মৌরির ২০টি দারুণ ব্যবহার জেনে নিন

0
950
মৌরির উপকারিতা

মৌরি খনিজ লবণসমৃদ্ধ একটি বীজ। খাওয়ার পর অনেকে এক চিমটি মৌরি চিবিয়ে থাকেন। অনেকের মতে, এতে মুখটা একটু স্বস্তি পায়। এই মৌরির যে গুণ মেলা, তা কিন্তু অনেকেরই জানা নেই। তামা, পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম, জিঙ্ক, ম্যাংগানিজ, ভিটামিন সি, আয়রন, সেলেনিয়াম আর ম্যাগনেশিয়ামের মতো খনিজ উপাদান আছে মৌরিতে। এর এই গুণাগুণ নিয়ে আজকের প্রতিবেদন।

দৃষ্টিশক্তির উন্নতি ঘটায়:

মৌরিতে রয়েছে প্রচুর মাত্রায় ভিটামিন এ এবং বেটা ক্যারোটিন , যা দৃষ্টিশক্তির উন্নতি ঘটানোর পাশাপাশি নানাবিধ চোখের সমস্যাকে দূরে রাখতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে। এছাড়াও এর ভিটামিন সি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।  সেই সঙ্গে গ্লকোমা সম্পর্কিত নানা লক্ষণ কমাতেও সাহায্য করে। চোখের সমস্যা গ্লুকোমা দূর করতে মৌরির চা কার্যকর।

প্রস্রাবের সমস্যা দূর করে:
মৌরির চা তৈরি করে পান করা যায়। মৌরির চা নিয়মিত খেলে শরীর থেকে বিষাক্ত পদার্থ দূর হয়ে যায় এবং প্রস্রাবের সমস্যা দূর হয়। এটি মূত্রবর্ধক হিসেবে কাজ করে। এটি শ্বাস-প্রশ্বাসের সমস্যা দূর করতেও উপকারী।

নিঃশ্বাসে দুর্গন্ধ দূর করতে:
নিঃশ্বাসে দুর্গন্ধ হয়েছে? নিয়মিত সামান্য পরিমাণে মৌরি খান। এতে আপনার শ্বাস পরিষ্কার হবে।

রক্তকে পরিশুদ্ধ করে:

মৌরিতে যে তেল ও তন্তু থাকে, তা রক্ত থেকে বিষাক্ত পদার্থ দূর করতে পারে। শরীর থেকে বিষাক্ত পদার্থ দূর করে শরীরকে সুস্থ থাকতে সাহায্য করে। শ্বাস-প্রশ্বাস, খাবার এবং আরও নানাভাবে সারা দিন ধরে নানা ধরনের ক্ষতিকর টক্সিক উপাদান আমাদের শরীরে প্রবেশ করে থাকে। এই টক্সিক উপাদানগুলি বেশি সময় আমাদের শরীরের এদিক-সেদিক ঘুরে বেরালে নানা ধরনের ক্ষতি হয়ে যায়। তাই তো টক্সিক উপাদানদের শরীর থেকে যত দ্রুত সম্ভব বের করে দেওয়াই শ্রেয়। আর এই কাজটি করতে আপনাকে সাহায্য করতে পারে মৌরি। এই প্রকৃতিক উপাদানটি নিয়মিত খাওয়া শুরু করলে শরীরে ফাইবার এবং এসেনশিয়াল অয়েলের মাত্রা বাড়তে শুরু করে, যা শরীর থেকে টক্সিক উপাদানদের বের করে দিতে বিশেষ ভূমিকা নেয়।

রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে:

ফুড সায়েন্সে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, মৌরি চিবোলে লালায় নাইট্রেটের পরিমাণ বেড়ে যায়, যা প্রাকৃতিক উপায়ে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এ ছাড়া এতে পটাশিয়াম থাকায় কোষ ও রক্তরসের জন্য দরকারি উপকরণ হিসেবে ভূমিকা রাখে। হৃৎস্পন্দনকে নিয়ন্ত্রণে রাখতেও মৌরি কার্যকর ভূমিকা রাখে। মৌরি রক্তকে  পরিষ্কার রাখতেও সাহায্য করে। এবং এটি শরীর থেকে ক্ষতিকর টক্সিন বার করে শরীরকে সুস্থ রাখে।

 মাউথ ফ্রেশনার হিসেবে:
মৌরি মাউথ ফ্রেশনার হিসেবে অত্যন্ত কার্যকর। মৌরিতে এমন কিছু উপাদান থাকে যা নিজস্ব সুগন্ধের জোরে মুখ থেকে খাবারের গন্ধ (তা সে সুগন্ধ বা দুর্গন্ধ যা-ই হোক না কেন) দূর করতে সক্ষম। মৌরির এই গুণের কথা জেনেই, খাওয়ার শেষে মৌরি মুখে দেওয়ার রীতি চালু হয়েছিল।

আরও পড়ুনঃ   কফি গুঁড়োর এই ৫টি ব্যবহার আপনি জানেন কি?

বদ-হজম দূর করে/হজম শক্তি বৃদ্ধি:

পেট পরিষ্কার রাখার ওষুধ তৈরিতে একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো মৌরি। আর এটি পেটের গ্যাস যেমন দূর করে তেমন হজমের গণ্ডগোলও দূর করতে সহায়তা করে। মৌরি চিবোলে মুখ থেকে যে লালা ক্ষরিত হয় তা হজমে সাহায্য করে। পাশাপাশি ‌মৌরিতে যে ফাইবার থাকে তা যেমন খাদ্যকে পাচনতন্ত্র বেয়ে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে তেমনই তা কোষ্ঠবদ্ধতার ওষুধ হিসেবেও কার্যকর। হজম ক্ষমতা কমে গেলে আজ থেকেই মৌরি ভেজানো পানি বা সরাসরি মৌরি খাওয়া শুরু করুন। দেখবেন উপকার মিলবে। কারণ মৌরির মধ্যে থাকা এস্ট্রাগল, ফেঙ্কন এবং অ্যানথল নামক উপাদান, পেটের অন্দরে প্রদাহ তো কমায়ই, সেই সঙ্গে পাচক রসের ক্ষরণ এতটা বাড়িয়ে দেয় যে গ্যাস-অম্বল এবং বদ-হজমের মতো সমস্যা একেবারে কমে যায়। সেই সঙ্গে হজম ক্ষমতারও উন্নতি ঘটে। অর্থাৎ মৌরিতে হজম শক্তি বাড়ে। খাবার হজম করতে সাহায্য করে। গ্যাসের সমস্যয় দারুন উপযোগী। এক গ্লাস জলে সারা রাত মৌরি ভিজিয়ে রেখে সেই জল খেলে পেট ফাঁপা ও গ্যাসের কারণে হওয়া পেট ব্যাথা কমে। এছাড়াও অন্যান্য পেটের সমস্যা নিয়ন্ত্রণ করতেও সাহায্য করে মৌরি।

কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে:
মৌরির চা হজম প্রক্রিয়ার জন্য দারুণ ওষুধ। পেটের সমস্যা ও কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধে মৌরির তেলের বিশেষ উপকারী গুণ আছে। গ্যাস্ট্রিক এনজাইম তৈরিতে এই মৌরি কার্যকর ভূমিকা রাখে। সুতরাং প্রতিদিন সকালটা যদি প্রচন্ড যন্ত্রণা দিয়ে শুরু হয়, তাহলে আজ থেকেই মৌরি খাওয়া শুরু করুন। দেখবেন অস্বস্তি কমতে সময় লাগবে না। আসলে এর মধ্যে থাকা বিশেষ এক ধরনের তেল বর্জ্যের উৎপাদন বাড়িয়ে দেয় ফলে কোষ্ঠকাঠিন্য মতো সমস্যা কমতে সময় লাগে না।

সাইনাসের সমস্যা দূর করে:

দেখা গেছে মৌরি সাইনাসের সমস্যা দূর করতেও উপযোগী। কারণ এতে থাকে ফাইটোনিউট্রিয়েন্ট যা সাইনাসের সমস্যাকে নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে। এছাড়াও হাঁপানির সমস্যা, ব্রঙ্কাইটিসের সমস্যা দূর করতেও সাহায্য করে মৌরি।

ত্বক ও চুলের স্বাস্থ্য রক্ষা করে:

মৌরির বীজ আয়রন ও ডি কমপ্লেক্স ভিটামিন সমৃদ্ধ যা ত্বক ভালো রাখতে সাহায্য করে। এতে জিংক ও সেলেনিয়াম থাকে যা অকালপক্কতা দূর করে চুলকে শক্তিশালী করে, চুলের ফলিকল মসৃণ করে ও দ্রুত বড় হতে সাহায্য করে। ব্রণ দূর করার ক্ষমতা আছে মৌরির। নিয়মিত মৌরি খেলে শরীরে জিঙ্ক, ক্যালসিয়াম ও সেলেনিয়ামের মতো উপাদান যুক্ত হয়। এটি হরমোন ও অক্সিজেনের ভারসাম্য রক্ষা করে। ত্বককে ঠান্ডা করে ও ত্বকের ঔজ্জ্বল্য বাড়াতে সাহায্য করে। এছাড়াও ব্রণর সমস্যা দূর করতেও সাহায্য করে।

আরও পড়ুনঃ   অজানা গুণে ভরা মৌরি-মৌরি খাওয়ার অনেক উপকারিতা

শরীরে পানি জমার আশঙ্কা কমে:
নিয়মিত মৌরি দিয়ে বানানো চা খেলে একদিকে যেমন দেহের অন্দরে অতিরিক্ত পানি জমার সম্ভাবনা কমে, তেমনি রক্তে মিশে থাকা টক্সিক উপাদানেরা শরীর থেকে বেরিয়ে যেতে শুরু করে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই রোগভোগের আশঙ্কা অনেক কমে যায়। এবার নিশ্চয় বুঝেছেন তো সুস্থভাবে বাঁচতে মৌরি খাওয়ার প্রয়োজন কতটা।

অ্যাজমা ও শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা দূর করতে:

মৌরিতে আছে ফাইটোনিউট্রিয়েন্ট যা সাইনাস পরিষ্কার রাখে এবং তা সাইনাসের সমস্যা দূর করতে পারে।  এবং এটি অ্যাজমার রোগীদের স্বস্তি দেয়। ব্রঙ্কাইটিস ও কফের সমস্যা দূর হয় মৌরির চা খেলে। হাঁপানির সমস্যা সমাধানেও মৌরি থেকে উপকার পাওয়া যাবে। মৌরির অন্দরে থাকা ফাইটোনিউট্রিয়েন্টস ফুসফুসের কর্মক্ষমতা তো বাড়ায়ই, সেই সঙ্গে শ্বাস প্রশ্বাসের প্রক্রিয়া যাতে ঠিক মতো হয়, সেদিকে খেয়াল রাখে। ফলে শ্বাস কষ্ট এবং ব্রঙ্কাইটিসের মতো রোগের প্রকোপ কমতে সময় লাগে না। প্রসঙ্গত, কফ এবং সর্দি-কাশির প্রকোপ কমাতেও এই প্রকৃতিক উপাদানটি বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে।

স্তন্যদানকারী মায়ের জন্য:

আমরা মৌরি, জিরা, জোয়ান ইত্যাদির পানি স্তন্যদানকারী মাকে দিয়ে থাকি কারণ এটা দুধের উৎপাদন বাড়ায় ও খাওয়াতে সাহায্য করে।

ব্রণ নিয়ন্ত্রণে:
মৌরিতে রয়েছে অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট গুণ। আর এ কারণে এটি দেহের সংক্রমণের বিরুদ্ধে যেমন কাজ করে তেমন দেহের ব্রণ সমস্যাও কমায়।

ওজন কমাতে:

যদি দ্রুত শরীর থেকে বাড়তি মেদ কমাতে চান তাহলে প্রতিদিন সকালে মৌরি বীজ ভেজানো পানি পান করুন। এটা বিপাকের হার বাড়ায় এবং চর্বি খরচ করতে সাহায্য করে যা ওজন কমানোর সহায়ক। তাছাড়া এটা ক্ষুধা কমাতেও ভালো কাজ করে।

পেটের চর্বি নিয়ন্ত্রণ করতে:
অনেকেরই পেটে বাড়তি চর্বি জমে যায়। এ সমস্যা দূর করতে পারে নিয়মিত মৌরি সেবন। এ জন্য প্রতিদিন সামান্য মৌরি, জিরা ও মেথির গুঁড়া একত্রিত করে উষ্ণ পানিতে মিশিয়ে পান করা যেতে পারে।
 খাবারের স্বাদ বাড়াতে:
আপনার যেকোনো রান্না খাবারের স্বাদ বাড়াতে পারে মৌরি। এ জন্য আপনি মৌরি এয়ারটাইট পাত্রে সংরক্ষণ করতে পারেন। রান্নার সময় এটি যে খাবারেই দেবেন, তারই স্বাদ বেড়ে যাবে।

ফোলাভাব কমায়:

মৌরি মুত্রবর্ধক এবং শরীরের অতিরিক্ত তরল বের করে দিতে সাহায্য করে। এটা এনজাইমকে সক্রিয় করে হজম ক্রিয়া উন্নত করতে সাহায্য করে। তাই এটা খাবারের পরে খাওয়া উপকারী। অ্যান্টি-স্পাসমোডিক এবং অ্যান্টি-ইনফ্লামাটরি উপাদান থাকায় মৌরির চা ও পানি কোষ্ঠকাঠিন্য ও পেটের সমস্যা দূর করতে সাহায্য করে।

আরও পড়ুনঃ   ডায়াবেটিসের প্রাকৃতিক চিকিৎসা -ভেষজ চিকিৎসায় ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করুন

ক্যান্সার প্রতিরোধক:

ক্যান্সারের সমস্যাতেও মৌরির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ত্বক, স্তন ও পেটের ক্যানসার তৈরিতে যেসব উপাদান কাজ করে, তা ঠেকাতে পারে মৌরির প্রভাব। দেহে ক্যান্সারকে ছড়িয়ে পড়তে দেয় না। আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে মৌরিকে ‘মঙ্গলকর’ উপাদান হিসেবে বর্ণনা করা হয়। বিভিন্ন খাবারে তাই মৌরি মসলা হিসেবে ব্যবহার করা হয়। উদ্ভিজ্জ নয় এমন খাবার রান্না করা ও গরম করা হলে তা বাতাসে ক্যান্সার উৎপাদক উপাদানের সৃষ্টি করে। যার ফলে ক্যান্সার রোগ দেখা দেয়। মৌরি শরীর থেকে এসকল বিষাক্ত উপাদান বের করে দিতে ও ক্যান্সার প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে।

রাশি মৌরির চা:

রাশি মৌরি, একটি ছোট্ট চিরহরিৎ গাছ। এটি প্রধানত চীনের স্থানীয় ফল। পরিপাক যন্ত্রণার যেমন পেট খারাপ, ডায়রিয়া, বমি বমি ভাব ইত্যাদির চিকিত্সার জন্য এই ফলটি ব্যবহার করা হয়। রাশি মৌরির চা হজমের সকল সমস্যার উপশম করে। হজমের সমস্যা সমাধান করে এই চা আপনাকে শারীরিক দিক থেকে প্রতিটি খাদ্য থেকে পুষ্টি যোগানোতে সহায়তা করে। এতে করে শারীরিক গঠন ঠিক হয়। রাশি মৌরির চা তৈরি অত্যন্ত সহজ। রাশি মৌরি ফলটির একটি সম্পূর্ণ শুঁটি থেকে এই চা তৈরি করা হয়ে থাকে। একটি সম্পূর্ণ শুঁটি ১০ মিনিটের জন্য এক কাপ গরম পানিতে ডুবিয়ে রাখা হয়। ১০ মিনিট পরে এতে মধু মিশিয়ে নেয়া হয়। ব্যস তৈরি হয়ে গেল স্বাস্থ্যকর মৌরি চা।

মৌরির চা বিষয়ে একজন অভিজ্ঞতা থেকে উত্তর দিয়েছে নিম্নরুপঃ
চা বানাতে চাইলে মৌরিগুলোকে আগে চুলোর উপর তাওয়াতে রেখে শুকিয়ে নিতে হবে।তবে কেন শুকাতে হয় তা জানিনা,মাকে দেখতাম এরকম করত তাই বলছি।এরপর নরমাল চা বানানোর মতই ফুটন্ত পানিতে ছেড়ে দিতে হবে।পাচ-সাত মিনিট পর নামিয়ে কাপে ঢেলে নিতে হবে।এই চায়ের একটা বিশেষত্ব হলো,ছাকনি দিয়ে ছেঁকে নেয়ার কোনো প্রয়োজন নেই।পুরোটাই ঢেলে নেওয়া যায়।আর এটা চিনি বা মধু দিয়ে খেতে চাইলেও খাওয়া যায়। চা-টা খেতে কিন্তু খারাপ লাগে না।

বিঃদ্রঃ অনেকেই প্রতিদিন এক অথবা দুই টেবিল চামচ মৌরি খাওয়ার পরামর্শ দেন। সবসময় পাওয়া যায় বলে চাইলে সারা বছর ধরেই এটা খাওয়া যায়।

সাধারণ একটি ব্যবহার পদ্ধতিঃ
সকালে খালি পেটে ও রাত্রে আহারের পূর্বে কুসুম গরম পানিসহ সেব্য।

 আরও পড়ুনঃ অজানা গুণে ভরা মৌরি-মৌরি খাওয়ার অনেক উপকারিতা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

2 × 4 =