সিগারেট ছাড়তে আয়ুর্বেদ ও হোমিওপ্যাথি

0
সিগারেট ছাড়তে আয়ুর্বেদ ও হোমিওপ্যাথি

সিগারেট ও তামাকজাত দ্রব্য ছাড়া অনেকের কাছেই প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। কিন্তু তা সম্ভবও করা যায়। কীভাবে? জানাচ্ছেন কেন্দ্রীয় সরকারের আয়ুর্বেদ গবেষণা বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত চিকিৎসাবিজ্ঞানী ডাঃ সুবলকুমার মাইতি ও ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হোমিওপ্যাথির তামাক আসক্তি দূরীকরণ কেন্দ্রের ইনচার্জ ডাঃ প্রলয় শর্মা। সাক্ষাৎকারে সুিপ্রয় নায়েক।

আয়ুর্বেদ 
আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে ধূমপানের বিধান শাস্ত্রসম্মত। তবে সেই ধূমপানের সঙ্গে তামাকের কোনও যোগ নেই। নানা ধরনের রোগ নিরাময়ের জন্য বিভিন্ন ভেষজের দ্বারা ধোঁয়ার ব্যবহারের উল্লেখ রয়েছে।
কারা কারা ধূমপান করতে পারবেন, তারও নির্দেশ রয়েছে।
শ্রান্ত, ভীত, দুঃখিত, বিরক্ত, রাত্রি জাগরিত, পিপাসার্ত, দাহার্ত, তালুশোষী, উদররোগী, শিরোরোগী, চক্ষুরোগী, বমনরোগী, আধ্বানরোগী, উরঃক্ষত রোগী, প্রমেহ রোগী, পাণ্ডুরোগী, সন্তানসম্ভবা নারী, রুক্ষ ও ক্ষীণ ব্যক্তিগণ এবং যেসব ব্যক্তি দাস্ত পরিষ্কারের জন্য জোলাপ নিয়েছেন (ডুস প্রভৃতি), ভাত, দই ও মাছ খেয়েছেন, এছাড়া বালক, বৃদ্ধ ও কৃশ ব্যক্তি ধূমপান করার উপযুক্ত নয়।
ধূমপান বেশি হলে বা অসময়ে করলে তার প্রতিকারের ব্যবস্থাও আছে। কয়েকটি ধূমপানের নমুনা এইরকম—
১. মনঃ শিলা, হরিতাল, যষ্টিমধু, জটামাংসী, মুথা ও ইঙ্গুদী ফল ছাগমূত্র দিয়ে বেটে একটি নতুন কাপড়ের টুকরোয় লেপন করে শুকিয়ে বাতি তৈরি করে শুকিয়ে রাখতে হবে। তারপর একটি শরাতে কুলকাঠের কয়লা দিয়ে আগুন ধরিয়ে তাতে প্রয়োজনমতো বাতি দিয়ে তার উপর ছিদ্রযুক্ত আর একটি শরা চাপা দিতে হবে। শরার ছিদ্রপথ দিয়ে ধোঁয়া বেরলে সেই ছিদ্রপথে নির্দিষ্ট মাপের ধূমপানের নল লাগিয়ে নাসিকার দ্বারা ধূমপান করতে হবে। ধূমপান নাক দিয়ে করে মুখ দিয়ে বের করা যায়, আবার মুখ দিয়ে ধোঁয়া টেনে নাক দিয়ে বের করতে পারে। ৩ দিন এই ধূমপান করলে সর্বদোষোদ্ভব যেসব কাশি কোনও প্রকার ওষুধে প্রশমিত হয়নি, তা এর দ্বারা নিবারিত হবে।
২. মনঃ শিলা জলে ঘষে কতকগুলো কুলপাতায় লাগিয়ে রোদে শুকনো করে রেখে দিতে হবে। সেই কুলপাতার ধূম গ্রহণ করলে সব ধরনের কাশিতে উপকার হয়ে থাকে। দুই ধরনের ধূমপানের পরই দুধ পান করা উচিত।
৩. ফ্লু জাতীয় রোগের প্রতিরোধক ব্যবস্থাগুলির মধ্যে ওষুধযুক্ত ধূমপানের ব্যবস্থা দেখা যায়। যেমন- লবঙ্গ, মরিচ, এলাচ, এরণ্ডমূল, চিতামূল ও সোঁদাল সমানভাগে নিয়ে কুটে গোঘৃত দিয়ে মেখে তামাকের মতো তৈরি করে ধূমপান করার বিধান রয়েছে।
বর্তমানে সমস্যা হল, মানুষ ওষুধ ছেড়ে কেবল তামাকজাতীয় ধূমপানের নেশার কবলে পড়ছে।
বিড়ি ও সিগারেট এমনকী গাঁজার নেশার কবলে পড়ছে অধিকাংশ যুবক-যুবতী। পৃথিবীর সহজতম কাজগুলির মধ্যে অন্যতম হল—ধূমপান আজ ছাড়া কাল ধরা। ছেড়ে দেবার পর অন্য কাউকে ধূমপান করতে দেখলে নেশা দ্বিগুণ হয়ে হাজির হয়। তবে কারো যদি এই নেশাটি ছেড়ে দেবার ইচ্ছা থাকে, তবে নিম্নোক্ত এক বা একাধিক বিধান মানতে পারলে ধূমপান ছাড়াটা অতি সহজ ব্যাপার। যেমন—
*যখনই ধূমপানের ইচ্ছা জাগবে, তখনই ৫/৬টি তুলসীপাতা চিবিয়ে খেতে হবে। বা তুলসী ড্রপস ওষুধটি ৩/৪ ফোঁটা জিভে ছেড়ে নিতে হবে। তারপর এক কাপ গ্রিন টি অতি অবশ্যই খাওয়া দরকার। দুধ দেবেন না। সামান্য চিনি মেশাতে পারেন।
*এক কোয়া রশুনের একটি কোয়া অথবা সাধারণ রশুনের ২/৩টি কোয়া সকালে খালিপেটে চিবিয়ে খেয়ে এক কাপ গ্রিন টি খান। তারপর যখন যখন ধূমপানের ইচ্ছা জাগবে, তখন তখন গ্রিন টি খাবেন।
* যাঁরা বিড়ি-সিগারেটে খুবই আসক্ত, তাঁরা ২/৩ গ্রাম হরতকীচূর্ণ কাপখানিক কলাপাতার রসের সঙ্গে মিশিয়ে সকালের দিকে প্রতিদিন একবার করে খেতে পারেন।
*আর একটি বিধান: পাতিলেবু বা কাগজিলেবু অথা গোঁড়ালেবু একটুকরো নিয়ে তাতে সামান্য লবণ লাগিয়ে হালকা আঁচে গরম করে সেই রস জিভে ফোঁটা ফোঁটা ছাড়তে হবে—যখনই ধূমপানের ইচ্ছে হবে।
* গাঁজা খাবার ইচ্ছাটা যখন জাগবে, তখনই এক টুকরো পেয়ারা চিবিয়ে খাবেন। তারপর হরতকী এক টুকরো মুখে রাখবেন।
* যখনই ধূমপানের ইচ্ছে হবে, তখনই একটা কমলালেবু চুষে চুষে খান।
* ধূমপান ছাড়ার পর নেশা যখনই মনের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি করবে, তখনই এককাপ গ্রিন টি খেয়ে মুখশুদ্ধি হিসাবে হরতকীর একটা টুকরো মুখে রাখুন।
* মুখশুদ্ধি হিসাবে সারাদিনে ব্যবহার করতে পারেন—হরতকী, যষ্টিমধু ও লালবচের টুকরো, শুঁঠ, পিছল, মরিচচূর্ণ, লবঙ্গ প্রভৃতি।
* ছেড়ে দেবার পর ধূমপান করার ইচ্ছা জাগলেই একটা সাদা পান চুন, সামান্য সুপারি ও ধনেভাজা, মৌরি ভাজা লবঙ্গ দিয়ে খেতে পারেন।
নিয়মিত কমলালেবু, পাতিলেবু, কাগজিলেবু, গোঁড়ালেবু, পুরাতন তেঁতুলের টক, পুদিনার চাটনি, পেয়ারা, গাজর, খেজুর, কিশমিশ প্রভৃতি খেলে ধূমপানের জন্য যা ক্ষতি হয়েছে, তা যেমন পূরণ হবে, তেমনি নতুন করে নেশার ইচ্ছেটা চলে যাবে।
আবার ধরা ছাড়া পদ্ধতিতেও ধূমপান ছাড়া যায়। যেমন—প্রথমে ২ দিন ধূমপান না করে আবার ধরলেন। তারপর ২-৩ দিন পান করার পর ৩-৪ দিন ছেড়ে দিন। আবার ২ দিন খান, ৫ দিন ছাড়ুন। ক্রমশ পরিমাণও কমান। এভাবে আসক্তিটা নষ্ট হয়ে গেলে একদিন টুক করে ছেড়ে দিতে পারেন।
তবে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হল সঙ্গদোষ। তাঁরা আপনাকে নেশা ধরাতে অনুরোধ করবে। তাঁদের বিড়ি-সিগারেট, গাঁজার কলকে কিংবা আধুনিক পাতায় আগুন ধরাতে দেখলে আপনার মাথায় যেন ঝোঁক না চেপে বসে। আমি বলব, সেখান থেকে দ্রুত চলে যান। আপ্তবাক্যটি স্মরণ করুন—‘য পলায়তি স জীবতি।’

আরও পড়ুনঃ   চিকিৎসার নামে অপচিকিৎসা: প্রতারিত জনগণ

হোমিওপ্যাথি
সমস্ত রকম নেশার পদার্থের মধ্যে তামাক সবচাইতে বেশি প্রচলিত। বহু বছর আগে দক্ষিণ আমেরিকাতে ওষুধ হিসাবে, ধার্মিক অনুষ্ঠানে এবং পূর্বপুরুষদের তুষ্ট করতে তামাকের ব্যবহার হত। মজার ব্যাপার হল, ১৪৯২ সালে কলম্বাস স্পেন থেকে ভারতের দিকে যাত্রা করার সময় জাহাজ নোঙর করেন দক্ষিণ আমেরিকায়। সেখানেই তিনি প্রথমবার ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের অধিবাসীদের একটা সরু কাঠের নলে তামাক পাতা ভরে ধোঁয়া পান করতে দেখেন। তামাকের ধোঁয়ার জাদু বশ করে ফেলে তাঁকেও। ক্যারিবিয়ানরা যে নালিকার মধ্য দিয়ে তামাক খেতেন, তার নাম ছিল টোবাকো। এর থেকেই পরবর্তীকালে তামাকের নাম হয় টোবাকো।
চিকিৎসা
তামাক খাওয়া এবং ধোঁয়া ত্যাগ করার আনন্দ সহজে ত্যাগ করা সম্ভব নয়। দেখা গিয়েছে, দীর্ঘদিনের তামাকসেবীরা এই নেশা ছাড়ার চেষ্টা করার পর ফের তামাক সেবনের অভ্যাসে ফিরে আসেন। তবে নিজের ইচ্ছাশক্তি থাকলে এ নেশা ত্যাগ করা যায়।
এছাড়া বিশেষ ধরনের মাউথ স্প্রে ব্যবহার করা যায়। এতে তামাক সেবনের ইচ্ছা নষ্ট হয়। সেগুলোতে কাজ না হলে হোমিওপ্যাথি ওষুধের সাহায্যে সিগারেটে আসক্তি দূর করা যায়।
হোমিওপ্যাথিক ওষুধ
ট্যাবেকাম—২০০ থেকে ১০০০ শক্তির ওই ওষুধ সেবনে তামাক সেবনের ইচ্ছা নষ্ট হয়।
ক্যালাডিয়াম ৩০ থেকে ২০০ থেকে ১০০০ শক্তির ওই ওষুধ সেবনে তামাক খাবার ইচ্ছা চলে যায়।
নাক্সভমিকা বহুদিন ধরে ধূমপানের পর অম্বল, গলা-বুক জ্বালা, বমি বমি ভাব হলে ২০০ শক্তির ওষুধ সেবনে তার উপশম হয়।
‌ইগনেশিয়া: দীর্ঘদিন তামাক সেবনের পর বারবার হেঁচকি উঠলে ইগ্নেশিয়া ২০০ খুবই কার্যকরী।
ইপিকাক: দীর্ঘদিন ধরে তামাক সেবনে পর গা বমি বমি ভাব বা বমি হওয়া ও তার সঙ্গে জল পিপাসা থাকলে, জিভ পরিষ্কার থাকলে ইপিকাক ২০০ শক্তির ওষুধ ভালো কাজ করে।
জেলসেমিয়াম: তামাক সেবনের পরে মাথা ঘোরা, মাথার যন্ত্রণার সঙ্গে তৃষ্ণা এবং দুর্বলতা থাকলে জেলসিমিয়াম ২০০ শক্তির ওষুধ সহজেই রোগের উপশম করে। এই প্রসঙ্গে একটা কথা বলি— আজ মানুষের আসক্তি শুধু ধূমপানেই সীমাবদ্ধ নেই। বরং নিত্যনতুন নেশার টানে ছুটে চলেছে মানুষ। দরকার সেই ধরনের নেশা থেকেও মুক্তি।
মদ বা অ্যালকোহল—
প্রথমে নেশাগ্রস্তকে মদ ছাড়তে উৎসাহিত করতে হবে। শুধুমাত্র সঠিক কাউন্সেলিং-এর মাধ্যমে এটি সম্ভব। এই চিকিৎসা পদ্ধতি কতকগুলো ধাপে ধাপে হয়। যেমন একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য স্থির করা, রোগীর আচার ব্যবহারে সংশোধন আনা, নেশায় আক্রান্তের পরিবারকেও চিকিৎসায় সাহায্য করতে হবে। তবে মদ্যপানের জন্য রোগী নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারালে তাঁকে আলাদা চিকিৎসা কেন্দ্রে রেখে চিকিৎসা করতে হবে। তাতে মদ্যপানে আসক্তি সম্পূর্ণরূপে সেরে যায়।
ওষুধ
কুয়েরকাস গ্ল্যানডিয়াম স্পিরিটাস মাদার টিংচার: এই ওষুধ দশ ফোঁটা করে দিনে চার বার করে খেলে মদ্যপান করার ইচ্ছা নষ্ট হয়। এমনকী ওষুধটি ফ্যাটি লিভারেও কার্যকরী।
এছাড়া আরও কিছু কার্যকরী ওষুধ রয়েছে। তবে সেগুলি চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া সেবন করা উচিত নয়।
উদ্বায়ী আঠার নেশা—
উদ্বায়ী পদার্থের প্রতি নেশা ক্রমশ বেড়ে চলেছে স্কুল কলেজের ছেলে-মেয়েদের মধ্যে। নেশার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে পেনসিল, সিডি-মার্কারের কালি, নেলপালিশ তোলার পদার্থ, ড্রাই ক্লিনার-এর জল এবং বিভিন্ন ধরনের আঠা। বিশেষ করে বাজার চলতি পুরানো একটি আঠা খুবই প্রচলিত। আঠাটির মধ্যে আছে টলুইন যা প্রকৃতপক্ষে একটি হাইড্রোকার্বন এবং মারাত্মক নিউরোটক্সিন (স্নায়ু অবশকারী)।
চিকিৎসা
যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে উদ্বায়ী পদার্থের নেশা করছেন, তাঁদের দিতে হবে ট্রাইনাইট্রো টলুইন ৩০ ওষুধটি। নেশাগ্রস্তর ওপর এই ওষুধ খুব ভালো কাজ করে।
গাঁজা
গাঁজা, চরসের মতো নেশার বস্তুর উৎস ‘ক্যানাবিস স্যাটাইভা’ নামক গাছ। এগুলিকে গ্রাসত বলে। এই নেশার পদার্থগুলি মস্তিষ্কে তাৎক্ষণিক আনন্দের ভাব তৈরি করে। গাঁজা ও চরস ধোঁয়া এবং নস্য হিসাবেও সেবন করা হয়। তাৎক্ষণিকভাবে মানসিক প্রফুল্লতা লাভ হলেও এগুলির সুদূরপ্রসারী ফল হয় মারাত্মক। চিকিৎসা
একবার আসক্ত হয়ে পড়লে, এই ধরনের নেশার প্রবৃত্তি থেকে সহজে মুক্তি সম্ভব নয়। নিয়মিত মনোচিকিৎসকের পরামর্শ এবং কাউন্সেলিং-এর মাধ্যমে এই ধরনের নেশা থেকে মানুষ বাঁচতে পারে। তবে সর্বোপরি নেশা ছাড়ার দৃঢ় সংকল্প নেশাক্রান্ত মানুষের মনের মধ্যে না থাকলে নেশার গ্রাস থেকে মুক্তি পাওয়া অসম্ভব।
ওষুধ
ক্যানাবিস স্যাটাইভা: দীর্ঘদিন ধরে নেশা করার ফলে শারীরিক নানা সমস্যা তৈরি হয়। এইসমস্ত ক্ষেত্রে ক্যানাবিস স্যাটাইভা ২০০ শক্তির ওষুধ সেবনে নেশা ছাড়ার পথ প্রশস্ত হয়।
ক্যানাবিস ইন্ডিকা: এটিও খুব উপকারী ওষুধ, তবে চিকিৎসকের পরামর্শ মতো ওষুধ সেবন জরুরি।
নাক্সভম ৩০: দীর্ঘদিন ধরে রোগীর মধ্যে খিদের অভাব, ঘুম না হওয়া, উত্তেজিত ভাব দেখা দিলে এই ওষুধ সেবন করতে হয়। নেশা ছাড়তে নাক্সভম খুবই কার্যকরী ওষুধ।

আরও পড়ুনঃ   মেছতা নিরাময়ে হারবাল চিকিৎসা
অনুলিখন: সুপ্রিয় নায়েক

যে ৮টি ভেষজ ধূমপান ছাড়তে সাহায্য করে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

18 + 7 =