রোগ সারবে কি, হাসপাতাল নিজেই তো ব্যাকটেরিয়ার আঁতুড়ঘর!

0
32
রোগ, হাসপাতাল ,ব্যাকটেরিয়া

হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে দক্ষিণ কলকাতার এক নার্সিংহোমে ভর্তি হয়েছিলেন বেহালার প্রবাল সরকার। কুড়ি দিন তাঁকে আইসিইউ (ইন্টেনসিভ কেয়ার ইউনিট) তে থাকতে হয়। কিন্তু আইসিইউতে থাকাকালীনই তাঁর শ্বাসনালীতে দেখা দিল সংক্রমণ। সঙ্গে ধূম জর এবং শ্বাসকষ্ট। কড়া অ্যান্টিবায়োটিকেও কাজ হল না।

যকৃতের সমস্যা নিয়ে প্রায় পনেরো দিন কলকাতার এক সরকারি হাসপাতালের সিসিইউ (ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিট) তে ভর্তি আছেন মধ্যমগ্রামের শ্রাবণী পাল। মূল সমস্যা থেকে সেরে ওঠার মুখেই তাঁর মূত্রনালীতে সংক্রমণ দেখা দিল। দিন দিন বাড়তে থাকল সমস্যা। এ ক্ষেত্রেও কাজ হল না অ্যান্টিবায়োটিকে।

ল্যাবরেটরিতে কালচার করে দেখা গেল এই দু’টি ক্ষেত্রেই সংক্রমণের জন্য দায়ী একই ব্যাকটেরিয়া-‘ক্লেবসিয়েলা নিউমোনি’।

যা এই মুহূর্তে সারা দেশ জুড়েই চিকিত্‍সকদের মাথা ব্যথার অন্যতম কারণ। বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, ক্লেবসিয়েলা এমনই এক ব্যাকটেরিয়া যা প্রধানত হাসপাতালেই রোগীদের মধ্যে বেশি ছড়ায়। আর সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয়টি হল, যে কোনও অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে এর জুড়ি মেলা ভার। তাই ক্লেবসিয়েলা জনিত সংক্রমণ, যেমন শ্বাসনালী বা মূত্রনালীতে সংক্রমণ, নিউমোনিয়া কিংবা সেপ্টিসেমিয়ার ক্ষেত্রে রোগী মৃত্যুর হার অন্তত ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ। যা রীতিমতো উদ্বেগজনক বলেই মনে করছেন চিকিত্‍সকেরা।

কিন্তু কী ভাবে অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ তৈরি করে ব্যাকটেরিয়া?

সুরক্ষার ল্যাবরেটরির প্রধান ও ফর্টিসের সংক্রমণ প্রতিরোধ বিভাগের প্রধান ভাস্কর নারায়ণ চৌধুরী জানাচ্ছেন, ব্যাকটেরিয়া অত্যন্ত দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে। কুড়ি মিনিটের মধ্যে ব্যাকটেরিয়া একটি থেকে দু’টি হয়ে যায় এবং ছ’ ঘণ্টার মধ্যে সংখ্যাটা এক থেকে বেড়ে দাঁড়ায় দশ লক্ষে। অ্যান্টিবায়োটিক দিলে প্রাথমিক ভাবে এরা মরে যায়। কিন্তু অ্যান্টিবায়োটিক যেহেতু একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত কাজ করে তাই পরিমাণে কম হলে এর কার্যকারিতাও কমে যায়। আর সেই সুযোগেই জিন মিউটেশনের মাধ্যমে অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ তৈরি করে ব্যাকটেরিয়া।

একই মত নারায়ণা সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালের (হাওড়া) মাইক্রোবায়োলজিস্ট চিকিত্‍সক রাজশ্রী মুখোপাধ্যায়েরও। তাঁরা আরও জানাচ্ছেন, প্রাথমিক কিছু অ্যান্টিবায়োটিকের বিরূদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুললেও খুবই উন্নতমানের অ্যান্টিবায়োটিক (থার্ড জেনারেশন অ্যান্টিবায়োটিক) কার্বাপ্যানেমে কাবু হত ক্লেবসিয়েলা। কিন্তু ২০০০ সালের পর থেকেই এটি ধীরে ধীরে কার্বাপ্যানেমের বিরুদ্ধেও প্রতিরোধ গড়ে তুলতে শুরু করে। এবং ইদানীং কালে সবচেয়ে শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিক কলিস্টিনের বিরুদ্ধেও এরা প্রায় ৫০% প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে। ফলে এই ব্যাকটেরিয়াজনিত যে সব সংক্রমণ হচ্ছে তার নিরাময় হয়ে উঠছে দুঃসাধ্য। ভাস্করবাবু বলেন, ”কলিস্টিনে কিডনির ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু এখন বাধ্য হয়েই ব্যবহার করতে হচ্ছে। কারণ ক্লেবসিয়ামকে ঠেকানোর মতো ক্ষমতা কিছুটা হলেও কলিস্টিনেরই আছে।”

আরও পড়ুনঃ   ১৪ ধরনের ক্যান্সার ও ১৩ রকম সংক্রমণ ঠেকাবে রসুন

কিন্তু হাসপাতালেই কেন এর প্রকোপ বেশি?

চিকিত্‍সকদের মতে, ক্লেবসিয়েলা হাসপাতাল ছাড়াও যে কোনও জায়গাতেই ছড়াতে পারে। তবে হাসপাতালের সিসিইউতে যে সব রোগী আসেন তাঁদের প্রতিরোধক্ষমতা সাধারণ মানুষের থেকে অনেক কম থাকে। তাছাড়া চিকিত্‍সার প্রয়োজনেই প্রচুর অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহারে তাঁদের শরীরে এমনিতেই ব্যাকটেরিয়ারদের প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সুবিধা হয়। সে জন্যই হাসপাতালে দীর্ঘদিন ধরে আছেন এমন রোগীদের ক্ষেত্রেই ক্লেবসিয়েলার সংক্রমণ বেশি হয়। রাজশ্রীদেবী বলছেন, ”ক্লেবসিয়েলার সংক্রমণ শ্বাসনালী বা মূত্রনালীতে হলে তাও একরকম। কিন্তু একবার যদি রক্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে অবধারিত সেপ্টিসেমিয়া। রোগীকে বাঁচানোই তখন মুশকিল হয়ে যায়।”

কিন্তু কী ভাবে ক্লেবসিয়েলার সংক্রমণ এড়ানো যায়?

ভাস্করবাবু জানাচ্ছেন, রোগীর দেখভাল করার সময় চিকিত্‍সক ও চিকিত্‍সাকর্মীদের হাত না ধোওয়ার অভ্যাস এর জন্য দায়ী। এক জন রোগীকে দেখে অন্য রোগী দেখার আগে ভাল করে হাত ধুলে এই সম্ভাবনা অনেকটাই কমে। তবে এর পাশাপাশি অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের পদ্ধতিকেও দায়ী করছেন তিনি। তাঁর মতে, সাধারণ অসুখেই কড়া অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার ব্যাকটেরিয়ার প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সাহায্য করছে। প্রথমেই বেশি মাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে দিলে পরে আর তাতে কাজ হচ্ছে না। তাঁর কথায়, ”আমাদের দেশে সামান্য জ্বর এলেই কড়া অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ার অভ্যেস তৈরি হয়ে গিয়েছে। স্থানীয় চিকিত্‍সকেরাও এর জন্য দায়ী। প্রেসক্রিপশন ছাড়া ওষুধ বিক্রি বন্ধ করা গেলে ভবিষ্যতে এই জাতীয় সমস্যা কিছুটা হলেও এড়ানো যাবে।”

নাইসেডের অধিকর্তা শান্তা দত্ত জানান, সব হাসপাতালেই ক্লেবসিয়েলার সংক্রমণ একটি বড় সমস্যা। তবে সচেতনতা থাকলেই কিছুটা হলেও এর সঙ্গে লড়াই করা যায়।

LEAVE A REPLY