তালমিছরির গুণ: জেনে নিন তালমিছরির উপকারিতা

0
303
তালমিছরির উপকারিতা

তালমিছরি ছোট থেকে বড় সকলের কাছেই সমান ভাবে জনপ্রিয়। এটি যেমন খেতে ভালো তেমনি উপকারী। তালমিছরিকে’ ন্যাচারাল সুগার’ বলা হয়ে থাকে। কারণ এটি তৈরী হতে কোনোরকম কেমিকেল ব্যবহৃত হয় না। তালগাছের রস থেকে এই মিছরি তৈরী হয়। আমরা যে চিনি ব্যবহার করি তার তুলনায় তালমিছরিতে কার্বোহাইড্রেড অনেক কম থাকে। মিছরির ব্যবহার বহুদিন ধরেই হয়ে আসছে। নানা ধরনের আয়ুর্বেদিক ঔষধ হোক কি সাধারণ সর্দি কাশিতে, চিনির মিছরি বা তাল মিছরি সমান ভাবে আজও বিরাজমান বাংলার ঘরে ঘরে। তালুমিছরির কথা শুনলেই যাদের মনে পড়ে সুগার, প্রেশার বা চিনি খাওয়ার যে খারাপ দিকগুলি,তাদের অবগতির জন্য জানাই,বাজার চলতি চিনি আর মিছরির মধ্যে পার্থক্য আছে। ফলে মিছরির গুনাগুণ অপরিসীম।

তবে তার আগে আসুন জেনে নিই তালমিছরি বা চিনির মিছরি কীভাবে তৈরি হয়। তালমিছরি কিন্তু প্রাকৃতিক ভাবে তৈরি মিষ্টি। যাকে বলে আনপ্রসেসড সুগার। আজকাল সব ধরনের প্রসেসড খাবার এর বিরুদ্ধে সব ডাক্তার থেকে স্বাস্থ্য সচেতন মানুষ সরব। কিন্তু তালমিছরি এই দোষে দুষ্ট নয়। এতে কোনো রকমের ক্ষতিকর উপাদান মেশানো হয় না। ব্লাড সুগার বাড়ানোর জন্য যেটি দায়ী,সেই গ্লাইসেমিক ইন্ডেক্স (GI)স্বাভাবিকভাবে অন্যান্য খাবারে থাকে ৫৫%, কিন্তু তালমিছরিতে তার পরিমাণ মোটে ৩৫%। তাই তালমিছরি খেলে যাদের সুগার আছে তাদেরও সুগার লেভেল নিয়ন্ত্রণ এ থাকে। তবে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিয়েই খাবেন। যাদের সুগার নেই,তারা নিশ্চিন্তে এটি খেতে পারেন।

তালমিছরিতে থাকে খাঁটি তালের রস। সেই তাল গুড় জ্বাল দেওয়া হয় একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত। এরপরে সেটিকে ঢালা হয় ট্রেতে বা কোনো পাত্রে | এরপরে একটি নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় এই ট্রেগুলিকে চট দিয়ে ঢেকে রাখা হয় একটি বন্ধ ঘরে। সপ্তাহ খানেক পরে ওপরে ও নিচের অংশগুলি শুকিয়ে দানাতে পরিণত হয়,অর্থাত্‍ তালমিছরিতে পরিণত হয়। মাঝের লেয়ারটি তখনও নরম এবং জলীয় ভাব থাকে এবং সেটিকে বিশেষ উপায়ে আলাদা করে নেওয়া হয়। মিছরি তৈরি করার মরসুম মোটে চারটি। চৈত্রের মাঝামাঝি থেকে শ্রাবণের প্রথমার্দ্ধ,এই সময়েই বানানো হয় তালমিছরি। এভাবেই তৈরি হয় আমাদের অতিপরিচিত তালমিছরি।

আসুন,এবারে জেনে নেওয়া যাক,তালমিছরিতে কী কী আছে যার জন্য এটি এত উপকারী?

জানলে অবাক হবেন,তালমিছরিতে আছে প্রচুর পরিমাণে এসেনশিয়াল ভিটামিনস,মিনারেলস ( ক্যালশিয়াম,পট্যাশিয়াম,আইরন,জিঙ্ক,ফসফরাস ইত্যাদি) আর আমাইনো এসিডস। একটি অল্প লভ্য ভিটামিন, বি ১২,যা মূলত আমিষাশী খাবারেই পাওয়া যায়,তা পাওয়া যায় এই তালমিছরিতে। এ ছাড়াও এতে আছে ২৪ টি প্রাকৃতিক উপাদান,যার জন্য এটি প্রভূতভাবে আয়ুর্বেদিক ঔষধি তৈরির ক্ষেত্রে ব্যবহার হয়।

আরও পড়ুনঃ   আনারস ও দুধ একসাথে খেলে কী হয়?

তালমিছরির গুনাগুণ এবং তৈরির পদ্ধতি তো জানা গেল। এবারে আসুন,জেনে নিই,তালমিছরি কীসে কীসে ব্যবহার হয়? সেই ছোটবেলাতেই আগেকার দিনে বাচ্চাদের দেওয়া হতো তালমিছরির জল। গুড় চিনিতে কৃমির প্রকোপ বাড়ে। তাই তালমিছরিই ভরসা।
এক এক করে আসছি তালমিছরির নানা ধরনের উপকারিতাতে –

১) রক্তস্বল্পতায়: হ্যাঁ, ঠিকই পড়েছেন, তালমিছরি রক্তস্বল্পতা সমস্যা থেকে দূরে থাকতে সাহায্য করে। কারণ তালমিছরিতে থাকে আয়রন, যেটি রক্তের হিমোগ্লোবিন লেভেল ঠিক রাখতে গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান।

২) হাড়ের সমস্যা সমাধান: প্রচুর পরিমাণ ক্যালশিয়াম আর পোট্যাশিয়াম থাকার কারণে তালমিছরি হাড় ও দাঁত শক্ত করে ও হাড়ের সমস্যা দূর করে।মেয়েদের মেনোপজের পরে হাড় ক্ষয় হতে শুরু করে এবং হাড় ভাঙ্গার সমস্যা একটি দৈনন্দিন সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। এই ক্ষয় রোধ করতে নিয়মিত তালমিছরি সেবন করলে উপকার পাওয়া যায়। এই দুটি কারণের জন্য বাচ্চাদের জন্যও তালমিছরি খুব উপকারী।

৩) সর্দি কাশির উপশম: তালমিছরির রস কাশি উপশম করতে সাহায্য করে এবং গলায় শ্লেষ্মা নরম করে দেয়, ফলে গলায় খুসখুসানি কমে যায়।এক টুকরো তালমিছরি মুখে নিয়ে চুষলে সর্দিতে এবং কাশিতে আরাম পাওয়া যায়। খুব ছোট বাচ্চাদের জন্য ওষুধ না ব্যবহার করে তালমিছরির প্রয়োগ করে দেখতে পারেন। এটি ঠান্ডা লাগাও প্রতিরোধ করে। কাশতে কাশতে গলায় ব্যথা হলে এক টুকরো তালমিছরি গোলমরিচ আর ঘি দিয়ে পেস্ট বানিয়ে এক চামচ খেলে গলা ব্যাথায় উপকার মেলে। এক চামচ তালমিছরি,গোলমরিচ এবং আমন্ড-এর পেস্ট রোজ রাতে গরম দুধের সাথে খেলে নাকের শ্লেষ্মা বের করে দেয় এবং ঠান্ডা লাগা প্রতিহত করে।

৪) চোখের দৃষ্টি বাড়ায়: বাদাম,মৌরী,তালমিছরি এবং গোলমরিচ এর গুঁড়ো করে রোজ রাতে ১ চামচ করে দুধের সাথে খেলে তা চোখের দৃষ্টি বাড়ায়।

৫) কিডনি স্টোন এর জন্য: পেঁয়াজের রসের সাথে তালমিছরি মিশিয়ে কিছুদিন খেলে কিছুদিনের মধ্যেই প্রস্রাবের সাথে কিডনি স্টোন বেরিয়ে যায় । তালমিছরি কিডনির জন্য উপকারী।

৬) পেটে ব্যথা: তালমিছরি পেটের ব্যথার উপশম এবং পাতলা পায়খানাতে ভীষণ কার্যকরী । নিমপাতার সাথে তালমিছরি খেলে পেটের ব্যথা কমে। ধনে গুঁড়োর সাথে তালমিছরি গুঁড়ো মিশিয়ে জলের সাথে দিনে ২-৩ বার খেলে পাতলা পায়খানা আটকে যায়,বিশেষ করে গরম কালে হিট স্ট্রোক হলে এটি খুব কাজে লাগে।

৭) নাক দিয়ে রক্ত পড়া: অনেকেরই গরমকালে নাক দিয়ে রক্তপাত হয়। নাকের কাছে মিছরি গুঁড়ো করে শুঁকলে রক্তপাতের উপশম হয়।

8) মুখের আলসার: মুখের আলসারের জ্বালাতে উপশম পেতে তালমিছরি আর এলাচ গুঁড়ো করে পেস্ট করে মুখের ভেতরে লাগালে আরাম পাওয়া যায়। আলসার কমে। বাচ্চাদের জন্যও ব্যবহার করা যায়।

আরও পড়ুনঃ   মধুর দাম যত, গুণও তত

৯) নতুন মায়েদের জন্য: বলা হয়,ব্রেস্ট মিল্ক এর পরিমাণ বাড়ানোর জন্য তালমিছরি খুব উপকারী। কালো তিল এর সাথে তালমিছরি গুঁড়ো করে গরম দুধের সাথে দিনে দুবার খেলে ব্রেস্ট মিল্ক উত্‍পাদনে সহায়তা মেলে।

১০) মাথা ধরা: সাইনাসের জন্য বা চোখের জন্য মাথা ধরা খুব সাধারণ একটি ব্যাপার। বহু মানুষ এই সমস্যায় ভোগেন। আদার রসের সাথে তালমিছরি খেলে সাইনাস জনিত মাথাধরা থেকে উপশম মেলে। তুলসী পাতা, তালমিছরি আর গোটা মরিচ একসাথে খেলেও উপকার পাওয়া যায়।

১১) কন্সটিপেশন: তালমিছরিতে ডায়েটারি ফাইবারের প্রাচুর্যের জন্য এটি হজমে সাহায্য করে এবং কন্সটিপেশান সারিয়ে তোলে। এছাড়াও,চিনি বা মধুর তুলনায় তালমিছরি আমাদের শরীরে অনেক কম পরিমাণ কার্বোহাইড্রেট তৈরি করে,ফলে তালমিছরি সেবনে ক্লান্তি অনেক কম হয়, শরীরকে সতেজ রাখে।

১২) গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণ: তালমিছরিতে জি আই বা গ্লাইসেমিক ইনডেক্স এর পরিমান চিনি ,মধু ইত্যাদির থেকে অনেক কম থাকে,যার থেকে আমাদের শরীরে কার্বোহাইড্রেড কম তৈরী হয় ফলত এটি আমাদের রক্তে Glucose এর মাত্রা কে বাড়তে  দেয়না। এইকারণে এটি ডায়াবেটিস প্রতিরোধ এ সহায়তা করে।

১৩) ডায়রিয়াতে: বার বার পাতলা পায়খানা বা বমি হলে আমাদের শরীর থেকে ইলেক্ট্রোলের মাত্রা কমে যায়। ও আর এস এর পরিবর্তে তালমিছরি জলের সাথে মিশিয়ে বারে বারে খাওয়ালে এই ঘাটতি পূরণ হয় এবং শরীরে এনার্জি ফেরত আসে।

১৪) শিশুদের ব্রেন ডেভেলপমেন্ট: ছোট শিশুদের ব্রেন ডেভলপমেন্ট এর জন্য তালমিছরি অত্যন্ত উপযোগী। এছাড়া এটি নিয়মিত খেলে ছোট শিশুদের হাড় শক্ত হয়। এছাড়া ঠান্ডা জনিত রোগ হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে। কারণ এটি রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা বাড়িয়ে তুলতে সাহায্য করে। পেটের রোগ প্রতিহত করতে তালমিছরির জুড়ি নেই।

১৫) চিনির বিকল্প: তালমিছরি প্রাকৃতিকভাবে তৈরি মিষ্টি। এতে খুব কম পরিমাণে গ্লাইসেমিক ইনডেক্স (জিআই) থাকায় রক্তের সুগারের ওপর খুব কম প্রভাব পড়ে। ডায়াবেটিস সমস্যায় যাদের চিনি খাওয়ায় সমস্যা আছে, তারা এটি খেতে পারে।

১৬) কোষের সুরক্ষা: তালমিছরি তৈরী হতে কোনোরকম কেমিক্যাল ব্যবহৃত হয় না, উপরন্তু স্বাভাবিক ভাবেই এতে ভিটামিন, পটাসিয়াম, আয়রন, ফসফরাস, জিঙ্ক, ম্যাঙ্গানিজ এবং কপার ইত্যাদি জরুরি মিনারেলস থাকে যা আমাদের শরীরের কোষগুলিকে সুস্থ্য রাখে, এবং সুস্থ্য কোষ গঠনে সাহায্য করে। এছাড়া আমিনো অ্যাসিড শরীরে প্রোটিন ব্লক তৈরী করে যা কোষগুলিকে ঠিক  রাখতে সাহায্য করে।

আরও পড়ুনঃ   ধনেপাতা খাবেন কেন?

১৭) শরীরে এনর্জি: তালমিছরি  ORS এর পরিবর্তেও খাওয়া যেতে পারে। ডাইরিয়া বা বেশি বমি হতে থাকলে আমাদের শরীরে ইলেক্ট্রোল্যাটস এর পরিমান কমে যায়। ফলত আমাদের শরীর নিস্তেজ হয়ে পরে। তালমিছরি জলের সাথে মিশিয়ে খেলে আমাদের শরীরে এনর্জি ও ইলেক্ট্রোল্যাটস এর ক্ষয়কে পুষিয়ে, শরীরকে তাড়াতাড়ি সুস্থ্য করতে সাহায্য করে।

১৮) শরীরের জন্য ভালো :তালমিছরিতে প্রচুর পরিমানে ভিটামিন বি -১,ভিটামিন বি২, ভিটামিন বি ৩, ভিটামিন বি ৬, ভিটামিন বি ১২ থাকে। এছাড়া এতে অ্যামিনো অ্যাসিড, জিঙ্ক, পটাশিয়াম, এবং আয়রন থাকে। ফলত যে কোনো ক্ষেত্রেই এটি আমাদের শরীরের জন্য অত্যন্ত ভালো।

১৯) রোগের যম :এটি  হারবাল ওষুধ তৈরী করতে ব্যবহৃত হয়। এর বিভিন্ন উপাদান আমাদের অনেক রকম রোগের প্রতিরোধক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সর্দি কাশি হলে বা ঠান্ডা লেগে যে সমস্ত সমস্যা হয় তা প্রতিরোধ করতে তালমিছরি খাওয়া হয়। এছাড়া উচ্চ রক্তচাপ, এনিমিয় লোপ্রেসার এবং হাঁপানি ইত্যাদি রোগের ওষুধ তৈরী করতে তালমিছরি ব্যবহৃত হয়।

২০) ব্লাড সুগার লেভেলকে নিয়ন্ত্রণে রাখে: আগেই বলেছি তালমিছরি প্রাকৃতিক ভাবে তৈরি মিষ্টি। তাই এতে কোন ক্ষতিকর উপাদান নেই। এবং এতে খুব কম পরিমাণে গ্লাইসেমিক ইনডেক্স (GI) আছে। যেটার মাত্রা বেশি থাকলে ব্লাড সুগার লেভেল বাড়িয়ে দেয়। এটা সাধারণ খাবারে ৫৫% এর কম থাকলে তাকে কম পরিমাণ হিসাবে ধরা হয়। কিন্তু তালমিছরিতে আছে মাত্র ৩৫%। তাই এটি আপনার মিষ্টির চাহিদা পূরণ করার সাথে সাথে ব্লাড সুগার লেভেলকেও নিয়ন্ত্রণে রাখে। তাই নিশ্চিন্তে এটি খেতে পারেন।

২১) ক্লান্তি দূর করে: তালমিছরিতে ডায়েটারি ফাইবারের প্রাচুর্যের জন্য এটি হজমে সাহায্য করে এবং কন্সটিপেশান সারিয়ে তোলে। এছাড়াও চিনি বা মধুর তুলনায় তালমিছরি আমাদের শরীরে অনেক কম পরিমাণ কার্বোহাইড্রেট তৈরি করে, ফলে তালমিছরি সেবনে ক্লান্তি অনেক কম হয়, শরীরকে সতেজ রাখে।

১ তোলা তালমিছরি, একটি তেজপাতা ও একটি লবঙ্গ দু’কাপ পরিমাণ পানিতে গরম করে দু’বেলা খেলে সমস্ত পুরনো সর্দি উঠে আসবে। হাঁপানির টান বেশি থাকলে একদিন উপবাস করলে টান প্রশমিত হয়। উপবাসের সময় ঠাণ্ডা পানির পরিবর্তে ঈষদোষ্ণ গরম জলে লেবুর রস মিশিয়ে অল্প অল্প করে পান করতে হবে। এ সময় রোগীর বিশ্রাম নেয়া উচিত। উপবাসের পর সতর্কতার সাথে আহার করতে হয়। প্রয়োজনমতো দিনে ৩/৪ বার অল্প অল্প আহার করা উচিত।
আর্থারাইটিস,শ্বাসপ্রশ্বাস জনিত সমস্যা,স্মৃতিশক্তি বাড়ানোর জন্য ও তালমিছরি খুব উপকারী। তাই নানা ধরনের আয়ুর্বেদিক ওষুধে এই সব সমস্যার সমাধানের জন্য তালমিছরির ব্যবহার বহুদিনের।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

nine − seven =