প্যারাসিটামল খাবেন, নাকি খাবেন না

0
286
প্যারাসিটামল

জ্বর রোগ নয়, রোগের উপসর্গ। অনেকে জ্বর হলেই নিজে নিজে প্যারাসিটামল খায়। কিংবা যে কোন ধরনের ব্যাথায় প্যারাসিটামলই আমাদের একমাত্র ভরসা। কোনো চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই আমারা খুব সহজে ফার্মেসি থেকে প্যারাসিটামল কিনে ফেলতে পারি। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, সব ধরনের প্যারাসিটামলই কি খাওয়া ঠিক?
দেশে গত জুলাই মাসে জাতীয় ওষুধ নিয়ন্ত্রণ কমিটির ২৪৪তম সভায় এক ধরনের প্যারাসিটামলে অনুমোদন বাতিল করা হয়েছে। সাধারণ অনেকেই মনে করছেন, প্যারাসিটামলই বুঝি নিষিদ্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু বাস্তবতা আসলে তা নয়। প্যারাসিটামল ৫০০ মিলিগ্রাম ও ডি-এল মেথিওনিন ১০০ মিলিগ্রামের যৌগ হয়ে যে প্যারাসিটামল তৈরি হয়, সেটিই ওই ওষুধ নিয়ন্ত্রণ কমিটির সভায় নিষিদ্ধ করা হয়। প্যারাসিটামল হলো এসিটামিনোফেন নামক এক ধরনের প্রদাহবিরোধী রাসায়নিক পদার্থ। প্রাথমিক পর্যায়ের জ্বর ও ব্যথা-বেদনা কমাতে এটি সাহায্য করে। জ্বর ও ব্যথা-বেদনার সাথে সংশ্লিষ্ট রোগটি কমাতে পরবর্তীতে এটির সাথে বিভিন্ন উপাদান ব্যবহার করা হয়, যেমন ক্যাফেইন, ডি-এল মেথিওনিন ইত্যাদি।
কিন্তু এক সময় প্রমাণিত হলো যে, ডি-এল মেথিওনিন ব্যবহার করলে তা উপকারের পরিবর্তে বরং ক্ষতিই করে। কারণ ডি-এল মেথিওনিনে থাকা মেথিওনিন হৃদরোগ, ক্যানসার, যকৃতের সমস্যা, মস্তিষ্কের ক্ষতি ও রক্তের অম্লতা বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি করে। এছাড়া ১২ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য মেথিওনিনযুক্ত প্যারাসিটামল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
জাতীয় ওষুধ নিয়ন্ত্রণ কমিটির ডি-এল মেথিওনিন যুক্ত প্যারাসিটামলই নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তাই ওষুধ কেনার আগে ওষুধের প্যাকেটে এর উপকরণের নাম দেখে তবেই কিনুন। মনে রাখবেন, শুধু প্যারাসিটামল কখনোই নিষিদ্ধ নয়।

এ বিষয়ে কথা বলেছেন ডা. প্রদীপ রঞ্জন সাহা। বর্তমানে তিনি ইউনাইটেড হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগে পরামর্শক হিসেবে কর্মরত আছেন।

প্রশ্ন : জ্বর বলতে আমরা কী বুঝি।

উত্তর : বলা হয়, শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি পেলে সেটি জ্বর। তবে স্বাভাবিকটি কী? এটি নির্ভর করে লিঙ্গ কী, বয়স কত, বাইরের তাপমাত্রা কত, শারীরিক অবস্থা কী? এসবের ওপর। তবে আমরা যেটা প্র্যাকটিস করি মুখের তাপমাত্রা যদি ৯৯.৯ বা তার বেশি হয়, আমরা তখন তাকে জ্বর বলি। নয়তো নয়।

আরও পড়ুনঃ   যেভাবে বুঝবেন খাবারে অ্যালার্জি আছে, থাকলে করণীয়

অ্যাডাল্ট মেডিসিনের অধিকাংশ লোক এটি বিশ্বাস করে। তবে এটি আদর্শ নয়। যদি বয়স্ক লোক হয়, এটি আরো নিচে নেমে যেতে পারে। ৯৮ দশমিকের কিছু বেশি বা ৯৯ হতে পারে। তবে প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে মুখের তাপমাত্রা যদি ৯৯.৯ হয় সেই ক্ষেত্রে আমরা জ্বর বলছি।

প্রশ্ন : আমাদের মধ্যে একটি প্রবণতা দেখা দেয় যে জ্বর হলেই দেখা যায় প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধ খেয়ে নিচ্ছে, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই- এ ক্ষেত্রে আপনার কী পরামর্শ।

উত্তর : যদি সাধারণ জ্বর থাকে, জ্বরের সঙ্গে অন্য কোনো বড় ধরনের উপসর্গ নেই, বড় ধরনের খারাপ কোনো লক্ষণ নেই, প্যারাসিটামল আপনি খেতে পারেন। তবে যদি না আপনার আগে থেকে লিভার, কিডনি সংক্রান্ত রোগে না ভোগেন। যদি লিভার সংক্রান্ত রোগে ভোগেন তাহলে প্যারাসিটামলের পরিবর্তে আইবোপ্রোফেন আপনি খেতে পারেন।

প্রশ্ন : জ্বরের ক্ষেত্রে একটি জিনিস দেখা যায়, দু-দিনতিন অপেক্ষা করার পর অ্যান্টিবায়োটিক খেয়ে নিচ্ছে। সেই ক্ষেত্রে আপনার পরামর্শ কী?

উত্তর : সে ক্ষেত্রে আমি বলব রোগীর তরফ থেকে প্যারাসিটামল উনি শুরু করল, কিন্তু অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করা তার জন্য ঠিক সমুচিত হবে না। যদি ডাক্তারের কাছে যাওয়ার পর তিনি এমন কোনো লক্ষণ দেখেন যে ব্যাকটেরিয়া ইনফেকশন হয়েছে বলে চিকিৎসকের কাছে অনুমান হয়েছে, সেখানে চিকিৎসক অ্যান্টিবায়োটিক দিতেই পারে। দেখা যায়, গলায় দুটো টনসিল ফুলে আছে, সেখানে ডাক্তার প্রথম দিনে আপনাকে অ্যান্টিবায়োটিক দিতেই পারে। তবে ডাক্তার যদি এমন কিছু না পান তাহলে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া ঠিক হবে না।

আমার অভিজ্ঞতায় আমরা জিজ্ঞেস করি আপনি কি জ্বর কখনো মেপে দেখেছেন? বলল, আমি দেখিনি। আমাদের চিকিৎসা বিজ্ঞানে অনেক কিছু মাপতে পারি, অনেক কিছু মাপতে পারি না। আবার জ্বর মাপতে পারি, প্রেসার মাপতে পারি, দৃষ্টিশক্তি মাপতে পারি। তবে অনুভূতি মাপার তো কোনো উপায় নেই। এই সমস্ত ক্ষেত্রে আমার যে পরামর্শ জ্বর জ্বর ভাব বলছে, তবে অন্যান্য সিস্টেমিক কোনো বিষয় নেই। সে ক্ষেত্রে আমি যেটি বলি, একটা চার্ট দিয়ে দিই। যে এই সময়ে এই তারিখে জ্বরগুলো দেখে রেকর্ড করে নিয়ে আসেন। তখন আমি এবং আমার রোগী বসে শেয়ার করব কোনটিকে জ্বর বলতে চান? বিশেষ ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় রক্তচাপ হয়তো ভালো নেই। হয়তো সে কোনো কারণে বিরক্ত। অনেক কারণেই আপনার হালকা জ্বর জ্বর ভাব লাগতে পারে। কারো ওপর রেগে গেলেন, তখনো কিন্তু জ্বর জ্বর লাগতে পারে। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কোনো কারণ পাওয়া যায় না। এখানে আসলে মানসিক চিকিৎসা প্রয়োজন।

আরও পড়ুনঃ   যে ভিটামিনগুলো একসাথে খেলেই বিপদ!

প্রশ্ন : আমরা জানি জ্বর কোনো রোগ নয়, রোগের উপসর্গ। তা হলো জ্বর হলে কি আমরা পরবর্তীকালে বড় কোনো রোগের আশঙ্কা করব?

উত্তর : আসলে তো এখন অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার সুযোগ চলে আসছে। আমরা এগুলো ব্যবহার করতে পারি। আমাদের শাস্ত্রে একটি বিষয় আছে, জ্বর কিন্তু কারণ জানি না। অধিকাংশ রোগী ভালো হয়ে যায়। তবে সামান্য কিছু রোগীর ক্ষেত্রে সব পরীক্ষা করার পরও আমরা কারণ নির্ণয় করতে পারি না। সেখানে রোগীর সঙ্গে চিকিৎসকের একটি দ্বন্দ্ব শুরু হয়ে যায়। এত বড় পণ্ডিত, এত ব্ড় জায়গায় আসলাম। কিন্তু আমার জ্বর তো সারাতে পারছে না। যদি ১০১-এ বেশি জ্বর, তিন সপ্তাহের বেশি, এক সপ্তাহ হাসপাতালে থেকে সব পরীক্ষা করার পরও কারণ নির্ণয় করতে না পারি, ফিবার অব আননোন অরিজিন। মানে জ্বর, তবে এর কারণ জানি না। সেখানে আমাকে প্যারাসিটামল দেওয়া এবং পর্যবেক্ষণ করা ছাড়া আমার কিছু করণীয় নেই। প্রথম পরীক্ষায় হয়তো কিছু আসেনি। দ্বিতীয় বা তৃতীয়বারের পরীক্ষায় হয়তো কিছু আসবে। প্রথমবারে হয়তো কিছু পেলান না, পরে কোনো কিছু আসবেই। তাই অপেক্ষা করতে হবে। তবে চিকিৎসকরা অপেক্ষা করার জন্য প্রস্তুত তবে রোগীরা অপেক্ষা করতে চায় না।

প্রশ্ন : সেই ক্ষেত্রে রোগীদের আপনারা কীভাবে পরামর্শ দেন?

উত্তর : আমি ব্যক্তিগত জীবনে যেটা করি, রোগীদের বসাই, সব পরীক্ষাগুলো নিয়ে বসি, এগুলো দেখিয়ে রোগীকে আমরা যতদূর সম্ভব বোঝানোর চেষ্টা করি। এটা সুখের কথা যে মোটামুটি আমরা সময় দিলে রোগীরা বোঝে। যদি আমি রোগীকে পয়েন্ট টু পয়েন্ট বুঝাই, এখানে দ্বন্দ্ব দেখা দিতেই পারে। তখন চিকিৎসককে দোষারোপ করা স্বাভাবিক। অস্বাভাবিক কিছু নয়। কারণ উনি তো মেডিকেল প্রফেশনের নয়। আমি মনে করি, আমি সময় দিয়ে যদি ওনাকে বোঝাই, অর্থাৎ পয়েন্ট আউট করি, আমার মনে হয় যে উনি বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বুঝবেন। দু-এক ক্ষেত্রে তো ব্যতিক্রম হতে পারে।

আরও পড়ুনঃ   এক মিনিটে যাচাই করুন আসল মধু!

সতর্কতা: যেকোনো ওষুধ সেবন করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্যারাসিটামল-জাতীয় ওষুধ কেনার আগে অবশ্যই ওষুধের গায়ে লেখা পড়ে নিন। প্রত্যেক ওষুধের প্যাকেটে এর উপকরণের নাম ও পরিমাণ লেখা থাকে। প্যারাসিটামল ও ডি-এল মেথিওনিনের মিশ্রণ বা কম্বিনেশনের ওষুধ এড়িয়ে চলুন।

আখের রসের গুণাগুণ-আখের রসের ২১টি উপকারিতা!

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

seventeen + 10 =