৩০বছরের পর মা হওয়া সম্পর্কে জেনে নিন

0
মা হওয়া

আগের দিন তো আর নেই! লেখাপড়া শেষ করা, চাকরি এসব গুছিয়ে ওঠার পর বিয়ে করতে করতেই অনেক মেয়ের বয়স ৩০ ছুঁই ছুঁই হয়ে যায়।

এছাড়াও বিয়ের পর নিজেদের আন্ডারস্ট্যান্ডিং, আর্থিক সচ্ছলতা, এমন কি চাকরির ভাল পোস্টিং এসব গুছিয়ে ওঠার আগে বাচ্চা নেবার কথা তো অনেকেই ভাবতে পারিনা।

কিন্তু বয়স তো তার প্রভাব রেখেই যায়। আপনি জানেন কি যে আপনার যা বয়স, আপনার ডিম্বাণু গুলোর বয়সও তাই?

মেয়েরা তাদের দেহের সব ডিম্বাণু নিয়েই জন্ম নেয়। তাই একটি মেয়ের ডিম্বাণুর বয়স এবং তার বয়স সমান আর ডিম্বাণুর বয়সই তো গর্ভধারণের একমাত্র মুখ্য বিষয় না। আপনার এবং আপনার স্বামীর স্বাস্থ্য এবং লাইফস্টাইলও অনেক ইম্পরট্যান্ট।

আপনার বয়স যদি ৩০ বা তারও বেশি হয় তাহলে সহজ এবং নিরাপদে গর্ভধারণের এই আর্টিকেলটি আপনার অবশ্যই ফলো করা উচিৎ।

প্রেগন্যান্ট হবার জন্য সেক্স প্ল্যানিং

নিয়মিত হউনঃ আপনার বয়স যেহেতু এখন ৩০+, হয়তো আপনার সেক্স করার আগ্রহ আর আগের মত নেই। কিন্তু আপনার যদি বাচ্চা নেয়ার প্ল্যান থাকে তাহলে আপনাকে অবশ্যই বেশি করে সেক্স করার চেষ্টা করতে হবে।

বেস্ট টাইমঃ নিয়মিত সারামাস ধরে সেক্স করা সম্ভব নাও হতে পারে। সেক্ষেত্রে মনে রাখবেন যে আপনার সন্তান ধারনের সব থেকে বেশি সম্ভাবনাময় সময় হল মাসিক শেষ হবার ৮ দিন পর থেকে ১৯তম দিন পর্যন্ত। এই সময়ে আপনি যদি বেশি বেশি পরিমাণে মিলিত হন, তা আপনার সন্তান ধারনের সম্ভবনাকে বৃদ্ধি করবে।

সেক্স পজিশন খেয়াল রাখুনঃ সত্যিকার অর্থে যেকোনও সেক্স পজিশন(আসন) এ মিলিত হয়েই আপনি প্রেগন্যান্ট হতে পারেন, তবে আপনার স্বামীর শুক্রাণু আপনার ডিম্বাণু পর্যন্ত সহজে পৌঁছাতে পারে যদি সেক্স এর সময় আপনি নিচে থাকেন। আরও ভাল আপনি আপনার পিঠের ওপর শুয়ে আপনার পা ২টি একটু ওপরের দিকে উচু করে রাখলে।

বাদ দিন বাজে অভ্যাসঃ

ধূমপান বন্ধঃ গবেষণায় দেখা যায় প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ ধূমপান আপনার গর্ভধারণের ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। সিগারেটের সাথে থাকা নিকোটিন এবং অন্যান্য জিনিস আপনার গর্ভাশয়, ফেলোপিয়ান টিউবস এবং জরায়ু এর ক্ষতি সাধন করে। যার কারণে আপনার গর্ভধারণ কঠিন হয়ে পড়ে এবং গর্ভধারণের ক্ষমতা দিন দিন কমতে থাকে। এছাড়া পুরুষদের যৌনক্ষমতা কমে যাবার প্রধানতম কারণগুলোর একটি হচ্ছে ধূমপান। সুতরাং, বাচ্চা নেয়ার প্লান থাকলে অবশ্যই ধূমপান বন্ধ করুন এবং আপনার আশে পাশে কেউ ধূমপান করলে তাকে ভদ্র ভাবে মানা করুন অথবা কাছ থেকে সরে যান।

আরও পড়ুনঃ   বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ হতে স্যানিটারি ন্যাপকিনের স্বাস্থ্যঝুঁকি

মদ্য পান বন্ধঃ গবেষণায় দেখা যায় মদ্য পান এবং বাচ্চা জন্মদানের ক্ষমতা কমে যাওয়ার মধ্যে সম্পর্ক আছে। আপনার অথবা আপনার স্বামীর যদি মদ্য পানের অভ্যস থাকে, তাহলে ত্যাগ করুন।

ক্যাফেইন (চা-কফি) গ্রহণ করা নিয়ন্ত্রণ করুনঃ ক্যাফেইন আপনার স্বাভাবিক ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতে পারে যা গর্ভাবস্থায় আপনার জন্য ভাল নয়। এছাড়া এটি আপনার সন্তান ধারনের ক্ষমতাকে ধীর গতি করে দেয় এবং গর্ভপাতের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়। সুতরাং, ক্যাফেইন জাতীয় পানীয় থেকে দূরে থাকুন।একদম না পারলে দিনে বড়জোর ২ কাপ চা/কফি খেতে পারেন।

জাঙ্কফুড বাদ দিনঃ আমি আগেই বলেছি স্বাস্থ্যকর খাবার আপনার গর্ভধারণের জন্য খুবই দরকারি। গর্ভধারণের জন্য এবং গর্ভাবস্থায় ফাস্টফুড অথবা ফ্রোজেন ফুড ইত্যাদি খাওয়া থেকে দূরে থাকুন। তার বদলে ফ্রেশ খাবার রান্না করে খাবেন।

ঔষধ এর বিষয়ে সতর্ক হউনঃ আমরা বাংলাদেশীরা ওষুধ মনে হয় একটু বেশিই খাই। গর্ভধারণের আগে থেকেই আপনার বর্তমানে কি কি ঔষধ খাবার অভ্যাস আছে তা আপনার ডাক্তারের সাথে শেয়ার করুন এবং এগুলো খাওয়া যাবে কিনা তা নিশ্চিত হয়ে নিন। কেননা অনেক ওষুধ গর্ভধারণকে ঝুঁকিপূর্ণ করে দিতে পারে।

বিদায় জানান চিনিকেঃ আপনার ডায়াবেটিস থাকুক আর নাই থাকুক, চিনি সবসময়ই ক্ষতিকর। এটি একদিকে ওজন বাড়িয়ে দিয়ে পরোক্ষভাবে গর্ভধারণে সমস্যা সৃষ্টি করে, অন্যদিকে আপনার প্রজনন ক্ষমতাকেও প্রত্যক্ষভাবে দুর্বল করে ফেলে। তাই চিনিযুক্ত খাবার থেকে নিজেকে দূরে রাখুন।

হয়তো ভাবছেন যে মিস্টি খাওয়া ছাড়বেন কি করে। নাহ! আমরা মিস্টিজাতীয় খাবার খেতে বারণ করিনি, শুধু বলেছি চিনি বাদ দিতে। এক্ষেত্রে চিনির বিকল্প ZeroCal ব্যবহার করুন। এটি স্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ।

চিন্তা মুক্ত থাকুনঃ চিন্তার সাথে গর্ভধারণের কোন সরাসরি সম্পর্ক নেই। তবে আপনি যদি সব সময় কোন কিছু নিয়ে বেশি চিন্তিত থাকনে তাহলে আপনার খাওয়া কমে যাবে, ঘুম ঠিক মত হবে না। এই ব্যাপার গুলো কিন্তু আপনার হরমোনের উপর প্রভাব ফেলবে এবং যার ফলাফল ওভুলেশনে বাধা সৃষ্টি হওয়া।

আরও পড়ুনঃ   গর্ভাবস্থায় যে ১০ টি উপসর্গ দুশ্চিন্তার কারণ নয়

যত্ন নিন নিজের স্বাস্থ্যেরঃ

ওজন কমানঃ অতিরিক্ত ওজন আপনার গর্ভধারণকে বাধা দেয়। আপনার ওজন যদি অনেক বেশি হয়ে থাকে তাহলে চেষ্টা করুন ওজন কমানোর জন্য। তবে ওজন স্বাভাবিক এর চেয়ে কমে যাওয়া কিন্তু আবার ভাল কথা নয়। কারণ, আপনার মাসিক নিয়মতি হওয়ার জন্য স্বাস্থ্য ভাল থাকা প্রয়োজন। আর এইটা নিশ্চিত করতে পারে শুধু মাত্র আপনি যদি একটা স্বাস্থ্য সম্মত জীবন যাপন করেন।

নিয়মিত ব্যায়ামঃ আপনার হয়ত নিয়মিত ব্যায়াম করার অভ্যসা নাও থাকতে পারে কিন্তু এখন আপনি বাচ্চা নেওয়ার কথা ভাবচ্ছেন। তাহলে হাল্কা ব্যায়াম করা শুরু করেন। নিয়মিত ব্যায়াম আপনার গর্ভধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে।

প্রি-নাটাল ভিটামিনঃ এই টার্মটা আমাদের দেশে নতুন হলেও উন্নত দেশ গুলোতে এর ব্যবহার অনেক বেশি। আপনার গর্ভধারণের তিনমাস আগে থেকেই প্রস্তুতি হিসেবে ফলিক এসিড ট্যাবলেট খাওয়া শুরু করুন। এছাড়া ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ি আয়রণ এবং ক্যালসিয়াম ট্যাবলেটও খেতে পারেন।

বদলে ফেলুন খাবার অভ্যাসঃ

আপনার গর্ভধারণের ক্ষমতা বৃদ্ধির সব থেকে ভাল প্লান হল আপনি যদি নিয়মিত স্বাস্থ্য সম্মত খাবার খান। যে সব খাবারে ওমেগা ৩ ফ্যাটি এসিড, ভিটামিন বি৬, সি, ই এবং বেটা ক্যারোটিন বেশি থাকে ঐ সব খাবার বেশি বেশি করে গ্রহণের চেষ্টা করুন। যেমন ভালভাবে সিদ্ধ করে রান্না করা ডিম, সামুদ্রিক মাছ, এবং বিভিন্ন ফলমূল, সবজী।

হাজবেন্ডের স্বাস্থ্যটাও দেখতে হবেঃ

আপনার স্বামীর স্বাস্থ্যঃ বয়সের সাথে সাথে পুরুষের বীর্য এবং শুক্রাণু উৎপাদন ক্ষমতা কমতে থাকে। তবে স্বাস্থ্যের নিয়মিত যত্ন নেয়া হলে এর প্রভাব কাটানো সম্ভব। এছাড়া নিয়মিত বেশি করে সহবাস করার জন্য তার স্বাস্থ্য ভাল থাকা চাই। সুতরাং, যখন সন্তান ধারনের প্লান করবেন তখন স্বাস্থ্য ভাল রাখার জন্য আপনার স্বামীকে বুঝিয়ে বলুন।

আপনার স্বামীর খাবারঃ অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় পুরুষের বীর্যে শুক্রাণুর পরিমাণ কম হবার কারণে সেই দম্পতি বাচ্চা নিতে পারছেনা। প্রাকৃতিক যে খাবার গুলো এই ক্ষেত্রে ম্যাজিকের মত রেজাল্ট দিতে পারে তা হচ্ছে ডিম, কলা, ফুলকপি, ব্রকলি, ডালিম, আখরোট সহ বিভিন্ন বাদাম, রসুন, বার্লি, গরু-খাসীর মাংস, সামুদ্রিক মাছ, শিমের বিচি, মটরশুটি ইত্যাদি। এছাড়া তাকে নিয়মিতভাবে রসালো ফল এবং যথেষ্ট পরিমাণ পানি খেতে বলুন।

আরও পড়ুনঃ   সিজারে এতো আগ্রহ কেন এদেশের চিকিৎসকদের?

পরামর্শ নিন ডাক্তারের

নিয়মিত পরামর্শঃ বাচ্চা নেয়ার প্লান করার সাথে সাথে নিয়মিত ডাক্তারের কাছ থেকে পরামর্শ নেয়া চেষ্টা করুন। আপনার সমস্যা গুলো সম্পর্কে ডাক্তারকে সব সময় জানান।

প্রজনন স্বাস্থ্য পরীক্ষাঃ আপনি হয়ত কিছু দিন ধরে গর্ভধারণের জন্য চেষ্টা করলেন কিন্তু কোন আশার আলো দেখলেন না, তাহলে ডাক্তারের সাথে কথা বলুন। তিনি আপনাদের স্বামীস্ত্রী দুজনেরই কিছু বিশেষ পরীক্ষা দিতে পারেন যাতে করে বোঝা যাবে গর্ভধারণে সমস্যা কেন এবং কার জন্য হচ্ছে। এরপর তিনি আপনাদের এর থেকে সমাধানের জন্য পরামর্শ দিতে পারেন।

অন্যকোনও স্বাস্থ্য সমস্যাঃ আপনার যদি ডাইবেটিস, রক্ত চাপজনিত অসুবিধা  থেকে থাকে তাহলে এটি গর্ভধারণে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। এক্ষেত্রে ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করুন এবং ঐ গুলো কন্ট্রোলে রাখুন যেন আপনার গর্ভধারণকে সহজ হয়।

থাইরয়েড পরীক্ষাঃ থাইরয়েড আপনার গর্ভধারণ কে অনেক বেশি প্রভাব ফেলে। আপনার হরমোনের অবস্থা যদি বেশি ভাল না থাকে তাহলে আপনার গর্ভধারণ বাধাগ্রহস্থ হবে। সুতরাং, বাচ্চা নেয়ার প্লান মাথায় ঘুর ঘুর করার সাথে  সাথে থাইরয়েড চেক করেন এবং ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী স্টেপ নিন।

পরিশিষ্ট

পরিণত বয়সে মা হওয়ার কিছু সুবিধাও আছে। এ বয়সে আপনি অনেক বেশি সচেতন ও যত্নবান হবেন সন্তানের প্রতি, আর দম্পতি হিসাবে নিজেদের মাঝে বোঝা-পড়াও ভাল থাকে ম্যাচিউরড হলে। হ্যাঁ, এটা সত্যি যে বয়সের বাড়তে থাকলে স্বামী-স্ত্রী দুজনেরই প্রজনন ক্ষমতা কমতে থাকে।

কিন্তু দেখলেনই তো যে কিছু বিষয়ে সাবধানী হয়ে পরিকল্পনা করলে ৩০ বছরের পরেও প্রেগন্যান্ট হওয়া কঠিন কিছু না।

আপনার গর্ভধারণ শুভ হউক।

সুত্রঃ সুপারমমবিডি

আরও পড়ুনঃ মূত্রনালির সংক্রমণ, কারণ ও প্রতিকার

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

1 × three =