রক্তশূন্যতার কারণ ও করণীয়

0
199
রক্তশূন্যতা

রক্তশূন্যতা বিশ্বব্যাপী একটি স্বাস্থ্য সমস্যা। পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার ৩০ ভাগ মানুষ জীবনের কোনো না কোনো সময়ে রক্তশূন্যতায় ভুগে থাকেন। এই স্বাস্থ্য সমস্যাটি পুরুষদের তুলনায় নারীদের মধ্যে অনেক বেশি।

তবে রক্তশূন্যতা বা এ্যানিমিয়া কোনো অসুখ নয়। এটি অসুখের পূর্ব লক্ষণ বা উপসর্গ মাত্র। রক্তশূন্যতা মানে রক্ত কমে যাওয়া নয়, বরং রক্তের উপাদান লোহিত কণিকায় হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ কমে গেলেই রক্তশূন্যতা দেখা দেয়। বিশেষ করে গর্ভবতী মায়ের অধিক মৃত্যুহারের অন্যতম কারণ এই ‘রক্তশূন্যতা’। রক্তশূন্যতা বিভিন্ন কারণে হতে পারে। উল্লেখযোগ্য কারণগুলো হল—

(ক) দেহে আয়রনের অভাবজনিত রক্তশূন্যতা

(খ) থ্যালাসেমিয়া

(গ) এপ্লাস্টিক এ্যানিমিয়া

(ঘ) অন্যান্য হিমোলাইটিক এ্যানিমিয়া,

(ঙ) ব্লাড ক্যান্সার বা লিউকোমিয়া

রক্তশূন্যতার সংজ্ঞা

বয়স ও লিঙ্গ অনুযায়ী রক্তে প্রয়োজনীয় পরিমাণ হিমোগ্লোবিনের চেয়ে কম হিমোগ্লোবিন থাকার অবস্থাকে রক্তশূন্যতা বা এ্যানিমিয়া বলে।

প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের রক্তে হিমোগ্লোবিনের স্বাভাবিক মাত্রা ১৫.৫ ক্ট ২.৫ গ্রাম/ ১০০ মিলিলিটার এবং প্রাপ্তবয়স্ক মহিলার রক্তে এর মাত্রা ১৪ ক্ট ২.৫ গ্রাম/ ১০০ মিলিলিটার।

রক্তশূন্যতার কারণ

বহুবিধ কারণে রক্তশূন্যতা দেখা দিতে পারে। এগুলোর মধ্যে প্রধান ৩টি কারণ হল—

ক) অস্থিমজ্জায় লোহিত কণিকা কম তৈরি হওয়া। এর কারণগুলো হল—

১. অস্থিমজ্জার স্বল্পতা

২. লৌহ, ভিটামিন বি১২ অথবা ফলিক এসিডের অভাব (মাসিক, গর্ভধারণ, সন্তান প্রসব, দীর্ঘদিন রক্তক্ষরণ)

৩. দীর্ঘস্থায়ী জীবাণু সংক্রমণ, থাইরয়েড গ্রন্থির অসুখ বা লিভারের অসুখ, বিভিন্ন প্রকার ওষুধ সেবন, কীটনাশক ওষুধের ব্যবহার, রঞ্জন রশ্মি বা তেজষ্ক্রিয় রশ্মির প্রভাব ইত্যাদি।

খ) অতিরিক্ত পরিমাণে লোহিত কণিকা ভেঙ্গে যাওয়ার কারণগুলো হল—

১. জন্মগতভাবে লোহিত কণিকাতে ত্রুটি যেমন— থ্যালাসেমিয়া

গ) অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণগুলো হল—

১. সাময়িক ও দীর্ঘস্থায়ী রক্তক্ষরণ যেমন— আঘাতজনিত কারণ।

২. পেপটিক আলসার, পাইলস, বক্র কৃমির সংক্রমণ, ঘন ঘন গর্ভধারণ ও প্রসব, মহিলাদের মাসিকের সময় অধিক রক্তক্ষরণ ইত্যাদি।

রক্তশূন্যতার স্বাভাবিক লক্ষণ

সামান্য পরিমাণ রক্তশূন্যতায় তেমন কোনো উপসর্গ দেখা দেয় না। রক্তশূন্যতা প্রকট হলে নিচের উপসর্গগুলো দেখা দিতে পারে—

ক) অবসাদ, দুর্বলতা, ক্লান্তি

খ) বুক ধড়ফড় করা

গ) স্বল্প পরিশ্রমে শ্বাসকষ্ট

ঘ) মাথা ঝিমঝিম করা

ঙ) চোখে ঝাপসা লাগা

চ) মাথা ব্যথা করা

ছ) হাতে পায়ে ঝিনঝিন করা, অবশ ভাব হওয়া

জ) হাত, পা, সমস্ত শরীর ফ্যাকাসে হয়ে আসা

এ ছাড়া লৌহের অভাবজনিত কারণে রক্তশূন্যতা হলে যা আমাদের দেশে বেশি দেখা যায়—

ঝ) অস্বাভাবিক খাদ্যের প্রতি আসক্তি জমায়

ঞ) মুখের কোণায় ঘা হয় (Stomatitis)

ট) জিহ্বায় ঘা বা প্রদাহ (Glossitis)

ঠ) খাদ্য গিলতে অসুবিধা (Dysphagia)

ড) নখের ভঙ্গুরতা ও চামচের মতো আকৃতির নখ হয়ে যাওয়া

ঢ) থ্যালাসেমিয়াতে চেহারার আকৃতি মঙ্গোলীয় জাতির মতো দেখায় ও চাপা দেখা যায় (Mongoloid Facies)

রক্তশূন্যতায় করণীয়

রক্তশূন্যতার উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া বাঞ্চনীয়। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী কিছু পরীক্ষা করানো যেতে পারে। যেমন—

ক) রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা (Hb%)

খ) পেরিফেরাল ব্লাড ফিল্ম (PBF)

গ) অস্থিমজ্জা পরীক্ষা (Bone marrow examination)

ঘ) মাথার এক্স-রে (X-ray of Skull)

ঙ) প্রয়োজন ভেদে কিছু বায়োকেমিক্যাল পরীক্ষা ইত্যাদি।

রক্তশূন্যতার জন্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার সময় প্রথমে রোগীর রক্তশূন্যতা প্রকৃতপক্ষে আছে কি-না তা নিরূপণ করতে হয়। যদি রক্তশূন্যতা থাকে তবে রক্তশূন্যতার কারণ যাচাই এর জন্য আরও কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা যেতে পারে। যেমন—

চ) রক্তশূন্যতার উপসর্গের চিকিৎসা

ছ) খাদ্যে যে যে উপাদানের ঘাটতির জন্য রক্তশূন্যতা হয়েছে সে উপাদানের ঘাটতিপূরণ।

জ) যে শারীরিক ত্রুটি বা অসুস্থতার জন্য রক্তশূন্যতা দেখা দিয়েছে সে রোগের চিকিৎসা করানো।

লৌহের অভাবজনিত কারণে রক্তশূন্যতা দেখা দিলে (যেমন— খাদ্যে ঘাটতি, বক্রকৃমির সংক্রামক, পেপটিক আলসার এর রক্তক্ষরণ ইত্যাদি) আয়রন ট্যাবলেট খেতে হবে।

ভিটামিন বি১২ বা ফলিক এসিডের অভাবে উক্ত উপাদানের ঘাটতি পূরণ করতে হবে। যে কোনো কারণেই হোক যদি রক্তশূন্যতা অত্যন্ত প্রকটভাবে দেখা দেয় তবে অল্প সময়ে সাময়িক উন্নতির জন্য রক্ত পরিসঞ্চালন করা জরুরি হয়ে পড়ে এবং এ জন্য হাসপাতালে ভর্তি হওয়া প্রয়োজন। প্রেক্ষাপটে গর্ভবতী ও স্তন্যদায়ী মা এবং শিশুদের অধিকাংশই সাধারণ রক্তশূন্যতার শিকার। রক্তশূন্যতা রোধে গর্ভবতী মা, শিশুদের লৌহসমৃদ্ধ খাবার বেশি করে খেতে দিতে হবে। কালো কচু, ধনেপাতা, কাটা নটে, ডাঁটা শাক, আমচুর, পাকা তেঁতুল, ছোলা শাক, ফুলকপি, আটা, কালোজাম, চিড়া, শালগম, কলিজা, চিংড়ি এবং শুঁটকি মাছেও আয়রন রয়েছে। তাই এগুলো মা ও শিশুকে খেতে দিতে হবে।

গর্ভবতী মাকে গর্ভের চতুর্থ মাস থেকে আয়রন ট্যাবলেট খেতে দিতে হবে। শিশুর কৃমি রক্তশূন্যতার অন্যতম কারণ। তাই কৃমি প্রতিরোধে ব্যবস্থা নিতে হবে।

পরিশেষে, কেউ কেউ শরীর দুর্বল হলে বা ফ্যাকাসে হলেই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিজেরাই আয়রন সিরাপ বা ট্যাবলেট খেয়ে থাকেন। এটা ঠিক নয়, এতে ক্ষতির সম্ভাবনাই বেশি যেমন—থ্যালাসেমিয়া।

থ্যালাসেমিয়াতে রক্তশূন্যতা হয় ঠিকই কিন্তু আয়রনের অভাব হয় না। বরং আয়রন জমা হয়ে অসুবিধার সৃষ্টি হয়। এক্ষেত্রে রক্তের প্রয়োজন। সর্বোপরি অসুখ হলেই নিজের ইচ্ছামতো কোনো ওষুধ খাওয়া ঠিক হবে না, অসুখের সঠিক কারণ বের করে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা করাতে হবে।

প্রধান প্রধান রক্তশূন্যতাজনিত রোগ

দেহে আয়রনের অভাবজনিত রক্তশূন্যতা : অধিকাংশ মানুষই দেহে আয়রনের অভাবজনিত কারণে রক্তশূন্যতায় ভুগে থাক। অনুন্নত অপরিচ্ছন্ন, স্বাস্থ্য সচেতনতাবর্জিত জনপদে এ রোগের প্রকোপ খুব বেশি। আয়রন বা লোহ ঘাটতির প্রধান কারণসমূহ নিম্নরূপ—

ক) উঠতি বয়সী শিশুদের খাবারে প্রয়োজনমতো আয়রন না থাকলে

খ) মহিলারা তাদের গর্ভাবস্থায়, সন্তান জন্মদানের পরেও শিশুকে দুগ্ধ পানের সময়ে প্রয়োজনীয় আয়রন সমৃদ্ধ খাবার না খেলে

গ) কৃমি দ্বারা সংক্রমিত হলে

ঘ) পেপটিক আলসার ডিজিস

ঙ) পাইলস হেমরয়েড

চ) ক্রনিক লিভার ডিজিস

ছ) পাকস্থলী ও অন্ত্রের ক্যান্সার

জ) পাকস্থলীর অপারেশনের পর

লক্ষণ

ক) রক্তশূন্যতার সাধারণ লক্ষণ (পূর্বে আলোচিত)

খ) মুখের কর্নারে ঘা

গ) খাবার গিলতে অসুবিধা

ঘ) নখগুলো শুকনো, ভঙ্গুর ও চামচের মতো হয়ে যাওয়া

ঙ) চূড়ান্ত পর্যায়ে পায়ে পানি আসা (Generalized Oedema)।

চিকিৎসা প্রণালী

চিকিৎসক প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করে প্রথমে কারণ বের করেন এবং সেই অনুযায়ী চিকিৎসা দিয়ে থাকেন

ক) Cap Feplus ২০০সম ০+১+০ (রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ স্বাভাবিক হওয়ার পর আরও ৩ মাস খেতে হবে)

খ) কৃমির সংক্রামণ থাকলে ট্যাবলেট এলবেনডাজল ১+০+১ (৩ দিন)

গ) অন্যান্য কারণ ধরা পড়লে সে অনুযায়ী চিকিৎসা করাতে হবে

থ্যালাসেমিয়া

এটা একটি জন্মগত সমস্যা, যা প্রয়োজনমতো হিমোগ্লোবিন সংশ্লেষণ না হওয়ার জন্য হয়। এ রোগের লক্ষণ উল্লেখ করা হল—

ক) সাধারণত বাচ্চা বয়সেই এ রোগের লক্ষণ প্রকাশ পেয়ে থাকে

খ) শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়

গ) রোগী সবসময় বিষণ্ন থাকে এবং আশপাশের লোকদের জ্বালাতন করে

ঘ) রক্তশূন্যতার সাধারণ লক্ষণসমূহ প্রকাশ পায় (পূর্বে আলোচিত)

ঙ) খাওয়ায় অরুচি এবং ঘন ঘন ডায়ারিয়া ও জ্বর হওয়া

চ) অনেক সময় পেটে চাকা দেখা দিতে পারে

ছ) যৌনাঙ্গের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়

আরও পড়ুনঃ   যে ছয় কারণে রক্ত দেয়া যায় না !

জ) মুখের আকৃতি অনেকটা মঙ্গোলিয়ানদের মতো হয়ে যায়

ঝ) দেহের আকৃতি স্বাভাবিকের চেয়ে ছোট হয়

ঞ) অনেক সময় জন্ডিস দেখা দিতে পারে

ট) যৌন কেশরাজি ও বগলের নিচে চুলের পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে কম থাকে

ঠ) যকৃতে প্লিহা বড় হয়ে যায়।

চিকিৎসা

ক) নিয়মিত রক্ত পরিসঞ্চালন করা

খ) রোগ-সংক্রান্ত প্রতিকার ও প্রতিরোধ করা

গ) অনেক ক্ষেত্রে প্লিহা অপারেশন করে ফেলে দিতে হয়

ঘ) অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন করা।

প্রতিকার

ক) রক্তসম্পর্কীয় আত্মীয়দের মধ্যে বিয়ে প্রথা বন্ধ করা

খ) বাচ্চা গর্ভে থাকাকালীন জেনেটিক পরীক্ষা করে প্রয়োজনমতো গর্ভপাত করা

এপ্লাস্টিক এ্যানিমিয়া

জন্মগত ও জন্মপরবর্তী কোনো কারণে অস্থিমজ্জা শুকিয়ে গেলে এ রোগ দেখা দেয়। চীন দেশে এ রোগের প্রকোপ অনেক বেশি।

এপ্লাস্টিক এ্যানিমিয়া রোগের লক্ষণ

ক) রক্তশূন্যতার সাধারণ লক্ষণ (পূর্বে আলোচিত)

খ) ঘন ঘন জ্বর, মুখে ঘা, গলা ব্যথা, মুখে ও গলায় সাদা দাগ দেখা দেওয়া।

গ) দেহের বিভিন্ন জায়গায় রক্তক্ষরণজনিত লক্ষণ প্রকাশ পাওয়া যেমন—ত্বকের নিচে লালচে দাগ, নাক দিয়ে রক্ত পড়া, দাঁতের মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়া, প্রস্রাব ও পায়খানার সাথে রক্ত যাওয়া, মাসিকের সময় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ।

চিকিৎসা

(ক) রক্ত পরিসঞ্চালন ও সংক্রমণ প্রতিকার ও প্রতিরোধ

(খ) বয়স ২০ বছরের নিচে হলে অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন

(গ) বয়স্ক রোগীদের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের ইমিউনোসাপ্রেসিভ থেরাপি দেওয়া হয়

লিম্ফোমা বা লসিকা গ্রন্থির ক্যান্সারই

লিম্ফোমা রক্তের এক ধরনের ক্যান্সারজাতীয় রোগ। এই রোগে শরীরের লিম্ফনোড বা লসিকা গ্রন্থিগুলো অস্বাভাবিকভাবে বড় হয়। লিম্ফোমা নিয়ে আলোচনা করার আগে লিম্ফোটিক সিস্টেম কি তা জানা দরকার।

লিম্ফ

মানুষের শরীরে বিদ্যমান এক ধরনের তরল পদার্থ বা টিস্যু ফ্লুইড (Tissue fluid), যা দেহের ভিতরে কোষকলার মধ্যবর্তী স্থানে পাওয়া যায় এবং এই তরল পরবর্তী সময়ে লিম্ফোটিক সিস্টেম বা লসিকা নালীতে প্রবেশ করে। লিম্ফ বা লসিকা বিবিধ প্রোটিন, ব্যাকটেরিয়া, ক্যান্সার কোষসহ বিভিন্ন ধরনের পদার্থ পরিবহন করে থাকে।

লিম্ফোটিক সিস্টেম বা লসিকাতন্ত্র

এটি একটি আবদ্ধ নালীতন্ত্র (closed system of vessel) শরীরের কোষকলা এবং রক্ত জালিকার চারপাশে বিদ্যমান থাকে। এই নালীতন্ত্র শরীরের লিম্ফ নামক তরল পদার্থ পরিবহন করে এবং সবশেষে রক্ত সরবরাহতন্ত্রের সাথে মিশে যায়। সুতরাং এটি দেহে ভেনাস সিস্টেমের বিকল্প পথ হিসেবে কাজ করে। এই প্রবাহপথে লিম্ফোটিক বা লসিকা রালি ছোট বড় বিভিন্ন আকার-আকৃতির লিম্ফনোড বা লসিকাগ্রন্থির সাথে যুক্ত হয়। যাতে লিম্ফ বা লসিকা পরিশোধিত এবং নতুন নতুন লিম্ফকোষ সংযুক্ত হয়।

কাজ

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে লিম্ফ বিভিন্ন ধরনের প্রোটিন ফ্ল্যাট পরিবহন করে রক্তে নিয়ে যায়। বিশেষ করে দেহের খাদ্যনালীর সাথে সংযুক্ত লিম্ফোটিক নালী এই কাজ করে। অন্যান্য কাজের মধ্যে শরীরে রোগ প্রতিরোধ ব্যাকটেরিয়া নিধনসহ ক্যান্সার কোষ পরিবহনে এই লিম্ফ বা লসিকার বিশেষ ভূমিকা আছে।

লিম্ফোমা

লন্ডনের বিখ্যাত মেডিক্যাল ছাত্র Tomas Hodgkin (১৭৯৮-১৮৬৬) যিনি প্রথম ইংল্যান্ডে স্টেথোস্কোপ ব্যবহার করেন, তিনিই সর্বপ্রথম এই রোগ বর্ণনা করেন ১৮৩২ সালে। তাঁর নামানুসারে এই লিম্ফোমা (Lymphoma) কে দুই ভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে। যদিও লিম্ফোমার পরবর্তী ভাগসমূহ এখনো প্রশ্নসাপেক্ষ। তাই মূলত Hodgkin’s নামে প্রচলিতভাবে এই রোগ বিভক্ত আছে।

মানবদেহে অনেক কারণে লিম্ফনোড বা লসিকা গ্রন্থি অস্বাভাবিকভাবে বড় হয়। তার মধ্যে টি.বি. লিম্ফোমা, লিউকেমিয়া, মেটাস্টাটিক ক্যান্সার, ব্যাকটেরিয়া-ভাইরাসজনিত ইনফেকশন, অটোইম্যুন ডিজিজ অন্যতম। অনেক সময় ফেনাইটয়িন (phynytoin) নামক এক ধরনের ওষুধ খাওয়ার কারণে লিম্ফনোড বড় হতে পারে। কিন্তু লিম্ফোমার কারণে ঘাড়সহ শরীরের অন্যান্য স্থানের লিম্ফনোড বা লসিকা গ্রন্থিগুলো বড় হয়ে যায়। লিম্ফনোডের ভিতরে অনিয়ন্ত্রিত কোষ বিভাজন এর জন্য দায়ী। কিন্তু কোনো কারণে এই অনিয়ন্ত্রিত কোষ বিভাজন হয় তা এখনো সুনির্দিষ্টভাবে জানা যাযনি।

লিম্ফোমাকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা হয়। যথা—

(ক) হজকিন্স (Hodgkin’s Lymphom)

(খ) নান হজকিন্স (NonHodgkin’s Lymphom)

হজকিন্স লিম্ফোমার বৈশিষ্ট্য

(ক) কোষের অস্বাভাবিকতা (Histopathological feature) অনুযায়ী এটিকে নিম্নলিখিত শ্রেণীতে বিভক্ত করা হয়েছে।

প্রকারভেদ (Type) কোষের অস্বাভাবিকতা (Histopathology) আক্রান্তের হার (Incidence)
(১) গুটিযুক্ত লিম্ফোসাইটের সংখ্যাধিক্য হজকিনস লিম্ফোমা

(Nodular Lymphocytic predominant HL)

৫%
(২) শ্রেণীবিন্যাসগত হজকিনস লিম্ফোমা (Classical HL) (১) নডুলার স্কেলেরোজিং(Nodular sclerosing) ৭০%
(২) সংমিশ্রণ টাইপের কোষসমূহ (Mixed cellurarity) ২০%
(৩) লিম্ফোসাইটের আধিক্য ৫%
(৪) লিম্ফোসাইটের কমতি (Lymphocyte depleted) খুব একটা পাওয়া যায় না

(খ) সাধারণত মহিলাদের চেয়ে পুরুষরা সামান্য একটু বেশি আক্রান্ত হয়। পুরুষ:মহিলা = ১.৫:১

(গ) সাধারণত গড় বয়স হিসাবে ৩১ বছর বয়সীদের মাঝে এ রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি। তবে দু’টি স্তরের বয়সের মধ্যে এর আধিক্য বেশি লক্ষ্য করা যায়।

১ম স্তরটি ২০-৩৫ বছরের মাঝে;

২য় স্তরটি ৫০-৭০ বছরের মাঝে;

(ঘ) নডুলার স্কেলেরোজিং টাইপটি সচরাচর কম বয়সী মেয়েদের বেশি দেখা যায়। পক্ষান্তরে মিক্সড সেলুলারিট (Mixed cellurarity) বৃদ্ধদের বেশি দেখা যায়।

অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই লিম্ফনোড ব্যথাহীন, ছোট রবারের গোলকের মতো নরম থাকে। অনেক সময় রোগী কোনো অসুবিধা বোধ করে না আবার কারো কারো কাশি, শ্বাসকষ্ট এমনকি সুপেরিয়র ভেনাকেভাল অবস্ট্রাকশন (Superior venacaval obstruction) অর্থাৎ প্রধান রক্তনালীতে চাপ প্রয়োগের ফলে এ রোগের সৃষ্টি হয়। অন্যান্য শারীরিক অসুবিধার মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী জ্বর, রাতে তীব্র ঘাম হওয়া, দুর্বলতা, ওজন কমে যাওয়া চুলকানি ইত্যাদি কারো হতে পারে।

এই লিম্ফোমা জ্বরের একটি প্রকৃতি আছে। এই জ্বর বেশ কিছুদিন থাকে এর পর কিছুদিন থাকে না। এই ধরনের জ্বরকে পেল ইবস্টেইন ফিভার (Pel-Ebstain Fever) বলা হয়। সুতরাং কারো যদি দীর্ঘদিনের জ্বরের ইতিহাসসহ ওজন কমে যাওয়া ইত্যাদির সাথে লিম্ফনোড বা লসিকা গ্রন্থি ফুলে থাকে বিশেষ করে ঘাড়, বগলসহ শরীরের বিভিন্ন জায়গায়, সেক্ষেত্রে সেটা লিম্ফোমা (Lymphoma) বা লসিকা গ্রন্থির ক্যান্সার হিসেবে সন্দেহ করা উচিত।

রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষা

ক) রক্তের সার্বিক পরীক্ষা (Full blood Count)

ক.১ যদি নরমোসাইটিক নরমোক্রেমিক (Normocytic Normochromic) এ্যানিমিয়া থাকে ও সাথে লিম্ফোসাইটের সংখ্যা কমে যায় তা চরম খারাপ রোগীদের শ্রেণীতে পড়ে

ক.২ ইউসেনোফিল বা নিউট্রোফিলের সংখ্যা বেড়ে যেতে পারে

খ) ই, এস, আর (ESR) : বাড়তি পাওয়া যায়

গ) অস্থিমজ্জার পরীক্ষা (Bone marrow examination) : প্রথমদিকে এখানে আক্রমণ করে না তবে রোগ তীব্র আকার ধারণ করলে এখানে তার উপস্থিতি টের পাওয়া যায়

ঘ) লিম্ফনোড বায়োপসি : শল্য চিকিৎসার মাধ্যমে বা সুঁচ ফুটিয়ে এ পরীক্ষা করা হয়

ঙ) রোগ নির্ণয় ও নির্ণয়ের পর চিকিৎসার সুবিধার জন্য হজকিনস লিম্ফোমাকে কতোগুলো ধাপে (Stage) বিভক্ত করা হয়। এ জন্য নিম্নোক্ত পরীক্ষাগুলোর প্রাথমিকভাবে প্রয়োজন পড়ে

ঙ.১ ওয়ালডেয়ার’ম রিং (Waldeyer’s ring) নামক লিম্ফনোড জায়গায় সুনির্দিষ্টভাবে পরীক্ষা করা হয়

ঙ.২ বুকের এক্স-রে

ঙ.৩ যকৃত (Liver), প্লীহা (Spleen) এ আইসোটোপ দিয়ে স্ক্যান

ঙ.৪ বুকে ও পেটের অংশে সিটি স্ক্যান

ঙ.৫ এম.আর.আই (MRI), সিটির চেয়ে সেইক্ষেত্রে ভালো ফল দেয়-যেখানে বালকি রোগ (Bulky disease) অর্থাৎ যখন কোনো লিম্ফনোড ১০ সেন্টিমিটার এর বেশি হয়

ঙ.৬ হজকিনস লিম্ফোমার পরীক্ষা ও চিকিৎসাগত শ্রেণীবিন্যাস (Staging of Hodgkin’s lymphoma)

ধাপ-১ : একটি স্থানের লিম্ফনোড আক্রান্ত হওয়া অথবা লিম্ফনোডের বাইরের যে কোনো একটি স্থান আক্রান্ত হওয়া।

ধাপ-২ : মধ্যচ্ছেদার (Diaphragm) একই দিকে দু’টি স্থানের লিম্ফনোড আক্রান্ত হওয়া অথবা মধ্যচ্ছেদার একই দিকে একটি স্থানের লিম্ফনোডসহ লিম্ফনোডের বাইরের যে কোনো একটি অংশ আক্রান্ত হওয়া।

ধাপ-৩ : মধ্যচ্ছেদার উভয় দিকের লিম্ফনোড আক্রান্ত হওয়া ক্ট লিম্ফনোডের বাইরে অন্য কোনো অংশ আক্রান্ত হওয়া অথবা প্লিহাতে আক্রান্ত হওয়া।

ধাপ-৪ : এক বা ততোধিক লিম্ফনোডের বাইরে অন্য কোনো অংশে ছড়িয়ে পড়া (যেমন—অস্থিমজ্জা, লিভার, ফুসফুস, পরিপাকতন্ত্র, চর্ম ইত্যাদি)।

উপরে বর্ণিত অংশগুলোর সাথে সমন্বয় রেখে পুনরায় লিম্ফোমাকে নিচের শ্রেণীতে ভাগ করা যায়—

ধাপ-এ : যদি জ্বর, কাশি, গজন হ্রাস ইত্যাদির মতো সাধারণ লক্ষণগুলো না থাকে।

ধাপ-বি : যদি পরিলক্ষিতভাবে ওজন হ্রাস, জ্বর বা রাতে ঘুমানোর সময় ঘেমে যাওয়া ইত্যাদি লক্ষণ থাকে।

প্রচলিত চিকিৎসা

প্রচলিত চিকিৎসার মধ্যে রোগের ধাপ বা পর্যায় (Stage) অনুসারে রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া হয়। তার মধ্যে বিভিন্ন রেজিমেন্টের সমন্বয়ে গড়া কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপি দেওয়া হয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে অস্থিমজ্জা (Bone Marrow) প্রতিস্থাপন করা যেতে পারে।

ক) রেগিথেরাপি : যেসব রোগী ধাপ ১-এ বা ধাপ ২-এ এর আওতায় পড়ে এবং কোনের ধরনের তীব্র সংক্রমণ নেই- তারাই মূলত এই চিকিৎসায় উপকৃত হয়।

খ) কেমোথেরাপি : যেসব রোগী ধাপ ৩-বি ও ধাপ-৪ এর আওতায় পড়ে অথবা রেডিওথেরাপি দেওয়ার পর যাদের মাঝে পুনরায় এ রোগের লক্ষণ প্রকাশিত হয়েছে, তারাই বস্তুত এই পদ্ধতির আওতায় পড়েন।

খ.১ ‘ChIVPP’ পদ্ধতির স্বাস্থ্যবিধান : এই পদ্ধতিতে বমি ও লোমহীন হবার সম্ভাবনা কিছুটা কম। ওষুধসমূহ ৩-৪ সপ্তাহ পর্যন্ত দিতে হয় ও সাধারণত ৬টি ধাপে শেষ করা হয়।

খ.২ ‘ABVD’ পদ্ধতির স্বাস্থ্যবিধান : এই পদ্ধতি পূর্বতন পদ্ধতির নতুন সংস্করণ। শেষ পর্যায়ে জটিলতা স্বরূপ যে ব্লাড ক্যান্সারের প্রবণতা থাকে- তা এখানে কম।

রোগের ওষুধ

ক) ক্লোরামবিউসিল(Chlorambucil-Chl) : ৬ মি.গ্রা./মিটার২ (সর্বোচ্চ ১০ মি.গ্রা. প্রতিদিন) ১-১৪ দিন পর্যন্ত মুখে খেতে হয়।

খ) ভিনব্লাস্টিন (Vinblastin-V) : ৬ মি.গ্রা./মিটার২ (সর্বোচ্চ ১০ মি.গ্রা. প্রতিদিন) দিন ১ ও দিন ৮ শিরাপথে ধীরে ধীরে।

গ) প্রোকারবাজিন (Procarbazine-P) : ১০০ মি.গ্রা./মিটার২ (সর্বোচ্চ ১০ মি.গ্রা. প্রতিদিন) ১-১৪ দিন পর্যন্ত মুখে খেতে হয়।

ঘ) এ্যাডড্রিয়ামাইসিন (Adriamycin-A) : ৭৫ মি.গ্রা./মিটার২ একক মাত্রায় প্রতি ৩ সপ্তাহ পর পর শিরাপথে ধীরে ধীরে।

ঙ) ব্লিওমাইসিন (Bleomycin-B) : ১৫ মি.গ্রা./মিটার২ একক মাত্রায় প্রতি সপ্তাহে ১ বার বা ২ বার ২২৫ মি.গ্রা. পর্যাপ্ত শিরাপতে ধীরে ধীরে।

চ) প্রেডনিসোলোন (Prednisolone-P) : ৪০ মি.গ্রা./মিটার২ ১-১৪ দিন পর্যন্ত মুখে খেতে হয়।

ছ) ডেকারবাজিন (Decarbazine-D) : এটা বর্তমানে VP16 দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়েছে।

লিম্ফোমা মূলত ক্যান্সারজাতীয় রোগ হলেও চিকিৎসা নিলে ভালো হয় এবং দীর্ঘ মেয়াদে ভালো থাকা যায়। এ জন্য দরকার দ্রুত রোগ নির্ণয়, রোগের প্রকৃত অবস্থা জানা এবং সময়মতো চিকিৎসা নেওয়া। এক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া বাঞ্চনীয়।

নন হজকিন্স লিম্ফোমা (NonHodgkin’s Lymphom)

এটি মূলত লিম্ফোয়েড কোষের মনোক্লোনাল প্রোলিফারেশান। সাধারণত বিটা কোষ (β- cell)-এর ক্ষেত্রে ৭০% এবং ‘টি’-কোষ (C-cell)-এর ক্ষেত্রে ৩০%। এটি সাধারণত মহিলাদের তুলনায় পুরুষরা সামান্যতম বেশি আক্রান্ত হয়। এটি আক্রমণের গড় বয়স ৬৫-৭০ বৎসর।

লক্ষণ

কোনো কোনো ক্ষেত্রে লিম্ফনোডগুলো অতি দ্রুত বড় হয় আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে ধীরে ধীরে বাড়ে। আর এই বৃদ্ধির হার সাপেক্ষে নন হজকিন্স লিম্ফোমাকে হাইগ্রেড (Highgrade) অথবা লো গ্রেড (Low grade) পর্যায়ে বিভক্ত করা হয়। হাইগ্রেড টিউমার খুব দ্রুত অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আক্রমণ করে থাকে। কিন্তু লো গ্রেড টিউমার কিছুটা স্থবির হিসেবে থাকে। লো গ্রেড লিম্ফোমাতে সাধারণত লিম্ফনোডগুলো ব্যথাহীন হয়। এগুলো সাধারণত একটি স্থনে অথবা শরীরে বিস্তৃতভাবে ছড়িয়ে আক্রান্ত হতে পারে। অপরপক্ষে হাইগ্রেড লিম্ফোমাতে সাধারণ রোগের লক্ষণ লিম্ফনোড আক্রান্তের লক্ষণ পাওয়া যায় (যেমন—অবসন্নতা, ওজন কমে যাওয়া, জ্বর, ঘাম দেওয়া অথবা অরুচিভাব প্রকাশ পেতে পারে। উল্লেখ্য যে, লিম্ফনোডের বাইরে অন্য কোনো অংশে ছড়িয়ে যাবার প্রবণতা সাধারণত টি-কোষ (T-cell)- টাইপের নন-হজকিন্স লিম্ফোমাতে দেখা যায়। আবার অস্থিমজ্জাতে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা হাইগ্রেডের চেয়ে (১০%) লোগ্রেডের (৫০-৬০%) বেশি।

নন-হজকিনস্ লিম্ফোমার অপর আরেকটি ধরন হলো বারকিট্স লিম্ফোমা (Burkitt’s Lymphoma)। এটিতে পেটে ব্যথাসহ পেট ফুলে যাওয়ার লক্ষণাদি প্রকাশ পায়।

লিম্ফোমাতে আক্রান্ত রোগী অনেক সময় চাপের কারণে (লিম্ফনোড বড় হবার কারণে আশপাশের অঙ্গপ্রত্যঙ্গে যে চাপ সৃষ্টি করে) নানাবিধ লক্ষণাদি প্রকাশ করে থাকে। যদি স্পাইনাল কর্ডের উপরে চাপ পড়ে তাহলে রোগী প্যারালাইসিস হতে পারে। আবার খাদ্যনালী ও ট্রাকিয়ার পাশে চাপের সৃষ্টি হলে রোগী না খেতে পারা অথবা শ্বাসকষ্টজনিত লক্ষণ দেখা যায় অথবা বমি, নাড়ি পচে যাওয়ার উপসর্গ অথবা পেটে পানি জমার লক্ষণও দেখা যেতে পারে।

এই রোগীরা অনেক সময় প্লিহা বড় হয়ে যেতে পারে।

রোগ নির্ণয়ের নন-হজকিন্স লিম্ফোমার ধাপ

বস্তুত হজকিন্স লিম্ফোমার মতোই এর ধাপ নির্ণয় করা হয়। তবে এই রোগে রোগীরা সাধারণত ধাপ-৩ ও ৪-এর লক্ষণ দেখা যেতে পারে।

পরীক্ষা-নিরীক্ষা

পরীক্ষা-নিরীক্ষা মূলত হজকিন্স লিম্ফোমার মতোই। তবে কিছু কিছু সুনির্দিষ্ট চিকিৎসার প্রয়োজন পড়ে যা নিম্নরূপ—

ক) লিম্ফনোড বায়োপসি-এটি সুনির্দিষ্ট পরীক্ষার মধ্যে একটি

খ) সেল মেমব্রেন রিসেপ্টর স্টাডিজ

গ) অস্থিমজ্জা সংগ্রহ করে তার পরীক্ষা

ঘ) স্টেজিং পরীক্ষা

ঙ) HIV সেরোলজি

চিকিৎসা

লোগ্রেড লিম্ফোমার চিকিৎসা : সাধারণত এ ধরনের লিম্ফোমা সচরাচর পর্যবেক্ষণের মধ্যেই রাখা হয়। যদি লক্ষণ প্রকাশ পায় তবেই চিকিৎসা শুরু করা হয়।

ধাপ-১ এবং ২-এ এর ক্ষেত্রে সাধারণত একটি ড্রাগ দিয়ে চিকিৎসা শুরু করা হয়।

ধাপ-২বি, ৩ এবং ৪-এর ক্ষেত্রে সাধারণত একটি ড্রাগ দিয়ে (ক্লোরামবিউসিল) কেমোথেরাপি শুরু করা হয় অথবা (cyclophosphamide, doxorubicin, vincristine and prednisolone) থেরাপির সাথে সমস্ত শরীরে রেডিওথেরাপি দেওয়া হয়।

ইন্টারমিডিয়েট এবং হাইগ্রেড লিম্ফেমার চিকিৎসা

আপ ১-এর ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট জায়গায় রেডিওথেরাপি দিয়ে চিকিৎসা শুরু করা হয়।

আপ ২, ৩, ৪ এই ক্ষেত্রে CHOP থেরাপির সাথে শরীরে রেডিওথেরাপি দেওয়া হয় (সর্বোচ্চ মাত্রায়)।

বর্তমানে মনোক্লোনাল এ্যান্টিবডি থেরাপি (Monoclonal antibody therapy) দেওয়া হয়, যা প্রায় ৬০% ক্ষেত্রে সফলতা বয়ে এনেছে। এটি মূলত CD20 নামক কোষের একটি এ্যান্টিজেনের বিরুদ্ধে সৃষ্ট এ্যান্টিবোডি। এটি রিটুক্সিমাব (Rituximab) নামে অভিহিত।

লিউকেমিয়া (রক্তের ক্যান্সার)

লিউকেমিয়া, ব্লাড ক্যান্সার হিসেবেই আমাদের কাছে বেশি পরিচিত। সহজ কথায় বলতে গেলে এটা একটা রক্তের ক্যান্সার, যেখানে রক্ত তৈরির আদিকোষ (Haemopoietic tissue) গুলো বিশেষ করে শ্বেত কণিকাগুলো অনিয়ন্ত্রিতভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকে। যার ফলে অপরিপক্ব শ্বেত কণিকায় ভরে যায় আমাদের রক্ত। প্রতিবছর প্রতি লাখে প্রায় ১০ জন এই রোগে আক্রান্ত হয়। তবে পুরুষদের আক্রান্তের হার বেশি।

রোগের কারণ

এ রোগের আসল কারণ এখনো অজানা তবে নিম্নলিখিত কারণগুলোকে দায়ী করা হয়—

ক) রেডিয়েশন, রঞ্জনরশ্মি। আধুনিক বিশ্বে বিভিন্ন কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিতে এবং ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ব্যাপক প্রসারে লিউকেমিয়া রোগটি বেশি হচ্ছে। উল্লেখ্য যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণের পর জাপানীদের মধ্যে এই রোগ খুব বেড়ে যায়।

খ) সাইটোটক্সিক ড্রাগ (Cytotoxic drug)

ক্যান্সারে ব্যবহৃত বিভিন্ন ওষুধ ব্যবহারের ফলে এই রোগ হতে পারে।

গ) বিভিন্ন রকম কেমিক্যাল যেমন-বেনজিন নিয়ে যারা কাজ করে।

ঘ) কিছু কিছু ভাইরাসকে এই রোগের জন্য দায়ী করা হয়।

ঙ) কিছু জন্মগত রোগ যেমন- ‘ডাউন সিনড্রোমের’ (Down syndrome) রোগীদের এ রোগ বেশি হয়।

শ্রেণীবিভাগ : লিউকেমিয়া রোগটিকে একিউট লিউকেমিয়া এবং ক্রনিক লিউকেমিয়া এ দুই ভাগে ভাগ করা হয়—

ক) ইকিউট লিউকেমিয়া সাধারণত ১ থেকে ৫ বছর বয়সের বাচ্চাদের বিশেষ করে একিউট লিম্ফোব্লাসটিক লিউকেমিয়া (ALL) হয়ে থাকে। এটি অতি দ্রুতগতিতে সমস্ত শরীরে ছড়িয়ে পড়ে এবং রোগীকে অল্প কয়েক সপ্তাহের মধ্যে মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যায় যদি না এই রোগ সময়মতো ধরা যায় এবং চিকিৎসা করা যায়।

খ) ক্রনিক লিউকেমিয়া সাধারণত একটু বেশি বয়সে হয়ে থাকে, যা অনেকটা ধীর গতিতে শরীরকে আক্রান্ত করে।

রোগের লক্ষণ

শ্বেত কণিকা আমাদের শরীরের আদর্শ সৈনিক। শরীরের কোনো রোগ-জীবাণু ঢোকার সাথে সাথে শ্বেতকণিকা প্রতিরোধ (Defense) করে থাকে। কিন্তু এই শ্বেত কণিকা যখন নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়ে তখনই হয় সব রকম সমস্যা। এ রোগের লক্ষণ দেখা যায় শ্বেত কণিকা সংখ্যার ওপর ভিত্তি করেই।

এই রোগের অপর আরেক ধরনের লিউকিমিয়ার নাম এ্যাকিউট মাইলয়েড লিউকেমিয়া (Acute Myeloid Leukamia), যা সাধারণত বড়দের ক্ষেত্রে দেখা যায়। এটি সাধারণত চারগুণ বেশি এ্যাকুইট লিম্পোসাইটিক লিউকেমিয়া থেকে যা অবশ্যই বড়দের ক্ষেত্রে।

এ্যাকিউট লিউকেমিয়ার রোগীরা অতি অল্প সময়ে রক্তশূন্য হয়ে যায়। অপরিপক্ব শ্বেত কণিকার (Immature WBC) জন্য শরীরে দেখা দেয় বিভিন্ন ধরনের ইনফেকশন এবং প্রচণ্ড জ্বর, গায়ে ও হাড়ে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভূত হয়। বস্তুত রক্তশূন্যতা, ইনফেকশন ও রক্তক্ষরণ এ রোগের মূল লক্ষণ।

রোগীকে পরীক্ষা করলে রক্তের উপাদানের ঘাটতি লক্ষ্য করা যায়, যেমন— রক্তশূন্যতা, শরীরে র‌্যাশ (purpuric spot), লিভার (liver), প্লিহা (spleen) এবং লিম্প গ্ল্যান্ড (lymph Gland) বড় হয়ে যায় এবং শরীরের হাড়ে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভূত হয়।

পরীক্ষা

ক) রক্ত পরীক্ষা

ক.১ রক্ত শূন্যতা অর্থাৎ হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ কম

ক.২ শ্বেত কণিকার পরিমাণ বাড়তেও পারে আবার কমতেও পারে। এটি 1 x 10/লিটার থেকে 500 x 109/লিটার পর্যন্ত হতে পারে

ক.৩ অনুচক্রিকার (platelet) পরিমাণ কমে যায়

ক.৪ ব্লাড ফিল্ম : এক্ষেত্রে পরিপক্ক শ্বেত কণিকার (Mature WBC) চেয়ে অপরিপক্ক শ্বেত কণিকার বা ব্লাস্ট কোষ এর পরিমাণ বেড়ে যায়। এটি একটি সুনির্দিষ্ট পরীক্ষা।

খ) অস্থিমজ্জা পরীক্ষায় যা দেখা যায় তা নিম্নরূপ—

খ.১ কোষের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি

খ.২ সাধারণ পরিপক্ক কোষের চেয়ে অপরিপক্ক ব্লাস্ট সেল এর আধিক্য সাধারণত ২০% এর বেশি এই জাতীয় কোষ দেখা যায়। যদি এউর রডস (Auer rods) ব্লাস্ট সেলের সাইটোপ্লাজমে পাওয়া যায় তাহলে বলা যায় এটি সাইটোব্লাস্টিক ধরনের লিউকেমিয়া।

চিকিৎসা

এই রোগের চিকিৎসার মূল উদ্দেশ্য হল লিউকেমিয়ায় আক্রান্ত কোষগুলোকে মেরে ফেলা এবং অবশিষ্ট স্বাভাবিক মাতৃকোষগুলোকে (stem cell) সংরক্ষণ করা। পরবর্তীকালে উক্ত মাতৃকোষ থেকে পর্যায়ক্রমে স্বাভাবিক কোষের জন্ম নেয়। এটির তিনটি ধাপ রয়েছে—

ক) রোগ ভালো করার প্রাথমিক পর্যায় (Remission Induction)।

খ) প্রাথমিক পর্যায়ে আক্রান্ত কোষ নষ্ট হওয়ার পর যদি কোনো ক্যান্সার আক্রান্ত কোষ থাকে তাকেও ধ্বংস করা (Remission Consolidation)

গ) উপরিউক্ত ধাপে চিকিৎসা দেওয়ার পর কেউ যদি ভালো অবস্থায় চলতে থাকে তবে এই ধাপে তাকে নিয়মিত ওষুধ খেয়ে যেতে হয়। এটি ALL- তে বেশি কার্যকর। এটাকে বলা হয় Remission Maintenance।

উল্লিখিত ধাপসমূহে ওষুধের বাইরেও কিছু কিছু সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা দেওয়া হয় যেগুলো নিম্নরূপ—

(১) রক্তশূন্যতা চিকিৎসা দেওয়া

(২) রক্তক্ষরণ থাকলে তার চিকিৎসা দেওয়া

(৩) ইনফেকশন এবং তার ফলে সৃষ্ট জটিলতা চিকিৎসা প্রদান

ক) ব্যাকটেরিয়াজনিত

খ) ছত্রাক বা ফাংগাসজনিত

গ) ভাইরাসজনিত।

(৪) মানসিকভাবে চাঙ্গা রাখা। কেননা, এ ধরনের রোগী বিভিন্ন ধরনের ডিলিউশন, হ্যালোসিনেশ অথবা প্যারোনিয়াজাতীয় মানসিক ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়।

ক্রনিক লিউকেমিয়া

এ রোগ একটু বেশি বয়সে হয়ে থাকে এবং ধীরে 1×109/লিটার গতিতে অগ্রসর হয়। অনেক রোগী কোনো সমস্যা (Asymptomatic) ছাড়াই থাকতে পারে। তবে, অনেক রোগী দুর্বলতা, রক্তশূন্যতা অরুচি, জ্বর, ক্ষুধামন্দা ও ওজন কমে যাওয়ার লক্ষণ দেখা দিতে পারে।

রোগ নির্ণয়

রক্ত পরীক্ষা করলে রক্তের পেরিফেরাল ব্লাড ফ্লিম (PBF)-এ সাধারণত অপরিপক্ব শ্বেত কণিকার উপস্থিতি বেশি থাকে। অপরিপক্ব কোষের পরিমাণ <১০% অস্থিমজ্জা v (Bone marrow) পরীক্ষা করেও এই রোগের উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া যায়।

কোনো কোনো ক্ষেত্রে ক্রোমোজোমাল প্যাটান সাইটোজেনিক (cytogenic) এবং মলিকিউলার পরীক্ষা করা হ, যা এই রোগের একটা বিশেষ শ্রেণীবিন্যাস এবং রোগের চিকিৎসার অগ্রগতিতে সহায়তা করে থাকে।

চিকিৎসা

এ রোগের বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসা পদ্ধতি রয়েছে। সঠিক সময়ে এ রোগ ধরতে পারলে উপযুক্ত চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব। যার ফলে অনেক রোগীই ভালো হয়ে যায়।

১। কেমোথেরাপি : বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সার বিধ্বংসী ওষুধ দিয়ে এই রোগের চিকিৎসা করা হয়। যাকে কেমোথেরাপি বলে। এত করে ক্যান্সার কোষগুলোকে মেরে ফেলা হয়। সঠিক নিয়মে এই থেরাপি দিতে পারলে একটা বিশাল সংখ্যক রোগীর আয়ুষ্কাল বাড়ানো সম্ভব।

এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ওষুধ নিম্নরূপ—

ক) ক্রনিক মাইলয়েড লিউকেমিয়া (CML)

(১) ইমাটিনিব (Imatinib) : অনিয়ন্ত্রিতভাবে বেড়ে চলা বা জন্ম নেওয়া ক্যান্সার কোষগুলোকে জন্ম দিতে বাধা প্রদান করে। এটি ক্রনিক মাইলয়েড লিউকেমিয়ার ক্ষেত্রে প্রথম সারির ওষুধ।

(২) হাইড্রোক্সি কার্বামাইড (Hydroxy Carbamide) : পূর্বে বেশি ব্যবহৃত হলেও এখনও জনপ্রিয়।

(৩) আলফা ইন্টারফেরন (α Interferone) : ইমিট্যাবের পূর্বে আলফা ইন্টারফেরনকে প্রথম সারির ওষুধ মনে করা হতো। এ ওষুধ প্রায় ৭০% রোগ মুক্ত করাতে সক্ষম।

খ) ক্রনিক লিম্পোসাইটিক লিউকেমিয়া (CLL)

প্রয়োজনীয় ও নির্দেশিত ওষুধগুলো নিচে উল্লেখ করা হল—

(১) ক্লোরামবিউসিল (Chlorambucil);

(২) পিউরিন এনালগ ফ্লুডারাবিন (Purine analogue fludarabine);

(৩) কর্টিকোস্টেরয়েড (Corticosteroid)।

অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন

অল্প বয়সের রোগীর ক্ষেত্রে কেমোথেরাপি দেওয়ার পর এই চিকিৎসা দেওয়া হয়। তবে যার অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন করা হবে তার ব্লাডগ্রুপিং এবং HLA টাইপ ম্যাচ (Match) করিয়ে এই চিকিৎসা করা হয়। অন্য কোনো জটিলতা না হলে এতে রোগী ভালো হয়ে যায়। এই চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল।

স্টেমসেল প্রতিস্থাপন (stemcell) সামনের দিনগুলোতে আশার আলো নিয়ে আসবে, যা এই রোগের চিকিৎসার ক্ষেত্রে একটা বিপ্লব ঘটাবে। নতুন কিছু ওষুধ বাজারে আসছে। যা বিভিন্ন ট্রায়াল (Trial)- এ বিশেষ সফলতা রাখতে পেরেছে। এই রোগের চিকিৎসা ব্যয়বহুল হওয়ায় বিশেষ করে অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপনের জন্য উন্নত ও আধুনিক হাসপাতালে যেতে হয়। সঠিক সময়ে এই রোগ ধরতে পারলে এবং দ্রুত চিকিৎসা শুরু করতে পারলে অধিকাংশ রোগীই ভালো হয়ে যায়।

লেখক
ডা. শাহজাদা সেলিম
সহকারী অধ্যাপক
এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়
হরমোন ও ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ
কমফোর্ট ডক্টর’স চেম্বার
১৬৫-১৬৬, গ্রীন রোড, ঢাকা

আরও পড়ুনঃ   নিম্ন রক্তচাপ দূর করার ঘরোয়া টোটকা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

14 − 8 =