ইসলামে স্বাস্থ্য, শক্তি ও চিকিৎসার গুরুত্ব

0
ইসলামে স্বাস্থ্য, শক্তি ও চিকিৎসার গুরুত্ব

মুফতি ইবরাহীম আনোয়ারী:
এক ॥ ইসলাম স্বাস্থ্য ও চিকিৎসার গুরুত্বারোপ করে। তাই আল্লাহর নবী (সা.) বলেন, দুর্বল ঈমানদার অপেক্ষায় যে ঈমানদার ব্যক্তির শারীরিক শক্তি আছে তিনি শ্রেষ্ঠ ও আল্লাহর নিকট প্রিয় (মুসলিম শরীফ)।

ইবাদত করার জন্য শারীরিক শক্তি প্রয়োজন। আল্লাহর পথে জিহাদ করার জন্য, দ্বীন প্রচার করার জন্য, তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ার জন্য শারীরিক শক্তি প্রয়োজন । অনেক মানুষ আছে যাদের রাতের বেলায় ঘুম থেকে উঠতে মন চায়, কিন্তু সুস্থতার অভাবে পারছেন না। শারীরিক শক্তির কারণে ইবাদত করতে পারেন না। আল্লাহর নবী (সা.) বলেন, হে আমার উম্মত, পাঁচটি সম্পদ হারানোর পূর্বে তার মর্যাদা দাও। মারা যাওয়ার পূর্বেই তোমার জীবনের প্রতি মুহূর্তকে কাজে লাগাও। ২. বুড়ো হওয়ার পূর্বে যৌবনকে কাজে লাগাও। ৩. দারিদ্র্যের পূর্বে স্বচ্ছলতার মূল্য দাও। ৪. অসুস্থতার পূর্বে স্বাস্থ্যকে মূল্য দাও। ৫. ব্যস্ততার পূর্বে অবসরকে কাজে লাগাও (মুসতাদরিকে হাকেম)।

কাজেই মহানবী (সা.) আমাদেরকে অসুস্থ হওয়ার আগে স্বাস্থ্যকে সৎ কাজে ব্যবহার করার জন্য উৎসাহিত করেছেন। তিনি বলেছেন- স্বাস্থ্যকে কাজে লাগাও, স্বাস্থ্যকে রক্ষা কর। আল্লাহর নবী তার সাহাবীকে যিনি সারা দিন রোজা রাখেন, সারা রাত নফল নামাজ পড়েন, ডেকে বললেন, হে আমার সাহাবী, জেনে রাখ, “নিশ্চয় তোমার উপর তোমার শরীরের হক্ব রয়েছে” (বোখারী শরীফ-২.৬৯৭)।

বুঝা গেল, আমার এই শরীর আমার নয়, এটা ব্যবহার করার জন্য আমাকে দেয়া হয়েছে। কিছু দিনের জন্য এটি আল্লাহর দেয়া আমানত। আমি দাবি করি এটা আমার হাত, আমার শরীর, এটা আমার পা। হোটেলে রুম যারা ভাড়া নেয়, তারাও দাবি করে এটি আমার রুম। হোটেলের রুমকে আমার রুম দাবি করা যেমন সাময়িক, এটার আসল মালিক আমি নই। একইভাবে হাত, পা, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আমার এ দাবিও সাময়িক। আসল মালিক আল্লাহ তায়ালা। এটাকে যত্র-তত্র ব্যবহার করার জন্য দেয়া হয়নি। রাসূল সা. বলেন, হে আমার সাহাবী জেনে রাখ-তোমার উপরে তোমার এই শরীরের হক আছে। স্বাস্থ্যকে রক্ষা করতে হবে। এটাকে যথেচ্ছ ব্যবহার করা যাবে না, যাতে স্বাস্থ্য নষ্ট হয়ে পড়ে।

ইসলামী ফেকাহ্, ইসলামী আইন ও ইসলামী বিধি-বিধান প্রণয়নের ক্ষেত্রে পাঁচটি উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে প্রণয়ন করা হয়েছে। আরবিতে বলা হয় (মাকাসেদে শরিয়্যাহ) শরীয়তের উদ্দেশ্য। প্রথমত : মানব জাতির শরীরকে রক্ষা করা, প্রাণকে হেফাজত করা। এ জন্য হত্যা নিষিদ্ধ। একজন আরেকজনকে হত্যা করতে পারে না।

আরও পড়ুনঃ   খেজুরের অসাধারণ স্বাস্থ্য উপকারিতাগুলো জেনে নিন

দ্বিতীয়ত : মানুষের বিবেক-বুদ্ধি ও মানসিক স্বাস্থ্যকে রক্ষা করা। যেই জিনিসের কারণে মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য নষ্ট হয়ে যায়, এগুলোকে ইসলাম হারাম করেছে। যত প্রকার নেশা উদ্রেককারী উপাদান হতে পারে ইসলাম তা হারাম করেছে।

তৃতীয়ত : স্বাস্থ্যকে হেফাজত করা, বংশকে হেফাজত করা। যেনা করা ও ব্যভিচার করা হারাম। কারণ, ব্যবিচার করলে মানুষের বংশ নষ্ট হয়ে যায়। মানুষের পরিচিতি নষ্ট হয়ে যায়। এ জন্য কোন মেয়ের একই সময়ে একাধিক বিবাহ করা হারাম। একজন মহিলা একজন স্বামী গ্রহণ করতে পারে। একাধিক স্বামী এক সাথে গ্রহণ করতে পারে না। একটি নারী যদি একই সময় একাধিক স্বামী গ্রহণ করে তখন তার গর্ভে যে বাচ্চা আসবে তা কোন স্বামীর নির্ণয় করতে কঠিন হবে। এ জন্য মহিলাদের একাধিক বিবাহ একই সময় ইসলাম হারাম করেছে।

চতুর্থত : মানুষের ইজ্জতকে হেফাজত করা। এ জন্য কারো সমালোচনা করা, কারো গীবত করা ইসলামে হারাম। কারো বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ ও বানোয়াট প্রচার করা হারাম। কেউ কারো বিরুদ্ধে যদি মিথ্যা অভিযোগ প্রচার করে, আদালতে এসে যদি সাক্ষী পেশ করতে না পারে, তাহলে ইসলামী আইন অনুযায়ী তাকে আশিটি বেত দেয়া হবে। ইসলামের দৃষ্টিতে এই লোক আজীবনের জন্য ফাসেক হয়ে যাবে। আদালতে তার সাক্ষি আর গ্রহণ হবে না (সুরা নূর-৪)।

পঞ্চম : মানুষের সম্পদের হেফাজত করা। চুরি করা, রাহাজানি-ডাকাতি ইত্যাদি করা হারাম। ফিকাহর কিতাবসমূহ থেকেও আমরা শিখলাম যে, শরীয়া আইনের টার্গেটের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি হলো মানুষের স্বাস্থ্য রক্ষা করা। এমন কোন কাজ কার যাবে না যার কারণে মানুষের স্বাস্থ্য নষ্ট হয়।

রোগ প্রতিরোধে ইসলামের শিক্ষা: মানুষের রোগ যাতে না হয় তার আগেই ইসলাম মানুষকে রোগ প্রতিরোধের ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য উৎসাহিত করেছে। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের এটাই শ্লোগান (চৎবাবহংরড়হ রং নবঃঃবৎ ঃযধহ পঁৎব) রোগ হওয়ার আগেই তার প্রতিরোধ কর। এ জন্য আমরা দেখতে পাই, যেই জিনিসগুলোর কারণে মানুষের রোগ হয় ইসলাম আগেই সেগুলোকে নিষিদ্ধ করে দিয়েছে। হাদীস গবেষণায় দেখা যায়, বুখারী শরীফ, তিরমিযি শরীফ, নাসাঈ, আবু দাউদ বিশুদ্ধ হাদীসের এই চারটি কিতাবে এবং এর বাইরে আরো যেসব হাদীস গ্রন্থ আছে প্রায় প্রতিটি কিতাবে একটি অধ্যায় আছে যার নাম ‘চিকিৎসা অধ্যায়’।

আরও পড়ুনঃ   ডাক্তার ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কমিশন চুক্তি সম্পর্কে ইসলাম কী বলে?

বোখারী শরীফের কয়েকটি পাতায় আল্লাহর নবীর চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যের ব্যাপারে নির্দেশনাসমূহ সঙ্কলিত হয়েছে। মানুষের রোগ হওয়ার পিছনে সব চেয়ে বড় কারণ হলো মানুষের অলসতা, কর্ম বিমুখতা। আল্লাহর নবী দোয়া করেন- হে আল্লাহ, আমি তোমার কাছে অলসতা হতে পানাহ চাই (বুখারী-২৩৪১)।ইসলাম মানুষকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে খাওয়ার জন্য উৎসাহিত করে। কোরআন তাই বলে- খাও, পান কর কিন্তু অতিরিক্ত করো না (আল আরাফ-৩১)। যতটুকু খাবার তোমার শরীরের জন্য দরকার ততটুকুই তুমি গ্রহণ কর। নিজের জন্য যেটা ক্ষতিকর সেটাকে তুমি গ্রহণ করো না, সেটা ‘ইসরাফ’ বা অপচয়, সেটা অপ্রয়োজনীয়। ইসলাম খাওয়ার ব্যাপারে মানুষকে সীমারেখা ঠিক করে দিয়েছে।

হাদীস শরীফে আছে, কয়েকজন লোককে আল্লাহ তায়ালা অপছন্দ করেন, মানুষও তাদের অপছন্দ করে। ১. কৃপণ ব্যক্তিকে। ২. ঐ ব্যক্তি যে বেশি কথা বলে তাকে আল্লাহও পছন্দ করেন না, বান্দারাও পছন্দ করে না। ৩. যে ব্যক্তি অলস এবং বেশি খায়। তার সাথে কেউ খেতে চায় না। কারণ, এক টেবিলে হয়তো ছয়টি মাছের টুকরো দেয়া হলো, সে একা কয়েকটি নিয়ে বসে থাকবে। এদের কেউ পছন্দ করে না। তাহলে খাওয়ার ব্যাপারে ইসলাম প্রেসক্রিপশন দিয়েছে। ইসলাম বিভিন্ন ব্যবস্থা আমাদের দান করেছে। ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়ার পরে পানির মধ্যে হাত দেয়া যাবে না (মুসলিম-২৩৩)। হাদীসে আছে- যখন তোমাদের কেউ ঘুম হতে জাগ্রত হয়, তিন বার হাত না ধুয়ে পাত্রে হাত ঢুকিয়ে দিবে না। কারণ, হয়তো, সে সারা রাত এই আঙ্গুল গুলো দিয়ে শরীরের কোন স্থান চুলকিয়েছে, মশা মেরেছে কিন্তু সে দেখেনি। শরীরের মধ্যে অনেক জীবাণু লেগে আছে। হাউজের মধ্যে, কলসী বা বদনার মধ্যে আপনি যদি হাত ডুবিয়ে দেন, পুরা পানি জীবাণুযুক্ত হয়ে যাবে। কুলি করলে আপনার মুখের মধ্যে জীবাণু ঢুকে যাবে। নাকে পানি দিলে নাকের ভিতর জীবাণু ঢুকে যাবে। হাদীস বলে, ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে প্রথম কাজ হলো পানি দিয়ে হাতকে তিনবার করে ধৌত করো। তার পর পানি নিয়ে কুলি করো, নাকে পানি দাও। যাতে হাতের মাধ্যমে জীবাণু শরীরে প্রবেশ করতে না পারে। দেখুন, ইসলাম আমাদের কত সুন্দর ব্যবস্থা দান করেছে। মহানবী (সা.)’ এর সব ক’টি সুন্নাত বিজ্ঞান ভিত্তিক ও স্বাস্থ্যসম্মত। কেউ যদি ঘুম-জাগরণ, পানাহার, চাল-চলন, মলমূত্র ত্যাগসহ যাবতীয় কার্যাবলী সুন্নাত অনুযায়ী সম্পাদন করেন তাহলে জটিল কঠিন রোগের ঝুঁকি হতে তিনি মুক্ত থাকতে পারবেন। উদাহরণ স্বরূপ কয়েকটি সুন্নাত বিষয় উল্লেখ করা যায়-মহানবী (সা.) মল ত্যাগ করার পর মাটির মাধ্যমে ঢিলা ব্যবহার করার জন্য উৎসাহিত করেছেন। মাটির ঢিলা ব্যবহার করার নিয়মও শিক্ষা দান করেছেন। ইহুদীরা বিদ্রুপ করে বলেছিল, তোমাদের নবী কি পায়খানার নিয়মও শেখায়? মহানবী (সা.) কথাটি জেনে উত্তরে বলেছিলেন, আমি আমার উম্মতের পিতার মতো। আমি তাদের কল্যাণে সব কিছুই শিক্ষা দান করি। একজন ব্যক্তি যদি সুন্নাত অনুযায়ী ঢিলা দ্বারা পবিত্র হয়, পরে পানি ব্যবহার করে নানাবিধ রোগের জীবাণু হতে সে মুক্ত হতে পারবে। রাসূলুল্লাহ (সা.) হাঁচি দেয়ার নিয়মও আমাদের শিখিয়েছেন। হাঁচির সময় নাক, মুখকে ঢেকে নিতে হয়। যাতে নাক, মুখ হতে নির্গত ছিটেফোঁটা মানুষের গায়ে না পড়ে এবং নির্গত জীবাণু তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে না পারে। তাছাড়া হাঁচি দেয়ার সময় মুখ বিকৃত হয়, তা অন্যের কাছে যেন প্রকাশিত না হয়। অনুরূপভাবে হাই তোলার সময় মুখে হাত দিতে হয়। যাতে মুখের থুতনি যেন ঢিলে হয়ে না যায় এবং নির্গত বাতাস যেন জীবাণু না ছড়ায়। হাঁচির পর ‘আল হামদুলিল্লাহ’ বলতে হয়। মেসওয়াক করার ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সা.) উম্মতকে ব্যাপক গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি বলেছেন- মেসওয়াক মুখগহ্বরকে পরিচ্ছন্ন করে আর স্রষ্টাকে করে সন্তুষ্ট (বুখারী-২-৬৮২) –

আরও পড়ুনঃ   খাদ্যে ও ঔষধে ভেজাল

সিয়াম হতে পারে ক্যান্সার প্রতিরোধের সর্বোত্তম উপায়!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

16 − 16 =