রিউমাটিক ফিভার(বাতজ্বর)

0
191
বাতজ্বর

বাতজ্বর (RHEUMATIC FEVER)

পেশাগত জীবনে যে সমস্ত বাত রোগে সবচে বেশী “ভুল” দেখতে পেয়েছি তা হল রিউমাটিক ফিভার বা বাতজ্বর নিয়ে। আশা করি রিউমাটোলজিস্ট বা বাত রোগ বিশেষজ্ঞরা আমার সাথে এক মত হবেন।আমাদের দেশে এই ভুল কোথা থেকে এল তা চিন্তার বিষয়। রিউমাটিক ফিভার হার্ট ভাল্ব রোগের অন্যতম কারন,বিশেষ করে অল্প বয়সে। রিউমাটিক বা বাত , গিঠ ফোলা, ব্যাথা ইত্যাদির সাথে জ্বর থাকলেই বাতজ্বর এমন ধারনা অস্বাভাবিক ও নয়।হয়ত তারই ধারাবাহিকতায় আজ ও এই ভুল। রিউমাটিক ফিভার বা বাতজ্বর হল এক প্রকার প্রদাহজনিত রোগ যা স্ট্রেপ্টোকক্কাস(streptococcus beta hemolyticus) নামক এক প্রকার ব্যাক্টেরিয়ার সংক্রমনের পর হয়ে থাকে।

কারনঃ- সারা পৃথিবীতেই বাতজ্বর দেখা যায়। তবে উন্নত বিশ্বে প্রাদুর্ভাব নেই বললেই চলে।বাংলাদেশেও অনেক কমে গেছে এই রোগ। এন্টিবায়োটিক ঔষধের সহজ লভ্যতা, স্বাস্থ্যগত উন্নতি, উন্নত পয়ঃনিস্কাসন, বাসস্থান বিশুদ্ধ পানি ইত্যাদি রোগটির প্রাদুর্ভাব কমার কারন।

এটা বাচ্চাদের রোগ । শতকরা ৯০ ভাগের ও বেশী রোগীর বয়স ৫ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে।

স্ট্রেপ্টোকক্কাস ব্যাক্টেরিয়ার সংক্রমনের কারনে গলাব্যাথা, টনসিলাইটিস, স্কারলেট ফিভার(scarlet Fever) ইত্যাদি হয়ে থাকে। তার প্রায় ৩ সপ্তাহ পর এই রোগের লক্ষন দেখা দেয়।

যে সমস্ত অঙ্গ প্রত্যঙ্গ বাতজ্বরে আক্রান্ত হয়ে থাকেঃ- হৃৎপিন্ড, গিঠ, চামড়া, মস্তিস্ক ইত্যাদি।

উপসর্গ:-

• জ্বর
• পেটে ব্যাথা,
• গলা ব্যথা , বুকে ব্যথা্,শ্বাস কষ্ট,বুক ধড়ফড়, ইত্যাদি।
• গিঠে ব্যাথা, গিঠ লাল হয়ে,গরম হয়ে ফুলে ওঠা। প্রধান গিঠঃ হাটু কনুই, গোড়ালি, কবজি ।গিঠ ফোলার বৈশিষ্ঠ হল যে একাধিক গিঠ আক্রান্ত হয় এবং একটা গিঠ ফোলা উন্নতি হয় তো আরেকটা গিঠ আক্রান্ত হয় যাকে বলে মাইগ্রেটরি পলি আরথ্রাইটিস(Migratory polyarthritis)।
• বুক পিঠ বাহু বা পায়ের চামড়ার উপর গোটা(Rheumatic nodule ), বা দাগ(Erythema marginatum) দেখা যেতে পারে।
• খিচুনি, হঠাৎ হটাৎ হাত মুখ বা পায়ের অনিচ্ছাকৃত ঝাকুনি ইত্যাদি(Sydenham Chorea)।

লক্ষনঃ-
ভিন্ন ভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গ আক্রমনের কারনে নানা ভাবে রোগটি দেখা যায়। কোন ক্ষেত্রে গিঠের সমস্যা , কোন ক্ষেত্রে গলা ব্যাথা বুক ব্যাথা বা হার্টের সমস্যা।

পরীক্ষাঃ-
• এ এস ও টাইটারঃ(ASO Titre)- রক্তের এই পরীক্ষা দিয়ে স্ট্রেপ্টোকক্কাস ব্যাক্টেরিয়ার সংক্রমন বোঝা যায়।টাইটার বা পরিমান বেশী হলে তা সংক্রমনের ইঙ্গিত দেয়।এটি কখনই রিউমাটিক ফিভার বোঝায় না, শরীরের যে কোন স্থানে স্ট্রেপ্টোকক্কাস ব্যাক্টেরিয়ার সংক্রমন থেকে পরীক্ষাটি পজিটিভ হতে পার। শুধুমাত্র বেশী(ASO Titre) এর ভিত্তিতে রিউমাটিক ফিভার ডায়াগনোসিস একটা বড় ভুল।

• রক্তের রুটিন পরিক্ষাতে ই এস আর(High ESR) বেশী থাকে।
• ব্লাড কাউন্টে শ্বেত কনিকা (Raised WBC count)বেশী থাকে।
• ইলেক্ট্রোকার্ডিওগ্রাম(ECG) ইকোকার্ডিওগ্রাম(Echocardiogram)পরীক্ষা করে হৃৎপিন্ড আক্রান্ত হলে তা বোঝা যায়।

ডায়াগনোসিসঃ- সঠিক ভাবে ডায়াগনোসিসের জন্য কতগুলো মেজর এবং মাইনর ক্রাইটেরিয়া

মেজর ক্রাইটেরিয়া(Major criteria)
*অনেকগুলো গিঠের প্রদাহ এবং ফোলা বা আরথ্রাইটিস(Migratory Polyarthritis)
*হৃৎপিন্ডের প্রদাহ( Carditis)
*চামড়াতে গোটা(Rheumatic nodule)
* চামড়াতে দাগ(Erythema Marginatum)
* হাত পায়ের হটাৎ লাফ মারা বা খিচুনি((sydenham Chorea)

মাইনর ক্রাইটেরিয়াঃ-(Minor criteria)
o জ্বর(Fever)
o ইএস আর বেশি(Raised ESR)
o গিঠে ব্যাথা(arhtralgia)
o অনান্য প্ররীক্ষা

দুটো মেজর বা একটি মেজর এবং দুটি মাইনর ক্রাইটেরিয়ার সাথে যদি স্ট্রেপ্টোকক্কাস সংক্রমনের প্রমান( উচু এ এস ও টাইটার) থাকে তবে রিউমাটিক ফিভার ডায়াগনসিস করা হয়ে থাকে।

চিকিৎসাঃ-
এন্টিবায়টিকঃ- পেনিসিলিন(Penicillin) বা ইরাইথ্রোমাইসিন(Erythromycin) খুবই কার্যকর ঔষধ।

ব্যাথার ঔষধঃ-গীঠের ব্যাথার জন্য এস্পিরিন বা অন্য ব্যথার ঔষধ বা স্টেরয়েড জাতীয় ঔষধ ব্যবহার করা যেতে পারে।

স্বল্প মাত্রায় পেনিসিলিন(বেঞ্জাথিন পেনিসিলিন মাসে একটা ইঞ্জেকশান অথবা পেনিসিলিন ভি ট্যাবলেট ) বা ইরাইথ্রোমাইসিন ঔষধ দির্ঘদিন খাওয়ার দরকার পড়ে।৩ থেকে ৫ বছর ঔষধ খেতে হয় যাতে আবার স্ট্রেপ্টোকক্কাস সংক্রমন না হতে পারে।

জটিলতাঃ-

হৃৎপিন্ডের আক্রমন প্রধান সমস্যা। ভাল্বের রোগ মাইট্রাল স্টেনোসিস(Mitral Stenosis), এরিদমিয়া(Arythmia), এন্ডকার্ডাইটিস(EndoCarditis), হার্ট ফেলিও্(Heart Failure) পেরিকার্ডাইটিস(pericarditis), ইত্যাদি

মস্তিস্কের আক্রমনে;- খিচুনী , হাত পায়ের অনিচ্ছাকৃত লাফালাফি(Involuntary Movement) ইত্যাদি।

প্রতিরোধঃ দ্রুত এবং সঠিক চিকিৎসা করা জরুরী, পুনরায় সংক্রমনের হাত থেকে প্রতিরোধে দীর্ঘদিন এন্টিবায়টিক ঔষধ সেবন অপরিহার্য।

বীরেনদ্র 

LEAVE A REPLY