয়েক ঘণ্টা। এরা আঠালো। দেহের কোনও জায়গায় কেটে বা ছড়ে গিয়ে রক্তপাত হলে এরা লাখে লাখে ছুটে গিয়ে সেই জায়গায় একটা আঠালো প্রলেপ তৈরি করে রক্তপাত বন্ধ হতে সাহায্য করে। রক্তকোষ গুলির জন্ম এবং মৃত্যু এক ধারাবাহিক ঘটনা, একদিকে নতুন কোষ জন্মাচ্ছে, অন্যদিকে পুরানোরা মরে যাচ্ছে। আমরা প্রতিদিন যে জল খাই, সেই জল থেকেই এক বিশেষ দৈহিক প্রক্রিয়ায় তৈরি হয় রক্তরস বা প্লাজমা। লোহিত কণিকা, শ্বেত কণিকা ও অণুচক্রিকারা এই রক্ত রসে ভেসে ভেসে হৃদপিণ্ডের দ্বারা তাড়িত হয়ে সারা দেহে ছুটে বেড়ায় এবং নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করে। রক্তকোষ গুলি ছাড়াও কিছু কিছু রাসায়নিক লবণ (Chemical salt), প্রোটিন পদার্থ ইত্যাদি প্লাজমার মধ্যে দ্রবীভূত অবস্থায় থাকে।
হৃদপিণ্ড হচ্ছে একটি স্বয়ংচালিত (Automatic) পাম্প, যা আমৃত্যু অনবরত সঙ্কুচিত ও প্রসারিত হয়ে চলেছে। এই সংকোচন ও প্রসারণের মাধ্যমেই সে আমাদের রক্তকে সারা দেহে ছুটিয়ে বেড়াচ্ছে। ফুসফুস থেকে অক্সিজেন-সমৃদ্ধ রক্ত যখন আমাদের হৃদপিণ্ডে আসে, তখন সে সেগুলোকে ধমনির (Artery) মাধ্যমে সারা শরীরে পাঠিয়ে দেয়। রক্ত তখন অক্সিজেন বিলি করতে করতে আর পাশাপাশি কার্বন-ডাই-অক্সাইড সংগ্রহ করতে করতে ছুটে যায় দেহের দূর প্রান্ত পর্যন্ত। তারপর কার্বন-ডাই-অক্সাইড সমৃদ্ধ রক্ত শিরার (Vein) মাধ্যমে ফিরে আসে হৃদপিণ্ডে। এবার হৃদপিণ্ড তাদের ফুসফুসে পাঠায় প্রশ্বাসের মাধ্যমে কার্বন-ডাই-অক্সাইড বের করে দিয়ে অক্সিজেন সমৃদ্ধ হয়ে ফিরে আসতে। এভাবেই রক্ত তার দেহ-পরিক্রমার বৃত্ত পূর্ণ করে। এই প্রক্রিয়া বন্ধ হওয়া মানেই মৃত্যু। রক্ত যখন হৃদপিণ্ড থেকে বেরিয়ে ধমনির ভিতর দিয়ে ছুটে যায়, তখন সে ধমনির দেওয়ালে একটা চাপ সৃষ্টি করে। একই ভাবে সে যখন শিরার ভিতর দিয়ে হৃদপিণ্ডের দিকে ফিরে আসে, তখনও শিরার দেওয়ালে চাপ সৃষ্টি হয়। এটাকেই রক্তচাপ বলে। যাওয়ার সময় চাপ বেশি থাকে, তাকে বলা হয় সিস্টোলিক; আর ফেরত আসার সময়ের তুলনামূলক কম চাপ থাকে, তাকে বলে ডায়াস্টোলিক। রক্তচাপ মেপে কেউ যখন বলেন, ১২০ বাই ৮০, তখন বুঝতে হবে ১২০ হচ্ছে সিস্টোলিক আর ৮০ হচ্ছে ডায়াস্টোলিক। এটাই একজন সুস্থ মানুষের স্বাভাবিক রক্তচাপ।
দেহে কতটা রক্ত থাকবে বা আছে, তা নির্ভর করে ওই ব্যক্তির দৈহিক ওজনের উপর। চিকিৎসা বিজ্ঞান দেখেছে, প্রত্যেক নীরোগ পুরুষ-দেহে রক্ত থাকে প্রতি কেজি ওজনে ৭০ থেকে ৭৬ মিলিলিটার। মহিলাদের দেহে সেই পরিমাণটি হল ৬৬ থেকে ৭০ মিলিলিটার। অথচ ভীষণ পরিশ্রমের কাজ করতে হলেও নারী-পুরুষ নির্বিশেষে আমাদের দরকার প্রতি কেজিতে মাত্র ৫০ মিলিলিটার রক্ত। সাধারণ পরিশ্রমে এরচেয়ে সামান্য একটু কম হলেও চলে। তা হলে দেখা যাচ্ছে, আমাদের প্রত্যেকের দেহেই প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত (Surplus) রক্ত মজুত থাকে। ন্যূনতম হিসাব ধরলেও ৫০ কেজি ওজনের একজন পুরুষ মানুষের দেহে রক্ত থাকে (৫০x ৭০) = ৩৫০০ মিলিলিটার, মানে সাড়ে তিন লিটার, আর তার প্রয়োজন হল (৫০x ৫০) = ২৫০০ মিলিলিটার বা আড়াই লিটার। ৭০ এর জায়গায় ৭৬ ধরলে অতিরিক্ত রক্তের পরিমাণ হবে ১৩০০ মিলিলিটার। আরও বেশি ওজনের নর-নারীর দেহে রক্ত থাকবে আরও বেশি। সাধারণ ভাবে একজন মানুষের দেহে যে রক্ত থাকে, তাতে তার প্রয়োজন মিটিয়েও অতিরিক্ত রক্ত থাকেই। কিন্তু কোন দুর্ঘটনা, অস্ত্রোপচার, দীর্ঘদিন ধরে রোগে ভোগা, আগুনে পোড়া, ক্যান্সার রোগীদের ক্ষেত্রে কেমোথেরাপি বা ‘রে’ (Ray) দেওয়ার ফলে বেশি পরিমাণে রক্তকোষ নষ্ট হয়ে যাওয়া, মাতৃত্ব-কালীন পুষ্টি-হীনতা ইত্যাদি বিভিন্ন কারণে অনেক সময় একজন মানুষের দেহে বাইরে থেকে রক্ত দেওয়ার প্রয়োজন হয়ে পড়ে। তা ছাড়া থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশুদের তো অন্যের রক্ত গ্রহণের মধ্য দিয়েই বেঁচে থাকতে হয়। তখনই দরকার হয় রক্তদানের। কেননা, বহু বছর ধরে দিনরাত গবেষণা চালিয়েও বিজ্ঞানীরা আজ অবধি রক্তের কোন বিকল্প আবিষ্কার করতে পারেন নি। কোন কারখানা বা শস্যক্ষেতেও রক্ত উৎপাদিত হয়না। রক্ত তৈরির একমাত্র কারখানা হল এই মানব দেহ। ফলে কোনও রোগীর চিকিৎসা ও বেঁচে থাকার জন্য রক্তের দরকার হলে, কোন নীরোগ, হৃদয়বান, মানবিক গুণের অধিকারী মানুষকেই এগিয়ে এসে নিজ দেহ থেকে রক্ত দিতে হয়। তাঁর দেহে সঞ্চিত অতিরিক্ত রক্ত থেকেই তিনি রক্তদান করেন। সঞ্চিত অতিরিক্ত রক্ত থেকে আমরা যদি ৩০০-৩৫০ মিলিলিটার রক্ত দান করে দেই, তাহলেও আমাদের কোন অসুবিধাই হওয়ার কথা নয়। এছাড়া ওই রোগীকে বাঁচানোর বা রক্ত সংগ্রহের আর অন্য কোন উপায় নেই। অন্যের ক্ষেত্রে আমরা রক্তদানের গুরুত্বটি সঠিক ভাবে উপলব্ধি করতে পারিনা। কিন্তু এ রকম একটা দৃশ্য ভেবে দেখুন তো, আপনার মা, বাবা, স্ত্রী, পুত্র, কন্যা বা আপনি নিজে অসুস্থ হয়ে তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে চলেছেন, অথচ হাজার হাজার মানুষ তাদের দেহে প্রয়োজনের অতিরিক্ত রক্ত বয়ে নিয়ে বেড়ালেও শুধুমাত্র অজ্ঞতাজনিত ভয় ও কু-সংস্কারে আচ্ছন্ন হয়ে রক্ত দিতে রাজী হচ্ছেন না। ব্যাপারটা কত মর্মান্তিক ! কতটা অমানবিক ! ঘটনা তো এমনও হতে পারে; আপনি গাড়িতে চেপে দূরে কোথাও যাচ্ছিলেন, পথে গাড়িটি দুর্ঘটনাগ্রস্ত হয়ে সাঙ্ঘাতিক আহত এবং অচেতন অবস্থায় অকুস্থল থেকে আপনাকে কেউ হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে দিয়েছেন। প্রচুর রক্তপাত হওয়ায় আপনার জীবন রক্ষার জন্য এক্ষুণি আপনাকে রক্ত দিতে হবে। হাসপাতালের ব্লাড ব্যাঙ্কে কোন রক্ত নেই (কারণ লোকে রক্ত দিতে ভয় পায় বলে ব্লাড ব্যাঙ্কের ভাঁড়ার শূন্য)। আপনার বন্ধু-বান্ধব,আত্মীয় স্বজনেরা এখনও আপনার দুর্ঘটনার খবরই পাননি। এ রকম অবস্থায় ঘটনা কোন দিকে গড়াতে পারে ? এমন ঘটে যাওয়া অসম্ভব তো নয় ? কাজেই, শুধু অন্যের জীবন রক্ষার জন্য নয়, নিজেরও অনাগত বিপদের মোকাবিলা করার জন্যও নিজে নিয়মিত রক্তদান করা এবং অন্যদেরও সচেতন করে রক্তদান করতে উৎসাহিত করা আমাদের অন্যতম কর্তব্য।
রক্তদানে নিজের কোন ক্ষতিই হচ্ছেনা। দান করা রক্ত পূরণ হওয়ার জন্য ভাল ভাল খাবারের ও প্রয়োজন নেই। সাধারণ ডাল-ভাত-রুটি সবজিই যথেষ্ট। তা ছাড়া, ওই প্রতি কেজিতে ৭৬ মিলিলিটারের চেয়ে বেশি রক্ত শরীরে জমেও থাকে না। দান না করলেও নিজে থেকেই নষ্ট হয়ে যায়। আবার দান করে দিলে নিজে থেকেই তৈরিও হয়ে যায়। যে গাই প্রতিদিন আধ-সের দুধ দেয়, সাত দিন না দোয়ালে সে কি পরের দিন সাড়ে তিন লিটার দুধ দেবে ? না, তা হয়না। তেমনি, দান করে দিলে আবার রক্ত তৈরি হবে, না করলে জমে জমে দেহের মধ্যে রক্তের বিশাল ভাণ্ডার গড়ে উঠবে না। তা হলে রক্তদান করতে দ্বিধা/সঙ্কোচ কেন ? মনে রাখবেন, আপনার দান করা রক্ত শুধু একজন মানুষের প্রাণ রক্ষাই করেনা, একটি পরিবারকে ধ্বংসের হাত থেকেও রক্ষা করে। রক্ত না পেয়ে কোন পরিবারের একমাত্র রোজগেরে সদস্যটি মারা গেলে হয়তো তার বৃদ্ধ মা বাবার আর কোনদিন ওষুধ খাওয়া হবেনা, ছোট বোনটির আর বিয়ে হবেনা, ছেলে মেয়ে গুলোকে লেখাপড়া ছেড়ে দিয়ে পেটের ধান্দায় পথে পথে ঘুরতে হবে, হয়তো পা পিছলে অসামাজিক কাজকর্মে যুক্ত হয়ে যাবে। সংসারের খাইখরচ মেটাতে গিয়ে হয়তো তার স্ত্রীকে মানুষের বাড়িতে বাসন-মাজা-র কাজ নিতে হবে। হয়তো আরও নিকৃষ্ট কোন পথে পা বাড়াতে বাধ্য হতে পারে। মহান মানবিকতায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আপনার দান করা রক্ত সেই সমস্ত অপ-সম্ভাবনাকে প্রতিহত করবে।
অন্যদিকে, রক্তদানে শুধুমাত্র গ্রহীতাই উপকৃত হন না, দাতা নিজেও বিভিন্ন ভাবে লাভবান হন। জন্ডিস, ম্যালেরিয়া, যৌনরোগ, এইচ আই ভি প্রভৃতি হন্তারক রোগজীবাণু নিজের অজান্তেই আপনার শরীরে বাসা বেঁধেছে কি না, রক্তদান করলে সে সবের পরীক্ষা হয়ে যায় বিনা খরচে। পরীক্ষার ফলাফল চূড়ান্ত গোপনীয়। কোন রোগ জীবাণু ধরা পড়লে শুধুমাত্র আপনাকেই এ বিষয়ে জানানো হবে এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসার পরামর্শ দেওয়া হবে। ওই পরীক্ষা গুলো কোনও ল্যাবরেটরিতে করাতে হলে বর্তমান বাজার দরে আপনাকে খরচ করতে হবে প্রায় ১৭০০ টাকা। রক্তদান করলে আপনি সহজেই আপনার রক্তের গ্রুপ জেনে নিতে পারবেন। আপনার গ্রুপ সংবলিত একটি সরকারি কার্ড আপনাকে দেওয়া হবে, যা সারা পৃথিবীতে আপনার রক্তের গ্রুপের নিশ্চিত প্রমাণপত্র হিসেবে স্বীকৃত হবে। রক্তের গ্রুপ জেনে রাখা আধুনিক জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এক অত্যন্ত জরুরি বিষয়। রক্তদানের পর দেহে যে নতুন রক্তকণিকা জন্মায়, তা দাতার শরীরকে সতেজ, চনমনে আর কর্মচঞ্চল করে তোলে। আমাদের দেহ প্রতিদিন প্রায় ৪০০ মিলিলিটার রক্ত তৈরি করতে সক্ষম। কিন্তু যেহেতু স্বাভাবিক অবস্থায় আমাদের দেহ থেকে দৈনিক মাত্র ৫০ মিলিলিটারের মত রক্ত নষ্ট হয়, তাই সেই পরিমাণ রক্ত তৈরি করার পর আমাদের রক্ত তৈরির প্রক্রিয়া (Mechanism) স্তব্ধ হয়ে থাকতে বাধ্য হয়। স্তব্ধ হয়ে থাকতে থাকতে তার কর্মক্ষমতা কমে যায়। নিয়মিত রক্তদান করলে সেই মেকানিজম ঘন ঘন কাজ করার সুযোগ পায়। ফলে, ওই ব্যক্তির ছোট খাটো অপারেশনেও রক্ত গ্রহণের প্রয়োজন হয়না। নিয়মিত রক্তদাতাদের কখনো এনিমিয়া হয়েছে বলে শোনা যায়না। পাশাপাশি, নিয়মিত রক্তদান করলে হার্ট অ্যাটাক এবং রক্তচাপের সম্ভাবনা ২০ শতাংশ কমে যায়। নিয়মিত রক্তদাতাদের সরকারি তরফে একটি ‘ডোনার কার্ড’ দেওয়া হয়। সেই কার্ডের বিনিময়ে এক বছরের মধ্যে দাতা নিজে বা তার পরিবারের সদস্যরা এক বোতল রক্ত বিনা পরিবর্তে পেতে পারেন। কিন্তু এইসব বৈষয়িক লাভের চেয়ে অনেক বড় লাভ হল, একজন মানুষের প্রাণ রক্ষা করতে পারার অসাধারণ মানসিক তৃপ্তি। ‘আমি ডাক্তার নই, কোন মহাপুরুষও নই, কিন্তু আমার রক্তে একজন মানুষের প্রাণ আজ রক্ষা পেয়েছে’—এই স্বর্গীয় অনুভূতিতে রক্তদাতার মন-প্রাণ এক অবর্ণনীয় প্রশান্তিতে ভরে ওঠে।
খাদ্য সঙ্কটের সময় মানুষ যখন চারিদিকে খাদ্যের জন্য হাহাকার করছে, কালোবাজারিরা যদি তখন লুকিয়ে গুদামে খাদ্য মজুত করে রেখে দেয়, আধুনিক সভ্য সমাজ তখন সেটাকে অমানবিক, বে-আইনি আখ্যা দেয়। তেমনি, হাসপাতাল গুলিতে রোগীরা যখন রক্তের অভাবে ধুঁকছে, মারা যাচ্ছে, তখন আমরা আমাদের শরীরে অপ্রয়োজনীয় অতিরিক্ত রক্ত মিছিমিছি বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছি – রক্তদান করছিনা, এটাও কি মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে অপরাধ নয় ?
অনেকেই বলেন, অপরিচিত যাকে তাকে আমি রক্ত দিতে যাব কেন? বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন, পরিচিত বা আমার পাড়ার কেউ হলে বলবেন, আমি নিশ্চয় রক্ত দেবো। রক্তদানের মৌলিক সংহিতা বলে, রক্তদাতা এবং রক্ত গ্রহীতার মধ্যে পরিচয় থাকতে নেই। কেন ? কারণ, এর দুটো খারাপ সম্ভাবনা আছে। সমস্ত অগ্রগতির পরেও রক্ত বিজ্ঞান আজ পর্যন্ত এমন কোন পরীক্ষা পদ্ধতি আবিষ্কার করতে পারেনি, যে পদ্ধতিতে পরীক্ষার পর রক্তকে ১০০ শতাংশ বিপন্মুক্ত বলে ঘোষণা করা যায়। ‘জিরো রিস্ক ব্লাড’ আজও মানুষের জ্ঞানের অধরা। আপনি হয়তো জানেন না, আপনার শরীরে দাদ বা এক্জিমার মত কোন একটা চর্মরোগের জীবাণু প্রবেশ করেছে। এখনো আপনার শরীরে তার প্রকাশ ঘটেনি, কিন্তু রক্তে তার উপস্থিতি রয়েছে। পরীক্ষায় তা কোন কারণে ধরা পড়ল না। আপনার রক্ত পেয়ে পরিচিত সেই রোগী হয়তো সুস্থ হয়ে উঠলেন, কিন্তু তার একজিমা দেখা দিল। অনুসন্ধান করে বুঝতে পারলেন, যে আপনার দেওয়া রক্ত থেকেই ওই নতুন রোগের শিকার হয়েছেন তিনি। মনে মনে কি তিনি বলবেন না, ‘দূর ছাই, ওই অমুকের কাছ থেকে রক্ত নেওয়ায় আজ এই বিচ্ছিরি রোগে ভুগতে হচ্ছে।’ আবার উল্টোটাও হতে পারে। যে বন্ধুকে আজ রক্ত দিয়ে বাঁচালেন, বছর-দেড় বছর পর একদিন হয়তো কথায় কথায় তার সঙ্গে কোন বিষয়ে আপনার তর্ক বেঁধে গেল। বন্ধুটি রাগের মাথায় আপনাকে কিছু একটা খারাপ কথা বলেই ফেললেন। তখন আপনার মুখ দিয়ে না হোক মন থেকে এই কথা বেরিয়ে আসতেই পারে—ও’ ঠিকই আছে, একদিন তোকে রক্ত দিয়ে বাঁচিয়েছিলাম বলেই আজ এমন কথা বলতে পারলি, রক্ত না দিলে তো এই কথা বলার জন্য বেঁচেই থাকতিস না। অনাকাঙ্ক্ষিত এমন পরিস্থিতিগুলো এড়ানো উচিৎ, তাই পরিচিতদের মধ্যে রক্ত বিনিময় না হওয়াই বাঞ্ছনীয়। আর ঘনিষ্ঠ আত্মীয় – ইংরাজিতে যাকে বলে ‘ফার্স্ট ডিগ্রি রিলেটিভ’—মা, বাবা, ছেলে-মেয়ে, সহোদর বা জেঠতুতো-খুড়তুতো ভাই-বোন– এদের মধ্যে তো কখনোই নয়। অত্যাধুনিক গবেষণায় দেখা গেছে, একই জেনেটিক রক্ত যাদের শরীরে বহমান, তাদের একজনের রক্তের ক্রোমোজোম অন্যের রক্তের ক্রোমোজোমকে ভীষণ ভাবে প্রত্যাখ্যান করতে পারে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই একে অন্যকে মেনে নেয়, কিন্তু কখনো কখনো মারাত্মক ভাবে একে অন্যের সাথে বিক্রিয়া করে। যদিও খুব কম ক্ষেত্রেই এমন ঘটনা ঘটে, কিন্তু ঘটে গেলে আর কোনভাবেই রোগীকে বাঁচানো যায়না। কয়েক মিনিটের মধ্যেই তার মৃত্যু হয়। কে বলতে পারে, ওই মারাত্মক ঘটনা আপনার প্রিয় রোগীর ক্ষেত্রেই ঘটতে চলেছে কি না! চিকিৎসা শাস্ত্রের পরিভাষায় এর নাম “গ্রাফট্ ভার্সাস্ হোস্ট ডিজিজ”। রক্ত না পেলেও হয়তো তাকে বাঁচানো যেত, কিন্তু ‘ফার্স্ট ডিগ্রি রিলেটিভ’-এর রক্ত গ্রহণ করায় মৃত্যুই তার একমাত্র ভবিতব্য হয়ে দাঁড়ালো। কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্টেশনের সময়ও এমন ঘটনা ঘটতে দেখা যায়। পরিচিত মানুষ বা আত্মীয়স্বজনদের যারা রক্ত দিতে চান, এদিকটা ভেবে দেখতে তাদের অনুরোধ জানাই।
আরেকটি ভয়াবহ সম্ভাবনা আছে। আমাদের চারপাশের সমাজ আজ অভাবনীয় ভাবে পালটে গেছে, এবং আরও পাল্টাচ্ছে। যৌথ পরিবার ভেঙে অণু পরিবার তৈরি হচ্ছে। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আগের মত মূল্যবোধের বন্ধন এখন আর নেই। আমরা বা আমাদের সন্তানেরা কে কোথায় যাচ্ছি, কি করছি, সব খবর সব সময় রাখা সম্ভব হচ্ছেনা। অনেকেই হয়তো জ্ঞানে কিংবা অজ্ঞানে জীবনে এমন অস্বাস্থ্যকর ঘটনা ঘটিয়েছি, যাতে এখন মনে ভয় আছে- আমি নিজেই হয়তো খারাপ কোন একটা সংক্রমণ বাঁধিয়ে বসে আছি। লজ্জায় কাউকে কিছু বলতে পারছিনা। এ রকম অবস্থায়, যখন আমার মা, বাবা, ভাই, বোনের জন্য রক্ত দেওয়ার প্রস্তাব আসবে, তখন একদিকে চিন্তা, না দিলে লোকে বলবে, ‘ছেলেটা নিজের মা-কে বাঁচানোর জন্যও রক্ত দিতে রাজী হচ্ছেনা’ অন্যদিকে ভয়, অজানা সংক্রমণে আমার যা হবে হোক, দেখা যাবে, কিন্তু মা-কে কেন ওই রোগে সংক্রমিত করতে যাবো। পরিস্থিতির চাপে তখন ওই ব্যক্তির আত্মহত্যাকেই সবচেয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত বলে মনে হতে পারে। একজন স্বেচ্ছা রক্তদাতার সামনে এরকম কোন সংকট নেই। নিজের জীবনযাত্রা প্রসূত এ ধরণের কোন সংশয় থাকলে যে কোন অজুহাত দেখিয়ে তিনি রক্তদান এড়িয়ে যেতে পারবেন।
এর পরেও প্রশ্ন থেকে যায়, পয়সা দিয়ে যদি রক্ত কিনতে পাওয়া যায়, তবে কেন আমি আমার শরীর থেকে রক্তদান করতে যাবো ? আসলে, রক্ত বিক্রয় এবং ক্রয়—দুটোই আইনি অপরাধ। ধরা পড়লে, বিক্রেতার পাশাপাশি ক্রেতাকেও শাস্তি ভোগ করতে হয়। নেহাত বিপদে পড়ে কিনতে বাধ্য হয়েছেন বলে আইনের শাস্তির হাত থেকে রেহাই পাওয়া যায়না। তাছাড়া পয়সার বিনিময়ে যারা রক্ত বিক্রি করে, তাদের রক্তের গুণমান অত্যন্ত নিম্নমানের। পয়সার লোভে তারা ঘনঘন রক্ত বিক্রি করে। ও রকম তিন বোতল রক্তও স্বেচ্ছা রক্তদাতার এক বোতল রক্তের সমকক্ষ নয়। টক্ দই-এর মালিক যেমন নিজের দই টক বলে কখনো বলেনা, তেমনি রক্ত বিক্রেতা কখনোই নিজের অসুখ বিসুখের কথা প্রকাশ করে না। কারণ, উভয় ক্ষেত্রেই ক্রেতার স্বাদ বা স্বাস্থ্য তাদের চিন্তার বিষয় নয়, তাদের লক্ষ্য ক্রেতার পকেট। আরেকটা বিষয়, সংসার চালানোর জন্য বা উদরপূর্তির জন্য কোন ব্যক্তিকে রক্ত বিক্রয় করতে দেখা যায়না, ও’সব ‘সাহেব’ মার্কা বাংলা সিনেমার গল্প। শতকরা একশো-জন রক্ত বিক্রেতাই রক্ত বিক্রি করে নেশার পয়সা সংগ্রহের জন্য। সেই নেশার ঘোরে রেড লাইট এরিয়ায় যাতায়াতও অসম্ভব নয়। আর কে না জানে, ওই সব এলাকা হচ্ছে এইচ আই ভাইরাসের (HIV) কারখানা। তাদের কাছ থেকে সংগৃহীত রক্তেরও পরীক্ষা নিরীক্ষা অবশ্যই হয়, কিন্তু আগেই বলা হয়েছে, সমস্ত আধুনিকতম পরীক্ষার পরও রক্তের ১০০ শতাংশ নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়না। তা হলে কেন পয়সা খরচ করে জেনেশুনে নিজের প্রিয় মানুষটির জন্য মৃত্যু কিনে আনা ? মানুষ তো শত্রুর সঙ্গে এমন ব্যবহার করে, আমরা কেন আমাদের আপনজনদের জন্য এমন জঘন্য কাজ করবো ? বিক্রেতার রক্ততো নয়ই, পরিচিত ব্যক্তি বা আত্মীয়ের রক্তও নয়, মানবিক মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে একজন অদেখা, অপরিচিত মানুষের প্রাণ বাঁচানোর উচ্চ মানসিকতায় যিনি স্বেচ্ছায় রক্তদান করেন, তার রক্তই পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ সেরা রক্ত।
তা হলে কি সবাই রক্তদান করতে পারে ? রক্তদাতার যোগ্যতা নির্ধারণের তিনটি প্রাথমিক শর্ত আছে ; বয়স, দৈহিক ওজন এবং রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা।
ক) রক্তদাতার বয়স ১৮ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে হতে হবে। তার কম বা বেশি নয়।
খ) তার দেহের ওজন হতে হবে ৪৫ কেজি বা তার চেয়ে বেশি। কিন্তু কম হলে চলবে না।
গ) ইচ্ছুক দাতার রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা কমপক্ষেও ১২.৫ গ্রাম শতাংশ (এক ডেসিলিটার রক্তে থাকা হিমোগ্লোবিনের ওজন) হতে হবে।

আরও পড়ুনঃ   যা খেলে হিমোগ্লোবিন বাড়বে

  লিখেছেনঃ  বন্ধন সুরমা

LEAVE A REPLY