কিডনিতে পাথর-কিডনিতে পাথর হলে করণীয়

0
কিডনিতে পাথর

কিডনিতে পাথর। মেয়েদের তুলনায় ছেলেদের বেশি হয়। সাধারণত ৩০ বছরের ওপরের লোকদের এটা বেশি হয়ে থাকে। কিডনিতে পাথরের সাথে জন্মগত ও বংশগত সম্পর্ক রয়েছে। এ ছাড়া যেসব কারণ উল্লেখযোগ্য, সেগুলো হলো : মেটাবলিক ডিজিজ, যেমন- গাউট, সিসটিনিউরিয়া, হাইপার অক্সাল ইউরিয়া; ইউরিনারি ট্রাক্টের প্রদাহ; টিউবিউলসের কোনো রোগ, যেমন- প্যাপিলারি নেক্রোসিস অথবা কোনো কারণ ছাড়াই পাথর হতে পারে।

সাধারণত ছয় ধরনের পাথর দেখা যায়। যেমন- (১) ক্যালসিয়াম অক্সালেট পাথর, (২) ক্যালসিয়াম ফসফেট পাথর, (৩) অ্যামোনিয়াম-ম্যাগনেশিয়াম ফসফেট পাথর, (৪) ইউরিক এসিড পাথর, (৫) সিস্টিন পাথর, (৬) জ্যানথিন পাথর। তবে প্রায় ৯০ শতাংশ ক্যালসিয়াম পাথর, যার মধ্যে ক্যালসিয়াম অক্সালেট, ক্যালসিয়াম অক্সালেট ও ক্যালসিয়াম ফসফেটের মিশ্রণ অথবা ক্যালসিয়াম ফসফেট একা। এ ছাড়া ট্রিপল স্টোন হিসেবে পরিচিতি রয়েছে অ্যামোনিয়াম-ম্যাগনেশিয়াম পাথর, ইউরিক এসিড পাথর এবং সিস্টিন পাথর, যা কিডনি পাথরের ১০ শতাংশের মতো।
পাথর হওয়ার নানা থিওরি রয়েছে। সাধারণ সূত্র হলো রাসায়নিক ক্রিয়া-বিক্রিয়া মূত্রপথে পাথর জমতে সহায়তা করে। রাসায়নিক পদার্থ যেমনÑ ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, ইউরিক এসিড, সিস্টিন ও জ্যানথিন, প্রস্রাবের সাথে প্রচুর নির্গত হয়। যদি কোনো কারণে মূত্রপথ অবরুদ্ধ হয় কিংবা প্রস্রাব নিঃসরণে বাধার সৃষ্টি হয়, তাহলে পাথর জমা হওয়ার সম্ভাবনাও বেড়ে যায়। মূত্রপথে কোনো প্রতিবন্ধকতা থাকলে স্বাভাবিক মূত্র নিঃসরণ হতে পারে না। এটা জন্মগত ত্রুটির জন্য অথবা অর্জিত কোনো কারণেও ঘটতে পারে। আবার সিস্টিন ও জ্যানথিন পাথরের পেছনে বংশগত (জিনগত) কারণও সক্রিয় থাকতে পারে। যারা প্রাণিজ আমিষ বেশি খান, তাদের ইউরিক এসিড পাথর হতে পারে। জীবনযাত্রার উঁচুমান, উচ্চ ক্যালরিযুক্ত খাবার এবং প্রচুর প্রাণিজ আমিষ গ্রহণ করলে ক্যালসিয়াম অক্সালেট পাথর হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ খাবারের মধ্যে রয়েছেÑ দুধ, দুধজাতীয় খাবার, দুধের পুডিং, দুধ চকলেট, পনির ও আইসক্রিম। অক্সালেটসমৃদ্ধ খাবারে মধ্যে রয়েছে- শাক, টমেটো, কুল, বাদাম, কাজুবাদাম, কিশমিশ, আঙুরের রস, আপেলের রস, কোকো, কালো চা ইত্যাদি।
সাধারণত ৮০ শতাংশ পাথর এক দিকের কিডনিতে হয়ে থাকে। বেশির ভাগ পাথর তৈরি হয় রেনাল কেলিসেস, প্লেলভিস ও মূত্রথলিতে। কোনো কোনো সময় একই কিডনিতে একাধিক পাথর হতে পারে। রেনাল পেলভিসের পাথর সাধারণত ছোট আকারের হয়ে থাকে।
কিডনিতে পাথর অনেক সময় লক্ষণ ছাড়াই বেড়ে উঠতে পারে। অন্য কোনো কারণে পরীক্ষা করাতে গেলে (এক্স-রে, আল্ট্রাসনোগ্রাম) তখন ধরা পড়ে। পাথর কখনো বড় হয়ে অনেকটা হরিণের শৃঙ্গের মতো আকার ধারণ করতে পারে। কিডনিতে পাথর জমলে কিডনি অঞ্চল ভারী ভারী লাগতে পারে। কোনো তীব্র ব্যথা নাও হতে পারে। তবে পাথর গড়িয়ে পেলভিস দিয়ে নেমে মূত্রবাহী নলে আটকে গেলে তীব্র ব্যথা হতে পারে। চিকিৎসকের কাছে তা রেনাল কলিক নামে পরিচিত। ব্যথা নাভির পাশে সামনে এবং পেছনে কোনাকুনি যৌনাঙ্গ পর্যন্ত ছড়াতে পারে। মনে হতে পারে ব্যথায় যেন কোমর খামছে ধরে রেখেছে। থেমে থেমে এই ব্যথা তীব্র থেকে তীব্রতর হতে পারে। রোগী অস্থির হয়ে বিছানায় অথবা মেঝেতে গড়াগড়ি দিতে থাকে। নড়াচড়া করলেই ব্যথা বাড়তে থাকে। শরীরে জ্বরভাব থাকতে পারে। বমি বমি ভাব এমনকি বমিও হতে পারে। মনে রাখতে হবে, কলিক ব্যথা মানেই কিডনিতে পাথর নাও হতে পারে। পেটে গ্যাস জমা অথবা এপেনডিক্সের প্রদাহের কারণে ব্যথা হতে পারে। এ জন্য প্রয়োজনীয পরীক্ষা করে পার্থক্য নির্ণয় করতে হবে। দুই কিডনিতে বা মূত্রবাহী নলে একত্রভাবে বড় পাথর হলে প্রস্রাব একেবারে বন্ধ হয়ে যেতে পারে কিংবা খুব অল্প অল্প রক্তমিশ্রিত প্রস্রাব হতে পারে। রোগীর কোনো ব্যথা নাও থাকতে পারে অথবা ব্যথা থাকতেও পারে। অনেক দিন ধরে লক্ষণবিহীন পাথর থাকলে রোগীর উচ্চ রক্তচাপসহ অন্যান্য জটিলতা দেখা দিতে পারে। পাথর ছোট হলে প্রস্রাবের সাথে বেড়িয়ে যাবে। এসব রোগীর সাধারণত ব্যথা থাকে না। রোগ নির্ণয়ে মূত্র পরীক্ষা, এক্স-রে, আইভিপি, আলট্রাসনোগ্রাফি ও সিটিস্ক্যান করা যেতে পারে।
কিডনি পাথর প্রতিরোধে প্রচুর পানি পান করতে হবে। প্রতিদিন বড় গ্লাসের আট গ্লাস পানি পান করলে পাথর জমা হওয়ার সুযোগ কমে যায়। ক্যালসিয়াম বা ক্যালসিয়াম অক্সালেট সমৃদ্ধ খাবার বাদ দিতে হবে। ক্যালসিয়াম বেশি থাকে এমন খাবারের মধ্যে রয়েছে দুধ, দুধজাতীয় খাবার, ডিম ইত্যাদি। মাছের মাথা, ছোট মাছের কাঁটা, গরু-খাসির হাড্ডি ইত্যাদিতেও রয়েছে প্রচুর ক্যালসিয়াম। নানা ধরনের শাকপাতায়ও রয়েছে অনেক ক্যালসিয়াম। তাই যাদের কিডনিতে পাথর একবার জমেছে কিংবা বারবার পাথর জমার প্রবণতা রয়েছে তাদের ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ খাবার এড়িয়ে চলা ভালো। কিডনি পাথরের অ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসা মূলত সার্জারি। তা ছাড়া আধুনিক প্রযুক্তিতে মেশিনের সাহায্যে পাথর ভেঙে টুকরো টুকরো করে ফেলা সম্ভব হচ্ছে।
আলাট্রাসনিক তরঙ্গ বা হাইড্রোইলেকট্রিক ‘বুমের’ সাহায্যে পাথর ভাঙার এ কাজটি করা হচ্ছে। এর দ্বারা রোগী স্বল্পসময়ে পাথর অপসারণের সুযোগ পাচ্ছেন। অনেক রোগীর একাধিকবার পাথর ভাঙার ইতিহাস রয়েছে। হোমিওপ্যাথি চিকিৎসায়ও অনেক রোগী উপকার পাচ্ছেন। যথাযথ হোমিওপ্যাথি চিকিৎসায় কিডনি পাথর জমার প্রবণতা দূর করা যায়।

আরও পড়ুনঃ   কিডনিতে পাথর? কিডনিতে পাথর জমার লক্ষণ বুঝবেন যেভাবে

অধ্যাপক ডা: জি এম ফারুক

লেখক : নির্বাহী পরিচালক
ইনস্টিটিউট অব হোমিওপ্যাথিক মেডিসিন অ্যান্ড রিসার্চ।

ফোন : ০১৭৪৭১২৯৫৪৭

ক্যাপসিকামের ১৮টি গোপন উপকারিতা জেনে নিন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

3 × three =