সব রোগ নিরাময়ের এক বিধান প্রতিদিন দুই বেলা ত্রিফলা খান

0
315
ত্রিফলা

‘ত্রিফলা’ অতি চমৎকার এক ভেষজ মিশ্রণ, যা অসংখ্য রোগ নিরাময়ে আয়ুর্বেদ চিকিৎসকেরা ব্যবহার করে থাকেন। রেচক বা জোলাপ হিসেবে এর ব্যবহার হলেও, অসংখ্য রোগ নিরাময়ে এর রয়েছে বিশাল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। আজ বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষের দিনেও ত্রিফলার রোগ নিরাময়ী ভূমিকা পরিপূর্ণভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব হয়নি। তাই অনেক বিজ্ঞানী, চিকিৎসক ও গবেষকের কাছে ত্রিফলা এক অত্যাশ্চর্য ভেষজ মিশ্রণ। শুধু রেচক হিসেবে নয়, উদ্দীপক ও শরীরের বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে এর রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। ত্রিফলা আমাদের শরীর থেকে বিষাক্ত পদার্থ বের করে দেয়, রক্ত পরিষ্কার করে, আমাদের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে পুনঃযৌবন দান করে এবং আমাদের দেহকে নবীন ও শক্তিশালী করে।
সংক্ষিপ্ত পরিচিত
‘ত্রিফলা’ কথাটির মানে হচ্ছে তিন ফলের সমাহার বা মিশ্রণ। আর এই ফল তিনটি হলো- আমলকী, হরীতকী ও বহেড়া। দ্রব্যগুণে ফল তিনটির অবস’ান অনেক ঊর্ধ্বে। শুধু আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে নয়, আধুনিক গবেষণায়ও প্রমাণিত হয়েছে যে, দ্রব্যগুণে সর্বশ্রেষ্ঠ হচ্ছে হরীতকী, দ্বিতীয় স’ানে রয়েছে আমলকী এবং তৃতীয় স’ানে বহেড়া। ফল তিনটির বীজ বাদে বাকি অংশ শুকিয়ে গুঁড়ো করে সমপরিমাণে মিশিয়ে ত্রিফলা তৈরি করা হয়।
আয়ুর্বেদ রসায়নে ‘ত্রিফলা’
আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে বলা হয়েছে, মানবদেহ তিনটি মূল বা সারবস’র সমন্বয়ে গঠিত। এই সারবস’ তিনটি হলো বাতা (Vata), পিত্ত (Pitta) ও কাফা (Kapha)। ‘বাতা যার বাংলা মানে হচ্ছে বায়ু, যা আমাদের মন ও স্নায়ুতন্ত্রের সাথে জড়িত। এর স্বভাব বা প্রকৃতি হচ্ছে শুষ্ক, ঠাণ্ডা, হালকা ও শক্তিশালী। দ্বিতীয় সারবস’ হলো ‘পিত্ত’ যার বাংলা মানে হচ্ছে অগ্নি। এটি আমাদের বিপাকক্রিয়ার সাথে সম্পর্কিত, যা আমাদের দেহে যাবতীয় খাদ্যের হজমক্রিয়া এবং হজম-পরবর্তী খাদ্যের যাবতীয় সারবস’ ‘কাফা’ যার মানে হলো পানি বা শ্লেষ্মা। অনেক সময় পানি বা শ্লেষ্মাকে জীবনের মূল ভিত্তি বলা হয়। এটি আমাদের দেহের সব গঠনক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে। এটি আমাদের দেহের নিত্যনতুন কোষ তৈরি, মাংসপেশির গঠন, হাড়ের গঠন ও বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করে। এর প্রকৃতি বা স্বভাব হলো ঠাণ্ডা, আর্দ্র ও ভারী।
এই বাতা, পিত্ত ও কাফার সমন্বয়ে আমাদের দেহ গঠিত বলে এগুলোর যেকোনো একটির ভারসাম্যহীনতা বা অস্বাভাবিকতা আমাদের দেহে বিভিন্ন প্রকারের রোগ সৃষ্টি করে। আর ত্রিফলাতে রয়েছে এই সারবস’গুলোর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার কার্যকর উপাদান। এ তিন সারবস’র ভারসাম্য রক্ষা করতে পারে বলে একে বলা হয় ত্রিদোষনাশক। ত্রিফলার (আমলকী, হরীতকী ও বহেড়া) প্রতিটি ফলের ত্রিদোষনাশক গুণাবলি থাকলেও এর একেকটি ফল একেকটি সারবস’র (বাতা, পিত্ত ও কাফা) ভারসাম্য রক্ষায় বেশি কার্যকর। কোন ফলটি কোন সারবস’র ভারসাম্য রক্ষায় বেশি কার্যকর তা নিম্নে আলোচনা করা হলো।
হরীতকী- এ ফলটি তিক্ত স্বাদযুক্ত যা আমাদের ‘বাতা’ (Vata) নামক সারবস’ তথা মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের কার্যাবলি নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য রক্ষা করে। তাই মস্তিষ্ক ও স্নায়ুবিক কোনো রোগে হরীতকী খুবই কার্যকর। হরীতকী রেচক, সঙ্কোচক, পিচ্ছিলকারক, পরজীবীনাশক, মাংসপেশির সঙ্কোচক প্রতিরোধক এবং স্নায়ুবিক দুর্বলতা প্রতিরোধী গুণসম্পন্ন। তাই দীর্ঘকালীন কোষ্ঠকাঠিন্য, স্নায়ুবিক দুর্বলতা, উদ্বিগ্নতা এবং অল্পতেই হৃদকম্পন বেড়ে যাওয়ার চিকিৎসায় হরীতকী ব্যবহৃত হয়। ত্রিফলার তিনটি ফলের মধ্যে হরীতকী সর্বশ্রেষ্ঠ রেচক এবং দ্রব্যগুণেও সর্বশ্রেষ্ঠ।
আমলকী- আমলকী অম্ল বা টকস্বাদযুক্ত যা পিত্ত (Pitta) নামক সারবস’র ভারসাম্য রক্ষায় খুবই কার্যকর। এটি ঠাণ্ডাকারক, সঙ্কোচক, মৃদু বিরেচক গুণসম্পন্ন তাই আমাদের বিপাক (Metabolism) জনিত বিভিন্ন সমস্যা যেমন- আলসার, পাকস’লীর প্রদাহ, আন্ত্রিক প্রদাহ, কোষ্ঠকাঠিন্য, ডায়রিয়া, কলিজা বা লিভারের জ্বালাপোড়া, কলিজার সংক্রামণ (Liver Infection) এবং শরীরের জ্বালাপোড়া নিরাময়ে আমলকী খুবই কার্যকর। আধুনিক কালের অসংখ্য গবেষণায় আমলকীর ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাস প্রতিরোধী, কফ নিঃসারক এবং হৃৎপিণ্ডের টনিক গুণাবলির প্রমাণ পাওয়া যায়। আমলকী ভিটামিন-সি রয়েছে এবং এর ভিটামিন-সি তাপে নষ্ট হয় না। এমনকি অতি উচ্চ তাপেও এর ভিটামিন-সি নষ্ট হয় না। তাই আমলকীর পুষ্টি ও ঔষধিগুণ অপরিবর্তিত রেখে শুকিয়ে এক বছর পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায়। আমলকীর ভিটামিন-সি দীর্ঘস’ায়ী ও তাপ সহ্যকারী হওয়ার মূল কারণ হলো এতে বিদ্যমান ট্যানিন ভিটামিন-সির সাথে বন্ধন তৈরি করে এবং এর ক্রমাগত হ্রাস বা ধ্বংস হওয়া প্রতিরোধ করে।
বহেড়া- বহেড়া কষায় স্বাদযুক্ত ফল। এটি ‘কাফা’ (Kapha) নামক সারবস’র ভারসাম্য রক্ষায় খুবই কার্যকর। বহেড়া সঙ্কোচক, টনিক, হজমশক্তির বৃদ্ধিকারক এবং মাংসপেশির সঙ্কোচন (Spasm) প্রতিরোধক গুণসম্পন্ন। বহেড়া দেহের প্রধান জীবনীশক্তি শ্লেষ্মা তথা রসকে বিশুদ্ধ করে এবং এর ভারসাম্য রক্ষা করে। তাই বহেড়া হাঁপানি, অ্যালার্জি, ব্রঙ্কাইটিস ও কাশির ক্ষেত্রে খুবই কার্যকর।
দেহ রোগাক্রান্ত হওয়ার কারণ
প্রাচীনকালে চিকিৎসাশাস্ত্রের একটি কথা প্রচলিত ছিল যে, হজমশক্তি ভালো হলে ভালো রক্ত তৈরি হয়। আর আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে বলা হয়, হজমশক্তির দুর্বলতা তথা আন্ত্রিক দুর্বলতাই দেহে রোগ সৃষ্টির প্রধান কারণ। এই প্রাচীন তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই বিশ্বের অনেক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয় রোগ সৃষ্টির মূল কারণ অনুসন্ধানে অসংখ্য গবেষণাকর্ম পরিচালনা করে। সব গবেষণার ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে গবেষকেরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, কোষ্ঠকাঠিন্য, হজমশক্তির দুর্বলতা এবং আন্ত্রিক দুর্বলতাই দেহে রোগ সৃষ্টির প্রধান কারণ।
আমরা যেসব খাবার ও পানীয় গ্রহণ করি আমাদের শরীর সেসব খাদ্য ও পানীয় হতে প্রয়োজনীয় শক্তি উৎপন্ন করে। আর খাদ্যকে শক্তি উৎপাদদনের জন্য ও শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ব্যবহার উপযোগী সরল উপাদানে পরিণত করার কাজটি করে তাকে পরিপাকতন্ত্র।
আর এই পরিপাকে অংশগ্রহণ করে হজমে সহায়তাকারী বিভিন্ন পাচক রস, এনজাইম ও অ্যাসিড। তাই আমাদের শরীরের হজমশক্তি যদি দুর্বল হয় তবে শরীর জৈবিক কার্যাবলি নিয়ন্ত্রণের জন্য পর্যাপ্ত শক্তি পায় না এবং এর ফলে আমাদের শরীরে বাসা বাঁধে অসংখ্য রোগ এবং সৃষ্টি করে শারীরিক জটিলতা।
কেন ও কিভাবে রোগ হয়
আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে বলা হয়েছে, আমাদের শরীরে যখন ক্ষতিকর এবং বিষাক্ত বস’ উৎপন্ন হয়, তখন সেসব বিষাক্ত বস’র বিষক্রিয়ায় শরীরের সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা ব্যাহত হয়। এই বিষাক্ত বস’গুলোকে বলা হয় ‘আমা’ (Ama)। ‘আমা’ হলো আঁঠালো শ্লেষ্মাজাতীয় পদার্থ, যা আমাদের দেহে বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্যের আংশিক বা অসম্পূর্ণ হজমের ফলে উৎপন্ন হয়। এ আমা আমাদের শরীরের মূল সারবস’গুলোর (বাতা, পিত্ত ও কাফা) ভারসাম্যতা নষ্ট করে এবং শরীরে সৃষ্টি করে রোগব্যাধি। ‘আমা’ শুধু আমাদের শরীরের মূল সারবস’গুলোর (বাতা, পিত্ত ও কাফা) ভারসাম্যতা নষ্ট করে এবং শরীরে সৃষ্টি করে রোগব্যাধি। ‘আমা’ শুধু আমাদের দেহে রোগ বা জটিলতা সৃষ্টিই নয়, বরং অকালবার্ধক্যেরও সৃষ্টি করে।
আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে বলা হয়েছে, খাদ্যদ্রব্যের আংশিক বা অসম্পূর্ণ হজম বা বিপাকের (Metabolism) ফলে উৎপন্ন আঁঠালো শ্লেষ্মাজাতীয় পদার্থ বা ‘আমা’ দেহে রোগ সৃষ্টির প্রধান কারণ। আর চীনা লোকজ চিকিৎসাশাস্ত্রে এক ‘অদৃশ্য শ্লেষ্মা’-কে বলা হয়েছে রোগের মূল কারণ। এ প্রাচীন তথ্যগুলোর ওপর ভিত্তি করে বিজ্ঞানীরা অসংখ্য গবেষণা পরিচালনা করেন। সেসব গবেষণাপ্রসূত ফলের ওপর ভিত্তি করে আজ তারা বলেছেন, সেই ‘আমা’ বা অদৃশ্য শ্লেষ্মাই ইচ্ছে রক্তের অতিরিক্ত কোলেস্টেরল ও লিপিড।
গবেষণায় আর দেখানো হয়, এই কোলেস্টেরল ও লিপিড শ্লেষ্মাধর্মী ও আঠালো। এর ফলে এগুলো রক্তনালীতে জমে রক্তনালী পুরু করে রক্তের স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত করে। আর এর ফলে শরীরে ক্যান্সার, হৃদরোগ, বাত রোগ সৃষ্টি হয় এবং শরীর অকালেই বার্ধক্য জরাগ্রস্ত হয়ে পড়ে।
‘আমা’ এর ফলে সৃষ্ট রোগসমূহ
‘আমা’ বা আঁঠালো শ্লেষ্মাধর্মী বস’টির বৈশিষ্ট্য আজো আমাদের কাছে পরিপূর্ণভাবে স্বচ্ছ নয়। কিন’ গবেষণায় প্রমাণ পাওয়া যায়, এই ‘আমা’ই বাতা (Vata), পিত্ত (Pitta) ও কাফার (Kapha) মধ্যকার সাম্যাবস’া বিনষ্ট করে শরীরে রোগ সৃষ্টি করে। ‘আমা’ শরীরে যেসব রোগ বা জটিলতা সৃষ্টি করে তার একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা নিম্নে দেয়া হলো-
১. বদহজম ২. কোষ্ঠকাঠিন্য ৩. ক্যান্সার ৪. ডায়াবেটিস ৫. উচ্চ রক্তচাপ ৬. হৃদরোগ ৭. শ্বাসকষ্ট ৮. শোথ রোগ ৯. রোগপ্রতিরোধ শক্তি কমে যাওয়া ১০. অকালবার্ধক্য ১১. যকৃৎ বা লিভারে সমস্যা ১২. ক্রমাগত মাথাব্যথা ১৩. দৃষ্টিশক্তি হ্রাস ১৪. শারীরিক শক্তিসহ আরো অসংখ্য রোগ।
রোগমুক্তির সমাধান
যেহেতু তিন সারবস’র ভারসাম্যহীনতা বা ত্রিদোষ এবং ‘আমা’-এর ফলে দেহে রোগ হয়, তাই ত্রিদোষনাশক ও আমানাশক বস’ই পারবে আমাদের রোগমুক্ত করতে। আর ‘ত্রিফলা’ হচ্ছে সেই আশ্চর্যজনক মিশ্রণ বা ত্রিদোষনাশক ও আমানাশক। ত্রিফলাতে রয়েছে অ্যানথ্রাকুইনোন, যা কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে এবং হজমশক্তি বৃদ্ধি করে। তাই রেচক হিসেবে এর ব্যবহার সবচেয়ে বেশি হয়। কিন’ শুধু রেচক হিসেবে নয় উদ্দীপক, দেহ পরিষ্কারক, বিষাক্ত বস’ নিঃসারক, বলবৃদ্ধিকারক ও অকালবার্ধক্য প্রতিরোধক হিসেবেও ত্রিফলা খুবই কার্যকর। তাই ত্রিদোষনাশ ও আমানাশ করার মাধ্যমে আমাদের সুস’ রাখতে ত্রিফলার অবদান অনন্য।
ত্রিফলার কিছু গুণ
আজ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ত্রিফলার ওপর গবেষণা হচ্ছে। ত্রিফলার অনেক গুণ আজ আমাদের কাছে প্রমাণিত। নিম্নে এর কিছু গুণ দেয়া হলো-
১. হজমশক্তি বৃদ্ধি করে ২. অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে ৩. দেহে রক্তসঞ্চালন বাড়ায় ৪. রক্তচাপ কমায় ৫. হৃদরোগ কমায় ৬. রক্তে কোলেস্টেরল কমায় ৭. যকৃৎ বা লিভারের রোগপ্রতিরোধ করে ৮. লিভারের পিত্ত (Bile) নিঃসরণ বাড়ায় ৯. কফ নিঃসরণ করে ১০. ক্যান্সার প্রতিরোধ করে ১১. ওজন হ্রাস করে ১২. ব্যাকটেরিয়া প্রতিরোধ করে ১৩. অ্যালার্জি কমায় ১৪. BIV, CMV, হার্পেস (Harpes) ভাইরাস প্রতিরোধ করে ১৫. এইডস প্রতিরোধ করে ১৬. উপকারী ফ্যাটি অ্যাসিডের (HDL) পরিমাণ বাড়ায় প্রভৃতি।
ত্রিফলা কিভাবে দেহকে দোষমুক্ত করে
ত্রিফলার ত্রিদোষনাশক গুণাবলি বুঝতে হলে আগে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো সম্পর্কে ধারণা পরিষ্কার করা প্রয়োজন।
লবণাক্ত কোষ্ঠ পরিষ্কারক- এগুলো লবণ বা লবণাক্ত খাবারের সমন্বয়ে তৈরি। লবণের এক অনন্য বা বিশেষ গুণ হলো এটি পানি শোষণ করতে পারে। যখন লবণ বা লবণাক্ত খাবার আমাদের অন্ত্রে পৌঁছে, সেগুলো তখন আশপাশের কোষ ও কলা থেকে পানি শোষণ করে। ফলে পরিপাককৃত খাবারে পানির পরিমাণ বেড়ে যায় ও মল নরম হয়।
সাধারণ কোষ্ঠ পরিষ্কারক- এগুলো হাইড্রোজেন ও কার্বনের (হাইড্রোকার্বন) সমন্বয়ে গঠিত যৌগের কেলাস ও রেচক অপেক্ষা শক্তিশালী কোষ্ঠ পরিষ্কারক।
অতিশক্তিশালী কোষ্ঠ পরিষ্কারক- এগুলো অতি মাত্রায় শক্তিশালী কোষ্ঠ পরিষ্কারক। ফলে মলাশয়ে ও পরিপাকতন্ত্রে থাকা সব মলাংশকে দেহ হতে বের করে দিতে পারে এবং অন্ত্রের স্বাভাবিক সঙ্কোচন প্রসারণে সহায়তা করে। এগুলো মলকে অতি মাত্রায় পাতলা করে শরীর থেকে বের করে দেয়। কিন’ মল অতি মাত্রায় পাতলা করার ফলে অনেক সময় শরীরে আয়নের (Ion) ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায় এবং বিশাল ক্ষতিও হতে পারে। তাই অভিজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া এগুলো সেবন করা অনুচিত।
পিত্ত নিঃসারক- এগুলো এক বিশেষ ধরনের কোষ্ঠ পরিষ্কারক, যেগুলো কোষ্ঠ পরিষ্কারের পাশাপাশি যকৃৎ (Liver) থেকে পিত্ত নিঃসরণ বাড়ায় এবং অন্ত্র ও পৌষ্টিক নালীর স্বাভাবিক সঙ্কোচন প্রসারণ নিয়ন্ত্রণ করে। পিত্ত মলকে নরম হতে সহায়তা করে।
উপরি উক্ত আলোচনার মাধ্যমে আমরা বিভিন্ন রকমের কোষ্ঠ পরিষ্কারক সম্পর্কে ধারণা পেয়েছি। এখন ত্রিফলার কার্যকারিতা সম্পর্কে বলা যাক। ত্রিফলা এক বিশেষ ধরনের মৃদু বিরেচক, যা মল নরম করার পাশাপাশি অন্ত্রের সঙ্কোচন প্রসারণক্রিয়া বাড়ায় অর্থাৎ ত্রিফলার প্রতিটি কাজই আমাদের দেহের জন্য উপকারী ও খুবই ভারসাম্যপূর্ণ।
শুধু রেচক বা কোষ্ঠ পরিষ্কারক হিসেবেই নয়, বরং অন্ত্রে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া এবং এদের রোগ সৃষ্টিকারী ক্ষমতাও ত্রিফলা ধ্বংস করে দেয়। আর হজমশক্তির দুর্বলতাই যেহেতু ‘আমা’ বা রোগ সৃষ্টির মূল তাই ত্রিফলা হজমশক্তি বৃদ্ধির মাধ্যমে দেহকে প্রয়োজনীয় শক্তির সরবরাহ করে ও রোগমুক্ত রাখে।
ত্রিফলা কিভাবে কাজ করে
ত্রিফলা এক অতি চমৎকার ভেষজ মিশ্রণ, যা আমাদের শরীরের সব অঙ্গপত্যঙ্গের ওপর উপকারী ও কার্যকর ভূমিকা পালন করে। নিম্ন বিভিন্ন তন্ত্রের (System) ওপর এর কার্যকারিতা ব্যাখ্যা করা হলো।
বাহ্যিক ব্যবহারে- ত্রিফলা চূর্ণ চোখের জন্য খুবই উপকারী। ত্রিফলা দৃষ্টিশক্তি বাড়ায় এবং চোখের অনেক রোগ দূর করে। ত্রিফলা ঘৃত, এক আয়ুর্বেদি ওষুধ যা চোখের পেশিগুলোকে শক্তিশালী করে। চোখের রোগের চিকিৎসায় ত্রিফলার কাথ খুবই কার্যকর। এ ছাড়া ত্রিফলার পেস্ট ক্ষত নিরাময় এবং ফেলা কমাতে খুবই কার্যকর।
স্নায়ুতন্ত্রের ভারসাম্যতায়- আমাদের স্নায়ুতন্ত্রের ওপর রয়েছে ত্রিফলার বিশাল উপকারী ভূমিকা। ত্রিফলা আমাদের স্নায়ুতন্ত্রকে উদ্দীপিত করে এবং কর্মক্ষমতা বাড়ায়। ফলে মস্তিষ্ক দ্রুত কোনো কাজের সিদ্ধান্ত নিতে পারে। আয়ুর্বেদ শাস্ত্র মতে, যেকোনো স্নায়ুবিক রোগই বাতা (Vata) নামক সারবস’র ভারসাম্যহীনতার ফলে হয়। ত্রিফলা শুধু বাতা (Vata) নয়, পিত্ত (Pitta) ও কাপা (Kapha) অর্থাৎ তিনটির ভারসাম্য রক্ষা করতে পারে। তাই মস্তিষ্ক ও স্নায়ু সম্পর্কিত যেকোনো রোগ নিরাময়ে ত্রিফলা খুবই উপকারী ভূমিকা পালন করতে পারে।
পরিপাকতন্ত্রে হজমশক্তি বৃদ্ধিতে ত্রিফলা খুবই কার্যকর। এটি শুধু হজমশক্তি বৃদ্ধি করে না বরং খাদ্যের উপাদানগুলোর শোষণেও সহায়তা করে। এটি পৌষ্টিক নালীর সঙ্কোচন প্রসারণ স্বাভাবিক রাখে। এটি যকৃৎ থেকে পিত্ত নিঃসরণসহ অন্যান্য অঙ্গের পাচক রস নিঃসরণ বাড়ায়। এটি পাকস’লীর অম্লীয় (Acidic) ও ক্ষারীয় (Alkaline) অবস’া নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে হজমশক্তি বৃদ্ধি করে এবং সঠিক হজমক্রিয়া পরিচালনা করে। এটি ক্ষুধামান্দ্য দূর করে এবং আমাদের মাঝে আহার করার প্রবণতা সৃষ্টি করে। এটি আমাদের অন্ত্রের সঙ্কোচন প্রসারণ বাড়ায় এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে। সর্বোপরি এটি আমাদের পাকস’লীর মসৃণ পেশির টান বা সঙ্কোচন (Spasm) প্রতিরোধ করে এবং এর স্বাভাবিক কার্যাবলি সাধনে সাহায্য করে।
রক্তসংবহন তন্ত্র- এটি আমাদের রক্তসংবহনতন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যকলাপ সাধনের খুবই উপকারী ভূমিকা পালন করে। এটি রক্ত শোধনের পাশাপাশি হৃৎপিণ্ডের কর্মক্ষমতাও বাড়ায়। এটি রক্তে ব্যাকটেরিয়া ও পরজীবীর পরিমাণ কমায় এবং এদের মাধ্যমে সৃষ্ট সম্ভাব্য রোগ প্রতিরোধ করে। এটি আমাদের দেহে কোলেস্টেরল, এলডিএল (LDL) এবং ক্ষতিকর লিপিডের পরিমাণ কমায় এবং আমাদের হৃদরোগের ঝুঁকিমুক্ত রাখে। এটি আমাদের সব শরীরে রক্ত সরবরাহ বৃদ্ধি করে, দেহের সব কোষ ও কলায় প্রয়োজনীয় শক্তি সরবরাহ করে।
শ্বসনতন্ত্রে- এটি আমাদের শ্বাসনালী থেকে শ্লেষ্মা নিঃসরণ করে এবং আমাদের শ্বাসনালীর কর্মক্ষমতা স্বাভাবিক রাখে। এটি দেহে ও শ্বাসনালীতে অ্যালার্জির প্রকোপ কমায়, ফলে অ্যাজমা রোগে খুবই উপকারী ভূমিকা পালন করে। এটি আমাদের সাইনাস থেকে শ্লেষ্মা বের করে দেয়, ফলে সাইনোসাইটিসজনিত মাথাব্যথা প্রতিহত করে।
প্রজননতন্ত্রে- প্রজননতন্ত্রের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধিতে ত্রিফলা খুবই উপকারী। এটি প্রজনন অঙ্গগুলোর pH লেভেল নিয়ন্ত্রণ করে, যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটি আমাদের প্রজনন অঙ্গকে শক্তিশালী করে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ত্রিফলা পুরুষের শুক্রাণু বৃদ্ধি করে এবং মহিলাদের মাসিক চক্র নিয়মিত করে। তাই প্রজননতন্ত্রের সমস্যায় ত্রিফলার ব্যবহার খুবই ফলপ্রসূ।
রেচনতন্ত্রে- এটি আমাদের রেচনতন্ত্রের (কিডনি) কার্যাবলিতে সহায়তা করে। ফলে অন্ত্র পরিমাণমতো পানির সরবরাহ পায় এবং কোষ্ঠকাঠিন্য নিরাময় হয়। অপর দিকে এটি মূত্র সংবহনতন্ত্রের কর্মক্ষমতা বাড়ায়। অন্ত্র, মূত্র সংবহনতন্ত্র ও রেচন তন্ত্রের ভারসাম্যপূর্ণ স্বাভাবিক কার্যক্রমের জন্য দেহ শীতল থাকে এবং উচ্চ তাপমাত্রায় হিট স্ট্রোক হওয়ার ঝুঁকি কমে।
চামড়া সজীব রাখতে- এটি আমাদের চামড়ার স্বাভাবিক গঠন নিয়ন্ত্রণ ও রক্ষা করতে পারে। ত্রিফলা দেহে রক্তসঞ্চালন বাড়ায় ফলে চামড়া পরিপূর্ণ পুষ্টি পায়। অপর দিকে বেশি রক্তসঞ্চালন হওয়ায় চামড়ার মৃত কোষগুলোর অপসারণ হয়। ত্রিফলা বয়সের ফলে চামড়ার ভাঁজ ও চুল সাদা হয়ে যাওয়া প্রতিরোধ করে। ত্রিফলা দেহে রক্ত ও পানির সুসামঞ্জস্য রক্ষা করে, ফলে ত্বক উজ্জ্বল ও আর্দ্র থাকে এবং বয়সের ছাপ পড়ে না।
ত্রিফলার সাধারণ প্রস্তুতপ্রণালী
ত্রিফলা হলো হরীতকী, বহেড়া ও আমলকীর মিশ্রণ। এই মিশ্রণ তৈরি করার জন্য প্রথমে ফল সংগ্রহ করে শুকাতে হবে। তার পর বীজ বাদে ফলের বাকি অংশ সংগ্রহ করতে হবে। অতঃপর হরীতকী, বহেড়া ও আমলকী যথাক্রমে সমান অনুপাতে বা ১:২:৩ বা ১:২:৩ ১:২:৪ অনুপাতে মিশিয়ে গুঁড়া করতে হবে। অতঃপর এই গুঁড়া সুতি কাপড় দিয়ে চেলে, মিহি গুঁড়ার মিম্রণ ত্রিফলা হিসেবে ব্যবহার করা যাবে।
সাধারণ ও দৈনন্দিন ব্যবহারবিধি
এই ত্রিফলার গুঁড়া প্রতিদিন দুই বা তিন গ্রাম সেবন করা যাবে। তবে সকাল বেলা মধুর সাথে ২ গ্রাম, দুপুর বা বিকেলে কুসুম গরমপানিতে দুই গ্রাম এবং রাতে ঘুমাবার আগে দুধের সাথে দুই গ্রাম সেবন করা উত্তম।
ত্রিফলা গুঁড়ার কার্যকারিতা দুই মাস পর হতে কমতে শুরু করে। তাই দুই মাসের অধিক সময়ের বেশি পুরনো ত্রিফলার গুঁড়া সেবন না করাই ভালো।
ত্রিফলার আয়ুর্বেদিক প্রস্তুত প্রণালী ও ব্যবহারবিধি
আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে চার প্রকার ত্রিফলা মিশ্রণের প্রস্তুত প্রণালী ও ব্যবহার সম্পর্কে জানা যায়। সেখানে বলা হয়, এই প্রতিটি মিশ্রণই রোগ প্রতিরোধে এবং আয়ুষ্কাল বৃদ্ধিতে কার্যকর। নিম্নে মিশ্রণগুলোর প্রস’ত প্রণালী ও ব্যবহার দেয়া হলো-
‘ত্রিফলা’ রসায়ন নম্বর ১- যারা যৌবন ধরে রাখতে চান ও দীর্ঘজীবী হতে চান, তাদের জন্য এটি খুবই কার্যকর। এই প্রক্রিয়ার প্রথমে সকাল বেলা খালি পেটে একটি হরীতকী ফলের মিহি বা পাউডার খেতে হবে। অতঃপর সকালের আহারের আগে একটি আমলকী ও একটি বহেড়ার পাউডার খেতে হবে এবং আহার শেষে চারটি আমলকীর পাউডার ঘির সাথে মিশিয়ে খেতে হবে। এটি এক বছর চালিয়ে যেতে হবে। চরক সহিংতায় বলা আছে, যে ব্যক্তি এই ব্যবহারবিধি নিয়মিতভাবে মেনে চলবে সে অবশ্যই ১০০ বছর নীরোগ ও সুস্থ দেহে বাঁচবে।

আরও পড়ুনঃ   আলু দিয়ে সাদা চুলকে কালো করার উপায় জেনে নিন

ত্রিফলা রসায়ন নম্বর ২- এই প্রণালীতে প্রথমে ত্রিফলা পাউডার পানিসহযোগে পেস্ট করতে হবে। অতঃপর এই পেস্ট লোহার তৈরি বড় পাত্রে রাখতে হবে এবং এভাব ২৪ ঘণ্টা রেখে দিতে হবে। তার পর এই পেস্ট পাত্র থেকে খুঁচিয়ে তুলে মধু ও পানিসহযোগে পান করতে হবে। যে এই প্রণালী ও ব্যবহার বিধি এক বছর পালন করবে সে দীর্ঘজীবী হবে এবং যৌবন ধরে রাখতে পারবে।

ত্রিফলা রসায়ন নম্বর ৩- এই প্রণালীতে ত্রিফলা ষষ্ঠিমধু, গোলমরিচ, মিশ্রি, মধু ঘি ও বাঁশলোচনসহযোগে খেতে হবে। এসব উপাদান মিশিয়ে ১০ গ্রাম এর মিশ্রণ তৈরি করতে হবে, যা দুই বারে খেতে হবে। এটি যৌবন ধরে রাখতে এবং দীর্ঘজীবন লাভ করতে খুবই কার্যকর।

ত্রিফলা রসায়ন নম্বর ৪- এই প্রণালীতে বিভিন্ন ধাতুর (সোনা, রুপা, কপার, জিংক, লোহা ও সীসা) ভষ্ম, মধু, ঘি, পিপুল, খনিজ লবণসহযোগে ত্রিফলার সাথে মিশিয়ে খেতে হবে। এটি মস্তিষ্কের কর্মদক্ষতা ও স্মরণশক্তি বাড়ায়, রোগমুক্ত দেহ ও দীর্ঘজীবন লাভে সহায়তা করে।
আমাদের কথা
বিজ্ঞান যতই উৎকর্ষের দিকে যাচ্ছে মানুষ ততই বেশি রোগাক্রান্ত হচ্ছে। কিন্তু আমরা কি কখনো ভেবে দেখি, কেন এমনটি হচ্ছে? বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রার সাথে সাথে মানুষের জীবন হয়ে যাচ্ছে যান্ত্রিক। যান্ত্রিক জীবনযাত্রার ফলে শরীরে বাড়ছে কোলেস্টেরল। এ ছাড়াও রয়েছে অসংখ্য মানসিক চাপ। আর এই মানসিক চাপের ফলে দেহে উৎপন্ন হচ্ছে কর্টিসল (Cortisol) বা কর্টিকোস্টেরয়েড (Corticosteroid) নামক ক্ষতিকর উপাদান, যা আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ধ্বংস করে দিচ্ছে, কমিয়ে দিচ্ছে যৌনক্ষমতা আর দেহকে করছে বার্ধক্য জড়াগ্রস্ত। আর শরীরে তৈরি করছে নিত্যনতুন রোগব্যাধি ও জটিলতা। অথচ ত্রিফলা যা খুবই সহজপ্রাপ্য ও সুলভমূল্যের, তাতে রয়েছে কোলেস্টেরল ও কর্টিসল নিয়ন্ত্রণকালী ক্ষমতা। মূলত সুস’ ও নীরোগ দেহ দীর্ঘজীবন লাভের মূল শর্ত। আর ত্রিফলা ব্যবহারে মানুষ হয় দীর্ঘজীবী ও যৌবন হয় দীর্ঘস’ায়ী। তাই প্রতিদিন অন্তত দুই বেলা ত্রিফলা খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন এবং সুস’ ও নীরোগ থাকুন। হাদিসে উল্লেখ রয়েছে, ‘আল্লাহ তায়ালা যেখানে রোগ দিয়েছেন সেখানকার শস্য ও বৃক্ষলতায় এর আরোগ্য দানকারী গুণ দিয়েছেন।’ তাই আমাদের প্রয়োজন প্রকৃতিকে জানা, প্রকৃতির সন্তান বৃক্ষরাজির লালন করা। তাই আর বৃক্ষনিধন নয়, আসুন সবাই প্রকৃতির বৃক্ষরাজির ও তরুলতার গুণ জানি আর এগুলো ব্যবহার করে সুস’ ও নীরোগ দেহে দীর্ঘ জীবন লাভ করি।

আরও পড়ুনঃ   অ্যান্টিবায়োটিকের মতই কাজ করবে ঘরোয়া এই উপাদানগুলো!

ডা. আলমগীর মতি
লেখক : ব্যবস্থাপনা পরিচালক
মডার্ন হারবাল গ্রুপ

মাত্র ২ ফোটা তেল, মুহূর্তেই পরম সুখ!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

19 + 12 =