ডাক্তার ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কমিশন চুক্তি সম্পর্কে ইসলাম কী বলে?

0
doctor and diagonostic centre

মাওলানা মিরাজ রহমান : নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক লোক প্রশ্ন করে বললেন যে, ‘আমরা হিয়ারিং এইডের ব্যবসা করি। অর্থাৎ মানুষ কানে কম শুনলে অথবা অন্য কোনো সমস্যা থাকলে আমরা কানের পরীক্ষা করি এবং কানে কম শোনার মেশিন বিক্রি করে থাকি।
আমাদের এই ব্যবসায় সাধারণত নাক, কান, গলা বিভাগের ডাক্তারদের সাথে সম্পর্ক। আমাদের মার্কেটিংয়ের লোক বিভিন্ন হাসপাতাল বা চেম্বারে গিয়ে কান স্পেশালিস্ট ডাক্তারদের সাথে দেখা করেন এবং বলেন, স্যার! আমাদের কাছে রোগী পাঠাবেন। তখন ডাক্তারগণ আমাদের সাথে চুক্তি করেন। আমাকে কত পার্সেন্ট দিবেন। অমুক সেন্টার আমাদেরকে ৬০% দেয়। তখন আমাদের বাধ্য হয়ে বলতে হয় স্যার, তাহলে আমরা ৭০% পার্সেন্ট অথবা ৮০% দিব। এবং মাঝেমধ্যে বিভিন্ন গিফটও প্রদান করে থাকি। ব্যবসার খাতিরে আমাদের মন না চাইলেও এই কমিশন দিতে আমরা বাধ্য। এখানে উল্লেখ্য, কানের টেস্ট ফি নির্ধারিত এবং তা সব জায়গায় এক। এমন নয় যে, কমিশন দিতে হবে বিধায় রোগী থেকে বেশি ফি নিব। অবশ্য কোনো কোনো ডাক্তার খোদাভীরু, যারা বলেন, আমাকে যে কমিশন দিবেন সেটা রোগী থেকে কম নিবেন। তখন আমরা বলি, স্যার! আপনি এত পার্সেন্ট ডিসকাউন্ট এভাবে লিখে দিবেন আমরা কম নিব, ইনশাআল্লাহ। আমরা তাই করে থাকি। এখন আপনাদের নিকট জানার বিষয় হলো, ডাক্তারদের সাথে এমন লেনদেন করা কতটুকু শরীয়তসম্মত? যদি বলি, এই ব্যবসা ছেড়ে দিব তাহলে এটাই কি সমাধান? এভাবে সকলে ছেড়ে দিলে এই সেবা কে করবে?’
এ ব্যাপারে কোরআন-হাদিস অনুযায়ী ইসলামি বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য হলো, কোনো রোগী যখন ডাক্তারের কাছে নির্ধারিত চিকিৎসা ফি প্রদানের মাধ্যমে চিকিৎসা নেওয়ার জন্য আসে তখন ডাক্তারের দায়িত্ব হয়ে যায় রোগীকে সঠিক ব্যবস্থাপত্র প্রদান করা। এ ব্যবস্থাপত্র প্রদানের জন্য কখনো রোগীকে টেস্ট দেওয়ার প্রয়োজন হলে তা লিখে দেওয়া এবং কোথা থেকে তা করালে ভালো হবেÑ এটা বলে দেওয়াও ডাক্তারের ব্যবস্থাপত্র প্রদান সংক্রান্ত দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। যার জন্য রোগী ডাক্তারকে পূর্বেই নির্ধারিত ফি প্রদান করেছে।
সুতরাং প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে পরীক্ষার জন্য কোনো রোগীকে কোনো হিয়ারিং এইড সেন্টারে পাঠানোর প্রয়োজন হলে কোথায় পাঠালে ভালো হবেÑ এ বিষয়ে রোগীকে নির্দেশনা দেওয়া ডাক্তারের ব্যবস্থাপত্র প্রদান সংক্রান্ত দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। এ দায়িত্ব পালনের জন্য কোনো হিয়ারিং এইড সেন্টার থেকে ডাক্তারের কমিশন নেওয়া ঘুষের অন্তর্ভুক্ত হবে। আর ঘুষ নেওয়া যেমন হারাম তেমনি কাউকে ঘুষ দেওয়াও হারাম। হাদিস শরিফে আছে, আবদুল্লাহ ইবনে আমর রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘুষ দাতা ও গ্রহীতা উভয়ের উপর লানত করেছেন। [মুসনাদে আহমাদ : হাদিস নং ৬৫৩২]
আর এই কমিশনের বাইরে বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানী বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পক্ষ থেকে ডাক্তারকে যেসব উপহার দেওয়া হয় তা যদি নগদ অর্থ বা চেক হয় কিংবা বিদেশে যাওয়ার প্যাকেজ অথবা মূল্যবান কোনো ব্যবহার সামগ্রী ইত্যাদি হয় তাহলে তাও ঘুষের অন্তর্ভুক্ত। এগুলো গ্রহণ করা ডাক্তারের জন্য জায়েয নয়। অবশ্য ওষুধের সেম্পল কিংবা ওষুধের বিজ্ঞাপন সম্বলিত চিকিৎসার ব্যবহার সামগ্রী, যেমন কলম, খাতা, প্যাড, পেপারওয়েট ইত্যাদি নেওয়া ডাক্তারের জন্য জায়েয আছে। তবে ডাক্তারের জন্য এগুলো বিক্রি করে এর মূল্য ভোগ করা বৈধ হবে না।
উল্লেখ্য, ডাক্তারদেরকে কমিশন দেওয়ার এ প্রথাটি আগে ছিল না। এটি চালু করেছে কিছু অসাধু ডায়াগনস্টিক সেন্টার কর্তৃপক্ষ। তারা ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতায় অনৈতিক পথে আগায় এবং ডাক্তারদেরকে তাদের কাছে রোগী পাঠানোর জন্য কমিশন দেওয়ার প্রলোভন দেয়। প্রথমে এর পরিমাণ কম ছিল। পরে কমিশনের হার আকাশচুম্বী করা হয়। আর এ টাকার ভার রোগীদেরকেই বহন করতে হয়। এই অনৈতিক কাজের জন্য প্রাথমিকভাবে ওইসব অসাধু ডায়াগনস্টিক সেন্টার কর্তৃপক্ষই দায়ী। এই অবৈধ পন্থা চালু হওয়ার কারণে কোনো রকম গুণগত মান ছাড়াই রাতারাতি গজিয়ে উঠে অসংখ্য ডায়াগনস্টিক সেন্টার। যাদের মূল কামাইয়ের অধিকাংশ বা তারও বেশি ডাক্তারদেরকে কমিশন হিসেবে দিয়ে দিতে হয়।
বর্তমানে এর সমাধানও খুব কঠিন নয়। মানসম্মত ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো যদি ডাক্তারদেরকে কমিশন না দেওয়ার কথা ঘোষণা করে দেয়, সাথে টেস্টের ফিও স্বাভাবিক পর্যায়ে নিয়ে আসে এবং টেস্টের মানও উন্নত করে এবং রোগীদেরকে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা প্রদান করে তাহলে সহজেই ওই কমিশন পদ্ধতি বন্ধ হয়ে যাবে। এবং অন্যান্য ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোও ব্যবসায়িক খাতিরেই নিজেদের মান উন্নত করতে বাধ্য হবে এবং টেস্ট ফিও কমাবে। [মাআলিমুস সুনান : ৪/১৬১, আলমাবসূত সারাখসি : ১৬/৮২]
সম্পাদনা : আমিন ইকবাল

আরও পড়ুনঃ   খাদ্যে ভেজাল : ইসলামী দৃষ্টিতে মহা অপরাধ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

7 + two =