সামাজিক কুসংস্কার ও মৃগী রোগ

0
724
সামাজিক কুসংস্কার,মৃগী রোগ,epilepsy

অনেকে মনে করে মৃগী একটি আছরের ব্যাপার/আলগার দোষের ব্যাপার/বাতাস লেগেছে/জিন-ভূতের ব্যাপার। এ রোগের কোনো সঠিক চিকিৎসা নেই। এই রোগীর লেখাপড়া, বিয়েশাদি, সংসার কিছুই হবে না। অনেকে মনে করে মৃগী একটা প্রাকৃতিক অভিশাপ। ফলে রোগটি গোপন করে রাখে, বিশেষ করে মেয়েদের ক্ষেত্রে। কারণ, তারা মনে করে রোগটি জানাজানি হলে পরিবারের জন্য ক্ষতি হবে, মেয়েটির বিয়ে দিতে অসুবিধা হবে। এ রকম ধারণার বশবর্তী হয়ে চিকিৎসা না করিয়ে আরো ক্ষতি করা হচ্ছে। বিয়ের পর মেয়েটি যখন শ্বশুরবাড়ি যায় এবং সেখানে এই রোগ আক্রমণ করে তখন মেয়েটির বিয়ে টিকিয়ে রাখাই দুষ্কর হয়ে পড়ে। সুতরাং রোগটি গোপন না করে চিকিৎসা করানোই উত্তম।

রোগের লক্ষণ
১. হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে যাওয়া।
২. শরীরে খিঁচুনি শুরু হওয়া।
৩. হাত-পা ও শরীরে খিঁচুনি।
৪. জিহ্বা ও দাঁতে কামড় লাগা।
৫. খিঁচুনির সময় প্রস্রাব-পায়খানা হয়ে যাওয়া।
৬. জ্ঞান হারানোর মুহূর্তে তার চার পাশের ঘটনা বলতে পারে কি না­ এ বিষয়গুলোই মৃগী রোগ নির্ণয়ে সহায়তা করে।
৭. খিঁচুনির পর মাথাব্যথা, শুয়ে থাকা, কিছু সময় ধরে চুপচাপ থাকা। ৮. খিঁচুনির সময় পড়ে গিয়ে আঘাত পাওয়া।

মৃগী রোগ উঠলে আশপাশের লোকদের কী করণীয়?
মৃগী রোগীর মুখে অনেকেই চামড়ার জুতা, গরুর হাড়, লোহার শিক ইত্যাদি চেপে ধরে। এসব স্রেফ কুসংস্কার। এসবে আসলে কোনো কাজ হয় না, বরং ক্ষতিই হয়। মৃগী হঠাৎ শুরু হয়ে আবার এমনিতেই থেমে যায়। সাধারণত এ ধরনের অ্যাটাক আধা মিনিট বা এক মিনিট থাকে। এ জন্য কোনো কিছু করার দরকার নেই। অনেকে অস্থির হয়ে রোগীর হাত-পা চেপে ধরে, মাথায় পানি দেয়, অস্থির হয়ে মুখে ওষুধ খাওয়ানোর চেষ্টা করে। আসলে এসব কিছুই করার দরকার নেই। রোগটা নিজে নিজেই থেমে যাবে। তারপর সাধারণত রোগী ঘুমিয়ে পড়ে। কারো কারো অবশ্য মাথাব্যথা হয়। তবে করণীয় হলো রোগী যেমন করছে, করতে দেয়া। শুধু দেখতে হবে রোগীর আশপাশে ধারালো অস্ত্র, যন্ত্রপাতি, আগুন প্রভৃতি যেন না থাকে। যাতে সে আঘাতপ্রাপ্ত না হয়। জোরে ঠেসে ধরলেই বরং ক্ষতি হতে পারে। রাস্তার পাশে নিরাপদ জায়গায় নিয়ে যাওয়া উচিত। যদি দেখা যায়, ৫-১০ মিনিটেও মৃগী থামছে না, বা পর পর ঘন ঘন আক্রান্ত হচ্ছে তবে রোগীকে নিকটস্থ হাসপাতাল বা ক্লিনিকে স্থানান্তর করা দরকার। সেখানে ডাক্তাররা সঠিক ব্যবস্থা নেবেন।

আরও পড়ুনঃ   ওষুধে অ্যালার্জি কীভাবে বুঝবেন

রোগীর জন্য পরামর্শ
১. নিয়মিত ওষুধ সেবন করুন।
২. নিয়মিত ডাক্তারের পরামর্শ নিন।
৩. সময় মতো ঘুমান।
৪. উত্তেজনা প্রশমন করুন।
৫. পানিতে নামবেন না।
৬. খিঁচুনির মাত্রা পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আসা পর্যন্ত আগুনের সংস্পর্শ থেকে দূরে থাকুন।
৭. গাড়ি চালানো থেকে বিরত থাকুন।
৮. গাছে উঠবেন না।
৯. ভ্রমণে সাথে ওষুধ রাখুন।
১০. ধূমপান বর্জন করুন।
১১. রোগীর সাথে চিকিৎসকের পরামর্শের ফটোকপি ও বাসার ফোন নম্বর সার্বক্ষণিক সাথে রাখুন।

শিক্ষকদের করণীয়
১. মৃগী রোগের লক্ষণ সম্পর্কে ভালো জ্ঞান থাকা দরকার, যাতে স্কুলে কোনো শিশুর এই সমস্যা হলে ত্বরিত গতিতে বুঝতে পারে।
২. আগেই ধারণা থাকা উচিত নিকটস্থ কোন হাসপাতালে বা চিকিৎসকের কাছে পাঠাতে হবে।
৩. দীর্ঘদিন ওষুধ খাওয়ার গুরুত্ব ছাত্রছাত্রীদের বোঝানো উচিত।
৪. অন্য ছাত্রছাত্রীদের মাঝে মৃগী রোগের সামাজিক কুসংস্কার নিয়ে আলোচনা করা, যাতে তারা সোচ্চার হতে পারে এবং সচেতনতা বৃদ্ধি করতে পারে।
৫. এসব শিশুকে আলাদা চোখে না দেখা তাদের সব ছাত্রছাত্রীর সাথে পড়াশোনার সুযোগ করে দেয়া।

মহিলাদের বিশেষ পরামর্শ
১. মৃগী রোগে আক্রান্ত মহিলা, যাদের বয়স ৫০ বছরের নিচে অর্থাৎ রিপ্রোডাক্টিভ এজ তাদের মাসিকের সময় খিঁচুনির পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে। চিকিৎসকের পরিভাষায় এদের বলে কেটামেনিয়াল সিজার।
২. গর্ভাবস্থায় রোগীর মধ্যে থাকে অনেক দ্বিধাদ্বন্দ্ব, ভীতি ও প্রশ্ন। সন্তান নিতে পারবে কি না? মৃগী রোগের ওষুধ খেতে পারবে কি না? হ্যাঁ। চিকিৎসকের পরামর্শক্রমে মৃগী রোগীদের বিয়ে, সংসার, কর্মজীবন, লেখাপড়া ও সন্তান নেয়ায় কোনো বাধা নেই।

**************************
ডাঃ মোঃ দেলোয়ার হোসেন
লেখকঃ সহকারী অধ্যাপক, মাথাব্যথা, ব্রেন ও মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ, চেম্বারঃ মডার্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও হাসপাতাল, ধানমন্ডি, ঢাকা।

LEAVE A REPLY