চোখের রোগ গ্লুকোমা কী? গ্লুুকোমা প্রতিরোধে বিস্তারিতভাবে জেনে নিন!

0
গ্লুকোমা, চোখের রোগ
গ্লুকোমা এক ধরনের চোখের রোগ।চোখের প্রেশার বা চাপজনিত রোগ গ্লুকোমা। এ রোগে চোখের ভেতরের সূক্ষ্ম নালীগুলো বন্ধ হয়ে যায়।এই রোগে চোখের স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে চোখের ভেতরে এক ধরনের চাপের সৃষ্টি হয়। চোখের দৃষ্টিশক্তি ধীরে ধীরে হ্রাস পেতে পেতে এক সময় সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। গ্লুকোমার প্রাথমিক লক্ষণ সহজে ধরা পড়ে না। চক্ষু বিশেষজ্ঞরা জানান, প্রতিরোধই এ রোগ থেকে রক্ষা পাওয়ার একমাত্র উপায়। সে জন্য প্রতিদিন খাবারের সাথে সবুজ শাকসবজি গ্রহণ করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে কথা বলেছেন ডা. সিদ্দিকুর রহমান। বর্তমানে তিনি ভিশন আই হাসপাতালের ম্যানেজিং ডিরেক্টর ও গ্লুকোমা বিভাগের পরামর্শক হিসেবে কর্মরত।

প্রশ্ন : গ্লুকোমা বলতে কী বোঝায়?

উত্তর : ‘গ্লুকোমা’ শব্দটি আগে বেশি প্রচলিত ছিল না। শুধু খুব বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের চিকিৎসকদের মধ্যে একটু কথোপকথন চলত। তবে আজ অনেকেই এর নাম জানেন।

গ্লুকোমা চোখের একটি রোগ। এই রোগে চোখের স্নায়ু ধীরে ধীরে নষ্ট হয়। একসময় চোখ সম্পূর্ণ অন্ধ হয়ে যায়। এটি এত ধীরে ধীরে হয় যে বেশিরভাগ রোগী এর লক্ষণ বুঝতে পারেন না। আর যখন বুঝতে পারেন, তখন ৮০ থেকে ৯০ ভাগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যায়। এই কারণে গ্লুকোমার বিষয়ে আমাদের সচেতনতা প্রয়োজন।

প্রশ্ন : শুরুতে যেন রোগটি বোঝা যায়, সে বিষয়ে কী করণীয়?

উত্তর : আসলে প্রথমে রোগীকে চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে। কিন্তু কখন যাবে? চোখ ব্যথা হলে, লাল হলে বা চশমা লাগলে কোনো না কোনোভাবে রোগী একবার তো চিকিৎসকের যাবে? চিকিৎসকের কাছে গেলে তার উচিত একে খুঁজে বের করা। এটা চিকিৎসকের দায়িত্ব। অন্য যেকোনো সমস্যা নিয়েও যদি চোখের চিকিৎসকের কাছে যায়, চিকিৎসকের উচিত একে ভালো করে দেখা। তবে কয়েকটি প্রাথমিক জিনিস সাধারণভাবে রোগী হিসেবে আমরা মনে রাখতে পারি। সেটা হলো ঘন ঘন চশমার পাওয়ার পরিবর্তন হচ্ছে কি না সেটি, বিশেষ করে চল্লিশের কাছাকাছি বয়স হলে। তবে অনেক সময় আগেই চশমা লাগে। অনেক সময় চোখে অস্বস্তি হয়।

সুতরাং একজন চোখের চিকিৎসকের কাছে রোগী পৌঁছালে চিকিৎসকের দায়িত্ব হবে চোখের প্রেশার ঠিক আছে কি না, সেটি দেখা। চোখের ভেতরের স্নায়ুর গঠন দেখতে গ্লুকোমা রোগীদের মতো কি না, সেটি দেখতে হবে। আর এটি যদি সন্দেহজনক হয়, অবশ্যই পরবর্তী কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার ভেতর চলে যেতে হবে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে আমাদের একটি সিদ্ধান্তে এসে পৌঁছাতে হবে।

আরও পড়ুনঃ   দৃষ্টিশক্তি বাড়াবে ৬ খাবার

প্রশ্ন : যদি আপনারা মনে করেন রোগী ঝুঁকির মধ্যে আছে, এর পরবর্তী পদক্ষেপ কী থাকে?

উত্তর : একটি ক্লিনিক্যাল শব্দই আছে গ্লুকোমা সাসপেক্ট। এর মানে কিছু কিছু লক্ষণ হয়তো দেখা যাচ্ছে। তবে চোখটি সম্পূর্ণভাবে এখনো ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। তখন তাদের আমরা নিয়মিত ফলোআপের ভেতর থাকতে পরামর্শ দিই। সেটা হয়তো তিন মাস, ছয় মাস বা এক বছর পর পর। তেমন কোনো সমস্যা না থাকলে সাধারণত এক বছর পর পর দেখাতে বলি। তখন আমরা আবার ভিজুয়াল ফিল্ড টেস্ট করে দেখি, তার কোনো ক্ষতি হচ্ছে কি না। ক্ষতিগ্রস্ত হলেই কেবল আমরা নিশ্চিত হতে পারি, তার রোগটি আছে এ বিষয়ে। এর মানে আমাকে রোগ নির্ণয়ের জন্য কিছু ক্ষতি মেনে নিতে হবে। তবে সেটি যেন আমাদের গ্রহণযোগ্য মাত্রার মধ্যে থাকে এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ব্যাহত না করে। তাই ক্ষতির মাত্রা যদি বেড়ে যাচ্ছে দেখি, তাহলে গ্লুকোমার চিকিৎসা শুরু করে দিই।

গ্লুকোমা হলে সকালে বেশি পানি খাবেন না

গ্লুকোমা চোখের জটিল রোগ। এই রোগের চোখের নার্ভ স্নায়ু নষ্ট হয়ে যায়। সময় মতো চিকিৎসা না নিলে রোগ জটিল আকার ধারণ করতে পারে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ আই হাসপাতালের পরিচালক ও অধ্যাপক অধ্যাপক ডা. জালাল আহমেদ কথা বলেছেন ।

প্রশ্ন : গ্লুকোমা চোখের অত্যন্ত জটিল একটি রোগ। গ্লুকোমা বিষয়টি কী?

উত্তর : গ্লুকোমা চোখের একটি রোগ। এ রোগ চোখের দৃষ্টি নষ্ট করে দেয়। চোখের একটি স্বাভাবিক চাপ রয়েছে। গ্লুকোমা রোগে সাধারণত চোখের চাপ বেড়ে যায়। চোখের অপটিক নার্ভ থাকে। এই অপটিক নার্ভের ফাইবারগুলো আস্তে আস্তে নষ্ট হতে থাকে, গ্লুকোমা রোগের জন্য। চোখের চাপ বৃদ্ধি পেয়ে আস্তে আস্তে নার্ভের ফাইবারগুলো নষ্ট হয়ে যায়। একটি নার্ভের মধ্যে ১ দশমিক ২ মিলিয়ন ফাইবার থাকে। এই ফাইবারগুলো আস্তে আস্তে নষ্ট হয়।

তবে একটা জিনিস মনে রাখা দরকার, গ্লুকোমা রোগে সাধারণত চাপ বাড়ে। তবে চাপ স্বাভাবিক থাকা অবস্থায়ও কারো কারো গ্লুকোমা রোগ হতে পারে।

আরও পড়ুনঃ   'লক্ষ্মীট্যারা' আসলে বিষয়টি কী?

দুই রকমের গ্লুকোমা রয়েছে। একটি হলো, বাচ্চাদের গ্লুকোমা এ বড়দের গ্লুকোমা। বড়দের গ্লুকোমার মধ্যে একটিকে বলে ওপেন এঙ্গেল গ্লুকোমা। আরেকটি হলো, ন্যারো এঙ্গেল গ্লুকোমা। ওপেন এঙ্গেল গ্লুকোমাকে বেশি ক্ষতিকর হিসেবে ধরা হয়। কারণ এই গ্লুকোমাটা রোগী বুঝতে পারে না। এতে আস্তে আস্তে চোখের ক্ষতি হতে থাকে। গ্লুকোমার যে নার্ভ ফাইবারগুলো নষ্ট হয়, এগুলো চিরস্থায়ীভাবে নষ্ট হয়। চোখ একবার নষ্ট হলে আর ভালো হয় না।

হাত পায়ের নার্ভে একবার আঘাত লাগলে ভালো হয়। চোখের নার্ভ একবার নষ্ট হলে এটি আর কখনো ফিরে আসে না।

প্রশ্ন : গ্লুকোমা হওয়ার জন্য কী কী বিষয় দায়ী?

উত্তর : চোখের মণির পাশের যে এঙ্গেল থাকে, সেটি যদি ছোট হয়ে যায় বা সরু হয়ে যায় সমস্যা হয়। ট্রাবিকুলাম বলে একটি বস্তু রয়েছে, এর ভেতর দিয়ে চোখের পানি প্রবাহিত হয়। এই পানি প্রবাহিত হওয়ার সময় যদি কোনো বাধার সম্মুখীন হয়, সেক্ষেত্রে চোখের চাপ বাড়ে। এটি চোখের ভেতরের কোনো কোনো সমস্যার কারণেও হতে পারে এবং শরীরের অন্যান্য কিছু কারণ রয়েছে, এর জন্যও হতে পারে।

প্রশ্ন : ছানির অস্ত্রোপচার না হলে কী গ্লুকোমা হতে পারে?

উত্তর : ছানি যদি সময়মতো অস্ত্রোপচার না করা যায়, সেক্ষেত্রে চোখের চাপ বেড়ে, এর পেছনে যে আইরিশ রয়েছে, এটি সামনের দিকে চলে আসে। যার জন্য এঙ্গেল ছোট হয়ে যায় এবং চোখের চাপ বাড়ে। এ ছাড়া আরো কিছু কারণ রয়েছে।

তাই গ্লুকোমা রোগের শুরুতে এটি চিহ্নিত করা প্রয়োজন। ন্যারো এঙ্গেল গ্লুকোমার কারণে চোখ লাল হয়, চোখ ব্যথা হয়, চোখের দৃষ্টি কমে যায় এবং তীব্র ব্যথা হতে পারে। সেটি হলে রোগী সাধারণত চিকিৎসকের কাছে যায়। চিকিৎসকের কাছে না গিয়ে কোনো উপায় থাকে না। এটির রোগ নির্ণয় তাড়াতাড়ি হয়।

প্রশ্ন : গ্লুকোমা রোগ আগেভাগে নির্ণয়ের উপায় কী?

উত্তর: ওপেন অনসেট গ্লুকোমা সাধারণত চল্লিশের কাছাকাছি সময়ে হয়। যারা চল্লিশ বছরের কাছাকাছি বয়সের তারা চক্ষু বিশেষজ্ঞের কাছ থেকে পরামর্শ নেবেন। চিকিৎসকও দেখবেন রোগটি হয়েছে কি না। আর রোগীও জানতে চাইবেন তাঁর রোগটি রয়েছে কি না।

আরও পড়ুনঃ   মাড়িরোগ প্রতিরোধ করা যায়

যদি কারো পরিবারে গ্লুকোমা থাকে, তাদের অবশ্যই ৪০ বছর বয়সের পর চোখ পরীক্ষা করতে হবে।

প্রশ্ন : গ্লুকোমার পরীক্ষা কত বছর পর পর করতে হয়?

উত্তর : যারা চাকরি করেন তাঁদের একটি বাৎসরিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে হয়। যাদের বয়স চল্লিশের বেশি প্রতি বছর তাদের চোখ পরীক্ষা করতে হবে। চোখের কোনো রোগ আছে কি না দেখতে হবে। এ ছাড়া আরেকটি বলব, ৪০ বছর বয়স হলে আমরা কাছে পড়তে পারি না, তখনও একটি পরীক্ষার প্রয়োজন হয়।

এ ছাড়া সরকারি বেসরকারি সংস্থা, গ্লুকোমা সোসাইটি- এদেরও বলব সারা দেশে রোগ নির্ণয়ের প্রক্রিয়া শুরু করা। গ্লুকোমা রোগের শুরুতে যদি রোগ নির্ণয় করা যায় এর চিকিৎসা করা সহজ হবে।

প্রশ্ন : গ্লুকোমা রোগীর চিকিৎসায় কী করে থাকেন?

উত্তর : গ্লুকোমা রোগ নির্ণিত হওয়ার পর বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসা রয়েছে। কিছু উপদেশ মেনে চলতে হয় তাদের। সকালবেলা কেউ কেউ একসাথে এক লিটার, দেড় লিটার পানি খেয়ে ফেলে। এটি ত্যাগ করতে হবে। উচ্চ রক্তচাপের জন্য বিটাব্লকার জাতীয় ওষুধ রাত্রে খাওয়া যাবে না। যাদের পরিবারে গ্লুকোমা আছে তাদের এই বিষয়ে সতর্ক করা।

আর চিকিৎসার ক্ষেত্রে লেজার চিকিৎসা রয়েছে। ওষুধের চিকিৎসা রয়েছে। অস্ত্রোপচার রয়েছে। এই তিন রকম চিকিৎসা গ্লুকোমায় করা হয়।

প্রশ্ন : গ্লুকোমা চিকিৎসা করলে লাভ কী? আপনি বলছিলেন নার্ভে একবার সমস্যা হলে সেটি ফিরে আসে না। তাহলে এর চিকিৎসার গুরুত্বটা কোথায়?

উত্তর : জিনিসটার গুরুত্ব এখানেই যে যখন রোগটি শুরু হয়, ধরেন একজনের ১০ ভাগ বা ২০ ভাগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, আধুনিক পরীক্ষার মাধ্যমে শুরুতেই রোগ নির্ণয় করা সম্ভব হয় এবং কতখানি ক্ষতি হয়েছে সেটিও বোঝা যায়। আমাদের দেশে শুরুতে গ্লুকোমা রোগ নির্ণয় করার সব ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা সম্ভব। গ্লুকোমা রোগ নির্ণয়ের জন্য সবাইকে সচেষ্ট হতে হবে। আর যাদের গ্লুকোমা রোগ ধরা পড়ে গেছে তাদের নিয়মিত ওষুধ নিতে হবে। ওষুধ না নিলে নীরবে নার্ভের ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। গ্লুকোমার কারণে নার্ভ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ওই অন্ধত্ব হলে আর দৃষ্টি ফেরানো যায় না।

চোখে গ্লুকোমা কি ও বোঝার উপায়

উচ্চ রক্তচাপ ও চোখের রোগ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

1 + twelve =