থামানো যাচ্ছে না ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিকের দৌরাত্ম্য!

0
67
ক্লিনিক,হাসপাতাল , ডায়াগনিস্টক সেন্টার

জাকিয়া আহমেদ:

রাজধানীতে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে ক্লিনিক-হাসপাতাল ও ডায়াগনিস্টক সেন্টার। সামনে দেশের নামি চিকিৎসকদের নামফলক টানানো থাকলেও এসব প্রতিষ্ঠানে না আছে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, না আছে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি। আইসিইউ কক্ষে পড়ে রয়েছে ময়লা ফেলার ঝুড়ি, ঝাড়ু; দরজার পাশেই স্যু-সেলফ। নামসর্বস্ব অপারেশন থিয়েটারে নেই অত্যাবশ্যকীয় যন্ত্রপাতি। উন্নত চিকিৎসাসেবার নামে সরকারি হাসপাতাল থেকে রোগী ও স্বজনদের ভাগিয়ে এনে এসব হাসপাতাল-ক্লিনিকে ভর্তি করাচ্ছে এক শ্রেণির দালাল। আর তাতে করে চিকিৎসা পাওয়ার বদলে ভোগান্তি আর হয়রানি সঙ্গী হচ্ছে রোগী ও তার স্বজনদের।

স্বাস্থ্য অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫ সাল পর্যন্ত ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকাগুলোতে হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার গড়ে তোলার আবেদন জমা পড়েছে প্রায় সাড়ে তিন হাজার। অধিদফতরের হিসাব অনুযায়ী, এসব এলাকায় হাসপাতাল ও ক্লিনিক রয়েছে ৬১০টি, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ১৩শ’রও বেশি। আর স্বাস্থ্য অধিদফতরের ম্যানজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমের বার্ষিক হেলথ বুলেটিনের তথ্য অনুযায়ী, সারাদেশে অনুমোদিত হাসপাতাল ও ক্লিনিকের সংখ্যা চার হাজার ২৮০, ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সংখ্যা ৯ হাজার ৬১। তবে লাইসেন্সবিহীন হাসপাতাল, ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কোনও পরিসংখ্যান অধিদফতরে নেই।

এদিকে, বাংলাদেশ প্রাইভেট ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, সারাদেশে রেজিস্টার্ড হাসপাতাল-ক্লিনিক রয়েছে ৭শ’, ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে দুই হাজারের বেশি। এর মধ্যে কেবল রাজধানীতেই রেজিস্টার্ড বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিকের সংখ্যা ৬০ থেকে ৬৫টি।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের কর্মকর্তারা বলছেন, অনুমোদিত এ সংখ্যার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে সারাদেশে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তারা বলছেন, ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, পঙ্গু হাসপাতাল ও মানসিক হাসপাতালের বিপরীত দিকে মোহাম্মদপুরের বাবর রোড ও হুমায়ুন রোডেই রয়েছেন এমন অননুমোদিত অনেক হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। আবার ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালকে কেন্দ্র করেও পুরান ঢাকায় গড়ে উঠেছে অগুনতি হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশেই এসব হাসপাতাল থেকে মানহীন ও অননুমোদিত হাসপাতাল, ক্লিনিকে যেতে বাধ্য হয় রোগীরা।

আরও পড়ুনঃ   ছড়াচ্ছে মশা বাহিত রোগ, পরিদর্শনে স্বাস্থ্য কর্তারা

জানা গেছে, ব্যাঙের ছাতার মতো ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক সেন্টার যেন নতুন করে গড়ে উঠতে না পারে, সেজন্য সম্প্রতি স্বাস্থ্য অধিদফতর নতুন কয়েকটি শর্ত আরোপ করেছে। অধিদফতরের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোকে লাইসেন্স দেওয়া হচ্ছে ‘দ্য মেডিক্যাল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিস (রেজুলেশন) অর্ডিনেন্সে’র আওতায়। এই অর্ডিনেন্সের বাইরে ক্লিনিক ও হাসপাতালগুলোকে লাইসেন্স নিতে হলে চারটি নতুন শর্ত পূরণের বাধ্যবাধকতা দিয়েছে অধিদফতর। এছাড়াও, ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর জন্য তিনটি এবং ব্লাড ব্যাংকের জন্য নতুন পাঁচটি শর্ত যোগ করা হয়েছে। এসব শর্ত সব ঠিকঠাক থাকলেই কেবল লাইসেন্স পাওয়া যাবে।

বেসরকারি হাসপাতালের দৌরাত্ম্য রোধে এরইমধ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় একটি কমিটিও গঠন করেছে। হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর ফি নির্ধারণ, সমস্যা খুঁজে বের করাসহ তাদের মান উন্নয়নে কাজ করার কথা এই কমিটির।

তবে স্বাস্থ্য অধিদফতরের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা জানান, রাস্তার ধারে সুযোগ-সুবিধাহীন এসব ডায়াগনস্টিক সেন্টার আর ক্লিনিক নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রচলিত অর্ডিন্যান্সের সংস্কার করতে হবে। কারণ, পুরনো এই আইন দিয়ে সঠিকভাবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব নয়। একইসঙ্গে কেবল এই কাজের জন্যই আরও জনবলের প্রয়োজন বলে দাবি করেন তারা।

অনুমোদনহীন হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার সম্পর্কে জানতে চাইলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা এসব হাসপাতালের বিরুদ্ধে কথা বলছি, ব্যবস্থা নিচ্ছি। কিন্তু কোনোভাবেই তাদেরকে রোধ করা যাচ্ছে না। তবে এবার সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে। অনুমোদনহীন কিংবা অভিযোগ রয়েছে— এমন বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর বিরুদ্ধে আমরা যুদ্ধ ঘোষণা করছি। কোনোভাবেই তাদেরকে ছাড় দেওয়া হবে না। মানুষকে জিম্মি করে তারা ব্যবসা করতে পারবে না। বারবার তাদেরকে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। এবার আমরা ব্যবস্থা নেবো।’

স্বাস্থ্য অধিকার আন্দোলনের সভাপতি এবং বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশীদ-ই মাহবুব বলেন, ‘এসব বেসরকারি ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো কোনোভাবেই রোগীর সেবা করছে না। তারা রীতিমতো ব্যবসা করছে। আর তাদের এই ব্যবসার বলি হচ্ছেন দেশের সাধারণ মানুষ।’

আরও পড়ুনঃ   সংকটে বাগেরহাট সদর হাসপাতাল

স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) ডা. কাজী জাহাঙ্গীর হোসেন এ বিষয়ে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ব্যাঙের ছাতার মতো হাসপাতাল-ক্লিনিক-ব্লাডব্যাংক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার যেন না গড়ে উঠতে পারে, সেজন্য আমরা নতুন করে কয়েকটি শর্ত আরোপ করেছি। সবগুলো শর্ত পূরণ করলেই কেবল তারা লাইসেন্স পাবে।’

বাংলাদেশ প্রাইভেট ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ও শমরিতা হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ বি এম হারুন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সঠিকভাবে ইক্যুইপ্ট না হয়ে, সরকারের অনুমোদন ছাড়া যেসব হাসপাতাল-ক্লিনিক সারাদেশে গড়ে উঠেছে, তাদের অবিলম্বে বন্ধ করে দেওয়া হোক। কারণ, এদের জন্য আমাদের সুনাম নষ্ট হচ্ছে। এরা আমাদের অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য না। এমনকি সদস্য হওয়ার যোগ্যতাও এরা রাখে না। সরকারের অনুমোদন না নিয়ে যেসব প্রাইভেট হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে, তাদের সঙ্গে আমরা কিংবা আমাদের সংগঠন নেই। এরা চিকিৎসার নামে অপচিকিৎসা করছে, সুবিধার নামে হয়রানি করছে।’

আপনাদের সংগঠনের পক্ষ থেকে এসব অনুমোদনহীন হাসপাতাল-ক্লিনিকগুলোর বিরুদ্ধে কখনও কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কিনা, জানতে চাইলে এ বি এম হারুন বলেন, ‘স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে একাধিক বৈঠকে আমরা আমাদের অবস্থান জানিয়েছি। সেখানে পরিষ্কারভাবে আনরেজিস্টার্ড হাসপাতাল-ক্লিনিক বন্ধ করতে বলেছি। অননুমোদিত ব্লাড ব্যাংকগুলোকেও বন্ধ করে দেওয়ার কথা আমরা বলেছি।’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

1 × one =