চুলকানি মানেই অ্যালার্জি নয়

0
চুলকানি ,অ্যালার্জি ,Allergy,itching

চুলকানি কোন রোগ নয়, বিভিন্ন রোগের উপসর্গ মাত্র। সাধারণের মাঝে ধারণা রয়েছে চুলকানি মানেই এলার্জি, বাস্তবে কিন্তু তা নয়। এলার্জিতে চুলকানি অবশ্যই একটা প্রধান উপসর্গ। কিন্তু এলার্জি ছাড়া বহু রোগ রয়েছে যেখানে চুলকানি উপসর্গ হিসেবে দেখা দিতে পারে। চুলকানি দু’ভাবে শরীরে দেখা দিতে পারে। সারা শরীর জুড়ে হতে পারে, আবার শরীরের নির্দিষ্ট স্থানে এর উপসর্গ সীমাবদ্ধ থাকতে পারে। অন্যদিকে চুলকানি যে শুধুমাত্র চর্মরোগই হবে তা নয়। চর্মরোগ ছাড়া দেহের ভেতর অবস্থিত বহু রোগও চুলকানি হতে পারে। সারাদেহে চুলকানি শব্দটি সাধারণত যখন ত্বকের প্রাথমিক কোন কারণ পাওয়া যাবে না। তখনই ব্যবহার করা যেতে পারে। কারণ সারাদেহে চুলকানি অথবা দেহের সামগ্রিক চুলকানি সমস্যা সাধারণত দেহের অভ্যন্তরীণ রোগের সাথে সংশ্লিষ্টতার কারণে হয়ে থাকে এবং এটা শতকরা ১০ ভাগ থেকে ৫০ ভাগ ক্ষেত্রে। যখনই সমগ্র দেহে চুলকানি দেখা দেবে তখনই নিজের কোন সমস্যা রয়েছে কিনা তা খতিয়ে দেখা দরকার। এজন্য নিম্নলিখিত উপসর্গগুলো বিবেচনায় আনা উচিত। যেমন- ত্বকের শুষ্ক হওয়াজনিত সমস্যার কারণে চুলকানি হতে পারে। এই সমস্যাটি অবশ্য মধ্যবয়স্ক বা বৃদ্ধদের বেলায় বেশি দেখা দিতে পারে। এক্ষেত্রে দেখা যাবে যে, ত্বক থেকে বেশি মরা চামড়া উঠে যাচ্ছে, অবশ্য অল্প মাত্রায়। এ ধরনের সমস্যায় তৈলাক্ত পদার্থের ব্যবহার, ইমলিয়েন্ট ব্যবহার করবেন এবং সাবান ব্যবহার বন্ধ রাখলে বেশ উপকার পাওয়া যেতে পারে। দু’ থেকে চার সপ্তাহের মধ্যে উন্নতি পরিলক্ষিত হবে। তারপরেও সমস্যা থাকলে অন্য কোন কারণ রয়েছে কিনা তা চিন্তা করতে হবে।
-লাল চাকা হয়ে যাওয়া সমস্যা যদি দেখা যায় তাহলে আমবাত রোগটির কথা চিন্তা করতে হবে। যদি বাহ্যিক কারণজনিত কোন ঠান্ডা, গরম, ব্যায়াম, রোদে যাওয়া, পানির সংস্পর্শ এগুলোর কারণ হয়ে থাকে তাহলে নির্দিষ্ট কিছু পরীক্ষার মাধ্যমে রোগ নির্ণয় করা সম্ভব।
-খুজলি, উকুন, সংস্পর্শজনিত একজিমা এসব কারণেও চুলকানি হয়। যদি উপরোক্ত ত্বক সমস্যার কারণে চুলকানি না হয়ে থাকে তাহলে দেহের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন রোগের জন্য রোগীকে ভালভাবে পরীক্ষা, পর্যবেক্ষণ, মূল্যায়ন ইত্যাদি করা ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের কেমিক্যাল, প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষার মাধ্যমে দেহের অভ্যন্তরীণ রোগ নির্ণয় করা প্রয়োজন।
-পিত্তনালী বাধাগ্রস্ত হওয়ার কারণে প্রচন্ড চুলকানি হাত-পায়ের তালুতে হতে পারে। এটা বিলিয়ারী সিরোসিস নামক রোগ অথবা ওষুধ ব্যবহারের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবেও হতে পারে। এ ধরনের রোগে বাইল সল্ট নামক পদার্থ ত্বকের নিচে জমা হয়ে চুলকানির সমস্যা সৃষ্টি করে থাকে। এ ক্ষেত্রে কলিস্টারামিন নামক ওষুধ প্রয়োগে চুলকানি উপসর্গ থেকে মুক্তি থাকা যায়। কিডনির অসুখে চুলকানি হতে পারে। দীর্ঘকালীন কিডনির কার্যকারিতা ব্যাহত হওয়া যাকে ক্রনিক রেনাল ফেইলুর বলা হয়ে থাকে। এ ক্ষেত্রে রোগের সাথে সারাদেহে চুলকানি সমস্যা দেখা দিতে পারে। এ রোগে চুলকানি ছাড়াও ত্বক শুষ্ক থাকবে। হাইপারপ্যারাথাইরয়েড রোগেও এ সমস্যা হতে পারে। এ ক্ষেত্রে প্যারাথাইরয়েড গ্রন্থির অপারেশন করতে হবে।
ক্রনিক রেনাল ফেইলুরের কিছু ক্ষেত্রে চুলকানির কারণ ব্যাখ্যা সম্ভব নাও হতে পারে। এ ধরনের ক্ষেত্রে আল্ট্রাভায়োলেট রশ্মির ব্যবহার, ওষুধ কলিসটাইমিন, চারকোল, আমিষ জাতীয় খাবার, বার্লি ইত্যাদির মাধ্যমে চুলকানি কমিয়ে আনা সম্ভব। ডায়ালাইসিস করার মাধ্যমে সবসময় চুলকানি মুক্ত থাকা সম্ভব নয় বরং কিছুটা ক্ষেত্রে বেড়েও যেতে পারে। সেই ক্ষেত্রে ডায়ালাইসিস প্রক্রিয়ায় ম্যাগনেসিয়ামের ব্যবহার কমিয়ে আনলে বরং কিছুটা উপকার পাওয়া যেতে পারে। তবে একটি কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, একিউট রেনাল ফেউলুরে কিন্তু চুলকানি থাকবে না। ডায়াবেটিস রোগে চুলকানি থাকতে পারে। যদিও শতকরা ১ ভাগ ডায়াবেটিস রোগীর ক্ষেত্রে দেখা যায়। ডায়াবেটিসে কেন চুলকানি হয়, এটা স্পষ্ট না হলেও ধারণা করা যায় ত্বক শুষ্ক থাকার কারণে এবং ডায়াবেটিস রোগীর স্নায়ু দুর্বলতার জন্য ত্বকে চুলকানি হতে পারে। থাইরয়েড গ্রন্থির রোগেও চুলকানি থাকতে পারে। থাইরয়েড গ্রন্থির রোগেও চুলকানি থাকতে পারে। এটা থাইরয়েড গ্রন্থির অতিমাত্রায় কার্যকারিতা যেমন চুলকানি উপসর্গ থাকতে পারে। অন্যদিকে থাইরয়েড গ্রন্থি কম কাজ করলেও ত্বক শুষ্ক হয়ে যেতে পারে এবং সে ক্ষেত্রে সারাদেহে চুলকানি হতে পারে। প্যারাথাইরয়েড গ্রন্থির রোগের কার্যকারিতা কম হওয়ার সমস্যা সমগ্র দেহে চুলকানি হতে পারে। রক্তের আয়রন কমে যাওয়ায় রক্তশূন্যতা রোগের চুলকানি হতে পারে। রক্তের লোহিহত কণিকার মাত্রা বেড়ে গেলেও চুলকানি হতে পারে। সে ক্ষেত্রে দেখা যাবে যে, গলা, মাথা ও হাতে পায়ে চুলকানি হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে মাঝে মধ্যে চুলকানি দেখা দেবে। যদি কখনও দেহে তাপমাত্রা হঠাৎ কমে যায় অথবা পানির সংস্পর্শে আসে তাহলে চুলকানি হতে পারে। এ ধরনের চুলকানিজনিত সমস্যা এসপিরিন জাতীয় ওষুধের কার্যকরি ভূমিকা রয়েছে। এছাড়াও কলিস্টাইরামিন, পিজোটিফেন, সাইমেটিডিন ওষুধের কার্যকারিতা রয়েছে। ক্যান্সার জাতীয় রোগের হজস্কিন ডিজিজ এই রোগটিকে চুলকানি তীব্র আকারে দেখা দিতে পারে। হিজকিন ছাড়াও আরো কিছু ধরনের ক্যান্সার জাতীয় রোগের চুলকানি হতে পারে। পরজীবী দ্বারা সংঘটিত রোগ যেমন বিভিন্ন ধরনের কৃমি রোগের চুলকানি হতে পারে। কিছু কিছু ওষুধ ব্যবহারেও চুলকানি হতে পারে। বিশেষ করে ম্যালেরিয়া রোগের ব্যবহৃত ওষুধ স্নায়ুতন্ত্রের রোগে ব্যবহৃত ওষুধ নারকোটিস্ক জাতীয় ওষুধ ইত্যাদি ব্যবহারের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে চুলকানি উপসর্গ হিসেবে দেখা দিতে পারে। এইডস রোগের চুলকানি সমস্যা বিশেষভাবে হতে পারে। উপরোক্ত বিভিন্ন রোগ ছাড়াও কিছু রোগ যাকে অটোইমিউন রোগ বলা হয়ে থাকে। এসব রোগের যেমন চুলকানি হতে পারে অন্যদিকে বিভিন্ন মানসিক রোগ ও স্নায়ণুরোগেও প্রচন্ড চুলকানি সামগ্রিক দেহের চুলকানি হতে পারে। অতএব চুলকানির সমস্যার জন্য কারণ অনুযায়ী ও রোগ অনুযায়ী চিকিৎসা করা প্রয়োজন। চুলকানি চিকিৎসায় কিছুটা স্বস্তি পেতে হলে এন্টিহিসটামিন জাতীয় ওষুধ ব্যবহারে উপকার পাওয়া যেতে পারে। ত্বক শুষ্ক থাকার কারণে চুলকানি হলে তৈলাক্ত পদার্থের ব্যবহার ইমলিয়েন্ট ব্যবহার আরামপ্রদ, ঠান্ডা পরিবেশ চুলকানি উপশমে উপকারী।
-ডা. এম ফেরদৌস
চর্ম, যৌন ও কসমেটিক বিশেষজ্ঞ
সহযোগী অধ্যাপক
চেম্বার : নাজ-ই-নূর হাসপাতাল, বাড়ি ৬৯, রোড ১৯
ধানমন্ডি, ঢাকা

আরও পড়ুনঃ   অ্যাজমা সম্পর্কে জানুন- হাঁপানি (অ্যাজমা) কি?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

eight + fifteen =