চিনি খাওয়া কি খারাপ?

0
51
চিনি খাওয়া

শাশ্বতী মাথিন:

অনেকেই চিনি বা মিষ্টিজাতীয় খাবার খেতে ভালোবাসেন। তবে বিশেষজ্ঞরা সব সময়ই বলেন, অতিরিক্ত চিনি খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ভালো নয়। 

গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজের খাদ্য ও পুষ্টিবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সৈয়দা তাবাসসুম আজিজ জানান, চিনি ক্ষুদ্র শিকলবিশিষ্ট দ্রবণীয় কার্বোহাইড্রেট। এর মধ্যে কার্বন, হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন থাকে। প্রাকৃতিক চিনি (আখ, বিভিন্ন ধরনের ফল) সুক্রোজ চিনি। এটা শরীরে গিয়ে সমপরিমাণ ফ্রুকটোজ ও গ্লুকোজে পরিণত হয়।

সৈয়দা তাবাসসুম আজিজ আরো জানান, আর একেবারে পরিশোধিত চিনিগুলোতে ফ্রুকটোজের পরিমাণ বেশি থাকে। প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া চিনিতে ফসফরাস, ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম পাওয়া যায়। এতে পেসটিসাইড থাকে না। 

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন বিভাগের ডিন অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ বলেন, সাধারণত মানুষ স্বাভাবিক চিনি খেলে ভালো। তবে চিনি বা মিষ্টিজাতীয় খাবার বেশি খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য সমস্যা তৈরি করে। যাদের পারিবারিকভাবে প্রবণতা রয়েছে ডায়াবেটিস হওয়ার, তাদের চিনি কম খাওয়া ভালো। এবং মাঝেমধ্যে শরীরের শর্করার মাত্রা পরীক্ষা করা প্রয়োজন। এ ছাড়া চিনি ওজন বাড়িয়ে দেয়। যাদের ওজন বেশি, তারা চিনি খাওয়া এড়িয়ে যাবে। ওজনাধিক্য লোকদের ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপের প্রবণতা বেশি থাকে। 

ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ আরো বলেন, সাধারণত একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ প্রতিদিন তিন থেকে পাঁচ চামচ চিনি খেতে পারে। 

সৈয়দা তাবাসসুম আজিজ বলেন, চিনিকে সাধারণত ১১ ভাগে ভাগ করা হয়। সেগুলো হলো : 

১. দানাদার চিনি 
একে টেবল সুগার বা হোয়াইট সুগার (সাদা চিনি) বলা হয়। এগুলো উচ্চমাত্রায় রিফাইন বা পরিশোধন করা থাকে। এগুলো সাধারণত পাওয়া যায় আখ, সুগার বিট ইত্যাদি থেকে। এ ধরনের চিনি ঘরোয়া রান্নাবান্নায় ব্যবহৃত হয়। 

২. সাসটার সুগার 
এটাও দানাদার রিফাইন বা পরিশোধিত চিনি। এটা হোয়াইট সুগারের তুলনায় বেশি পরিশোধিত থাকে। এ ধরনের চিনি সিরাপ আর ড্রিংক ককটেলে ব্যবহৃত হয়। 

আরও পড়ুনঃ   গুড় না চিনি, কোনটি বেশি উপকারী?

৩. কনফেকশনারস সুগার 
এটা গুঁড়ো চিনি। এটাকে টেন পারসেন্ট সুগারও বলা হয়। এটা বেক পণ্য ডেকোরেশনে (সজ্জায়), বরফ করার ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। আইস কিউব, ললির ক্ষেত্রে এটা ব্যবহার করা হয়। 

৪. পার্ল সুগার 
এটা অন্যান্য চিনির থেকে একটু শক্ত হয়। একটু ক্রিমি রঙের হয়। এটা উচ্চ তাপেও সহনশীল, গলে না। এটা প্রেসটি, কুকিজ, বাটার বান ইত্যাদিতে ব্যবহৃত হয়। 

৫. স্যানডিং সুগার 
এটাও তাপ সহনশীল। অন্যান্য চিনি থেকে দানাটা একটু বড়। কিছু কিছু বিস্কুটের ওপরে নতুন মাত্রা দিতে এবং মচমচে করার ক্ষেত্রে এটা ব্যবহার করা হয়। 

৬. কেইর (আখ) সুগার
এই চিনি আখ থেকে তৈরি হয়। এটা কম প্রক্রিয়াজাত চিনি। এই চিনি সবচেয়ে উৎকৃষ্টমানের। এটা শরীর সহজে শোষণ করতে পারে।

৭. ডিমেরারা সুগার 
এটাও কম প্রক্রিয়াজাত। এর দানাও বড়। গন্ধটা অন্য চিনি থেকে একটু ভিন্ন থাকে। দোকানের চা, কফি এগুলোকে মিষ্টি স্বাদের করতে সাধারণত এগুলো ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়া কেক, কুকিজে ব্যবহার করা হয়।

৮. টারবিনেডো সুগার 
এই চিনিও আখ থেকে পাওয়া যায়। বড় দানাদার এবং হালকা খয়েরি বর্ণের হয়। এই চিনি ক্যারামেল ফ্লেভারের হয়। এটা কোমলপানীয় শিল্পে ব্যবহার করা হয়। 

৯. মাসকোভাডো সুগার 
এটা অপ্রক্রিয়াজাত আখের চিনি। এখান থেকে মলাসেসকে (খাদ্য উপাদান) আলাদা করা হয় না। এটা গাঢ় অথবা হালকা দুটো বর্ণের হয়। একটু ভেজা ভেজা এবং আঠালো হয়। কড়া গন্ধের হয়। বালুর মতো হয়। বার-বি-কিউ বা মেরিনেট সুগারে এটা ব্যবহার করা হয়। 

১০. লাইট ব্রাউন সুগার 
এটা পরিশোধিত হোয়াইট সুগারের মধ্যে সামান্য পরিমাণ মলাসেস যোগ করা হয়। এটা ভেজা ভেজা এবং বালুর মতো হয়। ক্যারামেল ফ্লেভারের হয়। 

১১. ডার্ক ব্রাউন সুগার 
এটার গন্ধও অনেক কড়া থাকে। এটা এক ধরনের পরিশোধিত হোয়াইট সুগার। এর মধ্যে বেশি পরিমাণে মলাসেস যুক্ত থাকে। 

উপকারিতা

আরও পড়ুনঃ   ফরমালিনমুক্ত আম চিনবেন যেভাবে

চিনির রয়েছে অনেক উপকারিতা। চিনির বিভিন্ন উপকারিতা হলো : 

দ্রুত শক্তি দেয়
যখন শরীরে চিনির ঘাটতি হয়, তখন শক্তি কমে যায়। আর চিনি খেলে শরীর তাৎক্ষণিক শক্তি পায়। 

ত্বকের টোন ঠিক রাখে
এর মধ্যে রয়েছে গ্লাইকোলিক এসিড, যা ত্বকের টোনকে ঠিক রাখে। ত্বকের তৈলাক্ততার ভারসাম্য রক্ষা করে, দাগ দূর করতে সাহায্য করে। 

নিম্ন রক্তচাপ
চিনি নিম্ন রক্তচাপকে স্বাভাবিক হতে সাহায্য করে। নিম্ন রক্তচাপ হলে চিনির শরবত বা চিনি খাওয়া যেতে পারে। 

কাটাছেঁড়া
চিনির দানা যেকোনো কাটাছেঁড়া ক্ষেত্রে প্রলেপ হিসেবে লাগালে অ্যান্টিবায়োটিকের মতো কাজ করে। 

বিষণ্ণতা দূর করে
চিনি বিষণ্ণতা দূর করতেও সাহায্য করে।
 
অপকারিতা

চিনি খাওয়া শরীরের জন্য ভালো হলেও অতিরিক্ত চিনি গ্রহণ স্বাস্থ্যের জন্য ভালো নয়। চিনির বিভিন্ন অপকারিতা হলো:

লিভার
চিনির গ্লুকোজ শরীর শোষণ করে নেয়। তবে পরিশোধিত চিনিতে ফ্রুকটোজ বেশি থাকে। ফ্রুকটোজকে একমাত্র পরিশোধিত করতে পারে লিভার। লিভারে গিয়ে এই ফুকটোজ চর্বিতে পরিণত হয়। ফলে লিভার ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
 
বাজে কোলেস্টেরল বাড়ায়
বেশি চিনি খেলে শরীরে বাজে কোলেস্টেরলের পরিমাণ বেড়ে যায়। আর ভালো কোলেস্টেরলের পরিমাণ কমে যায়। 

চিনি ওজন বাড়িয়ে দেয় ও ডায়াবেটিস
চিনি ওজন বাড়িয়ে দেয়। তাই যাদের ওজন বেশি, তাদের চিনি খাওয়া এড়িয়ে যাওয়াই ভালো। চিনি বেশি খেলে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বেড়ে যায়। 

কিডনির রোগ
উচ্চমাত্রায় চিনি খেলে কিডনির নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে। বিশেষজ্ঞরা জানান, বেশি পরিমাণ চিনি বা মিষ্টিজাতীয় খাবার খাওয়া কিডনির জন্য ক্ষতিকর। বেশি চিনি খাওয়া কয়েক বছর পর কিডনিকে দুর্বল করে ফেলে এবং এর কার্যক্ষমতাকে নষ্ট করতে পারে।

ক্ষুধা কমে না
পরিশোধিত চিনি থেকে শরীর প্রচুর ক্যালরি পায়। তবে এতে ক্ষুধা মেটে না। কারণ, ক্ষুধা নিবৃত করার হরমোন গ্রেলিন চিনির ফ্রুকটোজে কাজ করে না। 

আরও পড়ুনঃ   যে খাবারগুলো কখনোই নষ্ট হবে না!

উচ্চ রক্তচাপ
বেশি চিনি খাওয়া দেহের রক্তচাপ বাড়িয়ে দেয়। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিদিন ৭৩ অথবা ৭৪ গ্রাম বা তার বেশি পরিমাণে চিনি খেলে দেহের রক্তচাপ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

আরও পড়ুনঃ গুড় না চিনি, কোনটি বেশি উপকারী?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

3 × 3 =